Thursday, 12 March 2026 |
শিরোনাম
নিউইয়র্কে অ্যাসাল ওজোন পার্ক চ্যাপ্টারের ইফতার ও অভিষেক নিউইয়র্কে বাংলাদেশ ল সোসাইটি ইউএসএ’র ইফতার মাহফিল: খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকার আহ্বান BOROUGH PRESIDENT GIBSON HOSTS FOURTH ANNUAL BRONX IFTAR DINNER DIALOGUE UNDER THE THEME “UNITY IN DIVERSITY” নিউইয়র্কে মানসিক সংকটে থাকা যুবককে গুলি: পুলিশ প্রশিক্ষণ এবং মানসিক সংকটসংক্রান্ত ৯১১ কল নিউইয়র্কে গ্রী ম্যাকানিকেল ইয়াঙ্কার্স এর ইফতার ও দোয়া মাহফিল নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গমাতা পরিষদ’র ইফতার ও দোয়া মাহফিল নিউইয়র্কে ঢাকা জেলা অ্যাসোসিয়েশনের ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ সোসাইটি অব ব্রঙ্কস নিউইয়র্ক ইনকের কোরআন তেলাওয়াত প্রতিযোগিতা ও ইফতার মাহফিল New York Attorney General James Releases Statement on Live Nation Trial নিউইয়র্কে গোল্ডেন এইজ হোম কেয়ারের ইফতার মাহফিল
সব ক্যাটাগরি

বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে পরিপূর্ণ মানুষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একান্ত শেষ ইচ্ছাগুলোর কোনটাই রাখা হলো না!

অনলাইন ডেস্ক পঠিত: 23 বার

প্রকাশিত: August 8, 2020 | 12:09 PM

স্বপন পাল :

‘কোথাও দুঃখ, কোথাও মৃত্যু, কোথা বিচ্ছেদ নাই…
জীবনের মাঝে স্বরূপ তোমার রাখিবারে যদি পাই।’

‘আশ্রম থেকে যাত্রা, শুক্রবার, ২৫ জুলাই। অস্ত্রোপচার, বুধবার, ৩০ জুলাই। মৃত্যু বৃহস্পতিবার, ৭ আগস্ট।‘ ডায়রীর পাতার এক কোণে লিখেছেন কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আগস্ট ৯, ১৯৪১-এ লিখলেন, ‘সব শেষ করে আশ্রমে ফিরেছি। এখন কেবল তাঁর স্মৃতি নিয়ে সময় কাটছে।’

এক
আশি বছর বয়সে এক দুর্দান্ত সৃষ্টিমুখর জীবনের শেষ প্রান্তে (মৃত্যুর ১১ দিন আগে; ১১ শ্রাবণ) এসে কবিগুরু লিখলেন,
‘প্রথম দিনের সূর্য
প্রশ্ন করেছিল
সত্তার নূতন আবির্ভাবে,
কে তুমি,
মেলে নি উত্তর।
বৎসর বৎসর চলে গেল,
দিবসের শেষ সূর্য
শেষ প্রশ্ন উচ্চারিল পশ্চিম-সাগরতীরে,
নিস্তব্ধ সন্ধ্যায়,
কে তুমি,
পেল না উত্তর।’

এর তিন দিন পর, ১৯৪১ সনের ৩০ জুলাই, ১৪ শ্রাবণ ১৩৪৮ সকাল সাড়ে নয়টায় অস্ত্রোপচারের কিছুক্ষণ পূর্বে ‘জীবনদেবতা’র উদ্দেশ্যে কবির শেষ নিবেদন,-
‘তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি
বিচিত্র ছলনাজালে,
হে ছলনাময়ী।
মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ পেতেছ নিপুণ হাতে
সরল জীবনে।
এই প্রবঞ্চনা দিয়ে মহত্ত্বেরে করেছ চিহ্নিত;
তার তরে রাখ নি গোপন রাত্রি।
তোমার জ্যোতিষ্ক তা’রে
যে-পথ দেখায়
সে যে তার অন্তরের পথ,
সে যে চিরস্বচ্ছ,
সহজ বিশ্বাসে সে যে
করে তা’রে চিরসমুজ্জল।
……
সত্যেরে সে পায়
আপন আলোকে ধৌত অন্তরে অন্তরে।

কিছুক্ষন পর অস্ত্রোপচারের জন্য তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়। জীবনের কলতানে আর ফিরে আসেননি রবীন্দ্রনাথ। জীবন-মৃত্যুর মাঝামাঝি একটানা নয়দিন এক কষ্টকর সময় পার করার মধ্যে দিয়ে অমৃতলোকে যাত্রা করেছিলেন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের এযাবৎ কালের সবচেয়ে পরিপূর্ণ মানুষ-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। 
যে অস্ত্রোপচার রবীন্দ্রনাথ চাননি, চাননি কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথসহ পরিবারে অন্য সদস্যরা, চাননি কবির একান্ত আপনজন, আজীবনের প্রিয় বন্ধু, ব্যক্তিগত চিকিৎসক ‘ধন্বন্তরী’ ডাঃ নীলরতন সরকারও। 

