ভয়ঙ্কর এক নেশা ভিডিও গেমস!
মনিজা রহমান : কিছুদিন আগের ঘটনা। ট্রেনে করে জ্যাকসন হাইটস থেকে পারসন বুলভার্ডে যাচ্ছিলাম এক অনুষ্ঠানে। পরের স্টেশন ফরেস্ট হিলে ট্রেন পৌঁছালো। এক মহিলাকে দেখলাম স্ট্রলারে করে শিশু সন্তানকে নিয়ে ট্রেনে উঠতে যাচ্ছেন, কিন্তু তার আগেই ট্রেনের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। ওদিকে আরেক দরজা দিয়ে ট্রেনে উঠে গেছে তার বড় ছেলে। হাতে ধরা মোবাইলে ভিডিও গেমস খেলায় এতটাই ব্যস্ত ছিল সে, মা যে তার ছোট ভাই বা বোনকে নিয়ে ট্রেনে উঠতে পারেনি খেয়াল করার সময়ই পায়নি সে।
ওদিকে মা তো রীতিমতো চিৎকার করছে। আমার সহযাত্রী বন্ধু বললো, ভদ্রমহিলার চিৎকার শুনেছো? আমি উত্তরে বললাম, এরকম অবস্থায় কারো মাথা ঠিক থাকে! কথা বলছিলাম আর মন দিয়ে দেখছিলাম ছেলেটির কাণ্ড। বয়স বারো কি তেরো বছর হবে। হালকা পাতলা গড়ন। সে তখনও মনোযোগ দিয়ে মোবাইলে ভিডিও গেমস খেলে যাচ্ছে। কখনও আনন্দ ধ্বনি করছে। কখনও আবার হতাশায় ‘শিট’ বলে শ্লাগ করছে। ‘ওর তো কোনো প্রতিক্রিয়াই নেই। জানি না ওদিকে ওর মায়ের মনের কি অবস্থা!’ আমার সেই বন্ধু বললো। আমিও সায় দিলাম ওর কথায়। ট্রেন ছাড়ার আগে কাঁচের দরজার ওপাশ থেকে মা ইশারায় ছেলেকে বলে দিয়েছে, পরের স্টেশনে নেমে যাবার জন্য। ছেলেটা কাঁচের এপাশ থেকে ঘাড় কাত করে সায় দিলেও একটু টেনশনে ছিলাম, যেভাবে বিভোর হয়ে গেমস খেলছে পরের স্টেশনে নামার কথা মনে থাকবে তো? পরের স্টেশন সেভেন্টি ফিফথ এভিনিউয়ে অবশ্য ঠিকই নামল সে।
পারসন থেকে অনুষ্ঠান শেষ করে বাড়ি ফেরার পথেও মনে ঘটনার রেশ ছিল। রাত সাড়ে আটটার দিকে বাসায় ফিরে দেখি, যা ভেবেছিলাম তাই! দুই ছেলেকে তাদের বাবার কাছে রেখে বাইরে গিয়েছিলাম। বাবা তার ছোট ছেলে সৃজনকে নিয়ে বিভোর হয়ে ঘুমাচ্ছে বেডরুমে। আর লিভিং রুমে বড় ছেলে মনন ভিডিও গেমস খেলায় ব্যস্ত। তার যে অনেক হোম ওয়ার্ক পড়ে আছে এই নিয়ে সামান্যতম চিন্তা নেই!
আমি এসে হইচই শুরু করার পরে সবার ঘুম ভাঙলো। নিউইয়র্কের স্কুলগুলো থেকে বলা থাকে ছাত্ররা যেন নয়টার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে। কারণ ওদেরকে ভোর সাড়ে ছয়টার মধ্যে ঘুম থেকে উঠতে হয়। অথচ এখন রাত প্রায় নয়টা, মনন ম্যাথ ছাড়া কোনো হোমওয়ার্কই করেনি। অনেকগুলো লেখা পড়ে নিজের মতো করে বানিয়ে ‘রিডিং রেসপন্স’ লিখতে হবে। সায়েন্স হোমওয়ার্কও আছে।
পড়া শুরু করার পরে দেখি মনন বার বার মাথার চুল ধরে টানছে, টেবিলে মাথা রাখছে, কারণ সে কোনোভাবে পড়ায় মনোযোগ দিতে পারছে না। এতক্ষণ ভিডিও গেমস খেলার জন্য তার ফোকাস সমস্যা হচ্ছে। আমি আর ওর বাবা মিলে অনেক খাটতে হলো ওর হোমওয়ার্ক শেষ করার জন্য। রাত এগারোটায় ঘুমাতে গেল মনন।
এই সমস্যা এখন ঘরে ঘরে। মননের বন্ধুদের মায়ের সঙ্গে কথা শুরু হলে প্রথমেই প্রসঙ্গ ওঠে ছেলের ভিডিও গেমস খেলার নেশা নিয়ে। মনে হয় স্কুল থেকে বাসায় ফিরে ভিডিও গেমস খেলাই তাদের প্রথম ও প্রধান কাজ। সেই কাজের ফাঁকে ফাঁকে তারা হোমওয়ার্ক ও অন্যান্য কাজ করে। বড় ছেলেকে এগারোটায় ঘুম পাড়িয়ে ঘরের কাজ সারি। ছোট ছেলে সন্ধ্যায় ঘুমিয়েছে বলে এখন আর তার ঘুম আসে না। অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরে ড্যাবড্যাবে চোখে তাকিয়ে থাকে। আমি ওর দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকি আপন শৈশবের নেশার কথা।
