করোনা, করণীয়, মৃত্যু ও মৃত্যু-ভয়
মিনহাজ আহমেদ : একদিন রাতে মনে হলো, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। গলাতেও একটা অস্বাভাবিক অনুভূতি টের পাচ্ছিলাম। দু’একবার কাশিও দিয়েছি, জ্বর-জ্বর ভাবও আছে সাথে। নির্ঘাৎ করোনাভাইরাসের লক্ষণ!
মনের চাপ কমাতে তড়িঘড়ি ঘুমোতে গেলাম চুপিসারে। ঘুম এলোনা। একটা দুর্ভাবনা চেপে বসলো মাথায়- যদি মারা যাই?
গেলেতো গেলাম। কি আর হবে!
সত্যি, এসব যদি-টদি আমার কাছে গুরুত্বহীন। আমি বিশ্বাস করি, “নাহি ক্ষয়, নাহি শেষ, নাহি নাহি দৈন্যলেশ”; মৃ্ত্যুই শেষ কথা নয়। কিন্তু হন্তারক অণূজীব কোভিড-১৯ আবির্ভূত হওয়ার পর মনে হয় মৃত্যু ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা নবায়নের প্রয়োজন। বাস্তবতা এখন এমন যে, জীবনের সাধ-আহ্ণাদ মেটানো নয়, কিংবা ব্যক্তিগত, সামাজিক, পারিবারিক প্রতিশ্রুতি পূরণ নয়- প্রিয়জনের সান্নিধ্যে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ কিংবা প্রিয়জনের অন্তিম সময়ে কাছে থাকাও এখন আর সম্ভব হচ্ছে না।

ভোরে নিয়মিত অভ্যাস অনুযায়ী ঠিক অফিস যাওয়ার সময় ঘুম ভাঙলো। শ্বাস-প্রশ্বাসে কোনো সমস্যা নেই, জ্বর নেই, কাশিও নেই। করোনার হাতে বেঘোরে পরিকল্পনাহীন মৃত্যুর আশঙ্কাও নেই। বেঁচে থাকার ও বাঁচিয়ে রাখার তীব্র প্রেরণায় মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ঘর থেকে অফিস করছি। তবে এর মাঝে স্বভাবসুলভ বেপরোয়া খেয়ালে এবং খুব কাছের এক বন্ধুর এনজিওগ্র্যামের জরুরি অ্যাপয়েন্ট যাতে মিস না হয়, তাই তাকে স্বতোঃপ্রণোদিত হয়ে হাসপাতালে পৌঁছে দেবার তাগিদে ঘর থেকে বের হই ২৪ মার্চ ভোরে। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় একজনের একটি সাবধানবাণী শুনতে পেয়েছিলাম। বাণীটি এক কান দিয়ে ঢুকলো, আরেক কান দিয়ে বের হলো।
সেদিনই সন্ধ্যায় আরেক বন্ধুর ফোন পেলাম, হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছিলাম যে বন্ধুটিকে, তার স্ট্রোক করেছে। কাছেই বাসা, সাথে সাথে গিয়ে উপস্থিত হলাম। তখন অ্যাম্বুল্যান্সে প্যারামেডিকরা তাকে প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। রোগী আমার বন্ধু শুনে তারা চিকিৎসা বিষয়ক কয়েকটা প্রশ্ন করলো। তখন অ্যাম্বুল্যান্সে স্ট্র্যাচারে শুয়ে থাকা প্রায় অচেতন বন্ধুটির ফ্যাল ফ্যাল দৃষ্টি দেখে খুবই খারাপ লাগছিল। এদেশে তার অনেক বন্ধু-বান্ধব, শুভাকাঙ্ক্ষী, গুণগ্রাহী আছেন, কিন্তু নিকটাত্মীয় বলতে যা বুঝায়, তেমন কেউই নেই। নিজের সংসারও নেই। অ্যাম্বুল্যান্সের ভিতরে দাঁড়িয়ে এসব সাত পাঁচ ভাবছিলাম। এ সময় সেই সংবাদদাতা বন্ধুটিও ফোনে আমাকে বার বার বলছিল- আমি যেন আমার গাড়িটি রেখে অ্যাম্বুল্যান্সে করে বন্ধুটির সঙ্গে হাসপাতালে যাই, পাশে থাকি, এবং