১৯৩৮ সালে শান্তিনিকেতনের উত্তরায়ণে এক সন্ধ্যায় বিসর্প রোগে আক্রান্ত হয়ে অচেতন হয়ে পড়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। খবর গেল ডাঃ নীলরতন সরকারের কাছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে আরো কয়েকজন চিকিৎসককে সাথে নিয়ে তিনি চলে গেলেন কবির কাছে, বোলপুরে। অক্লান্ত প্রয়াস চালালেন কবিকে সুস্থ্য করে তুলতে। রাত জেগে বসে রইলেন সংজ্ঞাহীন বন্ধুর পাশে। টানা আড়াইদিন পরিশ্রম করে ‘ধন্বন্তরী’ চিকিৎসক নীলরতন সরকার বন্ধুকে ফিরিয়ে এনেছিলেন যমের দুয়ার থেকে। অচেতনার আলোহীন জগত থেকে আলোর জীবনে ফিরেছিলেন সাতাত্তর বছরের রবীন্দ্রনাথ। নিজেকে আবিস্কার করেছিলেন ‘রূপনারানের কুলে’; অনুভব করেছিলেন ‘এ জগৎ স্বপ্ন নয়।’ আমরা পেয়েছিলাম মহাকবির আরো নতুন নতুন মহান সৃষ্টি। ১৯৩৮ এ প্রকাশিত হলো ‘সেজুতি’। বন্ধু নীলরতন সরকারকে অর্ঘ্য নিবেদন করে উৎসর্গ পত্রে লিখলেন,-
অন্ধতামসগহ্বর হতে
ফিরিনু সূর্যালোকে।
বিস্মিত হয়ে আপনার পানে
হেরিনু নূতন চোখে।
মর্তের প্রাণরঙ্গভূমিতে
যে চেতনা সারারাতি
সুখদুঃখের নাট্যলীলায়
জ্বেলে রেখেছিল বাতি
সে আজি কোথায় নিয়ে যেতে চায়
অচিহ্নিতের পারে,
নবপ্রভাতের উদয়সীমায়
অরূপলোকের দ্বারে।
আলো-আঁধারের ফাঁকে দেখা যায়
অজানা তীরের বাসা,
ঝিমঝিমি করে শিরায় শিরায়
দূর নীলিমার ভাষা।
সে ভাষায় আমি চরম অর্থ
জানি কিবা নাহি জানি,
ছন্দের ডালি সাজানু তা দিয়ে,
তোমারে দিলাম আনি।

আরেকবার কালিম্পংএ অসুস্থ হয়ে পড়ায় কবিকে নিয়ে আসা হলো কলকাতায়। অন্য চিকিৎসকদের অস্ত্রোপচারের পরামর্শ যুক্তি দিয়ে ঠেকিয়ে নীলরতন সরকার চিকিৎসা করেছেন শুধু ঔষধ দিয়ে। সুস্থ করে তুলেছেন। কিন্তু শেষ বার পারেন নি। নিজের অসুস্থতা, স্ত্রীর মৃত্যু-এসব কারনে থাকতে পারেননি কবির কাছে। তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁর পরামর্শকে উপেক্ষা করে অন্য চিকিৎসকগণ অস্ত্রোপচারে করেছেন কবির শরীরে। এখন পর্যন্ত সেই অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্তকে ‘ঐতিহাসিক ভুল’ হিসেবেই আখ্যায়িত করেছেন অনেকেই। কারন সেই সিদ্ধান্তটি এসেছিল আরেক প্রবাদ-প্রতিম চিকিৎসক ডাঃ বিধান রায়ের কাছ থেকে। 

