বাইডেনের জয়ে আমেরিকার সাধারণ মানুষের রাহুমুক্তি ঘটবে কি?
মিনহাজ আহমেদ : প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্র্যাম্প নির্বাচনে তার ভরাডুবি মেনে নেওয়ার ঘোষণা এখনও দেন নি। ডোনাল্ড ট্র্যাম্প যখন ট্যুইট করে নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ এবং আদালতে দেখে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন, তখনও আমার এক ফেসবুক বন্ধু বলছেন, বিশ্ববেহায়ার পতন হলো, আর আমি বলেছি, আমেরিকা রাহুমুক্ত হলো। সম্ভবত আমেরিকান ঐতিহ্যগত রাষ্ট্রীয় প্রথার প্রতি আস্থা থাকার কারণে শুধু আমরা নই, যুক্তরাষ্ট্র ও বহির্বিশ্বের অধিকাংশ মানুষই ধারণা করছেন যে, জো বাইডেনই হবেন আগামী চার বছরের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। সবকিছু প্রথাগতভাবে চালু থাকলে ২০২১ সালের ২০ জানুয়ারি থেকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট অভিষিক্ত হবেন জো বাইডেন। সাধারণ এক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও ২০২০ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে বাইডেন প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, অদম্য মানসিক শক্তি, চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং দূরদর্শীতা থাকলে দূরবর্তী লক্ষ্য অর্জনও সম্ভব হয়। যেসব কারণে এবারের নির্বাচনটি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে, তারমধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো অতিমারী করোনা কবলিত এবং নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠান। এবারই ইতিহাসের সর্বাধিকসংখ্যক মানুষ ডাকযোগে ভোট দিয়েছেন, যে কারণে ভোট গণনায় অপ্রত্যাশিত বিলম্বজনিত কিছু জটিলতাও সৃষ্টি হয়েছে। তাছাড়া নির্বাচনের ঠিক আগে আগে ঘটে যাওয়া বর্ণবাদী সহিংসতার প্রেক্ষিতে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ব্ল্যাক লাইভ ম্যাটার্স আন্দোলন, ট্র্যাম্পের জাতিবিদ্বেষ ও ইমিগ্র্যান্টবিদ্বেষমূলক আচরণ ও কথাবার্তা এবং করোনা রোধে যথাযথ ভূমিকা পালনে ব্যর্থতার কথাও উল্লেখযোগ্য। এসব কারণে চলমান অবস্থা থেকে পরিত্রাণ লাভের উদ্দেশ্যে অধিক সংখ্যক নারী, কৃষ্ণাঙ্গ, এবং ইমিগ্র্যান্ট ভোটাররা এবার ভোট দিয়েছেন। এবারের নির্বাচনের অপর একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট ছিলো অধিকসংখ্যক আমেরিকান মুসলিমদের ভোট দেওয়া ও নির্বাচনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা। ইউরোপে জঙ্গী ইসলামপন্থীদের কর্মকাণ্ডে যেখানে বিশ্বজুড়ে ইসলামবিদ্বেষ বৃদ্ধির মুখে, সেখানে বাইডেনের হাদিস উদ্ধৃতি ও মিশিগানের একটি মুসলিম পরিবারকে অভয় দেওয়ার পর স্বভাবতই মুসলিমদের মধ্যে বাইডেনের গ্রহণযোগ্যতা তুমুল বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগত ইমিগ্র্যান্টদের নির্বাচন-উত্তর উল্লাস থেকেও এর সত্যতা অনুমান করা যায়।তবে জো বাইডেন যতো কিছুই প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকুন না কেনো, কিংবা ভোটাররা যা কিছু প্রত্যাশা করুন না কেনো, প্রতিশ্রুতির কতোটুকু তিনি রক্ষা করতে পারবেন, সেটা একা বাইডেনের ওপর নির্ভর করবে না। সেটা বহুলাংশে নির্ভর করবে সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদে তার দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে কি না যারা তার প্রতিশ্রুতিগুলোর সাথে সম্মত হবেন, তার ওপর। এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট দলীয় প্রার্থী বাইডেন জয়ী হলেও, এবং প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখতে পারলেও সিনেটে তারা পিছিয়ে আছেন। সিনেট ও কংগ্রেস যদি বিভক্ত হয়ে পড়ে, তাহলে কোনো ইস্যুতে উভয় দল ভিন্নমত করলে সে ইস্যুটি ডেড ইস্যুতে পরিণত হতে পারে। বাইডেনের প্রাক-নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে এমন অনেক কিছুই আছে যা নিয়ে উভয় দলের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। এ নিয়ে পার্টি লাইন ক্রস করে যে সমর্থন পাওয়া যাবে, তেমন সম্ভাবনা খুব