লাইবেরিয়ার প্রেসিডেন্ট ইলেন জনসন-সারলিফ ও মানবাধিকার কর্মী লেমাহ বোয়ী এবং ইয়েমেনের গণতন্ত্রপন্থি বিরোধীদলীয় নেত্রী তাওয়াক্কুল কারমান এর শান্তিতে নোবেল জয়

ডেস্ক: শান্তিতে এ বছর একযোগে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তিন নারী। এরা হলেন- লাইবেরিয়ার প্রেসিডেন্ট ইলেন জনসন-সারলিফ ও মানবাধিকার কর্মী লেমাহ বোয়ী এবং ইয়েমেনের গণতন্ত্রপন্থি বিরোধীদলীয় নেত্রী তাওয়াক্কুল কারমান। লাইবেরিয়াতে শান্তি আনার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান এবং ইয়েমেনে গণতন্ত্রের লক্ষ্যে চলমান লড়াইয়ে অবদান রাখার জন্য এদের তিনজনকে এবার শান্তিতে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হলো। ডিসেম্বরে স্টকহোমে আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেয়া হবে। গতকাল শান্তিতে নোবেল বিজয়ী হিসেবে এ তিনজনের নাম ঘোষণা করে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান থ্রোবজোয়ার্ন জাগল্যান্ড বলেছেন, নারীদের পুরুষের মতো একই সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে না পারলে বিশ্বে আমরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারবো না। ৭২ বছর বয়সী হার্ভার্ড প্রশিক্ষিত অর্থনীতিবিদ জনসন-সারলেফ ২০০৫ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার দেশ লাইবেরিয়াতে প্রথম গণতান্ত্রিক নারী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। ১৪ বছরের গৃহযুদ্ধে অবকাঠামো ভেঙে পড়া দেশের উন্নয়নের প্রসারে তিনি যথেষ্ট কাজ করেছেন। একজন সমাজকর্মী এবং ট্রুমা কাউন্সিলর বোয়ী নারী অহিংস সংগঠন উইমেন অব লাইবেরিয়ান ম্যাস অ্যাকশন ফর পিসের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শান্তির প্রতীক সাদা টি-শার্ট পরে এর সদস্যরা শান্তির লক্ষ্যে বিভিন্ন সময় মিছিল সমাবেশ আয়োজন করতেন। এ সংগঠনের উদ্যোগেই ২০০৩ সালে লাইবেরিয়াতে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটেছিল। ৩২ বছর বয়সী কারমান ইয়েমেনের সবচেয়ে সোচ্চার ও সুপরিচিত রাজনৈতিক কর্মী এবং দেশের প্রধান ইসলামি বিরোধী দল ইসরাহর একজন সদস্য। তিনিই প্রথম প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহ’র শাসনকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সানা ইউনিভার্সিটিতে ছাত্র বিক্ষোভের আয়োজন করেছিলেন। তিন সন্তানের জননী এবং ইয়েমেনের মানবাধিকার সংগঠন উইমেন জার্নালিস্ট উইদাউট চেইনের প্রধান কারমান নোবেল জয়ের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বলেছেন, এ পুরস্কার পেয়ে আমি খুবই খুশি। ইয়েমেনের তরুণ বিপ্লবী এবং ইয়েমেনের জনগণের উদ্দেশ্যে আমি এ পুরস্কার উৎসর্গ করলাম। শুক্রবার শান্তিতে নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণার আগে মাদার তেরেসা, জানে অ্যাডামস এবং সদ্য প্রয়াত ওয়াঙ্গারি মাথাইসহ ১২ জন নারীকে এ সম্মাননায় ভূষিত করা হয়েছিল। এর আগে বুধবার রসায়নে ইসরায়েলি এক গবেষক, মঙ্গলবার পদার্থবিদ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের তিনজন এবং সোমবার চিকিৎসা বিজ্ঞানে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও কানাডার তিন বিজ্ঞানীর নাম ঘোষণা করা হয়েছে।
সারলিফ: লৌহমানবী বলে পরিচয় যার