দুই
নিয়ে যাব জীবনের চরম প্রসাদ,
নিয়ে যাব মানুষের শেষ আশীর্বাদ…

কবির জীবদ্দশায় শেষ জন্মদিন শান্তিনিকেতনে অনাড়ম্বরভাবে পালিত হয়েছিল। সেই জন্মদিনের ভাষণে ‘সভ্যতার সংকট’এর কথা বলেছিলেন। আশি বছর আগে যে সংকটের স্বরূপ কবি উন্মোচন করেছিলেন, তা একটুও কমেনি, বরং ক্রমান্বয়ে আরও ঘনীভূত হয়েছে৷ যদিও এর মধ্যে মানুষ জ্ঞান বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে নতুন নতুন ধাপে পা দিয়েছে। তিনি মানুষের উপর বিশ্বাস রেখেছিলেন। আশার প্রতীক হয়ে এসেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন- অক্টোবর বিপ্লব । কিন্তু বাইরের নানা চাপ আর ভেতরের নানা ভুলে তাও একদিন ধ্বসে পড়লো। যদিও কবি তা দেখে যাননি। তাহলে হয়তো আরও নিরাশ হতেন। এরপর তো কেবলি মানুষের বিচ্ছিন্নতা। পরিবার থেকে, সমাজ থেকে, প্রজাতি থেকে এমনকি নিজের সত্ত্বা থেকে মানুষ কেবলই বিচ্ছিন্ন হতে থাকলো। আর এর মধ্যে দিয়ে আজকে আমরা, আমাদের সভ্যতা এক গভীর সংকটে নিমজ্জিত।
রবীন্দ্রনাথ কি ধরেই নিয়েছিলেন সেটি তাঁর জীবনের শেষ জন্মদিন! সেদিন তিনি অন্নদাশঙ্কর রায়কে লিখে পাঠিয়েছিলেন যে কবিতা, সেখানেও যে ছিল সেই বিদায়ের সুর,
আমার এ জন্মদিন-মাঝে আমি হারা
আমি চাহি বন্ধুজন যারা
তাহাদের হাতের পরশে
মর্ত্যের অন্তিম প্রীতিরসে
নিয়ে যাব জীবনের চরম প্রসাদ,
নিয়ে যাব মানুষের শেষ আশীর্বাদ।
শূন্য ঝুলি আজিকে আমার;
দিয়েছি উজাড় করি
যাহা-কিছু আছিল দিবার,
প্রতিদানে যদি কিছু পাই
কিছু স্নেহ, কিছু ক্ষমা
তবে তাহা সঙ্গে নিয়ে যাই
পারের খেয়ায় যাব যবে
ভাষাহীন শেষের উৎসবে।
এর কয়েকদিন পরেই ত্রিপুরা রাজার প্রতিনিধি এসে কবিকে ‘ভারত ভাস্কর’ উপাধি দিয়ে গিয়েছিলেন। কবির প্রথম জীবনেও এরা অভিনন্দিত করেছিলেন কবিকে।
৯ শ্রাবণ ১৩৪৮,  ২৫ জুলাই ১৯৪১ কবিকে অস্ত্রোপচারের জন্যে শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতার জোড়াসাঁকোর বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। শান্তিনিকেতনের সাথে সত্তর বছরের সম্পর্ক।  তিনি কি বুঝতে পেরেছিলেন আর ফেরা হবে না জীবনের সবচেয়ে প্রিয় আঙিনায়? যাবার সময় চোখে রুমাল দিচ্ছিলেন বারবার।

‘বাইশে শ্রাবণ’ এবং প্রাসঙ্গিক কথন (দ্বিতীয় পর্ব)
-স্বপন পাল

‘কোথাও দুঃখ, কোথাও মৃত্যু, কোথা বিচ্ছেদ নাই…
জীবনের মাঝে স্বরূপ তোমার রাখিবারে যদি পাই।’

তিন
যে নিয়মে ঝড়ে পড়ে শুকনো পাতা,পরিপক্ক ফল সেই নিয়মেই আমি জীবনের বৃন্ত থেকে খসে যেতে চাই….

