কোটা সংস্কার মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক?
আহমেদ মূসা : মনীষী আহমদ ছফা আওয়ামী লীগকে আন্দোলনের উত্তাপ থেকে জন্ম নেওয়া দল বলে উল্লেখ করেছিলেন । বঙ্গবন্ধুর ‘সেন্স অব টাইমিং’ ড. কামাল হোসেনকে প্রধানভাবে আকর্ষণ করেছিল বলে জানিয়ে ছিলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোটা সংস্কার-আন্দোলনে-সৃষ্ট রাজপথের ভাষা পাঠ করে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন; দৃশ্যত ইচ্ছার বিরুদ্ধে। তার কন্ঠের ক্ষোভ-অভিমান তিনি লুকোবার চেষ্টাও করেননি। সবকিছু নিয়ে একগুঁয়েমি না করার কারণেই আওয়ামী লীগ বার বার ফিরে আসে। একই সঙ্গে অনেকের জন্য এমন ‘রামকুন্ডুলি’ সৃষ্টি করে, যে, তারা আওয়ামী লীগ না করলেও এডহক ভিত্তিতে বা পার্টটাইম সমর্থন দিতে বাধ্য হয়। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ যা করে তা অতি দক্ষতার সঙ্গে করে, এমন কি দমন-লুন্ঠনও।
আমি কোটা সংস্কারের পক্ষে সরাসরি অবস্থান নেওয়ায় কেউ কেউ বিস্মিত হয়েছেন। আমার অবস্থান আমি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করিনি বলে বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় এই ব্যাখ্যার চেষ্টা।
কোটা সংস্কারের নির্দলীয় আন্দোলন নিয়ে আলোচনার সময় অনেকে সরাসরি আন্দোলনের পক্ষে কথা বলেছেন। কেউ কেউ ক্ষীণ ধারায় হলেও বিরোধিতা করেছেন। কোনো কোনো ব্যক্তি আবার আন্দোলনকারী ও তাদের সমর্থকদের ‘রাজাকার’ বলে গালি দিয়ে ‘দেখে নেওয়া’র আষ্ফালন করেছেন। বর্তমানে দরে-বায়ে না বনলে ‘রাজাকার’ ও ‘নাস্তিক’ গালিদ্বয় দৈনন্দিন-বর্ষণে পরিণত হয়। রাজনৈতিক ব্যবসা শুধু ধর্ম নিয়েই নয়, কিছু ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধ নিয়েও চলে। কারণ, এই দু’টির তেজারতিতেই তরক্কী প্রচুর। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের লাভতো ষোলো আনা।
লেখক-সাংবাদি-রাজনীতিক-আমলা প্রভৃতির সংমিশ্রনে সম্প্রতি-সৃষ্ট ‘সুশীলদের’ অনেককেও নিরব থাকতে দেখা গেল। কেউ আবার কচ্ছপের মতো মাঝে মাঝে গলা বাড়িয়ে হাল-হকিকত দেখে আবার গুটিয়ে নিচ্ছেন। একদল আবার টিভি চ্যানেলে তাদের ‘মধ্যরাতের বাণী চিরন্তনী’তে এতো বেশি ধানাইপানাই করেন, যে কিছুই বোঝা যায় না। কিছু ব্যতিক্রমও আছেন, যারা আগাগোড়া সাহসের সঙ্গে কথা বলেছেন।
কেউ কেউ বলেন, বঙ্গবন্ধু কোটা করে যাওয়ায় এর পরিবর্তন বঙ্গবন্ধুর অপমান। কিন্তু তারা ভুলে যান যে, উপযোগিতা হারানো বা সমসাময়িক-কালের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ করার লক্ষ্যে অনেক কিছুরই রদবদল ঘটাতে হয়েছে, এমন কি বাদ দিতে হয়েছে বাকশালও।