স্কুল-কলেজ জীবনে গল্পের বই পড়ার নেশা ছিল মারাত্মক। এভাবে রাত জাগতাম বই শেষ করার জন্য। রীতিমতো কাহিনীর সঙ্গে একাত্ম হয়ে যেতাম। ক্লাসে স্কুলে পড়ার বইয়ের মাঝখানে রেখেও গল্পের বই পড়েছি। একটু যখন বড় হলাম ভিসিআরে হিন্দি সিনেমা দেখার নেশা হলো। টিভিতে কার্টুনও দেখতাম। তবে ভিডিও গেমস খেলার নেশা কোনো কালে ছিল না। আসলে তেমন কোনো ধারণাও ছিল না। আমার ছোট ভাইকে দিয়ে ধারণা হলো। তখন টাকার বিনিময়ে পাড়ার মোড়ে মোড়ে ভিডিও গেমস খেলার দোকান খোলা হলো। কম্পিউটার তখনও আসেনি ঘরে ঘরে। এক সময় কম্পিউটার এলো। মোবাইল ফোনসহ আরো অনেক গেজেট এলো। ছেলে-বুড়ো সবাই মাতলো ভিডিও গেমসের নেশায়। শুধু ছোটদের কথা বলি কেন, বড়রাও ভিডিও গেমস খেলায় কম যায় না! ফেসবুকে গেমের রিকোয়েস্ট পাঠান যারা, তাদের নানাভাবে অপমান করা হয়, আনফ্রেন্ড করার হুমকি দেয়া হয়, এমনকি আনফ্রেন্ড করাও হয়, তবু তাদের গেম রিকোয়েস্ট বন্ধ হয় না।
বছরখানেক আগে খবরটা পড়েছিলাম। ভিডিও গেমস খেলার মধ্যে বার বার বিরক্ত করছিল বলে টেক্সাসে এক লোক তার পাঁচ বছর বয়সী কন্যাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছিল! কি মর্মান্তিক। কি মারাত্মক এই গেমসের নেশা! মদের নেশা-ড্রাগের নেশার চেয়ে কম কি! চীনে এক সন্তানসম্ভবা নারী প্রসব বেদনা উঠে যাবার পরেও ভিডিও গেমস খেলা চালিয়ে যাচ্ছিল। এমনকি ইন্টারনেট ক্যাফেতে কন্যা সন্তান জন্ম দেয়ার পরেও সে খেলা বন্ধ হয়নি। নবজাতকের দিকে ফিরে তাকানোর সময়ও ছিল না। ক্যাফের লোকজন এসে শিশুটিকে কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে হাসপাতালে নিয়ে যায়। তখনও শিশুর মা গেমস খেলতে ব্যস্ত। মদের নেশা, সিগারেটের নেশা, ড্রাগের নেশা কাটাতে মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়! ভিডিও গেমস খেলার নেশা কাটাতে ভারতীয় এক পরিবার তাদের সন্তানদের হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছিল বলে সেখানকার পত্রিকাতে খবর হয়েছিল। দিল্লির ১৬ বছর বয়সী এক কিশোর প্রচণ্ড ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করতো তার পরিবারের সঙ্গে, স্কুলের পড়াশুনারও দিন দিন অবনতি হচ্ছিল, ওজন বেড়ে যাচ্ছিল দ্রুত, তখন ওর বাবা-মা অগত্যা উপায় হিসেবে ছেলেকে হাসপাতালে ভর্তি করায়।
- দুই তরুণী রোগীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ; নিউইয়র্কে বাংলাদেশি-আমেরিকান চিকিৎসক ডা. ফজলুল ইউসুফ গ্রেপ্তার, জামিনে মুক্ত
- বাংলাদেশে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফনে বাধার প্রতিবাদ, ‘শিখা অনির্বাণ’ প্রজ্জ্বলিত রাখার দাবি নিউইয়র্কে
- শান্তি প্রতিষ্ঠায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের সব পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ জরুরি: জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির প্রচার সম্পাদক রিজুর পিতার ইন্তেকাল
- যুক্তরাষ্ট্রের ডিভি লটারি ফের স্থগিত, নিম্ন আদালতের আদেশে আপিল আদালতের বাধা
- যুক্তরাষ্ট্রে ডেলাইট সেভিং টাইমের অবসান, ১ নভেম্বর ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা পেছাবে
- নিউইয়র্কে ন্যাশনাল ইমিগ্র্যান্টস ডে উদ্যাপন; বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি, সাত বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সম্মাননা প্রদান
- জাতিসংঘে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য; এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ল আরও ৩ বছর