ডাঃ নীলরতন সরকার বারবার বারণ করেছেন কবির দেহে অস্ত্রোপচার করতে। তিনি ঔষধ দিয়ে চিকিৎসা চালিয়ে যাবার কথা বলেছেন সবসময়। বলেছিলেন,
‘ভুলে যেও না, রোগী অন্য কেউ নন, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। সুকোমল দেহ ওঁর, খুব সুন্দর করে বাঁধা একটা তানপুরার মতো। সামান্য আঘাতে গোটা দেহযন্ত্রটা ভেঙে পড়তে পারে।’
যতোদিন সুস্থ ছিলেন, কবির কাছে ছিলেন নীলরতন সরকার, ততোদিন ঠেকিয়ে রেখেছেন অস্ত্রোপচার। বারবার অন্য চিকিৎসকদের  বলেছিলেন,
‘আপনাদের কথা ঠিক যে, এ অপারেশন খুব সহজ। কিন্তু মনে রাখবেন রোগী স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ওঁর নার্ভ-সিস্টেম সাধারণ লোকের মতো নয়। সুকুমার দেহ ওঁর। কাজেই অন্য লোকের সাথে তাঁর তুলনা চলে না। অন্যের ক্ষেত্রে যা ফোঁড়া কাটা মাত্র, রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে তা না-ও হতে পারে। আমার মনে হয় না, এই রিস্ক নেওয়া উচিত।’
কবির নিজেরও অমত ছিলেন এই ব্যাপারে। যখন অস্ত্রোপচারের কথা জানতে পেরেছিলেন, বলেছিলেন,
‘তার কি দরকার! এমনিতে ক’টা দিন আর বাঁচবো! যে ক’দিন বাঁচি, তাতে দৈহিক গ্লানি একটু কম থাকলেই ঢের।’
অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্তটি পিতাকে জানানোর জন্য রথীন্দ্রনাথ ডাক্তার জ্যোতিপ্রকাশ সরকারকে নিয়ে শান্তিনিকেতনে গেলেন, শুনে কবি বলেছিলেন,
‘শনি যদি একটা কিছু ছিদ্র খোঁজে, সে যদি আমার মধ্যে রন্ধ পেয়েই থাকে-তাকে স্বীকার করে নাও। মানুষকে তো মরতেই হবে একদিন। মিথ্যে এটাকে কাটাকুটি ছেঁড়াছেঁড়ি করার কী প্রয়োজন। দেহ অক্ষতভাবেই তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়া ভালো।’
মৈত্রেয়ী দেবী লিখেছেন,
‘যখনই কবির কাছে বসি, উনি জিজ্ঞাসা করেন, ‘অপারেশনের কথা শুনছ? দেখ, এ আমি একেবারে চাই না। এসেছিলাম গোটা মানুষ, যাবার সময় কি ছেঁড়াখোঁড়া হয়ে যাব।’ আবার কখনো বলেন, ‘যে নিয়মে ঝড়ে পড়ে শুকনো পাতা, পরিপক্ক ফল সেই নিয়মেই আমি জীবনের বৃন্ত থেকে খসে যেতে চাই। টানাহেঁচড়া করে লাভ কি!’ আমারও মন বলে অপারেশন করে লাভ নাই। কী হবে? উনি কি স্বাস্থ্য ফিরে পাবেন? এই অস্তোন্মুখে রবি তার আবর্তন পথেই চলে যাবে।  তবে কেন এত কষ্ট দেওয়া। আরেকদিন কবি বললেন, ‘মিত্রা,ওরা কি বলে অপারেশন করতেই হবে?’ ‘ওঁরা মনে করেন তাহলে আপনি খানিকটা সুস্থ হবেন।’ ‘তুমি কি মনে কর?’ ‘আমি চুপ করে রইলাম, বলতে পারলাম না যে, যদিও খানিকটা ভালো থাকেন সুপ্রাপিউবিকের থলি (ইউরিনারি ব্যাগ) বয়ে উনি একদন্ড শান্তি পাবেন না। সেটা হবে ওঁর চরম শাস্তি।’
নির্মল কুমারী মহলানবীশকেও কবি বলেছিলেন,
‘দেখো রানী, আমি কবি- আমি সুন্দরের উপাসক। বিধাতা আমার এই দেহখানা সুন্দর করে গড়েছিলেন। এখান থেকে বিদায় নেবার সময়, এই দেহখানা তেমনি সুন্দর অবস্থাতেই তাঁকে ফিরিয়ে দিতে চাই। গাছ থেকে শুকনো পাতা যেমন আপনি ঝরে যায়, পক্ক সুপারী ফল যেমন বৃন্ত থেকে আপনি খসে পড়ে, আমারও ঠিক তেমনি ভাবেই সহজে বিদায় নেবার ইচ্ছে চিরকাল। কেন এরা যাবার আগে মাকে ছেঁড়াখোঁড়া করে দিতে চাচ্ছে? বয়স তো ঢের হয়েছে, আর কদিনই বা মানুষ বাঁচে, কাজেই ছেড়ে দিক না আমাকে। ফুলের মতো, ফলের মতো, শুকনো পাতার মতো আমার স্বাভাবিক পরিণতি ঘটুক।’
মাঝখানে কবি’র ইচ্ছাতে কবিরাজী চিকিৎসাও শুরু হয়েছিল। কবিরাজ আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন,
‘ওঁর শরীর যে রকম অন্যান্য বিষয়ে শক্ত আছে, তাতে মনে করি উনি এতোটা ভালো হয়ে উঠবেন যে, অপারেশনের প্রশ্নই থাকবে না’।
কবিরাজী চিকিৎসায় সাড়াও দিচ্ছিল কবি’র শরীর। এ সময় অস্ত্রোপচারের কথা শোনার পর কবি বলেছিলেন,
‘কিন্তু কবিরাজ মশাই তো মনে করছেন যে, তিনি আমাকে অমনিই সারাতে পারবেন, কাজেই মিছেমিছি কাটা-ছেঁড়া করবার দরকার কি?’
অপারেশনের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর, কবিরাজ কমলাকান্ত ঘোষ বলেছিলেন,
‘আমাদের একটু সময় দিলেননা এঁরা। এই ক’দিনের ওষু্ধে তো উনি একটু ভালো আছেন আজকাল, খাওয়া তো সামান্য বেড়েছে, জ্বরও একটু কম এবং নাড়ীও আগের চেয়ে একটু ভালো; তবু কেন ওঁরা মনে করছেন যে এখনই অস্ত্রোপচারটা করা দরকার?’
রবীন্দ্রনাথের প্রস্টেটগ্রন্থি বড় হয়ে গিয়েছিল। মূত্রপথ বন্ধ হয়ে বাড়ছিল রক্তে ইউরিয়ার মাত্রা। সমস্যার ডাক্তারি নাম ‘ইউরিমিয়া’। সেই সময়, ১৯৪১ সালে প্রস্টেটগ্রন্থি বাদ দেবার অস্ত্রোপচার পরীক্ষামূলকভাবে কেবল শুরু হয়েছে পাশ্চাত্যের অল্প কয়েকটি দেশে। যে মানুষটি বিশ্বের নানা দেশ ঘুরেছেন, পৃথিবীর নানাপ্রান্তে যার অসংখ্য ভক্ত অনুরাগী, তাঁর এমন একটি অসুখে আমেরিকা, জার্মান কিংবা ইংল্যান্ডের কোন চিকিৎসকের পরামর্শ কেন নেওয়া হলোনা, এমন বড় একটি প্রশ্নের পাশাপাশি আক্ষেপ তো থেকেই যায়! ইতোপুর্বে এর চেয়ে অনেক ছোট সমস্যায়ও লন্ডনে কবির চিকিৎসা হয়েছে। এমন জটিল সমস্যায় লন্ডনে বা পৃথিবীর অন্য কোন স্থানে কবি’র চিকিৎসা’র কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তেমন কোন তথ্য এখনো জানা যায়নি। হতে পারে, তাঁর শারীরিক অবস্থা এমন ছিল যে, বিদেশে নিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না।