কি হচ্ছে না হচ্ছে, তাকে জানাই। আমি বুঝতে পারছিলাম হরিহর আত্মা এই বন্ধুটির জন্য সে খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে আছে। সে আমার মতো কাঠখোট্টা যুক্তিসর্বস্ব আবেগহীন মানুষ নয় যে ‘যা হয় হবে’ বলে কোন কিছু মেনে নেবে। আবেগের অশ্রুতে সে নিজে যেমন ভাসে, অন্যকেও তেমনি ভাসিয়ে দেয়। এই বন্ধুটির জন্য করতে পারেনা, এমন কিছুই নেই পৃথিবীতে। আশা করেছিলাম সে আমার আগে উড়ে আসবে। যাই হোক, আমি দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার সিন্ধান্ত নিয়ে গাড়ি পার্ক করে অ্যাম্বুলেন্সে উঠলাম। কিন্তু প্যারামেডিকরা জানালো, করোনা পরিস্থিতির কারণে হাসপাতালে, অ্যাম্বুল্যান্সে, ক্লিনিকে কোথাও রোগী ও চিকিৎসাকর্মী ছাড়া কারও উপস্থিতি অনুমোদিত নয়।
ঘরে ফেরার পথে ফোন পেলাম আরেকজনের, সেও আমার মতো ফোন পেয়ে আমার বন্ধুটির পাশে দাঁড়াতে আসছে দ্রুত গাড়ি চালিয়ে, অনেক দূর থেকে। আমি নিরুৎসাহিত করা সত্ত্বেও সে হাসপাতালে গেলো, এবং এ গেট ও গেট ঘুরে কোনো খবর না পেয়ে অনেক রাতে ঘরে ফিরলো।
পরদিন কাজের ব্যস্ততার মাঝেও হাসপাতালে বহুবার ফোন করে জানলাম, বন্ধুটির মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার হয়েছে, জ্ঞান ফেরেনি, সে নিবিড় পরিচর্যায় আছে। দুশ্চিন্তা কাটলো না। আড়াইদিন পরে ঘুম থেকে উঠে হাসপাতালে ফোন করে যখন সরাসরি তার সাথে কথা বলতে পারলাম, তখন কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিলাম। ফেসবুকে খবরটা শেয়ার করলাম।
এ সময় অদ্ভুত এক উন্মাদনা চোখে পড়লো। যাদের দু’কদম এগিয়ে গিয়ে অসুস্থ বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ নেবার সাহস নেই, তারা ফেসবুক ও গণমাধ্যমে কান্নাকাটি, আহাজারি, মেমোরি শেয়ার করে জিন্দা মানুষকে মুর্দা বানিয়ে একাকার করে দিচ্ছে। আমি মনে মনে প্রচণ্ড ধাক্কা খেলাম। এ সময় আমার একাধিক ঘনিষ্টজনের মৃত্যু সংবাদ পেলাম। ঘরে-ঘরে হাসপাতালে-হাসপাতালে ছিল মুমুর্ষ অসহায় মানুষের আর্তনাদ। আর এসব মানুষদেরকে নিয়ে চলছিল লাইক-সাবস্ক্রাইব-শেয়ার-বাণিজ্য। এক ধরনের ঘৃণার উদ্রেক হলো নিয়ন্ত্রণহীন সকল সামাজিক ও গণমাধ্যমের প্রতি।
ঠিক এমন অবস্থায় হাসপাতাল সূত্রে একটি তথ্য জানার পর হঠাৎ আমার মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো। মৃত্যুকে যেন চোখের সামনেই দেখতে পেলাম। চট করে কানে বেজে উঠলো একটি সাবধানবাণী। এটিই সেই সাবধানবাণী, যেটি আমার বন্ধুটিকে হাসপাতালে নামিয়ে দিতে ঘরে থেকে বের হওয়ার সময় শুনেছিলাম। আমার এক কান দিয়ে ঢুকেছিল, অপর কান দিয়ে বেরিয়েছিল।
এর মধ্যে মুদি দোকানগুলো রাতারাতি খালি হয়ে গেলো। চালডাল-মাছমাংস কিনে মানুষ তাদের ঘরকে দোকান বানিয়ে ফেললো। আর আমি বাসা থেকে আটটা-চারটা অফিসের কাজ শেষে একদিন বাজারে গিয়ে দেখি শেলফগুলো প্রায় খালি। অবশিষ্ট থেকে বেছে বেছে কিছু নিয়ে বাড়ি ফিরলাম।