লাইবেরিয়ায় ১৪ বছরের গৃহযুদ্ধ শেষে ২০০৫ সালে আফ্রিকার প্রথম নির্বাচিত নারী প্রেসিডেন্ট এলেন জনসন সারলিফ তার সমর্থকদের কাছে ‘লৌহমানবী’ নামেই পরিচিত। প্রেসিডেন্ট পদে এক মেয়াদে দায়িত্ব পালনের প্রতিশ্রুতি দিলেও মঙ্গলবার দ্বিতীয় মেয়াদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দেন তিনি। তবে এরই মধ্যে গতকাল জয় করে নিলেন শান্তিতে নোবেল পুরস্কার। নোবেল কমিটি তার অহিংস উপায়ে নারীদের নিরাপত্তা এবং অধিকার বাস্তবায়নে কাজ করার বিষয়টিকে বিবেচনা করেই পুরস্কারের জন্য তার নাম ঘোষণা করে। তবে শুধু তিনি নন পুরস্কারে ভাগ বসিয়েছেন স্বদেশী ও ইয়েমেনের আরও দুই নারী। ৭২ বছর বয়সী সারলিফ লাইবেরিয়ার ২৪তম এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট। এর আগে ১৯৭৯ সাল থেকে ৮০ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের আগ পর্যন্ত দেশটির প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম টোলবার্টের অধীনে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন তিনি। এরপর দেশ ছেড়ে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন অর্থনীতি বিষয়ে বিশেষ পারদর্শী এই নারী নেত্রী।
১৯৯৭ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে পরাজিত হলেও ২০০৫ এর নির্বাচনে ঠিকই জনগণের আনুকূল্য পান তিনি। হয়ে যান আফ্রিকায় নির্বাচিত প্রথম নারী রাষ্ট্রপ্রধান। ১৯৩৮ সালের ২৯শে অক্টোবর মনরোভিয়ায় এই সারলিফের জন্ম। ছাত্রী অবস্থায়ই মাত্র ১৭ বছর বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন সারলিফ, স্বামী জেমস সারলিফ। আর এর পরই লাইবেরিয়া ছেড়ে স্বামীর সঙ্গে চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে। ঘর-সংসার শুরু করলেও পড়াশোনাটা ছাড়েননি অর্থনীতির এই ছাত্রী। নিজ আগ্রহে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন-ম্যাডিসন থেকে হিসাব বিজ্ঞান বিষয় এবং এরপর ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডো, বাউল্ডার থেকে নেন অর্থনীতির ওপর ডিগ্রি। ১৯৬৯ থেকে ৭১ পর্যন্ত তিনি অর্থনীতি ও পাবলিক পলিসি বিষয়ে পড়াশোনা শেষে লোক প্রশাসন বিষয়ে মাস্টার ডিগ্রিটা নেন তিনি। এরপরই দেশের পথে পাড়ি জমান সারলিফ। সুযোগও পেয়ে যান উইলিয়াম টোলবার্ট সরকারে। দায়িত্ব পান সহকারী অর্থমন্ত্রীর। ১৯৭২ থেকে ৭৩ পর্যন্ত ওই দায়িত্ব পালন করলেও মাঝখানে পদত্যাগের পর ১৯৭৯ সালে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বটা ঠিকই বাগিয়ে নেন তিনি।
১৯৮০ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্যামুয়েল ডো’র ক্ষমতা দখলের আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন ওই দায়িত্বে। সে সময় ফায়ারিং স্কোয়াডে টোলবার্টসহ মন্ত্রিপরিষদের চার সদস্যের মৃত্যু কার্যকর করা হয়। স্যামুয়েল সরকারের সমালোচনা করায় সে সময় জেল খাটতে হয় সারলিফকেও। ছাড়া পেয়েও ওই বছরই দেশ ছাড়েন তিনি। শুরু হয় ‘অন্যজীবন’। এরপর বিশ্বব্যাংক, সিটিব্যাংকে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করলেও মাঝে ১৯৮৫ সালে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। সে সময় দায়িত্ব থেকে পদত্যাগও করেন তিনি। তবে এরপর থেকে ২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার আগ পর্যন্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন সারলিফ। তবে ২০০৯ সালে লাইবেরিয়ার ট্রুথ কমিশন যুদ্ধাপরাধী টেইলরের সহযোগী হিসেবে ৩০ বছরের জন্য এই নারী রাষ্ট্রপ্রধানকে রাজনীতিতে নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করে। কয়েক বছর আগে এলেন জনসনের সাবেক স্বামী মারা যান। চার সন্তানের জননী সারলিফের ছয় নাতি-নাতনি রয়েছে।
লেমা বোয়ি: নারীদের অনুপ্রেরণা
জাতিগত এবং ধর্মীয় বিভাজন রেখা মিটিয়ে নারীদের সংহত ও সংগঠিত করার মাধ্যমে লাইবেরিয়ার দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ বন্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণই শান্তিতে লেমা বোয়ির নোবেল জয়ে বিবেচিত হয়েছে। পাশাপাশি নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণে তার অবদানের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে নোবেল কমিটির কাছে। লাইবেরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরুর আগ থেকে পশ্চিম আফ্রিকায় নারীদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে কাজ করে আসছেন মানবাধিকার কর্মী লেমা। নারীদের সংগঠিত করার মাধ্যমে ২০০২ সালে দেশটিতে প্রেসিডেন্ট চার্লস টেইলরকে গৃহযুদ্ধের অবসানে চাপ প্রয়োগ করার অবদানও তারই। আর এই নারীরা ছিলেন যুদ্ধে অংশ নেয়া দুই পক্ষের যোদ্ধাদের মা, স্ত্রী কিংবা বোন।