চার
‘অপারেশন ছাড়া উপায় নেই। নইলে সারা দেশ আমাদের অপরাধী বানাবে।’

ডাঃ নীলরতন সরকারই চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু নিজের অসুস্থতা ও স্ত্রীর মৃত্যুজনিত কারণে কলকাতা থেকে গিরিডি’তে চলে যাওয়ায় কবির চিকিৎসার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন নীলরতনেরই ছাত্র ডাঃ বিধান রায়। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন অস্ত্রোপচারের। সালটা ১৯৪১। তখনো পেনিসিলিন আসেনি। জীবাণুর আক্রমন ঠেকাবার একমাত্র ব্যবস্থা সালফোনামাইড। নীলরতন সরকারের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী যেটি কবি কয়েক মাস ধরে সেবন করছিলেন। 
‘ধন্বন্তরী’ কলকাতা থেকে চলে যেতেই সক্রিয় হয়েছিলেন ডাঃ বিধান রায়। কারন, নীলরতন সরকার কলকাতায় থাকাকালীন তাঁর মতকে অগ্রাহ্য করবার সাহস ও ক্ষমতা কোনটাই ছিল না বিধান রায়ের।
রবীন্দ্রনাথ চাইছিলেন ফুল ফল পাতার মতো স্বাভাবিকভাবে ঝরে যেতে। কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথও অস্ত্রোপচারের পক্ষে ছিলেন না। তিনিও চাইছিলেন চিকিৎসা ঔষধ দিয়েই হোক। কিন্তু বিধান রায় তাদের কথা শোনেননি। যুক্তি দেখালেন,
‘অপারেশন ছাড়া উপায় নেই। নইলে সারা দেশ আমাদের অপরাধী বানাবে।’
সেই সময়ে ভারতবর্ষের এক নম্বর শল্যচিকিৎসক ললিতমোহন ব্যানার্জিকে শিলং থেকে খবর দিয়ে নিয়ে আসলেন। ১৯৪১ সালের ১৬ই জুলাই ললিত ব্যানার্জিকে নিয়ে বিধান রায় গেলেন বোলপুরে কবিকে দেখতে। দেখতে দেখতে পাশে দাঁড়ানো ললিত ব্যানার্জিকে জিজ্ঞেস করলেন,
‘কি? কবে করছো অপারেশন?’
ললিত ব্যানার্জি জানতেন সেই মুহূর্তে বিধান রায়ের কথাই শেষ কথা। কিছুক্ষণ চুপ থেকে উত্তর দিলেন,
‘তোমরা যে দিন বলবে। ‘

‘বাইশে শ্রাবণ’ এবং প্রাসঙ্গিক কথন’

কোথাও দুঃখ, কোথাও মৃত্যু, কোথা বিচ্ছেদ নাই…

পাঁচ
অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্তটি কি ‘ঐতিহাসিক ভুল’!

