বারীন দত্তরা যে স্বপ্ন দেখতেন, বাংলাদেশ আজ সে পথে নেই : স্মরণ সভা কমিটির সভায় বক্তারা
ইউএসএনিউজঅনলাইন.কম ডেস্ক. নিউইয়র্ক : কমরেড বারীন দত্তরা যে সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন, বাংলাদেশ এখন চলছে তাঁর উল্টো পথে। ক্ষমতাসীন শাসকরা ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য যেকোন শক্তির সাথে আপোষ করতে প্রস্তুত। ধর্মীয় মৌলবাদীদের প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে, গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। রাষ্ট্রের প্রতিটি কাঠামোকে নষ্ট করে দেয়া হয়েছে। বারীন দত্তের মতো অগুনিত পূর্বসূরীর ত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ নামক দেশটি আজ শ্বাপদদের কবলে। এমন বাস্তবতার অবসানে সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখা মানুষগুলোকে আবার ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। মুক্তিযুদ্ধ ও সমাজ প্রগতির চেতনাকে ধারণ করে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে নিজ নিজ অবস্থান থেকে।
৩১ অক্টোবর শনিবার নিউইয়র্ক সময় বেলা সাড়ে এগারোটায় প্রয়াত বারীন দত্তের প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে ভার্চুয়েল আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। কমরেড বারীন দত্ত নাগরিক স্মরণ সভা কমিটি যুক্তরাষ্ট্র আয়োজিত এ ভার্চুয়াল সভায় বাংলাদেশ সহ বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে বিশিষ্ট লোকজন যোগদেন। কমরেড আলিম উদ্দিনের সঞ্চালনায় স্মরণ সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রবীণ রাজনীতিবিদ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা সুব্রত বিশ্বাস।
স্মরণ সভায় প্যানেল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, ঐক্য ন্যাপের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক পঙ্কজ ভট্টাচার্য, প্রবীণ কৃষক নেতা কমরেড আব্দুল মালিক, প্রবীন রাজনীতিবীদ,সাংবাদিক ও একুশে পদকপ্রাপ্ত রনেশ মৈত্র, লেখক গবেষক তাজুল মোহাম্মদ, চারুকলা ইস্টিটিউটের সাবেক শিক্ষক গোপেশ মালাকার, লেখক ও টিভি ব্যক্তিত্ব বেলাল বেগ প্রোগ্রেসিভ ফোরামের সভাপতি খোরশেদুল ইসলাম প্রমুখ।
প্যানেল আলোচক ছাড়াও স্মরণ সভায় যোগ দিয়ে বিশিষ্টজন কমরেড বারীন দত্তের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানিয়েছেন। তাঁরা সমাজ প্রগতির লড়াইয়ে নিজেকে নিঃস্ব করে দেয়া এক লড়াকুর জীবনের নানা দিকের কথা তুলে ধরেন।
সভার শুরুতে কমরেড বারীন দত্ত সহ সম্প্রতি প্রয়াত কমরেড আইয়ুব আলী,হায়দার আকবর খান জুনো সহ প্রমুখদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মনিটের নীরবতা পালন করা হয়। কবি লেখক নাসরীন চৌধুরী কমরেড বারীন দত্তের জীবনী পাঠ করেন।
