মায়ের ভালবাসা স্টিভ জবস’র জন্যে

সিরাজুল ইসলাম কাদির: পল বোমার। সতের বছরের জার্মান কিশোর। এরিক মারিয়া রেমার্ক’র ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’র মূল চরিত্র। রণাঙ্গন থেকে এক সময় সতের দিনের ছুটি মেলে। বাড়িতে বৃদ্ধা মা ক্যান্সারে আক্রান্ত। শয্যাশায়িনী। দেখতে দেখতে ছুটির দিনগুলো ফুরিয়ে আসে। বর্ণনাটা এ রকম : বাড়িতে আমার শেষ বিকেল আজ। সবাই চুপচাপ। গভীর রাতে আস্তে করে মা এসে ঢুকল ঘরের মধ্যে। …মা চুপচাপ বসে থাকল আমার পাশে, আস্তে করে হাত দিয়ে চুলের মধ্যে বিলি কাটতে লাগল আমার। …‘ঘুমোতে যাও, মা, এখানে থাকলে ঠাণ্ডা লাগবে তোমার।’ ‘ঘুমোতে তো আমি অনেক পারব, বাবা,’ শান্ত ভেজা গলায় বলল মা। …সাবধানে থাকিস, বাবা।’ মা, মাগো, তুমি আমাকে দু’হাত দিয়ে তোমার বুকে জড়িয়ে রাখো না আমাকে। …মা, সোনা মা আমার, চলো না, মা ফিরে যাই আগের দিনগুলোতে…। মা, মা আমার, তুমি আমাকে এত ভালবাসো কেন, মা, আমার যে কষ্ট হয়। …আমার ওপর তোমার চেয়ে বেশি দাবি তো আর কারও নেই, মা, তবুও কার জন্যে, কিসের জন্যে তোমাকে ছেড়ে যেতে হবে আমার?
এই হচ্ছে- চিরকালীন মা, শাশ্বত মা। কিন্তু কি বেদনার- স্টিভ জবস চিরকালীন এ মায়ের স্নেহের নরম ভালবাসা থেকে ছিলেন বঞ্চিত। তার মৃত্যুতে আজ গোটা পৃথিবী কাঁদছে। মাত্র ৫৬ বছর বয়সে তিনি হেরে গেলেন ক্যান্সারের কাছে। ২০০৫ সালের ১২ই জুন তিনি স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের উদ্দেশে এক লিখিত বক্তৃতায় তার জীবনের তিনটি সত্য গল্পচ্ছলে তুলে ধরেছিলেন। প্রথম গল্পটায় ছিল জন্মবৃত্তান্ত। ছাত্রদের উদ্দেশ্য করে বললেন:
আমার জন্মদাত্রী মা ছিলেন এক তরুণী। কলেজছাত্রী। আর সে কারণে আমাকে অন্য কারও হাতে দিয়ে বড় করার সিদ্ধান্ত নেন। টেলিফোনে মা বললেন- ‘আমাদের একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পুত্র সন্তান রয়েছে, আপনি কি তাকে নিতে ইচ্ছুক?’ ওপ্রান্ত থেকে জবাব এল ‘অবশ্যই।’ অর্পিত হলাম এক দম্পতির হাতে। ১৭ বছর পর আমি কলেজে গেলাম। সেটি ছিল এ স্টানফোর্ডের মতো ব্যয়বহুল। মা-বাবার জমানো সব অর্থ আমার পেছনে শূন্য হতে থাকল। আমি আগ্রহ হারিয়ে ফেললাম কলেজে যেতে। কিন্তু কি করব বুঝতে পারছিলাম না। আমার জন্যে এটা কোন রোমাঞ্চকর ব্যাপার ছিল না। জীবনটা ক্লেশময় হয়ে ওঠল। বন্ধুদের বাড়িতে মেঝেতে রাত কাটত আমার। সপ্তাহে একদিন-রোববার শহর থেকে ৭ মাইল দূরে হেটে যেতাম সস্তায় একবেলা খাওয়ার জন্যে। এক সময় রীড কলেজে ভর্তি হলাম ক্যালিগ্রাফিতে দখল নিতে। ক্যালিগ্রাফির জন্যে ওটা ছিল সেরা প্রতিষ্ঠান। আনন্দ পেতাম। তবে আমার জীবনে এর প্রতিফলন কি- আমি জানতাম না। দশ বছর পর এর বাস্তব ফল বুঝতে পারলাম।
আমার জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায় ভালবাসা আর হারানোর গল্প নিয়ে।