১৯৪০ সালের ১৫ই সেপ্টেম্বর রবীন্দ্রনাথ কালিম্পংয়ে অসুস্থ হয়ে পরার দার্জিলিং-এর সিভিল সার্জনও অপারেশন করতে চেয়েছিলেন সেই রাতে। সেদিন সাথে থাকা কবি’র পুত্রবধু  প্রতিমা দেবী মত দেননি।
এবারও সেই কথার পুনরাবৃত্তি।  সামান্য অস্ত্রোপচারে ভালো হয়ে যাবেন কবি, লিখতে পারবেন কমপক্ষে আরও দশ বছর। ডাক্তার বিধান রায় এমনটাই বলেছিলেন। এমন আশ্বাসে কবি-পুত্র সম্মত হয়েছিলেন পিতার অপারেশনে। কবিও ছিলেন নিশ্চুপ। বিধান রায়ের মতো ডাক্তারের সিদ্ধান্ত তো মেনেই নিতে হয়। কবিকে সুস্থ করে তুলবার জন্যই বিধান রায় এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এটা আমরা মেনে নিতেই পারি। তবুও প্রাক-পেনিসিলিন যুগে কলকাতায় এমন অস্ত্রোপচার নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন। আজো সেই প্রশ্নের রেশ চলমান। যে কোন অস্ত্রোপচারে থাকে জীবাণু সংক্রমণের আশংকা। কিন্তু কবিপুত্রকে অথবা তাঁর পরিবারের কাউকে ইনফেকশনের আশংকা কিংবা ইনফেকশন হলে জীবন সংকট হতে পারে-এমন কথা বলা হয়েছিল কিনা, এ প্রশ্নও অনেকের ছিল, এখনো আছে। নীলরতন সরকারের পরামর্শ অগ্রাহ্য করে বিধান রায় অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। নীলরতন সরকার তাঁর বহুকালের বন্ধু এবং চিকিৎসক হিসেবে রবীন্দ্রনাথের দেহযন্ত্রকে যতোটা চিনতেন, বিধান রায় যতো বড় চিকিৎসকই হোন কেন, ততোটা যে চিনিতেন না, এ কথা বলাই যায়।
অস্ত্রোপচারের কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত কবির সৃজন ক্ষমতার একটুও ঘাটতি ছিল না। একের পর এক মুখে মুখে কবিতা বলেছেন, রানী চন্দ তা লিখে গেছেন। আগেই উল্লেখ করেছি, অস্ত্রোপচারের দিন সকালেও তিনি মুখে মুখে রচনা করেছিলেন, ‘তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি’ র মতো কবিতা। এটি বলার পর রানী চন্দকে বলেছিলেন, সেরে উঠে প্রয়োজনীয় সংশোধন করে দিবেন। কবি যে সেরে উঠবেন, আবার লিখতে পারবেন-এমন আশ্বাস বিধান রায়ের কাছ থেকে পেয়েছিলেন-আস্থাও রেখেছিলেন। কিন্তু সত্যি এটাই, তিনি আর সেরে উঠেননি। এতো সব তথ্য, যুক্তি বিবেচনায় নিয়ে তাই অনেকেই বলেছেন, কবির চিকিৎসার ব্যাপারে বিধান রায়ের নেয়া অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্তটি ছিল, একটি ‘ঐতিহাসিক ভুল’!
এটিকে ‘ভুল’ হিসেবে অনেকেই দেখেছিলেন, এখনো দেখেন, এই কারণে যে, বিধান রায় যদি সবকিছু খোলসা করে বলতেন, তাহলে হয়তো অস্ত্রোপচারে সম্মত হতেন না কবি, কবিপুত্র কিংবা কবি’র একান্ত স্বজনেরা। তথ্য-প্রমাণ এবং ঘটনাক্রমও সেই দিকটাই নির্দেশ করে। 

ছয়
‘সব্যসাচীর হাত থেকে গান্ডীব খসে পড়েছে।’

নীলরতন সরকারের অবর্তমানে কবির দেহে অস্ত্রোপচার হয়েছিল ১৯৪১ সালের ৩০ জুলাই। বহুবার সতর্ক করেছেন নীলরতন সরকার বন্ধুর ‘সুকুমার দেহে কাটাছেঁড়া’র পরিণতি নিয়ে। বারবার জানিয়েছেন, অস্ত্রোপচারের ফলে রবীন্দ্রনাথের পুরো দেহযন্ত্রটাই বিকল হয়ে যাবার আশংকার কথা।
অবশেষে সত্যি হয়েছে কবি’র বহুকালের বন্ধুর আশংকাই। অস্ত্রোপচারের পর ক্রমাগত অবনতি ঘটেছে কবি’র শারীরিক অবস্থার। শেষ সময়ে তাঁকে দেখতে নিয়ে আসা হয়েছে এতকালের বন্ধু ডাঃ নীলরতন সরকারকে। ‘ধন্বন্তরী’ দেখেই বুঝেছেন, সব আশা শেষ। ভাবলেন, কতোবার এই বন্ধুকে তিনি ফিরিয়ে এনেছেন মৃত্যুর দুয়ার থেকে। কিন্তু এখন আর উপায় নেই। ‘সব্যসাচীর হাত থেকে গান্ডীব খসে পড়েছে।’ পাশে বসে অনেক্ষণ বন্ধু’র হাতে হাত বোলালেন নীলরতন, ‘যাবার সময় বারে বারে  পিছন ফিরে তাকিয়ে গেলেন।’ বুঝে গেছেন, প্রিয় বন্ধু’র সাথে, ‘এই শেষ দেখা এ-জন্মের মতো।’ তারপর বের হয়ে এলেন সজল নয়নে। ‘কবির চোখের পাশ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো।’ টের পেয়েছেন বন্ধু’র চলে যাওয়া। ‘এই অশ্রুই তার বিদায়ের সম্ভাষণ।’
২১ শ্রাবন, ১৩৪৮। কবি শুয়ে আছেন জোড়াসাঁকোর বাড়িতে, তাঁর ঘরে। শিয়রে পূর্ণিমার চাঁদ। অচেতন কবির অপরূপ মুখশ্রীকে আরো বেশি দীপ্তিময় করে তুলেছে ভরা জ্যোৎস্নার অপার্থিব আলোকধারা। পরদিন অর্থাৎ  ২২ শ্রাবণ ১৩৪৮, ৭ আগস্ট ১৯৪১  দুপুরে অমৃতের পথে যাত্রা করেছিলেন কবি স্বার্বভৌম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। 

