স্মৃতিতে ও সংবাদে : এক নেপথ্য নায়কের আখ্যান!
অপূর্ব শর্মা : সাধারণত আমরা অনন্যদেরকেই উপমা দিতে গিয়ে নায়কের আসনে অধিষ্ঠান করে থাকি। সামনের সারিতে থেকে বাহবা পান বলে তারাই কি শুধু নায়ক? নিশ্চয়ই না! এমন অনেকে আছেন যারা নেপথ্যে থেকে কুশিলবের দায়িত্ব পালন করেন। তারা কোনও অংশেই নায়কের চাইতে কম নন; বরং অনেক ক্ষেত্রে নায়কের চাইতেও তারা এগিয়ে। কি বলবো তাদের? নেপথ্যের নায়ক ? হ্যাঁ এটাই যথোপযুক্ত হবে তাদের জন্য। যার কথা বলতে এমন ভনিতা, তাঁর নাম ইব্রাহীম চৌধুরী। অগ্রসর পাঠকমাত্রেই এ নামটির সঙ্গে পরিচিত। বিগত তিন দশক ধরে দেশের প্রধান প্রধান সংবাদপত্রের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে দেশ-বিদেশে আজ তিনি সমানভাবে সমাদৃত। তাঁর প্রাণবন্ত উপস্থিতি কেবল পাঠকদেরই ঋদ্ধ করছে না; সংবাদপত্রের জন্যেও হয়েছে সহায়ক। আমাদের ইতিহাসের বাক বদলের অনেক আখ্যানের সংবাদ পরিবেশন করে তিনি যেমন কালের সাক্ষি হয়েছেন তেমনই কোনও কোনও ক্ষেত্রে নিজেও অবতীর্ন হয়েছেন সেই ইতিহাস নির্মাতার ভূমিকায়। আন্দোলনের অগ্রভাগে থেকে যেমন গতিশীল করেছেন জাগরণকে তেমনই জাগরিত সেই সময়কে তুলে ধরে পালন করেছেন প্রকৃত কলম সৈনিকের ভূমিকা। যদিও সংবাদ ইতিহাস নয়, তবে কোনও কোনও সংবাদ বিবেচিত হয়ে থাকে ইতিহাসের আকর হিসেবে। সেই সংবাদগুলোই কালোত্তীর্ণ হয়। সেরকম কিছু সংবাদ আর স্মৃতিময়তার আখ্যান দিয়ে ইব্রাহীম চৌধুরী সাজিয়েছেন তাঁর ‘স্মৃতিতে ও সংবাদে’ গ্রন্থের জমিন। এবারের বইমেলায় অন্বয় প্রকাশ থেকে বের হওয়া এ বইটি ইতোমধ্যে পেয়েছে পাঠকপ্রিয়তা। এ কথা অকপটেই বলা যায়, বিষয়ের গভীরে অভিনিবেশের দক্ষতাই গ্রন্থটিকে করেছে অনন্য।


‘স্মৃতিতে ও সংবাদে’ গ্রন্থে যেসব ব্যক্তি ও বিষয়ে ইব্রাহীম চৌধুরী লিখেছেন তার প্রতিটিই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের বিশেষ করে সিলেট অ লের বিভিন্নক্ষেত্রে অবদান রাখা কিছু মানুষের কথা যেমন উঠে এসেছে তাঁর অনুভবের অলিন্দ থেকে তেমনই এসেছে যুক্তরাষ্ট্র জীবনের নানা অনুসঙ্গ। প্রবহমান জীবনকে সংবাদিকের দৃষ্টিতে দেখা-ই প্রতিভাত হয়েছে গ্রন্থের প্রতিটি পর্বে। সার্বজনীনতার কথা মাথায় রেখেই তাঁকে লিখতে হয়েছে। কোনও রাখ ঢাক না করে, ভনিতার আশ্রয় না নিয়ে অকপটেই তিনি বলেছেন, যা বলতে চান তা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যক্তিকে বিষয় হিসেবে দাড় করিয়ে স্মৃতির ক্যানভাস তিনি সাজিয়েছেন কখনো নিবন্ধে আবার কখনওবা সংবাদে। ব্যতিক্রমী পন্থায় জীবনস্মৃতির বয়ান বহুবর্নিল করেছে এই গ্রন্থকে। বলতে দ্বিধা নেই, গ্রন্থটির উপস্থাপন শৈলীতে যেমন নান্দনিকতা আছে, তেমনই আছে আবেগের অনুরণন। যা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠককে মগ্নময় করে রাখে। কখনও মনে হবে এটি একটি আত্মজীবনী, আবার কখনওবা মনে হবে এটি স্মৃতিকাতরতার আখ্যান।