কোটা সংস্কার-বিরোধীদের সঙ্গে সমর্থকদের পার্থক্য আকাশ-পাতাল নয়। পার্থক্য দৃষ্টিভঙ্গির। কেউ কেউ মনে করেন, মুক্তিযোদ্ধাদের পরবর্তী বংশধরদের জন্য কোটা তুলে দেওয়া বা হ্রাস করা মানে তাদের অপমান করা। কথাটি ঠিক নয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের জন্য বর্তমান হারের কোটা রাখাটাই মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান ও বিতর্কের দিকে ঠেলে দেওয়া এবং জনগণের মূলধারা থেকে ছিঁটকে ফেলার ঝুঁকি নেওয়া । বিশেষ করে এ-নিয়ে যখন কথা উঠে গেছে এবং আন্দোলন ব্যাপকতর হচ্ছে। এই অবস্থায় তাদের কোটা একটি কোটারি শ্রেণীর জন্ম দেবে, মুক্তিযোদ্ধার বংশধরেরা করুণা ও ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের শিকার হবেন। অনেকে প্রয়োজনীয় উদযোগ গ্রহণে বিরত থেকে একশ্রেণীর পরজীবীতে পরিণত হবেন। এসবের পরিণাম কারো জন্যই ভালো হবে না। আন্দোলনের সময় অনেক মুক্তিযোদ্ধাও বিব্রত বোধ করেছেন। ফেসবুকে মুক্তিযোদ্ধার এক সন্তানকে দেখলাম ‘কোটা চাই না’ বলে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে। সবচেয়ে বড় কথা, মুষ্টিমেয় ও চিহ্নিত রাজাকার-আলবদর-আলশামস প্রভৃতি বিশ্বাসঘাতক ছাড়া দেশের সব মানুষই স্বাধীনতার জন্য নানাভাবে যুদ্ধ করেছেন, যার যার অবস্থানে থেকে। জান-মাল-সম্ভ্রম হারানো মানুষের সংখ্যা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি।
মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে গিয়েছিলেন দেশের সবচেয়ে সাহসী ও অংগীকারবদ্ধরা। তারা যুদ্ধে গেছেন নিজের বা আপন পরিবারের কল্যাণের জন্য নয়, দেশের মুক্তির জন্য। কেউ সরাসরি রণাঙ্গনে ছিলেন, কেউ ভারতসহ অন্যান্য দেশে থেকে কাজ করেছেন। হাজার-হাজার মানুষ যুদ্ধ করতে গিয়েও বয়সের স্বল্পতা বা রোগের জন্য প্রশিক্ষণের সুযোগ পাননি। অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ-সুযোগের স্বল্পতার কারণে অনেকে প্রশিক্ষণ নিতে পারেননি। তারা ইয়ুথ ক্যাম্প থেকেই ফেরত এসেছেন। যুদ্ধের একেবারে শেষের দিকে ইয়ুথ ক্যাম্প থেকে অনেককেই শুধুমাত্র কয়েকটি গ্রেনেড বা বেয়োনেট ধরিয়ে দিয়ে দেশের ভেতরে পাঠানো হয়েছে। অবশ্য এখানে যুদ্ধ করতে যাওয়াটাই মুখ্য, যুদ্ধ করার সুযোগ পেল কি পেল না সেটা মুখ্য নয়।
বহু প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ইচ্ছে করেই সার্টিফিকেট নেননি। কেউ কেউ আবার বিশেষ রাজনৈতিক প্ররোচনায় সার্টিফিকেট পেয়েও ছিঁড়ে ফেলেছেন। হাজার-হাজার মানুষ দেশের ভেতরে থেকেই যুদ্ধ করেছেন বিভিন্ন বাহিনীর হয়ে, যেমন নরসিংদিতে আবদুল মান্নান ভুঁইয়া, মানিকগঞ্জে আবদুল হালিম চৌধুরি, বরিশালে সিরাজ সিকদার ও হেমায়েত বাহিনী প্রভৃতিতে যোগ দিয়ে। তাদের অনেকেই সার্টিফিকেট পাননি বা নেননি। অন্যদিকে বিলি করা হয়েছে হাজার হাজার ভুয়া সনদ। প্রতিদিনই এরা ধরা পড়ছে, কিন্তু এখনো অনেক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বিরাজমান রয়েছে।