সাত
কোথাও দুঃখ, কোথাও মৃত্যু, কোথা বিচ্ছেদ নাই…
জীবনের মাঝে স্বরূপ তোমার রাখিবারে যদি পাই।

অস্ত্রোপচারে একদিন আগে অর্থাৎ ১৯৪১ সালের ২৯ জুলাই বিকালে কবি লিখেছিলেন,
‘দুঃখের আঁধার রাত্রি বারে বারে
এসেছে আমার দ্বারে;
একমাত্র অস্ত্র তার দেখেছিনু
কষ্টের বিকৃত ভান, ত্রাসের বিকট ভঙ্গি যত
অন্ধকার ছলনার ভূমিকা তাহার।
যতবার ভয়ের মুখোশ তার করেছি বিশ্বাস
ততবার হয়েছে অনর্থ পরাজয়।
এই হার-জিত খেলা, জীবনের মিথ্যা এ কুহক
শিশুকাল হতে বিজড়িত পদে পদে এই বিভীষিকা,
দুঃখের পরিহাসে ভরা।
ভয়ের বিচিত্র চলচ্ছবি
মৃত্যুর নিপুণ শিল্প বিকীর্ণ আঁধারে। 
’ভয়ের মুখোশ’কে অবিশ্বাস তথা অস্বীকার করার মধ্যে দিয়ে ‘অনর্থ পরাজয়’কে বারবার মোকাবেলা করেছেন কবি। কিন্তু ‘আঁধারে’ ‘বিকীর্ণ’ ‘মৃত্যুর নিপুণ শিল্প’এর কাছে জীবনের অনন্য শিল্পী শেষ আশ্রয় নিলেন রাখীপূর্ণিমার দিন মধ্যাহ্নে, ২২ শ্রাবণ ১৩৪৮, ৭ আগষ্ট, ১৯৪১।
ডাঃ নীলরতন সরকারের পরামর্শ মতো চিকিৎসা চললে কবি আরো অনেকদিন বাঁচতেন, এমন কথা নিশ্চিত করে বলা যাবে না;-বলা ঠিকও না। কিন্তু সে ক্ষেত্রে কবির ‘ফুল পাতা বৃক্ষের’ মতো ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর’ ইচ্ছাটির মর্যাদা অন্তত দেওয়া যেতো। তবে এভাবে যে কয়দিনই বাঁচতেন, আরো কিছু অমর সৃষ্টি আমরা পেতে পারতাম, এবং কবিকে তাঁর জীবনের শেষ কয়টা দিন কাটাতে হতোনা এতো বেশী কষ্ট সয়ে। দূর্ভাগ্য আমাদের! বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এ যাবৎ কালের সবচেয়ে উজ্জ্বল মানুষটির জীবনের শেষ সময়টা-একটানা নয়দিন  কাটাছেঁড়ার তীব্র যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন তাঁর প্রিয় শান্তিনিকেতনে যেন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে; হয়নি! চেয়েছিলেন কাটাছেঁড়াবিহীন ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’; সেটাও হয়নি! জানা যায়, তাঁর সৎকার কলকাতায় হোক, এটাও তিনি চাননি; কিন্তু সেটাও হয়েছিল কলকাতায়ই! অথচ অন্যকিছু না হোক সৎকারের কাজটি শান্তিনিকেতনে হতে পারতো।
নির্মল কুমারী মহলানবীশ লিখেছেন,
‘শুভ্র কেশ, শুভ্র বেশ। নিশ্চিন্ত হয়ে শান্তিতে ঘুমাচ্ছেন। কোথায় গিয়েছে আমাদের উদ্বেগ উৎকণ্ঠা। অতৃপ্ত নয়নে শুধু চেয়ে চেয়ে দেখছি।.. … .. এইরকম যখন অবসন্নভাবে বসে রয়েছি, হাবলু (প্রদ্যোত কুমার সেন, শান্তিনিকেতনের প্রাক্তন ছাত্র) এসে আমাকে বললেন-রানীদি, আমরা আজ গুরুদেবকে কি শান্তিনিকেতনে নিয়ে যেতে পারবো না?