ঘটনাক্রমে স্বপ্না বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ থাকায় আমাকে কর্মজীবী গৃহী হিসেবে দুইজনের ভূমিকা পালন করতে হচ্ছে। কর্মজীবী গৃহিণী যদি হয়, কর্মজীবী গৃহীও হতে পারে। পারে না? আমি জানি, যদিও স্ন্যাক্স জাতীয় খাবার ছাড়া কোনো কিছু করার বাস্তব অভিজ্ঞতা ছিলনা, তবে মায়ের আঁচলঘেষা সন্তান হিসেবে রান্নায় আমার এক সহজাত প্রতিভা আছে। সীমিত রসদ সামগ্রী নিয়ে আমার সৃষ্টিশীল রন্ধনপ্রণালী ও ব্যবস্থাপনার প্রশংসাই পাচ্ছিলাম। তাই আমি অনায়াসে, হাসিমুখে, এবং সফলভাবে একজন কর্মজীবী গৃহী হতে পেরেছি এবং স্বপ্নার সার্জারি ও রিকভারি সম্পন্ন না হওয়ার পরও সেভাবে থাকতে পারবো।
বেচারি স্বপ্না! কিছুদিনের মধ্যে পর পর দু’বার ভিন্ন দু’টি কঠিন রোগে ঘর-হাসপাতাল-কাজ দৌড়াদৌড়ি করে এবার ভূগছে মেরুদন্ডের অস্থি ক্ষয়জণিত ব্যথায়। হাঁটাহাঁটি করলে বা বেশিক্ষণ দাঁড়ালে ব্যথা বাড়ে। অতএব তার জগৎ এঘর-ওঘরে সীমিত। এর সূত্রপাত বছর দশেক আগের এক সড়ক দুর্ঘটনা, আর এর থেকে মুক্তির উপায় মেরুদন্ডে একটা সার্জারি। লকডাউনে বাসা থেকে করার ব্যবস্থা তার জন্য সহায়ক হলেও এই লকডাউনের কারণেই তার সার্জারিটা বার বার পিছিয়ে যাচ্ছিল, ব্যথাটাও তাই প্রলম্বিত হচ্ছিল।

প্রলয়কাহিনি চোখে না দেখলেও কানে শুনতেই হয়। তাই যতই আমি ফেসবুক, টিভি, সংবাদপত্র থেকে দূরে চোখ বুঁজে বাস্তব থেকে পালিয়ে থাকতে চাই না কেনো, মানুষের ফোন, ইমেইল, টেক্সট মেসেজ আমাকে ততই বাস্তবের কাছ নিয়ে যায়। পরিস্থিতির ভয়াবহতা ও সহায়হীনতার কারণে এই মানুষগুলো শঙ্কাগ্রস্ত, বিহ্বল, বিভ্রান্ত। মৃত্যু, হাসপাতাল, অবহেলিত মুমূর্ষু রোগী ও মৃতদেহ, বেকারত্ব, অসহায়ত্ব ও সম্বলহীনতা, সর্বোপরী চিকিৎসার সুযোগ ও ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রীর অভাবে রক্তহিমকরা ভীতিকর পরিস্থিতি চারিদিকে। শুধু নিউ ইয়র্ক নয়, মানবিক এই বিপর্যয় দেখা গেলো রোম, বার্সিলোনা, ঢাকা, লন্ডন সর্বত্র।

অনুজপ্রতীম গিয়াস কুইন্স হাসপাতাল থেকে বলেছিল, ভাত রান্না করে পাঠাতে। খুব ক্ষুধা লেগেছে। ভাত পাঠানো হলো, কিন্তু হাসপাতালের নিষেধে গিয়াসকে তা দেওয়া সম্ভব হয়নি, অভূক্ত গিয়াসের মৃতদেহ পাঁচদিন পরে দাফন করা হয়। একই সময়ে করোনা ভাইরাসে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডক্টর রশিদের মৃত্যুর গুজব কমিউনিটিতে আতঙ্কের ছায়া ফেলে। আমার এক ভাগ্নি রত্নাকেও হাসপাতালের ডাক্তাররা মৃত ঘোষণা করার পর আবার সে নড়ে উঠলে তাকে পুনরায় ভেন্টিলেটারে নেওয়া হয়। আত্মীয়-বন্ধুবান্ধবদের দৃষ্টির আড়ালে বাড়তি কয়েক ঘণ্টা ভেন্টিলটরে থেকে বিদায় নেয় রত্না। এসব উদ্বেগজনক সংবাদ মানুষকে উন্মাদগ্রস্থ করে তুলছিল। এই উন্মাদনাগ্রস্থদের একজন হলো ট্র্যাম্প যিনি ভাইরাসমুক্তির জন্য ক্লোরক্স-অ্যারোসলের কথা ভাবছিলেন।
