মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদে পূনর্বার বৈঠক : জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল ও মহাসচিবের বিশেষ প্রতিনিধির বিবৃতি
ইউএসএনিউজঅনলাইন.কম, নিউইয়র্ক : জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে ১২ ডিসেম্বর পূনর্বার বৈঠকে বসে। এ বৈঠকে বিবৃতি প্রদান করেন জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল জেফ্রি ফেল্টম্যান। উল্লেখ্য গত ৬ নভেম্বর নিরাপত্তা পরিষদ মিয়ানমার পরিস্থিতির উপর সর্বসম্মতিক্রমে প্রেসিডেন্সিয়াল স্টেটমেন্ট গ্রহণ করে যেখানে জাতিসংঘ মহাসচিবকে স্টেটমেন্ট গ্রহণের ৩০ দিন পর নিরাপত্তা পরিষদে বিবৃতি প্রদানের অনুরোধ জানানো হয়। সে অনুযায়ী আজ জাতিসংঘ মহাসচিবের পক্ষে জাতিসংঘের রাজনৈতিক বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল জেফ্রি ফেল্টম্যান মিয়ানমার পরিস্থিতির উপর নিরাপত্তা পরিষদে বিবৃতি প্রদান করলেন। উল্লেখ্য মিয়ানমার বিষয়ে প্রেসিডেন্সিয়াল স্টেটমেন্ট গ্রহণ ছিল নিরাপত্তা পরিষদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ যা সুনির্দিষ্টভাবে এই পরিষদ গৃহীত দলিল হিসেবে লিপিবদ্ধ থাকবে।
নিরাপত্তা পরিষদের আজকের সভায় বক্তৃতা প্রদান করেন সংঘাতময় পরিস্থিতিতে যৌন সহিংসতা বিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ প্রতিনিধি মিজ্ প্রমীলা প্যাটেন। সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফরকালে তিনি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নারী ও শিশুদের উপর সংঘটিত ভয়াবহ যৌন সহিংসতার যে বাস্তব চিত্র নিজ চোখে দেখে এসেছেন এবং নির্যাতিত নারী ও শিশুদের যে বক্তব্য শুনেছেন তা এ সভায় তুলে ধরেন।
মিজ্ প্যাটেন বলেন, “যারা এখনও যৌন সহিংসতার ক্ষতচিহ্ন নিয়ে বেঁচে আছেন এবং যারা নিষ্ঠুরতম এই যৌন সহিংসতার দৃশ্য নিজ চোখে দেখেছেন, তাদের সকলেই আমাকে বলেছেন, নারকীয়ভাবে মিয়ানমারের সেনা সদস্যরা ধর্ষণ, গণধর্ষণ, জনসম্মুখে বিবস্ত্রকরণ এবং সেনাক্যাম্পে আটক রেখে দিনের পর দিন রোহিঙ্গা নারীদের যৌনদাসত্ব গ্রহণে বাধ্য করার মতো জঘণ্য কাজ গুলো করেছে”।
তিনি সহিংসতার শিকার এমন অনেক নারীর উদাহরণ দেন যাদের কেউ কেউ টানা ৪৫ দিন সেনা ক্যাম্পে ধারাবাহিক যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। অনেক মেয়েকে তার স্বামী অথবা পিতার সামনে উলঙ্গ করে ধর্ষণ করা হয়েছে। অনেক মায়ের সন্তানদের গ্রামের জলকুপে ডুবিয়ে মারা হয়েছে। শিশুকে কেড়ে নিয়ে শিশুর সামনে মাকে ধর্ষণ করা হয়েছে এবং ধর্ষণ শেষে শিশুটিকে আগুনের মধ্যে নিক্ষেপ করা হয়েছে। এমনই সব মর্মস্পর্শী বর্ণনা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা উল্লেখ করে মিজ্ প্যাটেন সর্বোচ্চ দ্রুততম সময়ে এই সহিংসতার সমাধানে নিরাপত্তা পরিষদের সর্বক্ষমতা প্রয়োগের আহ্বান জানান।
আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল জেফ্রি ফেল্টম্যান তাঁর বক্তব্যে মিয়ানমার সঙ্কটের সমাধানে বেশকিছু সুপারিশ তুলে ধরেন। সেগুলো হল: ১) রাখাইন স্টেটের অ্যাডভাইজরি কমিশনের সুপারিশমালাকে ভিত্তি ধরে শান্তিপূর্ণ ও স্থায়ীভাবে বাস্তুচ্যুতদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে, ২) প্রত্যাবাসন হতে হবে উচ্ছেদকৃতদের মুল ভূমিতে বা পছন্দনীয় কাছাকাছি কোন স্থানে, ৩) অবাধ চলাফেরার স্বাধীনতা থাকতে হবে যাতে তারা জীবন ধারণের মৌলিক প্রয়োজনগুলো সংস্থান করতে পারে, ৪) প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে যোগ্যতার মানদন্ড উদারভিত্তিক হতে হবে, ৫) সকল প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে হবে।
নিরাপত্তা পরিষদের চলতি ডিসেম্বর মাসের সভাপতি জাপানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সভায় পরিষদটির সদস্যদেশ সমূহের বাইরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকেও বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য রাখেন জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন। রাষ্ট্রদূত বলেন, “প্রতিদিন গড়ে ১০০-৪০০ জন বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। এতে প্রতীয়মান হয় যে, রাখাইন প্রদেশের উত্তরাঞ্চলে পরিস্থিতি এখনও স্বাভাবিক পর্যায়ে আসেনি”। তিনি সম্প্রতি উত্তর ও মধ্য রাখাইন প্রদেশের কোন কোন অঞ্চলে রোহিঙ্গাদের বসতবাড়িতে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
গত ২৩ নভেম্বর বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সম্পাদিত দ্বি-পাক্ষিক চুক্তির বিষয়ে রাষ্ট্রদূত আশা প্রকাশ করে বলেন, এ চুক্তির শর্তানুযায়ী শীঘ্রই জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠিত হবে এবং মিয়ানমারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব হবে। তবে তিনি উল্লেখ করেন এ দ্বি-পাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে কেবল প্রত্যাবাসনের কাজটি করা সম্ভব হতে পারে কিন্তু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানবিক দূর্দশার যে মূল কারণ তা দূর করতে এতদসংশ্লিষ্ট বহুবিধ বিষয় ও অমীমাংসিত প্রশ্নগুলো মিয়ানমারকেই সমাধান করতে হবে এবং এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত সহাযোগিতা ও পর্যবেক্ষণ একান্তভাবে প্রয়োজন, আর তা করতে হবে অসহায় রোহিঙ্গাদের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে।
রাষ্ট্রদূত মাসুদ তাঁর বক্তব্যে রাখাইন প্রদেশের বাস্তুচ্যুত অসহায় নাগরিকদের মানবিক সহায়তা প্রদান, সহিংসতার নিরপেক্ষ এবং স্বাধীন তদন্ত ও বিচার, রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবর্তন এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের সাথে একত্রে বসবাস উপযোগী পরিবেশ তৈরির উপর বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করেন।
নিরপত্তা পরিষদের সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিগণ এ সভায় বক্তব্য প্রধান করেন। তারা রোহিঙ্গাদের অব্যাহতভাবে মানবিক সহায়তা প্রদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং বরাবরের মতো বিশ্ব সম্প্রদায়কে মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিগণ বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সম্পাদিত দ্বি-পাক্ষিক চুক্তির সাফল্য কামনা করেন। উল্লেখ্য সভার সকলেই জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ প্রতিনিধি মিজ্ প্রমীলা প্যাটেনের মর্মস্পর্শী বর্ণনা মনোযোগসহকারে শোনেন এবং মিয়ানমার সঙ্কটের সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেন।
উল্লেখ্য, গত ১৬ নভেম্বর মিয়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতির উপর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটি উন্মুক্ত ভোটের মাধ্যমে একটি রেজুলেশন গ্রহণ করে। তৃতীয় কমিটি গৃহীত এই রেজুলেশন অচিরেই সাধারণ পরিষদের প্লেনারিতে উপস্থাপন করা হবে। এছাড়া গত ৫ ডিসেম্বর জেনেভাস্থ মানবাধিকার কাউন্সিলে মিয়ানমারের মানবিক পরিস্থিতির উপর একটি বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ বৈঠকে এ সংক্রান্ত একটি রেজুলেশন গ্রহণ করা হয়।
- দুই তরুণী রোগীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ; নিউইয়র্কে বাংলাদেশি-আমেরিকান চিকিৎসক ডা. ফজলুল ইউসুফ গ্রেপ্তার, জামিনে মুক্ত
- বাংলাদেশে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফনে বাধার প্রতিবাদ, ‘শিখা অনির্বাণ’ প্রজ্জ্বলিত রাখার দাবি নিউইয়র্কে
- শান্তি প্রতিষ্ঠায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের সব পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ জরুরি: জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির প্রচার সম্পাদক রিজুর পিতার ইন্তেকাল
- যুক্তরাষ্ট্রের ডিভি লটারি ফের স্থগিত, নিম্ন আদালতের আদেশে আপিল আদালতের বাধা
- যুক্তরাষ্ট্রে ডেলাইট সেভিং টাইমের অবসান, ১ নভেম্বর ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা পেছাবে
- নিউইয়র্কে ন্যাশনাল ইমিগ্র্যান্টস ডে উদ্যাপন; বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি, সাত বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সম্মাননা প্রদান
- জাতিসংঘে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য; এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ল আরও ৩ বছর