ভাষার ইতিহাস ও বর্তমান ভাবনা:যান্ত্রিক প্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা সবচেয়ে পিছিয়ে
সিরাজুল ইসলাম:ভাষার উদ্ভব কখন, কোথায়, কীভাবে ঘটেছে, তা আমাদের জানা নেই। প্রাচীন চীনাদের মতে একটি ছোট জাতের ভগবান ক্রুদ্ধ হয়ে ঐশী কর্মকাণ্ড ছেড়ে প্রথম পশুপাখি ও বৃক্ষরাজির নাম ঘোষণা করে অকাণ্ড করলেন এবং সেখান থেকেই মানব জাতির ভাষার উদ্ভব। ভারতে মানব জাতিকে প্রথম ভাষা শেখালেন ভগবান ইন্দ্র। এমনিভাবে গ্রিসে ভাষা শেখালেন দেবতা হার্মিস। বাইবেলে উল্লেখ আছে, সৃষ্টিকর্তা সব পশুপাখি-বৃক্ষরাজি সৃষ্টি করে শৃঙ্খলা রক্ষার খাতিরে এদের আলাদা আলাদা নাম দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন এবং আদমকে নির্দেশ করেন এদের নামকরণ ঠিক করার জন্য। জ্ঞানী আদম তাদের নিজ নিজ নাম জারি করে নিজ নিজ জায়গায় ফিরে যেতে বলেন।উনিশ শতকে ভাষাবিজ্ঞানের আবির্ভাব। প িতরা গবেষণা করে স্থির করেন যে, ভাষা মানুষ সচেতনভাবে এবং পরিকল্পনা মাফিক সৃষ্টি করেনি। তাদের মতে প্রাথমিক মানুষ ভাব-প্রকাশ করত ইঙ্গিত-ইশারায়, শব্দে নয়। তাদের মতে মানুষ প্রথম শব্দে ভাব প্রকাশ করতে শিখেছে পশুপাখির কাছ থেকে। পশুপাখি ইঙ্গিত-ইশারা করতে পারে না, তাই শব্দের মাধ্যমে যোগাযোগ করে। পশুপাখি থেকে ধার করা বিদ্যা মানুষকে শুধু সমৃদ্ধই করেনি, ধার করে নিজেদের সমৃদ্ধ করার প্রথম কৌশলও শিখে নিল। ভাষাবিদদের মতে শব্দের মাধ্যমে যোগাযোগ করার কৌশল ছিল মানবগোষ্ঠীর প্রথম প্রযৌক্তিক বিপল্গব।
তবে সে ভাষা-বিপ্লব কোনো অবিমিশ্র আশীর্বাদ ছিল না। মানুষ আত্মরক্ষার্থে এবং আক্রমণে অস্ত্র হাতে নিয়েছিল প্রথম থেকেই। অস্ত্রের সঙ্গে ভাষার যোগ হওয়ার ফলে মানুষ আগ্রাসী হয়ে উঠল এবং নিয়ন্ত্রণের জন্য সৃষ্টি করল রাজ্য, সাম্রাজ্য। রাজ্য নিয়ন্ত্রণের সুবিধার্থে রাজা তার নিজের ভাষা, অর্থাৎ রাজভাষা ছাড়া অন্যান্য ভাষা ধ্বংস করল। দুর্বল মানুষের ভাষা হার মানল রাজাভাষার কাছে। যত বড় রাজ্য তত বড় রাজভাষা। এমন নৃতাত্তি্বক প্রেক্ষাপটে আমরা বিশ্লেষণ করতে পারি সংস্কৃত, আরবি, ফার্সি, ল্যাটিন, চীনা প্রভৃতি ভাষার বিশালতার কারণ। এর সর্বশেষ ঐতিহাসিক উপমা ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ও ইংরেজি ভাষার প্রসার। নিজস্ব সত্তা নিয়ে রাজনৈতিকভাবে মাতৃভাষার উদ্ভব ঘটে আঠারো শতক থেকে যখন ইউরোপে লাতিন ভাষার স্থান দখল করে নিল নিজ নিজ জাতীয় ভাষা।
বাঙালির ভাষা বাংলা। সাম্রাজ্যের যুগে ফার্সি ও ইংরেজি রাজভাষা থাকা সত্ত্বেও চুপিসারে বাংলা ভাষার উদ্ভব ও বিকাশ একটি অসাধারণ ঘটনা। সবাই বলে থাকেন, যতদিন বাঙালি জাতি টিকে থাকবে ততদিন টিকে থাকবে বাংলা ভাষা। তবে মনে রাখতে হবে, সভ্যতা বিকাশের বর্তমান পর্বে ওইসব ভাষাই অস্তিত্ব রক্ষায় সক্ষম হবে যেসব ভাষা প্রযৌক্তিকভাবে যুগোপযোগিতা রক্ষা করবে। আগে রাজনৈতিক আধিপত্যের মাধ্যমে শাসকশ্রেণীর ভাষা আধিপত্য বিস্তার লাভ করেছে। কিন্তু বর্তমানে এর সুযোগ নেই। এখন ওইসব ভাষাই অস্তিত্ব রক্ষা ও সমৃদ্ধি লাভ করতে সক্ষম হবে যেসব ভাষা প্রযৌক্তিকভাবে যুগোপযোগী।
বলতে চাই যে, প্রযৌক্তিক পশ্চাৎপদতার কারণে ইতিমধ্যেই বাংলা ভাষা পৃথিবীর অন্যান্য ভাষার চেয়ে আপেক্ষিকভাবে অনেক পেছনে পড়ে গেছে। অনুবাদের মাধ্যমে বিশ্বজ্ঞানকে বাংলায় রূপান্তর প্রচেষ্টা আমাদের দৃষ্টিতে পড়ে না। যান্ত্রিক প্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা সবচেয়ে পিছিয়ে। জনসংখ্যার দিক দিয়ে বাংলা ভাষা পৃথিবীর পঞ্চম বৃহৎ ভাষা বটে; কিন্তু প্রযৌক্তিক দিক থেকে এটি এখন অন্যতম পশ্চাৎপদ ভাষা। উদাহরণ দিই। যা বলেছি আগে, ভাষার সমৃদ্ধি ও প্রসার অনেকটাই নির্ভর করে অন্যান্য বিশ্ব ভাষার সঙ্গে দেওয়া- নেওয়ার প্রক্রিয়ায়। সরাসরি ভাষাগত অনুবাদ এবং ডিজিটাল অনুবাদের মাধ্যমে বড় বড় ভাষা আরও সমৃদ্ধ, আরও শক্তিশালী হচ্ছে। দশ বছর হলো, টহরাবৎংধষ ঘবঃড়িৎশরহম খধহমঁধমব (টঘখ) নামে ইউনেসকোর উদ্যোগে একটি অদৃশ্য যান্ত্রিক অনুবাদের ভাষা উদ্ভাবিত হয়েছে। এ ভাষার মাধ্যমে পৃথিবীর সব ভাষা একে অন্যের সঙ্গে নিজ ভাষায় যোগাযোগ করতে পারে এবং তা সম্ভব হচ্ছে মুহূর্তের মধ্যেই। সনাতন অনুবাদ পদ্ধতিতে আপনি যদি একটি বাংলা দলিল একসঙ্গে পৃথিবীর একশ’ ভাষায় অনুবাদ করতে চান এবং নিজ নিজ দেশে প্রেরণ করতে চান তাহলে কত সময়, কত শ্রম, কত ব্যয় হতে পারে, আপনি নিজেই হিসাব করুন। কিন্তু দলিলটি যদি টঘখ-এর মাধ্যমে অনুবাদ করুন, তাহলে আপনার সময় লাগবে বোতামে টিপ দিতে যতটুকু সময় লাগে ততটুকুই। আর আর্থিক ব্যয়ের ঘর শূন্য। জাদুর জাদু বটে। তবে এ জাদুবিদ্যার আশীর্বাদ থেকে বাংলা ভাষা বঞ্চিত। হিন্দি, উর্দু, আরবি, ফার্সিসহ পৃথিবীর ১৬৫টি ভাষা এখন টঘখ-এর অন্তর্ভুক্ত। পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তম ভাষা বাংলা এখনও এ প্রযুক্তির বাইরে। অতএব কিসের গর্ব আপনার বাংলাকে নিয়ে? তবে সুখের কথা, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে বাংলা ভাষাকে টঘখ প্রযুক্তিতে আনার জন্য। দুই ডজন ভাষাবিদ ও ভাষাপ্রকৌশলী পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। তারা আশা করছেন আগামী দুই বছরের মধ্যেই বাংলা ভাষা টঘখ প্রযুক্তির সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে।সমকাল।