কম। কাজেই আশা করা যাচ্ছে, ২০২১ সালে অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী নির্বাচনে সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা যদি সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করতে পারে, তাহলেই প্রেসিডেন্টের প্রতিশ্রুতিগুলো পুরনের মতো সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। এছাড়াও লক্ষ্যণীয় হলো, ভোটাভুটির রাজনৈতিক বৈতরণী পার হওয়ার পরে প্রতিশ্রুতি পূরণ না করার মতো দৃষ্টান্তও পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল নয়। উদাহরণ হিসেবে ওবামা-বাইডেনের আট বছরে প্রতিশ্রুত ইমিগ্রেশন সংস্কার না করা, কিংবা রেকর্ডসংখ্যক বৈধতার কাগজপত্রহীনদের ডিপোর্ট করার কথা তুলে ধরা যায়। আমেরিকার রাজনীতির ইতিহাসের সাথে জো বাইডেনের সক্রিয় ও ঘনিষ্ট সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ১৯৭২ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কনিষ্টতম সিনেটর হিসেবে যোগদান করার পর থেকে আমেরিকান সরকারের সকল ভালো কাজের যেমন, তেমন খারাপ কাজগুলোর সাথেও জো বাইডেনের নাম প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে জড়িত। বাইডেন যেমন গালফ যুদ্ধের বিরোধীতা করেছেন, তেমনি ইরাক যুদ্ধকে অনুমোদনও দিয়েছেন। সিনেটে দীর্ঘদিন ফরেন রিলেশন্স কমিটির সদস্য ও চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করেছেন, কিন্তু আরব-ইসরাইল সংঘাত বন্ধে নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী ভূমিকা রেখেছেন কি? মধ্যপ্রাচ্য থেকে সৈন্য প্রত্যাহারে ভূমিকা রাখলেও ন্যাটোর আওতা বৃদ্ধিতে সমর্থন জুগিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমনে সমর্থন জুগিয়েছেন, সৌদি আরবের ইয়েমেন আগ্রাসনকালে সৌদির কাছে অস্ত্র বিক্রিতেও অন্যায় দেখেননি। সমস্যা আরও রয়েছে। যেমন কোভিড-১৯ প্রমাণ করে দিয়েছে যে, গণস্বাস্থ্যের ইস্যুটি কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী, কিংবা বিমা কোম্পানির নিয়ন্ত্রণাধীন ইস্যু নয়। এটি ব্যাপকভাবে যে কোনো রাষ্ট্রের জাতীয় ইস্যু, কাজেই এটাকে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় ব্যবস্থাপনা করতে হবে। অথচ বাইডেন সরকারি মালিকানার স্থলে বেসরকারি ব্যবস্থায় স্বাস্থ্য-ব্যবস্থাপনায় অধিক আগ্রহী। অনুরূপভাবে পরিবেশ সংক্রান্ত ইস্যুতেও তিনি জীবাশ্ম-জ্বালানি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য শক্তিশালী অবস্থান পছন্দ করছেন না। এসব বিষয় বিবেচনা করলে এক কথায় বলা যায়, আমেরিকার জনগণের জন্য জো বাইডেনের প্রতিশ্রুতির উপর নির্ভর করে বসে থাকা হবে বোকামী। সেক্ষেত্রে উচিৎ হবে বাইডেন-হ্যারিস সরকারের উপর চাপ অব্যাহত রাখা এবং তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে বাধ্য করা। পরিশেষে, যতই আমরা মুখে বলি না কেনো যে ট্র্যাম্পের পরাজয়ে আমেরিকার রাহুমুক্তি ঘটেছে, উপরের সংক্ষিপ্ত আলোচনার নিরিখে বলা যায়, আমেরিকার রাজনীতিতে যতদিন পর্যন্ত পুঁজি ও কালো টাকার দৌরাত্য দূর না করা যাবে, ততদিন ট্র্যাম্প হারবেন, বাইডেন জিতবেন, কিংবা হিলারি হারবেন, ট্র্যাম্প জিতবেন, কিন্তু আমেরিকার সাধারণ মানুষের জন্য পূর্ণ রাহুমুক্তি ঘটবেনা।

মিনহাজ আহমেদ, নিউইয়র্ক।
- নিউইয়র্কে মানসিক সংকটে থাকা যুবককে গুলি: পুলিশ প্রশিক্ষণ এবং মানসিক সংকটসংক্রান্ত ৯১১ কল
- নিউইয়র্কে গ্রী ম্যাকানিকেল ইয়াঙ্কার্স এর ইফতার ও দোয়া মাহফিল
- নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গমাতা পরিষদ’র ইফতার ও দোয়া মাহফিল
- নিউইয়র্কে ঢাকা জেলা অ্যাসোসিয়েশনের ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত
- বাংলাদেশ সোসাইটি অব ব্রঙ্কস নিউইয়র্ক ইনকের কোরআন তেলাওয়াত প্রতিযোগিতা ও ইফতার মাহফিল
- New York Attorney General James Releases Statement on Live Nation Trial
- নিউইয়র্কে গোল্ডেন এইজ হোম কেয়ারের ইফতার মাহফিল
- নিউইয়র্ক বাংলাদেশি আমেরিকান লায়ন্স ক্লাবের ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত








