Thursday, 22 October 2026 |
শিরোনাম
ওয়ার্ল্ড হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট ইউএসএর সাধারণ সম্পাদক ড. সাদিয়া আফরিন এরা চরমোনাই পীরের যুক্তরাষ্ট্র সফর উপলক্ষে নিউইয়র্কে দোয়া মাহফিল, কুরআন-সুন্নাহর আলোকে বয়ান New York Attorney General James Secures Reimbursements for T-Mobile Customers Whose Rates Were Unjustly Raised নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে কুনু-ফিরোজ পরিষদের সাত দফা ইশতেহার ঘোষণা; কমিউনিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠা, সাশ্রয়ী ফিউনারেল সেবা, বিমানের সরাসরি ফ্লাইট ও আর্থিক স্বচ্ছতায় অঙ্গীকার ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের পূর্ণ সমর্থন: জাতিসংঘে রাষ্ট্রদূত আইরিন খান নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে প্রথমবারের মতো বিতর্ক, গুরুত্ব পেল স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি New York Attorney General James Warns New Yorkers About AI-Generated Election Misinformation Ahead of November Elections Bangladesh calls for global treaty to protect victims of crimes against humanity নিউইয়র্কে জাতিসংঘে মুহাম্মদ নওশাদ জমির এমপি: মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রতিরোধে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সনদ প্রণয়নের আহ্বান সোশ্যাল মিডিয়ার তথ্য গোপন করলে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাখ্যান, আবেদনপত্রে চাওয়া তথ্য সঠিক ও সম্পূর্ণভাবে দেওয়ার নির্দেশনা মার্কিন দূতাবাসের
সব ক্যাটাগরি

কোরবানীর ঈদ এবং এক জোড়া স্যান্ডেল

অনলাইন ডেস্ক পঠিত: 46 বার

প্রকাশিত: July 17, 2020 | 10:30 AM

জুলি রহমান : বয়স কত? না হলফ করে বলতে পারিনা। যৌথ বাড়িতে তখন চার ডজন ছেলেমেয়ে। বাবা জেঠুরা চারজন। আমার বাব ভাইদের মধ্যে সর্ব কনিষ্ঠ। আটচল্লিশ জন ছেলেপুলে শুধু যে চাচা জেঠুদের তা কিন্তু নয়। এর সাথে যোগ হতো নায়রী কনেদের ছেলেপুলে। আমাদের যে দল সে টি ছিলো ভাংতি পয়সা চার আনার সিকি। আট আনা সিকি ছিলেন মেঝু ভাইদের দল। বারো আনা ছিলেন বড় ভাইবোনদের দল। ষোল আনা মানে এক টাকার দল দাদারা। বংশীয় ভাবে সবার যিনি বড় তিনি দাদাভাই। এই দাদা ভাইবোনদের দলে ছিলেন তিন দাদা আর তিন বুবু। এরা ছিলেন রুপের খণি।শাসনে শোষনে ও শানিত তরবারি।

বড় দাদা মজিদ আলী বলেন, এই জুলে নে তোর স্যান্ডেল। রোকেয়া বুবুর মেয়ে তাঁর জন্যও স্যান্ডেল। রোকেয়ার স্যান্ডেলটা লাল টকটকে। আমার টা নীল। আমার মনটা চোখটা গেঁথে রইলো রোকেয়ার লাল স্যান্ডেলের উপর। দুবার মাকে বললাম। মা বলেন, ছিঃ জুলে ওতো মেহমান। আমি ছুটলাম রোকেয়ার পেছনে। রোকেয়ার ছিলো আচার খাবার প্রচন্ড লোভ।
আচার তৈরী করন বড় জেঠিমা।জেঠি মা আবার আমাকে খুব ভালোবাসতেন। অগত্যা রোকেয়া আমাকেই ধরলো কষে। বড় নানীর কাছে একটু আচার চেয়ে দ্যাখ না রে জুলে।আমি ভাবলাম এইতো সুযোগ যায়-আমি বলি, শোন আচারের ব্যবস্থা করবো যদি তুমি তোমার লাল পেড়ে স্যান্ডাল টা আমাকে দিয়ে নীলটা তুমি নাও।