শঙ্কা, উদ্বেগ, আশাহীনতা ও সংকট এতটাই চরমে পৌঁছেছিল যে, কাউকে দুবার ফোন করে জবাব না পেলেই অনেককে দেখেছি যে ধরেই নিয়েছেন লোকটি নির্ঘাত করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। শুরু হয়ে যায় হাঁকডাক। একাধিক ব্যক্তিকে জানি যারা হাকিম-কবিরাজদের পরামর্শে আদা-হলুদ-গরমমশল্লার ফুটন্ত ভেষজ পানীয় পান করে নিজ নিজ শ্বাসনালী পুড়েছেন। অনেকে তাবিজ-কবচ নিয়েছেন, অনেকে সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে স্রষ্টার কৃপালাভের জন্য মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়ে ভাইরাস আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। বেঁচে থাকার জন্য কেউ কেউ গোমূত্রও পান করেছেন শুনেছি।

এসব নিয়ে দুদিন ধরে ভাবতে ভাবতে আমি আর রুমি ভাই সিদ্ধান্ত নিলাম, ঘরে বসে থাকলে হবে না, বের হতে হবে। তাই ব্যক্তিগত, সামাজিক, সাংগঠনিক কিংবা যেকোনো সংকটকালে যা করি, তাই করলাম। ফোন করলাম রানা ভাইকে। রানা ভাই ঘর থেকে বের হবার চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে বললেন, আর বললেন আমাদের (অপটিমিস্টস্-এর) ফেসবুক ফান্ডরেইজারকে প্রমোট করতে। যদিও আমরা টার্গেটের অধিক ফান্ড রেইজ করতে সক্ষম হয়েছি, তারপরেও আমরা ভাবছিলাম, এটা পর্যাপ্ত নয়। রানা ভাইয়ের ব্যাখ্যায় আমরা হতাশ হয়েছিলাম।
সেদিনই একজন বাঙালি ডাক্তার বিকেল বেলা হাসপাতাল থেকে পাওয়া তথ্যটি নিশ্চিত করে বিস্তৃত ব্যাখ্যা দিলেন। সাথে সাথেই স্পষ্ট হয়ে গেলো কেনো রানা ভাই আমাকে বাইরে যেতে বারণ করেছিলেন। ডাক্তারের কথায় মাথা চক্কর দিয়ে উঠেছিল। কানে বেজে উঠেছিল সেই সাবধানবাণীটি, যেটি এক কান দিয়ে ঢুকেছিল, অপর কান দিয়ে বেরিয়েছিল। আমি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলাম সাবধানবাণীটি উপেক্ষা করা ছিলো বোকামি। অনাকাঙ্ক্ষিত ও অবধারিত পরিণতি সম্পর্কে অনুমান করাটাই ছিল মাথাটা চক্কর দেওয়ার কারণ।
দেশে কোয়ারেন্টাইনে থাকা মানুষ দেখতে নাকি অনেকে ভীড় করেছিল। অপরিচিত এই শব্দটির খটোমটো উচ্চারণ হয়ত মানুষের মনে যাদুকরী আকর্ষণ সৃষ্টি করে থাকবে। অনেকের কাছে নতুন হলেও কোয়ারেন্টাইন শব্দটির সাথে আমার পরিচয় হয় প্রায় দুই দশক আগে। নিউ ইয়র্কে তখন অ্যানথ্রাক্স আক্রমণ সন্দেহে শিকদার হুমায়ুন কবীরসহ কয়েকজন সাংবাদিককে বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইন করা হয়েছিল। তবে সেটা বাংলাদেশে ড. ফেরদৌস খন্দকারকে যেভাবে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে কোয়ারেন্টাইনের নামে আটক করে রাখা হয়েছে, তেমন ছিলনা।