কোটা সংস্কারের আন্দোলনের আরেকটা সুফল হচ্ছে, এখন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনাক্তকরণের কাজ প্রাধান্য পাচ্ছে। আগের সরকারগুলি এ-নিয়ে আন্তরিক ছিল না। ১৯৮০-৮১ সালে একবার মুক্তিযোদ্ধা সংসদ বিতর্কিতদের সাক্ষাৎকার নিয়ে ভুয়াদের সনদ বাতিলের উদযোগ নিয়েছিল। আমি তখন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের বক্তৃতা-বিবৃতি লেখার কাজে যুক্ত থাকার সুবাদে কিছু কৌতুকর ঘটনা দেখেছি। প্রশ্নের উত্তরে অনেকেই বলতে পারতো না কোন অস্ত্রে কয়টা গুলি থাকে, গ্রেনেড কীভাবে ছোড়ে কিংবা তার সেক্টর ও সাব-সেক্টর কমান্ডারের নাম। কারো কারো আমতা আমতা করার দশা দেখে বোঝা যেত যুদ্ধের সে কিছুই জানে না, মুখস্ত করে আসা উত্তর গুলিয়ে ফেলছে। সাক্ষাৎকারের বর্ণণা শুনে অনেক ভুয়া সাক্ষাৎকার না দিয়েই পালিয়ে গেছে। এখনও ভুয়াদের তালিকায় আমরা উচ্চপদস্ত আমলা ও পুলিশের সদস্যসহ নানা শ্রেণী-পেশার মানুষই দেখতে পাচ্ছি। তাদের অপরাধ ভয়ঙ্কর অপরাধ। সব ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনাক্তকরণের জন্য একটি ঝড়ো ও আখেরি ছাক্নি প্রয়োজন।
এখন আসলে দরকার বেঁচে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সুযোগ-সহায়তা-সম্মান আরো বাড়ানো। মুক্তিযোদ্ধাদের শুধু আর্থিক অনুদানই নয়,তাদের আনুষ্ঠানিক দাওয়াত দিয়ে মেহমান হবার সম্মান দিতে হবে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানগুলিতে। প্রতি বছর প্রধানমন্ত্রী প্রতিজন মুক্তিযোদ্ধাকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক দু’টি করে বই উপহার দিতে পারেন। সরকারী বাস, ট্রেন, স্টিমারে তাদের বিন ভাড়ায় যাতায়াতের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পৃথিবীতে এমন কিছু দেশ আছে যেখানে মুক্তি-সংগ্রামীরা রাস্তাদিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় সাধারণ মানুষ আর কিছু করতে না পারলেও ফুল ছুড়ে দেন তাদের দিকে, সম্মান জানাতে। সম্মান অন্তরের বিষয়।
মুক্তিযোদ্ধাদের সবাইকে একটি করে বিশেষ চাকতি বা মেডেল দেওয়া যেতে পারে যা প্রদর্শন করা হলে সব ক্ষেত্রেই বিশেষ সুবিধা ও সম্মান পাবেন। তাতে অনেক বেসরকারী সংস্থাও স্বত:স্ফূর্ত ভাবে সম্মান জানাতে এগিয়ে আসবে।
অনেকে আমেরিকার ভেটেরানদের উদাহরণ দেন। কিন্তু বাংলাদেশ আমেরিকা নয়। আমেরিকায় প্রায় দেড় কোটি কাগজপত্রবিহীন (‘অবৈধ’ শব্দটা এখানকার বিবেকবান শ্রেণী ব্যবহার করে না) অভিবাসী থাকা সত্ত্বেও তারা নানা ধরনের ভিসার ব্যবস্থা করে প্রতিনিয়ত লোক আনছেন আমেরিকায়। এখানে কাজ করার লোকের অভাব। আর বাংলাদেশে প্রায় ২৮ লাখ শিক্ষিত বেকারসহ কর্মহীন মানুষের সংখ্যা চার কোটি বিরাশি লাখ। সেখানে ৫৬ শতাংশ কোটা অনেক বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন।
মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের মধ্যে যারা মোটামুটি মানসম্মত জীবিকা থেকে পিছিয়ে থাকবেন বা চেষ্টার পরও চাকরি পাবেন না, তাদের কর্মসংস্থানের জন্য মুক্তিযোদ্ধা কল্যান ট্রাস্ট বা এ জাতীয় নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি করে সে-সবের অধীনে গড়ে তোলা শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে তাদের চাকরি দেওয়া যেতে পারে। এসব প্রতিষ্ঠানে একশ’ ভাগ তাদের দ্বারা পূরণ করলেও অযৌক্তিক হবে না বা কোনো প্রশ্ন উঠবে না। কল্যাণ ট্রাস্ট অতীতে তেমন দরকারী ভূমিকা রাখতে পারেনি দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও নানাবিধ প্রতিবন্ধকতার কারণে। কিন্তু এখন অবস্থা আগের মতো নয়। এখন বিশ্বমানের দক্ষ ব্যবস্থাপনাও বাংলাদেশে গড়ে উঠেছে। বহু মুক্তিযোদ্ধা অনেক বড় ও লাভজনক প্রতিষ্ঠান চালিয়ে আসছেন, কেউ বা অবসর যাপন করছেন। নতুন-গড়া প্রতিষ্ঠানগুলিতে তাদেরকে উপদেষ্টা বা শীর্ষ পদে রেখে সেসব প্রতিষ্ঠান চালানো যায়। ব্যাংক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, কলসেন্টারসহ সেবাখাতের অনেক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে দেশে, বাড়ছে সম্ভাবনা। জামায়াতের লোকেরা হাজার হাজার লাভজনক প্রতিষ্ঠান চালিয়ে আসার নজির আমরা দেখেছি। মুক্তিযোদ্ধারা তা পারবেন না কেন?
মুক্তিযোদ্ধাদের উল্লিখিত পর্যায়ের সন্তানদের জন্য ব্যবসার সুযোগও করে দেওয়া যায়। সে ক্ষেত্রে ঋণেরও ব্যবস্থা করা যায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে।
মুক্তিযোদ্ধা কোটার বাইরেও যে-সব কোটা আছে, প্রতিবন্ধীদের কোটা ছাড়া বাকীগুলিও যৌক্তিক হারে হ্রাস করা যায়। সবকিছুকে সমকালের পরিপ্রেক্ষিত দিয়েই বিচার করতে হবে।
দুই
মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের পক্ষাবলম্বনকারী ভারতের প্রায় তিন হাজার সেনা নিহত ও নিখোঁজ হয়েছেন, আহত হয়েছেন বার হাজার। তাদের স্মরণেও কিছু করণীয় রয়েছে।
ক. শহীদ ভারতীয় বীরদের জন্মদিনে তাদের পরিবারের কাছে অন্তত কিছু ফুল ও উপহার পৌঁছে দিতে পারে ভারতে আমাদের দূতাবাস ও কনসুলেটগুলি। আহতদের পরিবারেও সম্মানসূচক কিছু পাঠানো যায়।
খ. ২৬ মার্চ বা ১৬ ডিসেম্বর দূতাবাস-কনসুলেটে যৌথভাবে সব ভারতীয় শহীদদের জন্য স্মরণসভা করা যেতে পারে। আলোচনায় অংশ নিতে পারেন দুই দেশেরই বুদ্ধিজীবীগণ ।
গ. মুক্তি বাহিনী ও মিত্র বাহিনীর শহীদদের স্মরণে দুই দেশের সীমান্তের সুবিধাজনক জায়গার নো-ম্যানসল্যান্ডে যৌথ শহীদ মিনার গড়া যেতে পারে, যেখানে দুই দেশের মানুষই কাছে গিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে পারেন।
তিন
এবার আমি তুলে ধরছি গত ৯ এপ্রিল থেকে ২২ এপ্রিল পর্যন্ত ফেসবুকে দেওয়া আমার ৭টি স্ট্যাটাসের বক্তব্য।
১. কোটা সংস্কারের ন্যায্য আন্দোলন অবশ্যই সফল হবে। প্রচলতি কোটা সিস্টেম মুিক্তযোদ্ধাদের জন্যও বিব্রতকর, কারণ তারাও ক্রমশ জনবচ্ছিন্নি হয়ে পড়বেন । অবশ্য ভুয়াদের জন্য স্বাগতকি। এ আন্দোলন সরকারের নড়বড়ে গদি ধরে টান দিতে পারে।
২. আজ-কালকার পলটিশিয়ানরা সব-সময় চালাকির মধ্যে থাকেন। তবে, ছাত্র-ছাত্রীদরে সঙ্গে চালাকি করলে খবর আছে। কারণ, ওরা সব চালাকি-ভন্ডামির মূল উৎপাটনের কায়দা জানে ও ক্ষমতা রাখে।