গ্রন্থটির বিন্যাসও বেশ নান্দানিক। আমেরিকা, ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্ব, স্মৃতিময় সিলেট ও ভ্রামনিক চোখে- এই চারপর্বে বিবৃত হয়েছে লেখক ভাষ্য। গ্রন্থে শিরোনাম আছে ৩৬টি। সেই সঙ্গে আছে পরিশিষ্ট। আমেরিকা পর্বে ১৩ টি, ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্ব পর্বে ১৯টি, স্মৃতিময় সিলেট পর্বে ২টি এবং ভ্রামনিক চোখে পর্বে ২টি লেখা সংযোজিত হয়েছে গ্রন্থে। লেখা ও সংবাদের এই যুগলবন্দি এক ব্যতিক্রমী আবহ তৈরি করেছে গ্রন্থটিতে। ‘আমেরিকা’ শিরোনামের প্রথম পর্বটি নামের কারনে অনুভূতিহীন মনে হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে যেমন হাসির উদ্রেক হয়, তেমনই অশ্রুসিক্ত হয় আখিযোগল। বিশেষ করে প্রথম পর্বে ‘বাবাদের গল্প’ পাঠ আমাদের শুধু আপ্লুতই করেনা, দায়বদ্ধতার পাঠ শেখাতেও সাহায্য করে, লেখাটিতে পিতাদের গল্প শোনাতে গিয়ে পিতা হিসেবে নিজের অনুভূতি যেমন ব্যক্ত করেছেন তেমনিই মা দিবসের কথা বলতে গিয়ে বলেছেন, বেশ কয়েকজন মায়ের কথা। ইব্রাহীম যখন নিজের মায়ের গল্প শোনাচ্ছিলেন, তখন অজান্তেই ঝাপসা হয়ে উঠে চোখ। ক্যান্সার আক্রান্ত মায়ের শেষ দিনগুলোর বর্ননা আমাদেরকেও বেদনায় বিক্ষত করে। এ পর্বের গুরুত্বপূর্ণ একটি লেখা হচ্ছে- ‘আমেরিকা ইজ গ্রেট অ্যাগেইন!’। লেখাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনিক আসয়-বিষয় তুলে ধরেছেন তিনি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে নিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত যে কমেডি চলে আমেরিকার টিভি চ্যানেলগুলোতে এবং ট্রাম্প কমেডির কল্যানেই যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে শোগুলো তারই ইঙ্গিত তিনি দিয়েছেন সাবলীল ভাষ্যে। অভিবাসন নীতি, ভ্রমন নিষেধাজ্ঞা, পারিবারিক অভিবাসন বন্ধের পদক্ষেপসহ ট্রাম্প জমানার প্রথম বছরের পর্যালোচনা করেছেন লেখক। এ পর্বে বিশ্ব সিলেটি সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বসবাসকারী সিলেটিদের একত্রিত হওয়ার কথা, ৯/১১ দুঃখগাথাসহ প্রাসঙ্গিক বেশকিছু বিষয়েও আলোচনা করেছেন তিনি।
ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্ব পর্বে প্রথমেই হযরত শাহজালাল (র.) প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন। এ অধ্যায়ে আলোচনা করেছেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সমরনায়ক নিভৃতচারী দেশপ্রেমিক লে. কর্নেল এ আর চৌধুরী, বারাক ওবামার পরামর্শক নীনা আহমেদকে নিয়ে। আর পর্যালোচনা করেছেন ‘চে’র শেষ কথা’। লেখক তাঁর যৌবন কালের এক মহান মানুষের কথা বলতে গিয়ে চে গুয়েভারার সঙ্গে তাঁর তুলনা করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ম আ মুক্তাদির যে যুদ্ধ পরবর্র্তী সময়ে অনেকের স্বপ্ন পুরনের অভিযাত্রী ছিলেন সেটাই তিনি বিশ্লেষণ করেছেন গঠনতান্ত্রিক আলোচনায়। লেখাটির শেষ লাইন পাঠে সহজেই অনুমান করা যাবে তারণ্যের দ্রোহি চেতনা স্ফুরণে ম আ মুক্তাদিরের ভূমিকা কি ছিলো। ‘তুমি আমাদের প্রথম যৌবনের চে গুয়েভারা ছিলে। মরে গিয়ে তুমি নিঃশেষ হয়ে যাওনি। মুক্তির প্রতিটি মিছিলে তুমি আছ, যেমন ছিলে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত।’ এ পর্বে আমরা ইব্রাহীম চৌধুরীর কবি সত্ত্বারও পরিচয় পাই। বিন¤্র কুর্ণিশ শিরোনামে আ ফ ম মাহবুবুল হককে নিয়ে একটি দীর্ঘ কবিতা লিখেছেন তিনি। ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন দুই দশকের বিরতির পর কবিতায় ফেরার কথা। তখন বুঝতে বাকি থাকেনা, কোত্থেকে আসে তাঁর সংবাদ ভাষ্যে কাব্যময়তা।
চন্দ্রজয়ের নেপথ্যে কাজ করা সিলেটের রফিক উদ্দিন পাখি মিয়ার কথা, মুক্তিযুদ্ধের আলোকচিত্রী আবুল লেইছ শ্যামলের কথা, মুক্তিযুদ্ধের সেনাপতি বঙ্গবীর ওসমানীর ও তার অপ্রকাশিত পা-ুলিপির কথা, উত্তর-পূর্বা লের বাম আন্দোলনের পুরোধা তবারক হোসেইন, লোকমান আহমেদ, এমাদউল্লাহ শহিদুল ইসলামসহ তাঁর জীবনঘনিষ্ট আরও অনেকের কথা তুলে ধরে তিনি পর্বটিকে করেছেন ঋদ্ধ। আত্মজৈবনিক বর্ননায় এসব প্রান্থজনের কথা এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যা আমাদের শুধু আকৃষ্টই করেনা নতুন অনেক তথ্যের সঙ্গেও করে পরিচিতি। এসব লেখা পাঠে কারোর বুঝতে এতটুকু অসুবিধে হবেনা যে, সুরমা উপত্যকায় বসবাসকালীন কতটা অপরিহার্য্য ছিলেন তিনি। অথচ জনসম্পৃক্ত জীবন ছেড়ে একদিন পারি জমালেন প্রবাসে। কিন্তু দেশান্তরি হলে কি হবে তাঁর অস্তিমজ্জার সঙ্গে মিশে আছে স্বাদেশিকতা। সুযোগ পেলেই দেশ-মাতৃকার কথা তুলে ধরেন পত্রিকায়। প্রবাসের বর্নিল জীবনও যে তাঁর তৃষ্ণা মেটাতে পারেনা, তাঁর মন যে পড়ে থাকে শৈশবের স্মৃতিবিজরিত মেঠোপথে- তারই আখ্যান আমরা উপলব্ধি করি ‘স্মৃতিময় সিলেট’ পর্বে। এ পর্বের প্রথম লেখাটি এতটাই হৃদয়গ্রাহী যে, তাঁর কাতরতা আমাদেরকেও বিদ্ধ করে। ‘সিলেট তোমাকে সালাম’ শিরোনামে লেখার শেষাংশে তাঁর অভিব্যক্তি আমাদের দাঁড় করায় এক দেশপ্রেমিক প্রবাসীর মুখোমুখি-‘এক বিমূর্ত ভাব-বিলাসে প্রিয় শহর ঘুরে দেখি। এই শহরের অলিগলি জানে আমার, আমাদের গোপন অনেক কিছু। নিউ ইয়র্ক, নিউ জার্সী, শিকাগো, ওয়াশিংটনে নয়, এই শহরেই আমাকে খুঁজতে হয় অন্তহীন পথচলার নিরন্তর সময়।’
প্রকৃত মানুষ কখনো শেকড় বিচ্ছিন্ন হতে পারেনা। ইব্রাহীম চৌধুরীও পারেন নি। তবে তাঁর বিশেষত্ব হচ্ছে, তিনি শুধু সংযুক্তই থাকেন না, মা মাটির প্রতি দায়বোধ সম্পর্কেও থাকেন সচেতন। তাইতো তাঁর কলমে উঠে আসে ফেলে আসা দিনের কথা, সমৃদ্ধ জীবনের কথা, স্বপ্ন দেখানো মানুষের কথা, দিনবদলের রূপকারদের কথা। যেমন স্বদেশ, তেমনই প্রবাস- তাঁর কলম খুঁজে নেয় সত্য ও তথ্যের ফারাক। যা কিছু ভালো তার সঙ্গেই সখ্যতা গড়ে উঠে তাঁর!