করোভাইরাসের হুমকির মুখে জীবন-মৃত্যুর মাঝামাঝি একটি ঝুলন্ত অবস্থা হলো কোয়ারেন্টাইন। কোয়ারেন্টাইনকালে অসহনীয় একাকীত্ব, মানসিক চাপ, নানাবিধ অশুভ আশঙ্কা, এবং হতাশা গ্রাস করেছিল আমাকে। এর মাঝে নিয়মিত ঘর থেকে অফিসের কাজ। যখন অফিসের কাজে ডুব দেই, রান্নার আয়োজনের কথা ভাবি, ফ্রিজে কী আছে কী নেই খুঁজি- তখন সব ভুলে থাকি। সদ্য কেনা আমার ক্রয়সাধ্যের চাইতে অধিক দামী বহুপ্রতীক্ষিত ক্যামেরার ল্যান্সটার দিকে তাকাই। কেনার পর ব্যবহারের সময় পাইনি, প্রবেশ করতে হয়েছে কোয়ারেন্টাইনে, জানিনা আদৌ ব্যবহারের সুযোগ হবে কি না। সামনে রাখা ডিজিটাল থার্মোমিটারে বার বার জ্বর মাপি, দুরু দুরু বুকে তেরছা চোখে দেখি কতো হলো। বিশ্বাস হয় না, তাই আবার মাপি। একই সাথে ফ্ল্যাস্কে রাখা ভেষজ চা পান করতে থাকি। নিঃশ্বাস নিতে নিতে নিজেকেই প্রশ্ন করি- একটু একটু শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, তাই না?
এসবের মাঝেও রান্নাবান্না করে নিজে খাই, স্বপ্নার জন্য রেডি করে রাখি। সে কখনও একাকি লিভিং রুমে এসে টিভি দেখে। কখনও ফোনে তার সাথে কথা বলি। ওর বেডরুম আর আমার বেড়রুমের মাঝখানে লিভিং, কিচেন ও বাথরুম। বেডরুমে আসার আগে সব ভালো করে ডিসইনফেক্ট করে আসি। বিয়ের পর পর আমরা দুজন সাড়ে সাত মাসের জন্য বিচ্ছিন্ন ছিলাম, আমি আমেরিকায়, ও বাংলাদেশে। সেই সময়টাকে যেমন সহজে মেনে নেওয়া সম্ভব হয়েছিল, এবারের এই বিচ্ছেদ তার চাইতেও অধিক অসহনীয় মনে হচ্ছে।
এতোসব ভাবনা-চিন্তা ও সাবধানতা শুধু একটা কারণেই, সেটা হলো এটা প্রমাণ করা যে, আমার দেহে দুষ্ট ভাইরাসটি নেই। কায়মনোবাক্যে আমি এটা চাইছি আমার বেঁচে থাকার আশায় নয়, শুধু একটা অপরাধবোধ থেকে মুক্তির আশায়। সে অপরাধবোধটা ছিল, আমার বন্ধুটিকে নিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যেতে ঘর হতে বেরোবার সময় শুনতে পাওয়া সাবধানবাণীটি উপেক্ষা করা।
রানা ভাইয়ের কাছ থেকে হতাশাব্যাঞ্জক ঘরে থাকার পরামর্শ পাওয়ার পরদিন হাসপাতালে থাকা বন্ধুটির শারীরিক খবর নিতে যখন ফোন করলাম ডাক্তার ফেরদৌস খন্দকারকে, তখনই শুনলাম সেই ভয়ঙ্কর খবরটি- আমার বন্ধুটি করোনা পজিটিভ, ধারণা করা হচ্ছে তার স্ট্রোকের কারণ করোনাভাইরাস। ফেরদৌস খন্দকার আমাকে কোয়ারেন্টাইনে থাকার সুপারিশ করলেন।
সংবাদটি আমার কাছে বজ্রাঘাতের মতো মনে হয়েছিল। ড. ফেরদৌস যখন বলছিলেন, তখন আমার মস্তিষ্কে ঝড় বইছিল। আমি হিসাব মিলাচ্ছিলাম, আমার বন্ধুটিকে হাসপাতালে নামিয়ে দিয়ে আসার আগে ও পরে আমি ছাড়া আর কে কে তার সংস্পর্শে গিয়েছিল, তাদের সংস্পর্শে আর কে কে গিয়েছিল। আমি দ্রুত তাদের তালিকা করে ফেল্লাম। আমাদের যে কমন বন্ধুটির কথা আগে উল্লেখ করেছিলাম, সে আমাদের বন্ধুটির করোনা পজিটিভ সনাক্ত হওয়ার কথা স্বীকার করলো, তবে বলে দিলো, আমি