এতো সহজেই রোকেয়া যে রাজী হবে আমি কল্পনাই করিনি। রোকেয়া তো সাথে সাথে তার লাল স্যন্ডেল আমাকে দিয়ে দিলো। এখন আচার চুরির পালা।আমি আবার টক খেতে পারি না। ছোট বেলা থেকেই আমার মিষ্টান্ন দ্রব্যের প্রতি আসুক্তি। এ কথা বাড়ি শুদ্ধ লোকের জানা। বড় জেঠিমা তেতুল গাছের পাকা তেতুলে গড়া আচার বড়া সারা বছরের জন্য দীর্ঘদিন ধরে তৈরী করেন। আর তা মেঝদা ইদ্রিস ভাইয়ের ভয়ে এমন জায়গায় লুকিয়ে রাখে যে জমেও ছুঁতে পারে না। আজ বাড়িতে মটরের ডাল রান্না হচ্ছে।দুই মনের কড়াইতে পাক হচ্ছে। বড় জেঠি মা জোড়েই মাকে অর্ডার করলেন দুলুর মা ডালে একবড়া তেতুল ছেড়ে দিও। আমি আর রোকেয়া হলাম গুপ্তচর।মায়ের পিছু নিলাম। দেখি মা বড় জেঠিমার ঘরের ভেতরের ধানের গোলার দিক যায়। একটা লাল রাশ পেড়ে আনলেন। রাশ বলতে গোলগাল মাটির মোটা পাত্র; যা জেঠিমা ঘি মেখে সাতদিন রৌদ্রে সেঁকে সেঁকে তৈরী করে তাঁর ভেতরে তেতুলের আচার।রেখেছেন।

মা চলে যাবার সংগে সংগে রোকেয়া সেই রাশে হাত ঢুকিয়ে নিয়ে নিলো কয়েক বড়া। তাঁরই অনতি দূরে থরে থর সাজানো রাশ কয়েকটি। রোকেয়ার লোভাতুর দৃষ্টি পড়ে সব রাশের ভেতর। কোনটায় আমলকির আচার। কোনটায় আমের। কোনটায় বা রসুন কাঁচা লংকার।সারাদিন রোকেয়ার আচার খাওয়ার দৃশ্যে আমার তো চোখ ছানাবড়া। এই আচার খেতে এক সময় দেখে ফেলে বড় বুবুর ছেলে রফিক। রফিক ছিলো আবার তোতলা। যার এক কথা বলতেই দম বের হয়ে যাবার উপক্রম। সে তখন বহু কষ্টে বার তিনেক আচার চাইলো।রোকেয়া তাঁরে এক ধমক দিলো। কিন্তু তোতলা রফিক ক্ষেপে গিয়ে বড় জেঠি মা কে বলে, না–নু  তো তো তো মা – মা -র; বাকী  কথা শেষ করার আগেই রোকেয়া তার মুখ ধরে চেপে।জেঠিমা কাজের চাপে কানই দিলেন না তোতলা রফিকের কথায়। রফিকের মুখ এতোটাই বিবর্ণ হলো যে দুপুরের ভাঁজা রোদ ভেদ করে এক খন্ড ঘন গভীর কালো মেঘ তাঁর মুখে স্থায়ী হয়ে আসন গাড়লো।রোকেয়া তাঁর হাত আমার হাতে চেপে দিলো হ্যাচকা টান। এক দৌঁড়ে আমরা কলমাই নদীর বালুর ভেতর।

সারাবেলা আর কাটেনা কখন রাত হবে। কখন ভোর হবে? নতুন জামা নতুন স্যান্ডের পরবো। তখন ছিলো শীতের দিন। ভোর না হতেই রোকেয়া আমার বিছানার পাশে দাঁড়ালো তুই এখনো ঘুমে? ওরা আমাদের আগেই নতুন কাপড় পরে নিবে। আমি তো উঠি তো পড়ি করে দিলাম দৌঁড় রোকেয়ার হাত ধরে কলমাইর দিকে। সে – কি ঠান্ডা বালুর শরীর। চাপ চাপ বালুতে আটকে গেলো আমার এতো সাধের লাল ফিতের স্যান্ডেল। রোকেয়া বলে, এই জুলে তুই এতো বোকা? স্যান্ডেল খোল।
এই দ্যাখ না আমি তো স্যান্ডেল পরিনি।
আমি বলি না আমি পারবো না বালু কী ঠান্ডা। রোকেয়া আমাকে বসিয়ে জোড় করে স্যান্ডেল খোলে নিলো। যাহ এবার হাঁট। আমি কিছু দূর অগ্রসর হতেই শরীরে কাঁপুনি উঠে গেলো। আর রোকেয়া দিব্বি হাঁটছে। আমি দেখি রোকেয়ার ফ্রকে কাঁদা লেপ্টে যাচ্ছে।
আমি বলি, জামাতো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তোর। দে আমাকে। দূর্বার শিশিরে ভেজা স্যান্ডেলে এঁটেল মাটি আর বালুর স্তর এমন ভাবে বসে গ্যাছে যে আমার ক্ষুদ্র পা টেনেও আমি কূল পাচ্ছি না।হঠাৎ দেখি আমার দু পা আলগা লাগছে। অর্থাৎ স্যান্ডেলের ফিতের দম শেষ। ফিতে ছিঁড়ে গেলে আমার কান্না কে দেখে? আমি কাঁদি আর বলি আমার লাল স্যান্ডেল! ঈদ হবে কেমন করে? আমার লাল স্যন্ডেল? আমার কাজিন জলিল ভাই। রোকেয়ার আপন মামা। আমাকে কোলে নিয়ে বলে, পোলাানের জন্য শান্তিমত যে গা গোসল দিবো  তাঁর ও উপায় নেই আর।চল বাড়ি দিয়ে আসি।