ছাত্রদের লক্ষ্য করে বললেন, আমি ছিলাম ভাগ্যবান- কারণ, আমি আমার প্রথম জীবনে যা করতে ভালবাসতাম তারই সন্ধান পেলাম। আমার বয়স তখন ২০ বছর। আমি এবং উজ এ্যাপেল নিয়ে যাত্রা শুরু করলাম। আর আমাদের কাজ শুরুর জায়গাটা ছিল আমার মা-বাবার (দত্তক) গ্যারেজে। কঠোরভাবে কাজ করে যাচ্ছিলাম। মাত্র ১০ বছরে ২০০ কোটি ডলারের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হল। আর তখন কর্মী সংখ্যা ছিল ৪ হাজারের উপরে। আমার বয়স তখন ৩০ বছর। তখনই আমাকে এই প্রতিষ্ঠান থেকে বিদায় নিতে হল। স্বাভাবিক প্রশ্ন জাগে- যে প্রতিষ্ঠান নিজের হাতে গড়া সেখান থেকে আমার বিদায় নিতে হয় কি করে? জবাব হচ্ছে এই- এ্যাপেল বিকশিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে আমরা এমন একজনকে নিয়োগ দিলাম যিনি ছিলেন খুবই মেধাবী। প্রথম বছর ভালই চলছিল। কিন্তু খুব দ্রুত আমাদের স্বপ্ন পতনের মুখে পড়ল। এ জন্যে পরিচালনা পর্ষদ আমাকে দায়ী করে তার পক্ষ নিল। অসম্মানের সঙ্গে আমাকে বেরিয়ে আসতে হলো। আমার তারুণ্যের সকল স্বপ্ন ধূলোয় মিলিয়ে গেল। আর সেটা ছিল আমার জন্যে বড় বিপর্যয়।
কয়েক মাস আমি বুঝতে পারছিলাম না আমি কি করব। নতুন করে আবার যাত্রা শুরু করলাম। পরের পাঁচ বছরে আমি ঘবঢঞ এই নামে একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করানোর চেষ্টা করলাম। পাশাপাশি আরেকটা প্রতিষ্ঠান- পিক্সার। এ সময় এক মহিলার প্রেমে পড়লাম এবং তিনিই পরে আমার স্ত্রী হন। পিক্সারই প্রথম বিশ্বে এনিমেটেড ফিচার ফিল্ম তৈরি করে। এ সময় একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে। আর তা হচ্ছে এ্যাপেল ঘবঢঞ কিনে নেয়। এভাবে আমি আবার এ্যাপেলে ফিরে আসি। আমি নিশ্চিত এ্যাপেল থেকে বহিষ্কৃত না হলে এই সাফল্য হাতের মুঠোয় আসত না। কখনও কখনও জীবন তোমাকে ইট দিয়ে মাথায় আঘাত করে। কিন্তু বিশ্বাস হারিয়ো না। সব চেয়ে বড় কথা- তুমি যা কর তাকে ভালবাসতে হবে। তুমি যা ভালবাস তা তুমি খুঁজে পাবেই। এটা তোমার কাজের জন্যে যেমন সত্য, তেমনি সত্য তোমার প্রেমিকার জন্যে। তুমি যা ভালবাস তা যদি খুঁজে না পাও তাহলে থেমে যেও না- খুঁজতেই থাক। থেমে যেয়ো না।
আমার তৃতীয় গল্প মৃত্যু নিয়ে:
আমার বয়স তখন ১৭ বছর। তখন আমি একটি উদ্ধৃতি পড়ি এবং সেটি এ রকম ‘যে দিনটি তুমি বেঁচে থাকবে, ধরে নিবে এটিই তোমার শেষ দিন। আর এ কথাটি তোমার জন্যে একদিন সত্যে পরিণত হবে।’ এ উদ্ধৃতি আমাকে প্রভাবিত করে। আর তখন থেকে গত ৩৩ বছর প্রতিদিন ভোরে আমি আয়নার দিকে তাকাই আর নিজেকে প্রশ্ন করি: ‘আজই যদি হয় আমার শেষ দিন আমি কি তাহলে আজ আমার যা উচিত তা করতে পারব?’ আমার যখন উত্তরটা হয় ‘না’ দিনের পর দিন, আমি জানি আমার কিছু একটা পরিবর্তন করা দরকার।
আমি জানি সবকিছু- বাইরের দিকে প্রত্যাশা, সকল অহঙ্কার, সব ভয়ভীতি অথবা ব্যর্থতা-সবকিছুই মৃত্যুর কাছে অর্থহীন, পরাজিত। আর বেঁচে থাকাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তুমি মারা যাচ্ছ- এই বোধই হচ্ছে-আমি কিছু একটা হারাচ্ছি এই চিন্তার ফাঁদ থেকে রক্ষার সেরা উপায়। তুমি ইতিমধ্যে বিবস্ত্র। তাই হৃদয়কে অনুসরণ না করার কোন অর্থ হয় না।