৩. একটি জাতির জীবনে কোনো কিছুই রাতারাতি ঘটে না । সব ধরনের সরকার এবং দলেরই দু’টি একাউন্ট থাকে – ভালো ও মন্দ জমা হওয়ার জন্য। মন্দ জমতে-জমতে পাল্লা ভারি হয়ে গেেল পতন ঘটে সরকারের। অবশ্য মানুষরে সামনে আস্থাভাজন বিকল্পও থাকা চাই। এটা আমার অভজ্ঞিতা ও পর্যবক্ষেণজাত উপলব্ধি।
৪. আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে তরুণদের মধ্যে যে স্থানটা করে নিয়েছিল, কোটা সংস্কারের নির্দলীয় আন্দোলনের বিরুদ্ধে দমনে গেলে তার অনেকটাই হারাবে। কারণ, প্রায় ২৮ লাখ শিক্ষিত বেকারসহ সব ধরনের ৪ কোটি ৮২ লাখ কর্মহীন মানুষের দেশে ৫৬ ভাগ কোটার মহার্ঘ বিলাসতিা মানুষ বেশিদিন সহ্য করবে না । এই আন্দোলন ঘরে-ঘরের আন্দোলন। এমন কি ছাত্রলীগের অল্প-ব্যতক্রিম ছাড়া সবাই আন্দোলনে ছিল এবং ভবষ্যিতেও থাকবে – যদি আওয়ামী লীগ রাজপথের ভাষা পড়তে ভুলে গিয়ে থাকে। সব ধরনরে কোটা মলিেিয় ১০ থেকে ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা কঠিন নয়।
৫. কোটা সংস্কারের নির্দলীয় আন্দোলন দমনে ছাত্রলীগের কতপিয় এবং দলকানা কিছু শিক্ষক যে ঘৃণ্য ভূমিকা রাখছে ইতিহাস কখনও ক্ষমা করবে না। ন্যায্য-আন্দোলন এবং দমন-বিশ্বাসঘাতকতা পাশাপাশি চললেও শেষ পর্যন্ত আন্দোলনই জয়ী হয়। ঝড়ো হাওয়ায় সাময়িকভাবে আলো কমে আসলেও প্রদীপ নিভে যায়নি, নিভবে না । এই জুলুমের জন্য আওয়ামী লীগকে মাসুল দিতে হবে। একই সঙ্গে ভবষ্যিত ঘটনা-প্রবাহে কিছু নতুন মাত্রা যোগ হবে। যেমন, এতকাল দেখে আসছি, ক্ষমতা বদলের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমতা হারানো দলের ছাত্র সংগঠনের বীর পুঙ্গবরা সব হল থেকে একযোগে লক্ষণ সেনের মতো পলায়ন করে এবং নতুন ক্ষমতাসীন দলের বীর পুঙ্গবরা সেসব দখল করে। হলে সিটের জন্য দলে যোগ দেওয়ারা সঙ্গে সঙ্গে দল পরিবর্তন করে। পরিবর্তন করে সুবিধাবাদীরাও। এখন থেকে হয়তো কিছু দলকানা শিক্ষককেও পালতে হবে; নানা রং-বর্ণের কিছু সুশীল ধাওয়ার শিকার হবে।
৬. অনুপস্থিত ভোটারের ভোটে ‘নির্বাচিত’ সরকারের সব-বক্তব্যের সঙ্গে মূলধারার অধিকাংশ মিডিয়ার কন্ঠমেলানো একটি দেশের জন্য দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কিছুই নয়।
কোটা সংস্কারে আন্দোলনরতরা সাংবাদিকদের ওপর ক্ষুব্ধ। এই ক্ষোভের কারণ খুঁজতে সাংবাদিকদেরও আয়নার সামনে দাঁড়ানো উচিত।
বাংলাদেশের মানুষ সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্য যেমন সংগ্রাম করেছে, তেমনি গণ-বিরোধী ভূমিকার জন্য ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের সময় দৈনিক বাংলা, মর্নিং নিউজ প্রভৃতি পত্রিকার অফিসে আগুনও দিয়েছে। বোমা মেরেছে দৈনিক সংগ্রামে।
আবার জনগণের পক্ষে থাকায় পাকিস্তানী হানাদাররা ইত্তেফাক, সংবাদ, গণবাংলা, দ্য পিপল প্রভৃতির অফিস পুড়িয়ে দিয়েছে।
সংবাদ মাধ্যমের পজিটিভ-নেগেটিভ ভূমিকাও এক ধরনের ভাষা যা মানুষের পড়তে অসুবিধে হয় না।