জলিল ভাই বাড়ি নিয়ে এলে ওঠোনে বসেই আবার কান্না আমার লাল স্যান্ডেল দেয় নি রে।আমার সমব্যাথিরা ততক্ষণে আমাকে ঘিরে ফেলেছে। আইয়ূব, হালিম, রোকেয়া মাজেদা, সোফিয়া, ইব্রাহীম, বারেক, তোতলা রফিকের সে কি কান্নার বেহাগ। ওর এতো কষ্টের কান্না দেখে আমি থেমে গিয়ে বলি, চল গরু জবাই দেখি। এখন আমি সবার পায়ের দিকে চেয়ে দেখি আমারই শুধু স্যান্ডেল নেই।
আইয়ূব মামা দৌঁড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে নে জুলে পর। নানা স্যান্ডেলের ফিতে গেঁথে দিয়েছে রে।

আমি এবার ভলো করে পায়ের দিকে তাকাতেই গরুর গলা থেকে তীব্র বেগে রক্ত ছুটে আমার নতুন জামাটা নোংরা করে দিলো। আমি একবার জামার দিকে আরেক বার গরুটির দিকে তাকাই। গরুটি মাটিতে ছটফট করছে একদল লোকের হাতের নিচে। ধারালো ছুঁরি হাতে শাদা পান্জাবী মাথায় টুপি পরিহিত হুজুর বীরদর্পে দাঁড়িয়ে। তাঁর হাত ও ছুরি থেকে টপটপ ঝরছে রক্ত। এতোটুকু দেখার পর আমি আর জানি না। যখন নিজেকে আবিষ্কার করলাম তখন আমি আমার বুবুর কোলে।

কতবার বলছি, পোলাপান তোরা জবাই টবাই দেখিস না।কে কার কথা শোনে? একটু বেলা হতেই আমার শরীরে প্রচন্ড জ্বর। সবাই কী খেলছে।আমি বারান্দার বেন্চিতে বসে দেখছি।
কতক্ষণ পর পর রোকেয়া সোফিয়া এসে কপালে হাত বুলিয়ে তাপ পরীক্ষা করে করে আবার দৌড়ে যাচ্ছে। হঠাৎ আমার ওদের কাছে যেতে মন চাইলো।পায়ে স্যান্ডেল গলাতে গিয়ে দেখি কোথাও নেই আমার সারিয়ে তোলা স্যান্ডেল জোড়া। আবার ভাংতি পয়সা চার আনার সিকির দল ছুটলো তদন্তে।
না নেই। কোথাও নেই।

বিকেল বেলা কুকুরের এতো ঘেউ ঘেউ যে বাড়িটা মাথায় তোলে নেবার উপক্রম হয়েছে।মাংসের হারের বন্টনে তাদের এই উচ্চস্বর।

হন্তদন্ত হয়ে হালিম ছুটে এলো। হাতে তাঁর লাল স্যান্ডেলের একপাটী। তাও অর্ধেক ভক্ষণ করা কুকুরের জিহবায় চর্বিত চর্বণে। এরপর নবম শ্রেণীতে পড়াকালীন সময় থেকেই পেন্সিল শো পরিধান করেছি। বাটার দুইতলা তিন তলা জুতো পরেছি। ভুলতে পারিনি কোনদিন সেই লাল ফিতের স্যান্ডেলের শোক। আহা আমার সেই শিশুকাল।

বিজ্ঞাপন / স্পন্সরড কন্টেন্ট
ট্যাগ:
সর্বশেষ সংবাদ