এলেন জনসন সারলিফের তুলনায় বোয়ি লাইবেরিয়ার বাইরে অনেকটা কম পরিচিত বললে অত্যুক্তি হবে না। তবে দেশে তার ব্যাপক পরিচিতি ও সমর্থন রয়েছে। গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত দেশটিতে যুদ্ধ পরবর্তী ২০০৫ সালের নির্বাচনে এলেন জনসন সারলিফের পক্ষে প্রচারে খ্রিষ্টান ও মুসলিম সমর্থকদের নিয়ে এই লেমা বোয়ি ১৫টি প্রদেশে কাজ করেন। ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত উইমেন পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি নেটওয়ার্ক আফ্রিকা নামে মানবাধিকার সংগঠনের সহযোগী প্রতিষ্ঠাতা তিনি। মূলত এটি পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোতে নারীদের নিয়ে কাজ করে।
তাওয়াকুল কারমান: বত্রিশেই নোবেল জয়
মাত্র ৩২ বছর বয়সে শান্তিতে নোবেল জয় করলেন ইয়েমেনি নারী নেত্রী ও মানবাধিকার কর্মী তাওয়াকুল কারমান। নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি শুক্রবার এ পুরস্কার বিজয়ী হিসাবে লাইবেরিয়ার প্রেসিডেন্ট এলেন জনসন-সারলিফ এবং স্বদেশী লেমা বোয়িসহ কারমানের নাম ঘোষণা করে। নারীর নিরাপত্তা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় নারীর পূর্ণ অংশগ্রহণের অধিকার আদায়ে অহিংস আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য তারা এ পুরস্কার পেলেন।
ইয়েমেনের প্রধান বিরোধী দল আল-ইসলাহের জ্যেষ্ঠ সদস্য কারমান ২০০৫ সালে গঠন করেন মানবাধিকার সংগঠন ‘উইমেন জার্নালিস্ট উইদআউট চেইনস’। গত পাঁচ বছর ধরে এই নেত্রী মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করে আসছেন। ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট আলী-আবদুল্লাহ সালেহর পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনের সময় গ্রেপ্তার হওয়া রাজবন্দিদের মুক্তির জন্য ২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহে পার্লামেন্ট ভবনের সামনে অবস্থান ধর্মঘট করে গেছেন কারমান। ‘সরকারবিরোধী’ কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকায় চলতি বছরও তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সমর্থকদের আন্দোলনের মুখে ২৪ ফেব্রুয়ারি প্যারোলে মুক্তি পান তিনি। শুধু সরকারবিরোধী আন্দোলন নয়, ইয়েমেনের নারীদের বিয়ের সর্বনিম্ন বয়সসীমা বেঁধে দেয়ার জন্যও প্রচার চালিয়ে আসছেন তাওয়াকুল কারমান। নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্য বাবদ এবার ১ কোটি সুইডিশ ক্রোনার ভাগ করে নেবেন সারলিফ, লেমা ও কারমান। আগামী ১০ই ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেয়া হবে।মানবজমিন
- নিউইয়র্কে অ্যাসাল ওজোন পার্ক চ্যাপ্টারের ইফতার ও অভিষেক
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ ল সোসাইটি ইউএসএ’র ইফতার মাহফিল: খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকার আহ্বান
- BOROUGH PRESIDENT GIBSON HOSTS FOURTH ANNUAL BRONX IFTAR DINNER DIALOGUE UNDER THE THEME “UNITY IN DIVERSITY”
- নিউইয়র্কে মানসিক সংকটে থাকা যুবককে গুলি: পুলিশ প্রশিক্ষণ এবং মানসিক সংকটসংক্রান্ত ৯১১ কল
- নিউইয়র্কে গ্রী ম্যাকানিকেল ইয়াঙ্কার্স এর ইফতার ও দোয়া মাহফিল
- নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গমাতা পরিষদ’র ইফতার ও দোয়া মাহফিল
- নিউইয়র্কে ঢাকা জেলা অ্যাসোসিয়েশনের ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত
- বাংলাদেশ সোসাইটি অব ব্রঙ্কস নিউইয়র্ক ইনকের কোরআন তেলাওয়াত প্রতিযোগিতা ও ইফতার মাহফিল