৭. কোটা সংস্কারের আন্দোলনে সংগ্রামটাই মুখ্য। একে ঘিরে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা গুজব গৌণ ব্যাপার।
কেউ কেউ গৌণকে মুখ্য প্রচারণা দিয়ে আন্দোলনের সম্মানহানির চেষ্টা করেছেন যা অনৈতিক।
ভিসির বাড়িতে আক্রমণের নিন্দনীয় ঘটনাটির মূলে তিনটি কারণ অনুমেয় : ক. ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহের সরকারী অন্তর্ঘাত খ. বিরোধী দলের ফায়দা নেওয়ার অপচেষ্টা গ. সব আন্দোলনে কিছু হঠকারী লোক থাকে, এটা তাদেরই অপকর্ম ।
কারণ যাই হোক, এগুলি হচ্ছে আন্দোলনের কো-লেটারেল ড্যামেজ বা সিস্টেম লস। এসব বাই প্রোডাক্ট ব্যাসিক হওয়া উচিত নয়।
তা ছাড়া, ভিসির বাড়ি আক্রমণের উর্ধে থাকেনি । অতীতে বহুবার ভিসির বাড়ি ভাঙচুর হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই এককালের ভিসি খাজা শাহাবুদ্দিনের বাড়ি ক্ষুব্ধ জনতার হাতে অগ্নিদগ্ধ হয়েছিল একসময়।
আবার, জাতির ক্রান্তিকালে সাহসী ভূমিকা পালনের জন্য দেশের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন আরেক ভিসি আবু সাঈদ চৌধুরী।
উল্লিখিত সাতটি স্ট্যাটাস ছিল সংগ্রামীদের পাশে থাকতে আমার কাগুজে কসরত। একই সঙ্গে আমি মনে করি, এগুলি মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের উত্তর-পুরুষদের সম্মান জানানোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। নতুন প্রজন্ম আরো গর্বিত ও উদ্ভাসিত হবে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন-চেতনা ও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে। মুক্তিযোদ্ধাদের বিরামহীনভাবে সম্মান দিয়ে গেলে রাজাকার-আলবদরদের আধিপত্য আরো কমে আসবে, ক্রমশ আরো ¤্রয়িমান হতে থাকবে তারা; এক সময় আর মাথা উঁচু করে কথাই বলতে পারবে না।
ওকলাহোমা, ২ এপ্রিল, ২০১৮।
আহমেদ মূসা লেখক-সাংবাদিক : সাপ্তাহিক বর্ণমালার উপদেষ্টা সম্পাদক।
email : [email protected]
website Address:
https://sites.google.com/view/sreejonkal
- SUSPENDED ATTORNEY CHARGED WITH GRAND LARCENY FOR STEALING MORE THAN $1 MILLION FROM BORROWERS, DIME COMMUNITY BANK
- Six Bangladeshi Peacekeepers Posthumously Awarded UN Dag Hammarskjöld Medal
- নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ড্যাগ হ্যামারশোল্ড পদকে ভূষিত ছয় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী
- যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া স্টেট সিনেট নির্বাচনে বাংলাদেশি-আমেরিকান শেখ রহমানের টানা পাঁচবার জয়
- A Star Dimmed: Mourning the Loss of Tofail Ahmed, Architect of Our History
- নিউইয়র্ক ষ্টেট অ্যাসেম্বলী ডিষ্ট্রিক্ট-৩০’র প্রাইমারী নির্বাচনে শামসুল হকের সমর্থনে জ্যামাইকায় ফান্ড রেইজিং
- Bangladesh Secures Historic Victory in UNGA Presidency
- New York Attorney General James Secures Refunds for All New Yorkers Cheated by Nissan Dealerships’ Lease Overcharge Schemes