তবে একটা ব্যাপারে চমৎকৃত না হয়ে পারা যায়না। সেটি সাংবাদিকতা। জীবনের নানা পর্বে, নানা পেশায় যুক্ত হলেও এই একটি বিষয়ের সঙ্গে কখনো সম্পর্ক ছিন্ন করেন নি তিনি। আজ দূর প্রবাসে ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করলেও তাঁর অনুভবের সঙ্গে মিশে আছে শব্দময়তা। শব্দের মায়াজাল তাঁকে এতটাই আবিষ্ট করে রেখেছে যে কাজের ফাঁকে অবসরে, ছুটির দিনে, নির্ঘুম রাত কাটিয়ে তিনি প্রবহমান রেখেছেন সাংবাদিকতা। শুধু তাই নয়, আলো ছড়াচ্ছেন প্রবাসে বাংলার মুখ হয়ে। উত্তর-আমেরিকা থেকে প্রতি সপ্তাহে বের হওয়া প্রথম আলো পত্রিকা প্রকাশেরও সহযাত্রী তিনি। ক্লান্তিহীন এই কলম সৈনিক অসম্ভবকে সম্ভব করে চলেছেন। গ্রাম থেকে নগরে, নগর থেকে মহানগরে এবং বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিধর রাষ্ট্রে আবাস গড়লেও কখনো ছন্দপতন ঘটেনি তার! সেটাই যেনও প্রতিভাত হয়েছে তাঁর ভূমিকার পরিবর্তে লেখা প্রান্থ কথনে। ‘কাদা মাড়তে দেবে না বলে, কৈশোরের এক গ্রাম্য বন্ধু কাঁধে করে খাল পার করে দিয়েছিল। অবাক বিস্ময়ে ফিরে তাকিয়ে বুঝেছিলাম, ভালোবাসার এ দায় নিয়ে আমাকে চলতে হবে। এমন ভালোবাসার দায় সর্বত্র। দায়, দায়িত্বে গড়ায়। চাইলেই এ দায় মেটানো যায় না, তাও টের পেয়েছি। দায় নিয়েই চলা। এ দায় নিত্যদিন প্রেরণা যোগায়। সমাজ সংসার স্বজন, পরিজনের প্রতি জন্মের দায়। অনেক কাজের ভীড়ে তাই শব্দের জাল বুনি। অক্ষর আর শব্দের মালা গাঁথি। দেশের বাইরে এসেও এ দায় মাথায় রেখে চলি।’ এ দায়ই অনন্য করেছে একজন ইব্রাহীম চৌধুরীকে। আর তাঁর শব্দভাষ্যে অনন্যতা পেয়েছে স্মৃতিতে ও সংবাদে গ্রন্থের ক্যানভাস।
সর্বশেষ সংবাদ
- নিউইয়র্কে ন্যাশনাল ইমিগ্র্যান্টস ডে উদ্যাপন; বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি, সাত বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সম্মাননা প্রদান
- জাতিসংঘে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য; এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ল আরও ৩ বছর
- নিউ জার্সিতে উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপিত
- নিউইয়র্কের জেএমসির সম্প্রসারণ প্রকল্প রমজানের আগেই সম্পন্নের প্রত্যাশা, ফান্ডরেইজিংয়ে প্রায় ১০ লাখ ডলার সংগ্রহ, বাকি প্রয়োজন আরও ২০ লাখ
- New York Attorney General James Secures More Than $480,000 and Debt Relief for New York Homeowners
- এই জীবন চিরস্থায়ী নয়, একদিন মরে যাবো
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে; ১৭ ডিসেম্বর উভয় পক্ষকে তথ্য-উপাত্ত জমার নির্দেশ
- নিউইয়র্কে নৃত্যশিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠক তাহসিন ফেরদৌসের অকালমৃত্যু, বাংলাদেশি কমিউনিটিতে শোকের ছায়া