পাঠ করা জীবনীতে নাসরীন চৌধুরী স্মরণ করেন, এক সম্পন্ন পরিবার থেকে আসা কমরেড বারীন দত্তের কমিউনিস্ট আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ার কথা। তাঁর গ্রেফতার , মুক্তিযদ্ধে তাঁর অবদান নিয়ে পাঠ করা জীবনীতে বিস্তারিত আলোচিত হয়। বারীন দত্তের পুরো পরিবার পূর্ব বাংলার সমাজ পরিবর্তনের লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ার কাহিনী জানা যায় নাসরীন চৌধুরীর পাঠ করা বারীন দত্তের জীবনী থেকে।
কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন ইতিহাসের যাত্রাপথে আমরা যেন নিজেদের মতো অবদান রাখতে পারি। কমরেড বারীন দত্ত , যিনি কমরেড সালাম পরিচয়ে রাজনীতি করতেন নিজেকে আড়াল করার জন্য। কমিউনিস্ট আন্দোলনের জটিল পাঠ নিয়ে বারীন দত্তরা তরুণ কমিনিস্টদের শিক্ষা দিয়েছেন। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে তাঁর ভূমিকার কথা তিনি বলেন।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম মুক্তিযুদ্ধের সময় নানা ঘটনা নিয়ে তাঁর স্মৃতিতর্পন করেন। স্বাধীনতা পরবর্তি বাংলাদেশের প্রগতির আন্দোলন, কৃষক আন্দোলনের জন্য দেশের গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ানর কথা জনান মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে ফ্যাসিজমের সমস্ত আলামত এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, দেশের মানুষের মধ্যে এক ধরনের নৈরাজ্যবাদী চিন্তা এখন প্রবল হয়ে উঠছে। এরমধ্যে নানা শক্তির উত্থান ঘটছে। করোনার সংকটে লুটপাট বৃদ্ধি করা হবে, না লুটপাট কমিয়ে আমরা সম্পদের বন্ঠনের লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, আমাদের দেশ হয় মুক্তিযুদ্ধের ধারায় ফিরে যেতে হবে। না হলে পাকিস্তানের ধারায় ফিরে যাবে। মাঝামাঝি কোন পথ নেই। সাম্যবাদের প্রতিদিনের লড়াইয়ে বারীন দত্তরা সদা উপস্থিত থাকবেন বলে মুজাহিসুল ইসলাম সেলিম আশা প্রকাশ করেন।
প্রগেসিভ ফোরামের সভাপতি খোরশেদুল ইসলাম তাঁর বক্তব্যে বলেছেন,আমিত্ব বিসর্জন দিয়ে দেশ ও প্রগতির লড়াই করেছেন বারীন দত্তরা। সমষ্টিকে গুরুত্ব দিয়ে আদর্শবাদ বুকে ধারন করার উদাহরণ রেখে গেছেন বারীন দত্তের মতো নেতারা। চলমান সময়ের লড়াকুরা এ থেকে শিক্ষা নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।
প্রবীণ জননেতা পঙ্কজ ভট্টাচার্য বারীন দত্তের জীবন নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে গেরিলা যুদ্ধের জন্য ভারত সরকারের আলোচনায় বারীন দত্তের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে পঙ্কজ ভট্টাচার্য বলেন, মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধকে ধারণ করে নতুন ঐক্য করতে হবে। দেশ ক্রমশঃ অগণতান্ত্রিক হয়ে উঠেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, জনগণের অংশগ্রহণের নির্বাচনের ব্যবস্থা করে বাংলাদেশকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার জন্য আমাদের প্রয়াস নিতে হবে। নতুন প্রজন্মের কাছে বারীন দত্তদের বীরত্ব আর ত্যাগের কথা আমাদের ছড়িয়ে দিতে হবে।
প্রবীণ কৃষক নেতা কমরেড আব্দুল মালিক উপমহাদেশের সাম্যবাদী আন্দোলনে বারীন দত্তের গুরুত্বপূর্ন অবদানের কথা উল্লেখ করেন। প্রবীন সাংবাদিক রনেশ মৈত্র বলেছেন, দেশে মৌলবাদের উত্থান ঘটছে। নতুন প্রজন্মকে মৌলবাদীরা বিভ্রান্ত করছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ৪৭ সালের আগের অবস্থায় চলে গেছে। আমাদের নিস্পৃহ থাকার আর কোন অবকাশ নেই। তিনি বলেন, আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। ভারতের উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তির সামনে গনতান্ত্রিক শক্তি দাঁড়াতে পারছে না। আমাদের দেশেও এক কঠিন বাস্তবতা বিরাজ করছে। এসব মোকাবেলা করে বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
লেখক, টিভি ব্যক্তিত্ব বেলাল বেগ তাঁর জন্মদিনে বারীন দত্তের স্মরণ সভায় যোগ দেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশ টেলিভিশনে কর্মকালীন সময়ে বারীন দত্তের সাথে তাঁর যোগাযোগ নিয়ে স্মৃতিতর্পন করেন। দেশে ‘ধর্মধাপ্পার’ রাজনীতি চলছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। বেলাল বেগ বলেন, শেখ হাসিনাকেও আজ আর বিশ্বাস করা যায় না। ক্ষমতায় থাকার জন্য শেখ হাসিনা ধর্মগোস্টির সাথে হাত মিলাতে পারেন। বাংলাদেশের মানুষকে এখন এক ঘোর অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আবার প্রগতির চেতনা সবাইর কাছে ছড়িয়ে দিতে হবে।সবার উপরে মানুষ সত্য এবং আবার মানুষ হওয়ার জাগরণ সৃষ্টি করার জন্য তিনি আহ্বান জানান।
পদকপ্রাপ্ত গবেষক, লেখক তাজুল মোহাম্মদ আলোচনায় বারীন দত্তের জীবনী লেখতে গিয়ে তাঁর সান্নিধ্যে যাওয়ার স্মৃতিময়দিনগুলোর কথা তুলে ধরেন। একজন নিবেদিতপ্রাণ মানুষ সমাজ প্রগতির লড়াইয়ে যুক্ত হয়ে কীভাবে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিলেন, তার চিত্র তাজুল মোহাম্মদ তুলে ধরেন।
কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম পত্রিকায় বারীন দত্তের সংযুক্ত থাকার কথা জানা যায় তাজুল মোহাম্মদের আলোচনায়। পত্রিকায় বিভিন্ন নামে বারীন দত্ত লিখেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট গড়ে উঠার সময় বারীন দত্ত জাতীতাবাদী নেতাদের সাথে বৈঠক করেন , আলোচনা করেন। স্বাধিকার ও স্বাধীনতার আন্দোলনের প্রস্তুতি নিয়ে নিয়ে বারীন দত্তের নানা প্রয়াসের কথা তাজুল মোহাম্মদ তাঁর তথ্য ভান্ডার থেকে জানান।
ঐতিহাসিক নানকার বিদ্রোহের অন্যতম লড়াকু ছিলেন বারীন দত্ত। সিলেটের বিয়ানীবাজারে আশির দশকে নানকার বিদ্রোহের স্মৃতিস্থম্ভ উদ্বোধন করতে বারীন দত্তের আগমনের স্মৃতি নিয়ে কথা বলেন কমরেড আলীম উদ্দিন।
সাবেক শিক্ষক গোপেশ মালাকার তাঁর দীর্ঘ স্মৃতি থেকে বারীন দত্তের সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেন। সিলেট জেলার সমৃদ্ধ বাম আন্দোলনের ঐতিহাসিক নানা বিষয় নিয়ে নিজের স্মৃতি তুলে ধরেন কানাডা প্রবাসী গোপেশ মালাকার। আদর্শের প্রশ্নে অবিচল মানুষ হিসেবে বারীন দত্তের মতো নেতাদের কমই দেখা যায় বলে তিনি উল্লেখ করেন। পার্টি পরিচালনায় বারীন দত্তের প্রজ্ঞা আর কৌশলের নানা ঐতিহাসিক ঘটনার কথা তিনি উল্লেখ করেন। গোপেশ মালাকার বলেন, অসাধারণ দরদ দিয়ে মানুষের সাথে চলাফেরা করতেন বারীন দত্ত।
সাংবাদিক নিনি ওয়াহিদ তাঁর বক্তব্যে বারীন দত্তকে নিয়ে তাঁর স্মৃতির কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বারীন দত্তদের অবদানের কথা নতুন প্রজন্মকে জানানোর মধ্য দিয়ে সমাজের কলুষিত অবস্থা থেকে মুক্তি আসতে পারে।
সাংবাদিক ইব্রাহীম চৌধুরী তাঁর বক্তব্যে বলেন, যে দেশে বারীন দত্তদের বিচরণ ছিলো সেই দেশটি আজ হাঁটছে উল্টো পথে। নতুন প্রজন্মের কাছে বারীন দত্তদের ত্যাগ আর দেশপ্রেমের বার্তা আমরা পৌঁছাতে পারিনি।
কবি, লেখক শামসুজ্জামান হীরা তাঁর বক্তব্যে বারীন দত্তকে উপমহাদেশের অন্যতম সেরা বিপ্লবী বলে তিনি উল্লেখ করেন। একজন মানবিক কমিউনিস্ট ছিলেন, তাঁর কিছু মেকি কিছু ছিলো না। এমন বিশাল হৃদয়ের মানুষ রাজনীতিতে সমাজে বিরল বলে তিনি উল্লেখ করেন। অধ্যাপক সৈয়দ মুজিবুর রহমান তাঁর বক্তব্যে বারীন দত্তদের চেতনায় নতুন প্রজন্মকে জাগিয়ে তোলার আহ্বান জানান।
অন্যদের মধ্যে আলোচনায় অংশ নেন সুলেখা পাল, এডভোকেট মকবুল হোসেন, আব্দুল্লাহ চৌধুরী, ডাঃ আবুল খান সামাদ, সৈয়দ রকীব আহমেদ, জাকির হোসেইন, শ্যাম চন্দ্র, বিজন সাহা, বারীন দত্তের ছেলে কিশোর দত্ত, কাশেম আলী, আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী, মিল্টন বড়ুয়া, উৎপল দত্ত, মিনহাজ আহমেদ প্রমুখ।
প্রয়াত বারীন দত্তের নাতনি ইস্পিতা দত্ত তাঁর বক্তব্যে প্রয়াত বারীন দত্তকে নিয়ে সবার আলোচনায় তিনি আপ্লুত বলে উল্লেখ করেন।
সভাপতির বক্তব্যে সুব্রত বিশ্বাস অসুস্থ কমরেড হারুনের সুস্থতা কামনা করেন। তিনি দেশে বিদেশে সমমনাদের মধ্যে যোগসূত্র বৃদ্ধির প্রয়াসের উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। ভার্চুয়াল সভায় প্রয়াত বারীন দত্ত সহ অন্যান্য ত্যাগি নেতাদের জীবনী নিয়ে একটি স্মারক গ্রন্থ প্রকাশের বিষয়েও আলোচনা করা হয়।
- ওয়ার্ল্ড হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট ইউএসএর সাধারণ সম্পাদক ড. সাদিয়া আফরিন এরা
- চরমোনাই পীরের যুক্তরাষ্ট্র সফর উপলক্ষে নিউইয়র্কে দোয়া মাহফিল, কুরআন-সুন্নাহর আলোকে বয়ান
- New York Attorney General James Secures Reimbursements for T-Mobile Customers Whose Rates Were Unjustly Raised
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে কুনু-ফিরোজ পরিষদের সাত দফা ইশতেহার ঘোষণা; কমিউনিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠা, সাশ্রয়ী ফিউনারেল সেবা, বিমানের সরাসরি ফ্লাইট ও আর্থিক স্বচ্ছতায় অঙ্গীকার
- ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের পূর্ণ সমর্থন: জাতিসংঘে রাষ্ট্রদূত আইরিন খান
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে প্রথমবারের মতো বিতর্ক, গুরুত্ব পেল স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি
- New York Attorney General James Warns New Yorkers About AI-Generated Election Misinformation Ahead of November Elections
- Bangladesh calls for global treaty to protect victims of crimes against humanity