যেন বিষয়টি কাউকে না জানাই। আমি মানলাম না, বরং উল্টো তাকেও আমি কোয়ারেন্টাইনে যেতে বললাম। আমি জানি, স্ট্রোক করার দু-একদিন আগেও আমাদের করোনাপজিটিভ বন্ধুর সাথে সে সময় কাটিয়েছে। এ থেকে আমার এটাও মনে হলো, নিজে করোনা পজিটিভ হওয়ার কারণে সে নিজেই হয়তোবা কোয়ারেন্টাইনে ছিলো বলে হরিহর আত্মার খবর নিতে সশরীরে না গিয়ে আমাদেরকে পাঠিয়েছে, এবং করোনাসংক্রমণের খবর গোপন রাখতে চেয়েছে। ফোনটি রেখে সাথে সাথে লিস্ট অনুযায়ী সবাইকে ফোন করে কোয়ারেন্টাইনে যেতে বল্লাম, এবং তারপর দৃষ্টি ফেরালাম নিজের দিকে।
আমি নিজের জন্য ভীত নই, সময় ফুরোবার আগে মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণের জন্যও আমি প্রস্তুত নই। তবে ভীতির কারণ আছে। মনে আছে একটা সাবধান বাণীর কথা বলেছিলাম? বাণীটি এরকম ছিল, ‘মনে রাখবে, তোমার ওপর আমি একশোভাগ নির্ভরশীল, কাজেই সাবধানে যাবে’। স্বপ্নার এই কথাটিই এক কান দিয়ে ঢুকেছিল, আরেক কান দিয়ে বেরিয়েছিল। বেপরোয়া ও আত্ম-অসচেতন ছেলেরা মায়েদের এবং স্বামীরা স্ত্রীদের এমন সাবধানবাণী জীবনে থোড়াই পরোয়া করে থাকে। এই অপরিণামদর্শী বেপরোয়া ভাবটিই আজ হয়ে গেলো আমার বুকের ওপর চেপে থাকা অপরাধবোধের ভারী পাথর!
যদিও ঘটনাটি জানার পর বিরূপ প্রতিক্রিয়া না করে বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার মতো মানসিক দৃঢ়তা দেখিয়েছে স্বপ্না, তবুও সাবধানী ব্যবস্থার তোয়াক্কা না করার মতো অপরিণামদর্শীতা ও বোকামীর অপরাধবোধ থেকে আমি মুক্ত হতে পারিনি। কারণ যেসব শারীরিক অবস্থা থাকলে কেউ করোনাভাইরাসের সহজ শিকারে পরিণত হতে পারে, স্বপ্নার মধ্যে তার বেশ কয়েকটি বিদ্যমান, তার ওপর সম্প্রতি ব্যাকটেরিয়া ও ফাংগাস ইনফেকশনের জন্য তাকে কড়া ডোজের অ্যান্টিবায়োটিক নিতে হয়েছে। এটি তার নিজস্ব রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে একেবারে ভেঙে দিয়েছে। করোনাভাইরাসের এমন সহজ শিকার যারা, তাদের কথা ভেবেইতো বিশেষজ্ঞরা বার বার বলছেন- প্রিয়জনদের কথা বিবেচনা করে স্বাস্থবিধিগুলো মেনে চলতে হবে! আমিও তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, এ যাত্রায় বেঁচে গেলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবো, অন্তত যতদিন পর্যন্ত না আমরা মহামারির হুমকি থেকে মুক্ত হই।
কোয়ারেন্টাইনের অষ্টম দিনে হঠাৎ সুযোগ মিললো কোভিড টেস্ট-এর। ভাবলাম, আজ টেস্ট করাতে পারলে অবশিষ্ট ৬ দিন এই নরকসম অন্তর্দহন থেকে মুক্তি মিলবে। কিন্তু তা আর হলোনা, রেজাল্ট এলো আমার কোয়ারেন্টাইনের সাড়ে তেরোদিনের মাথায়। আমার দেহে কোভিড নেই। তবুও ডাক্তারের পরামর্শে পুরো চৌদ্দ দিন শেষ করার পর স্বপ্নার সাথে পুনর্মিলন হলো।