তবে সে ভাষা-বিপ্লব কোনো অবিমিশ্র আশীর্বাদ ছিল না। মানুষ আত্মরক্ষার্থে এবং আক্রমণে অস্ত্র হাতে নিয়েছিল প্রথম থেকেই। অস্ত্রের সঙ্গে ভাষার যোগ হওয়ার ফলে মানুষ আগ্রাসী হয়ে উঠল এবং নিয়ন্ত্রণের জন্য সৃষ্টি করল রাজ্য, সাম্রাজ্য। রাজ্য নিয়ন্ত্রণের সুবিধার্থে রাজা তার নিজের ভাষা, অর্থাৎ রাজভাষা ছাড়া অন্যান্য ভাষা ধ্বংস করল। দুর্বল মানুষের ভাষা হার মানল রাজাভাষার কাছে। যত বড় রাজ্য তত বড় রাজভাষা। এমন নৃতাত্তি্বক প্রেক্ষাপটে আমরা বিশ্লেষণ করতে পারি সংস্কৃত, আরবি, ফার্সি, ল্যাটিন, চীনা প্রভৃতি ভাষার বিশালতার কারণ। এর সর্বশেষ ঐতিহাসিক উপমা ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ও ইংরেজি ভাষার প্রসার। নিজস্ব সত্তা নিয়ে রাজনৈতিকভাবে মাতৃভাষার উদ্ভব ঘটে আঠারো শতক থেকে যখন ইউরোপে লাতিন ভাষার স্থান দখল করে নিল নিজ নিজ জাতীয় ভাষা।
বাঙালির ভাষা বাংলা। সাম্রাজ্যের যুগে ফার্সি ও ইংরেজি রাজভাষা থাকা সত্ত্বেও চুপিসারে বাংলা ভাষার উদ্ভব ও বিকাশ একটি অসাধারণ ঘটনা। সবাই বলে থাকেন, যতদিন বাঙালি জাতি টিকে থাকবে ততদিন টিকে থাকবে বাংলা ভাষা। তবে মনে রাখতে হবে, সভ্যতা বিকাশের বর্তমান পর্বে ওইসব ভাষাই অস্তিত্ব রক্ষায় সক্ষম হবে যেসব ভাষা প্রযৌক্তিকভাবে যুগোপযোগিতা রক্ষা করবে। আগে রাজনৈতিক আধিপত্যের মাধ্যমে শাসকশ্রেণীর ভাষা আধিপত্য বিস্তার লাভ করেছে। কিন্তু বর্তমানে এর সুযোগ নেই। এখন ওইসব ভাষাই অস্তিত্ব রক্ষা ও সমৃদ্ধি লাভ করতে সক্ষম হবে যেসব ভাষা প্রযৌক্তিকভাবে যুগোপযোগী।
বলতে চাই যে, প্রযৌক্তিক পশ্চাৎপদতার কারণে ইতিমধ্যেই বাংলা ভাষা পৃথিবীর অন্যান্য ভাষার চেয়ে আপেক্ষিকভাবে অনেক পেছনে পড়ে গেছে। অনুবাদের মাধ্যমে বিশ্বজ্ঞানকে বাংলায় রূপান্তর প্রচেষ্টা আমাদের দৃষ্টিতে পড়ে না। যান্ত্রিক প্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা সবচেয়ে পিছিয়ে। জনসংখ্যার দিক দিয়ে বাংলা ভাষা পৃথিবীর পঞ্চম বৃহৎ ভাষা বটে; কিন্তু প্রযৌক্তিক দিক থেকে এটি এখন অন্যতম পশ্চাৎপদ ভাষা। উদাহরণ দিই। যা বলেছি আগে, ভাষার সমৃদ্ধি ও প্রসার অনেকটাই নির্ভর করে অন্যান্য বিশ্ব ভাষার সঙ্গে দেওয়া- নেওয়ার প্রক্রিয়ায়। সরাসরি ভাষাগত অনুবাদ এবং ডিজিটাল অনুবাদের মাধ্যমে বড় বড় ভাষা আরও সমৃদ্ধ, আরও শক্তিশালী হচ্ছে। দশ বছর হলো, টহরাবৎংধষ ঘবঃড়িৎশরহম খধহমঁধমব (টঘখ) নামে ইউনেসকোর উদ্যোগে একটি অদৃশ্য যান্ত্রিক অনুবাদের ভাষা উদ্ভাবিত হয়েছে। এ ভাষার মাধ্যমে পৃথিবীর সব ভাষা একে অন্যের সঙ্গে নিজ ভাষায় যোগাযোগ করতে পারে এবং তা সম্ভব হচ্ছে মুহূর্তের মধ্যেই। সনাতন অনুবাদ পদ্ধতিতে আপনি যদি একটি বাংলা দলিল একসঙ্গে পৃথিবীর একশ’ ভাষায় অনুবাদ করতে চান এবং নিজ নিজ দেশে প্রেরণ করতে চান তাহলে কত সময়, কত শ্রম, কত ব্যয় হতে পারে, আপনি নিজেই হিসাব করুন। কিন্তু দলিলটি যদি টঘখ-এর মাধ্যমে অনুবাদ করুন, তাহলে আপনার সময় লাগবে বোতামে টিপ দিতে যতটুকু সময় লাগে ততটুকুই। আর আর্থিক ব্যয়ের ঘর শূন্য। জাদুর জাদু বটে। তবে এ জাদুবিদ্যার আশীর্বাদ থেকে বাংলা ভাষা বঞ্চিত। হিন্দি, উর্দু, আরবি, ফার্সিসহ পৃথিবীর ১৬৫টি ভাষা এখন টঘখ-এর অন্তর্ভুক্ত। পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তম ভাষা বাংলা এখনও এ প্রযুক্তির বাইরে। অতএব কিসের গর্ব আপনার বাংলাকে নিয়ে? তবে সুখের কথা, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে বাংলা ভাষাকে টঘখ প্রযুক্তিতে আনার জন্য। দুই ডজন ভাষাবিদ ও ভাষাপ্রকৌশলী পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। তারা আশা করছেন আগামী দুই বছরের মধ্যেই বাংলা ভাষা টঘখ প্রযুক্তির সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে।সমকাল।
সর্বশেষ সংবাদ
- নিউইয়র্কের জ্যামাইকায় জল খাবার রেস্টুরেন্ট এর গ্র্যান্ড ওপেনিং
- New York Attorney General James Secures $375,000 from 1-800-Flowers for Deceiving Consumers About Automatic Subscription Renewals
- নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসে বাংলাদেশি আমেরিকা পুলিশ কর্মকর্তার নামে সড়ক ‘ডিটেকটিভ দিদারুল ইসলাম ওয়ে’
- ECOSOC recommends UN General Assembly to take decision on Bangladesh and Nepal’s LDC graduation extension requests
- ইকোসকের সুপারিশ: বাংলাদেশ ও নেপালের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সাধারণ পরিষদ
- Bangladesh co-chairs multi-stakeholder panel session on Global Road Safety, calls for stronger institutions to save lives
- নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক বহুপক্ষীয় প্যানেল অধিবেশনে বাংলাদেশের যৌথ-সভাপতিত্ব; প্রাণহানি কমাতে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আহ্বান
- Road Transport Minister reaffirms Bangladesh’s commitment to halving road traffic deaths by 2030