মনে পড়লো গুরুদেব বারবার আমাকে বলেছিলেন, ‘তুমি যদি আমার সত্যি বন্ধু হও, তাহলে দেখো আমার যেন কলকাতার উন্মত্ত কোলাহলের মধ্যে, ‘জয় বিশ্বকবি কি জয়, জয় রবীন্দ্রনাথের জয়, বন্দেমাতরম’-এইরকম জয়ধ্বনির মধ্যে সমাপ্তি না ঘটে। আমি যেতে চাই শান্তিনিকেতনের উদার মাঠের মধ্যে উন্মুক্ত আকাশের তলায়, আমার ছেলেমেয়েদের মাঝখানে। সেখানে জয়ধ্বনি থাকবে না, উন্মত্ততা থাকবে না। থাকবে শান্ত স্তব্ধ প্রকৃতির সমাবেশ। প্রকৃতিতে মানুষে মিলে দেবে আমাকে শান্তির পাথেয়। আমার দেহ শান্তিনিকেতনের মাটিতে মিশে যাবে-এই আমার আকাঙ্খা। চিরকাল জপ করেছি ‘শান্তম’। এখান থেকে বিদায় নেবার আগে যেন সেই ‘শান্তম’ মন্ত্রই সার্থক হয়। কলকাতার উন্মত্ত কোলাহল, জয়ধ্বনির কথা মনে পড়লে আমার মরতে ইচ্ছে করে না। তোমাকে সব বলে রাখলুম আগে থেকে।’
প্রদ্যোত যখন বললেন, খুব ব্যগ্রভাবে তাকে বললাম-খুব ভালো হয়। এইটাই কবির ইচ্ছা ছিল।
খানিক পরে তিনি ফিরে এসে বললেন-না রানীদি, হল না। সবাই বলছেন শান্তিনিকেতনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। এখানেই সব আয়োজন হয়ে গিয়েছে। এই সবাই যে কারা, তা আর প্রশ্ন করলাম না।  শুধু বললাম-আজ আমার স্বামী অসুস্থ এবং রথীবাবু শোকে একেবারে ভেঙ্গে পড়েছেন, কাজেই আমি অসহায়। আজ প্রশান্ত চন্দ্র যদি সুস্থ থাকতেন তাহলে নিশ্চয়ই যেমন করেই হোক কবির ইচ্ছাপালনের জন্যে শান্তিনিকেতনে নিয়ে যেতেন। …….
বেলা তিনটার সময় একদল অচেনা লোক ঘরের মধ্যে ঢুকে নিমেষে আমাদের সামনে থেকে সেই বরবেশে সজ্জিত দেহ তুলে নিয়ে চলে গেল। যেখানে বসেছিলাম, সেইখানেই স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম। শুধু কানে আসতে লাগলো-‘জয় বিশ্বকবি কি জয়, জয় রবীন্দ্রনাথের জয়, বন্দেমাতরম।’ 
এটা তো কষ্টেরই! যিনি সারা বিশ্বের কতো মানুষের কতো কথা বলে গিয়েছেন, কতো মানুষের কতো শত কথা রেখেছেন; কিন্তু তাঁর একান্ত শেষ ইচ্ছাগুলোর কোনটাই রাখা হলো না। ‘সুপ্রাপিউবিক সিস্টোস্টমি’ নামক অপারেশনের জন্য কবিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল কলকাতায়, সেখানেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর সৎকার তো তাঁর চাওয়া মতো শান্তিনিকেতনে করতেই পারতেন-যাদের দায়িত্ব ছিল করার। যেহেতু কবির ইচ্ছা তারা জানতেন।
‘ঐতিহাসিক ভুল’ পরিণত হয়েছে ঐতিহাসিক সত্যে। চাই বা না চাই -এ নিয়ে কথাবার্তা চলছে; চলবে আরো অনেকদিন। যেহেতু মানুষটি রবীন্দ্রনাথ! কিন্তু এটিও আমরা জানি, ইতিহাসের সত্যের সাথে তর্ক চলেনা।
মরণশীল রবীন্দ্রনাথ চলে গিয়েছেন; বেঁচে আছেন সৃজনশীল রবীন্দ্রনাথ,-বেঁচে থাকবেন আরো অনেক অনেক কাল!

-লেখক

স্বপন পাল

ট্যাগ:
সর্বশেষ সংবাদ
Advertisements
karnafully1
TEKSERV

Situs Streaming JAV