ততদিনে আমার সে বন্ধুটি করোনামুক্ত হয়ে একটি রিহ্যাব সেন্টারে, আমাদের খুব কাছেই আছে। প্রতিদিন কথা হয়, ভয়েস এবং ভিডিওতে। তার শিশুসুলভ কথা, আচরণ ও প্রত্যাশার কথা শুনে আমার খুব খারাপ লাগে। আমি তাকে দেখতে যাবো, কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস পৌঁছে দেবো, এটা সে চাইতো। আমি পারিনা, তাই খারাপ লাগে। হাসপাতাল কিংবা রিহ্যাব, সর্বত্র দর্শনার্থী নিষিদ্ধ। এদিকে আমি কোয়ারেন্টাইনে আছি। কেনো কোয়ারেন্টাইনে থাকা উচিৎ, ঝুঁকিটা কোথায়, স্বপ্নার নির্ভরশীল জীবনযাপন— সব ব্যাখ্যা করে বলেছি। প্রতিদিন বা প্রতিবার কথা হলেই বলতে হয়েছে। মনে হয়, আমার কথায় সে ভুল বুঝেছে, তার আত্মসম্মানে লেগেছে। আমি জানি, আমার বন্ধুটির স্মৃতি এখনও পুরোটা ফেরত আসেনি। এটা টের পেয়েছি তার এবং তার ঘনিষ্টজনদের আচরণে। কি করবো, আমি কিছুটা বানিয়ে, কিছুটা বাড়িয়ে, কিছুটা লুকিয়ে, কিছুটা অভিনয় করে বলতে পারিনা।
আমি জানি, একদিন করোনাকালের অবসান হবে। প্রতিষেধক এবং/অথবা নিরাময় বের হবে। ততদিনে আমরা চিনে ফেলবো কিছু স্বার্থপর, ভণ্ড ও লোভী মানবতাবর্জিত মানুষদের, লোকদেখানো আন্তরিক কিছু মেকী চরিত্রদের। সাথে সাথে পরিচিত হবো কিছু ত্যাগী, স্বার্থহীন, ভয়হীন, নিবেদিতপ্রাণ করোনাযুদ্ধাদের, যাদের জন্য অনাগত দিনের পৃথিবী হয়ে উঠবে আরও উদার, আরও আন্তরিক, আরও মানবিক।
করোনাউত্তরকালে সেই বাসযোগ্য পৃথিবীর অপেক্ষায় থাকলাম।
. . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . .
পুনশ্চ: ছবিগুলো গত ৬ জুন শনিবার তোলা ম্যানহাটানের বিভিন্ন অংশের। কৃষ্ণাঙ্গ নির্যাতনের প্রতিবাদ এবং করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে লকডাউনের কারণে ম্যানহাটানের টাইম স্কোয়্যারসহ বিভিন্ন অংশে যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ ছিলো। বিরল এই দৃশ্যগুলো সবার সাথে শেয়ার করার লোভ সামলাতে পারলাম না।-মিনহাজ আহমেদ।
- নিউইয়র্কে অ্যাসাল ওজোন পার্ক চ্যাপ্টারের ইফতার ও অভিষেক
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ ল সোসাইটি ইউএসএ’র ইফতার মাহফিল: খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকার আহ্বান
- BOROUGH PRESIDENT GIBSON HOSTS FOURTH ANNUAL BRONX IFTAR DINNER DIALOGUE UNDER THE THEME “UNITY IN DIVERSITY”
- নিউইয়র্কে মানসিক সংকটে থাকা যুবককে গুলি: পুলিশ প্রশিক্ষণ এবং মানসিক সংকটসংক্রান্ত ৯১১ কল
- নিউইয়র্কে গ্রী ম্যাকানিকেল ইয়াঙ্কার্স এর ইফতার ও দোয়া মাহফিল
- নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গমাতা পরিষদ’র ইফতার ও দোয়া মাহফিল
- নিউইয়র্কে ঢাকা জেলা অ্যাসোসিয়েশনের ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত
- বাংলাদেশ সোসাইটি অব ব্রঙ্কস নিউইয়র্ক ইনকের কোরআন তেলাওয়াত প্রতিযোগিতা ও ইফতার মাহফিল