বছর খানেক আগের কথা। ডাক্তারি পরীক্ষায় আমার ক্যান্সার ধরা পড়ল। সকাল সাড়ে সাতটায় আমাকে পরীক্ষা করা হল। আর এতে স্পষ্টই ধরা পড়ল যে আমার প্যাংক্রিয়াসে একটা টিউমার রয়েছে। আমি তখনও জানি না প্যাংক্রিয়াস কি। চিকিৎসকরা এক রকম নিশ্চিত হয়ে বললেন, এটা এমন এক ধরনের ক্যান্সার যা কোনদিন নিরাময়ের যোগ্য নয়। তাই আমার আয়ু তিন থেকে ছ’মাস। চিকিৎসক আমাকে বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্যে পরামর্শ দিলেন এবং সবকিছু গুছিয়ে নিতে বললেন। অর্থাৎ আগামী ১০ বছরে তুমি যা করতে চাও তা মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে সন্তানদের জানাও। ….তুমি সবকিছুকে বিদায় জানাও।
সারাদিন আমার মনের মধ্যে এসব পরামর্শ ঘুরপাক খেতে থাকল। ওইদিন সন্ধ্যায় আমার বায়োপসি করা হল। এটা করতে গিয়ে তারা আমার গলার মধ্য দিয়ে একটি এনডোসকোপ ঢুকাল। সেটি আমার পাকস্থলি পার হয়ে ইনটেস্টাইনে প্রবেশ করল। আমার প্যাংক্রিয়াসে একটি সুঁই ঢুকানো হলো। তারপর টিউমার থেকে কিছু কোষ তুলে আনা হলো। আমি তখন তন্দ্রাচ্ছন্ন। কিন্তু সেখানে আমার স্ত্রী ছিলেন। তিনি আমাকে বললেন, চিকিৎসকরা ওই কোষ যখন মাইক্রোসকোপে দেখলেন- তখন চিৎকার দিয়ে উঠলেন। কারণ, তাদের সন্দেহটা অমূলক হল। দেখা গেল এ ধরনের ক্যান্সার নিরাময়যোগ্য। আমার অস্ত্রোপচার হলো- আর আমি এখন ভাল আছি।
এভাবেই আমি মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। আর আমার মনে হলো মৃত্যুর খুব কাছে থেকে আমি কয়েকটা দশক পেয়ে গেলাম। আমি এই প্রেক্ষাপটে তোমাদের মৃত্যু নিয়ে কিছু খাঁটি কথা যা একেবারেই বুদ্ধিবৃত্তিক তা বলতে চাই:
কেউ মারা যেতে চান না। এমনকি যিনি স্বর্গে যেতে চান তিনিও মৃত্যু চান না ওখানটায় যাওয়ার জন্যে। কিন্তু তারপরও আমরা সবাই জানি মৃত্যুই হচ্ছে আমাদের শেষ গন্তব্যস্থল। কারোরই এ থেকে মুক্তি নেই। তবে এ কথা সত্য- মৃত্যু হচ্ছে জীবনের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার। এটা জীবনকে পরিবর্তন করে দেয়। মৃত্যু পুরনোকে সরিয়ে নতুনকে জায়গা করে দেয়। আর এ মুহূর্তে তোমরাই হচ্ছ সেই নবীন। তবে সেদিন বেশি দূরে নয় যখন তোমরাও ধীরে ধীরে পুরনো হয়ে যাবে এবং নতুনদের জন্যে পথ করে দেবে। দুঃখিত এ রকম নাটকীয়পনা করার জন্যে। তবে এটাই চিরন্তন সত্য।
তোমার সময় সীমিত। তাই এ সময়কে নষ্ট করো না। কোন মতবাদের ফাঁদে নিজেকে আটকে ফেল না- এতে অন্যের চিন্তা বাধা পড়ে যায়। অন্যের মতবাদকে নিজের মধ্যে ধারণ করে তোমরা নিজের সৃজনশীলতাকে খাটো করো না। সবচেয়ে যেটা গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে- সাহসের সঙ্গে তোমরা নিজের হৃদয় আর চেষ্টাকে মহিমান্বিত করে রাখ।
আমি যখন বয়সে তরুণ একটি চমৎকার প্রকাশনা ছিল- নাম তার দ্য হোল আর্থ ক্যাটালগ। ওটা ছিল আমার প্রজন্মের অন্যতম বাইবেল। এটা ষাটের দশকের শেষের দিকের কথা। স্টুয়ার্ড ব্রান্ড এ ক্যাটালগ তৈরি করেন। তিনি তার সঙ্গীদের নিয়ে অনেকগুলো সংখ্যা প্রকাশ করেন। এর সর্বশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয় সত্তর দশকের মাঝামাঝি। আমার বয়স তখন তোমাদের মতোই। ওই সংখ্যায় পেছনের প্রচ্ছদে ছিল- গ্রামের রাস্তায় ভোরের একটি ছবি। তার নিচে লেখা ছিল: ‘ক্ষুধার্ত থাকুন। বোকা থাকুন।’ ওটা ছিল তাদের বিদায়ী বার্তা- কারণ ওই সংখ্যা দিয়েই তারা তাদের যবনিকা ঘটায়। এ কামনাই সব সময় তোমাদের জন্যে আমার। তোমরা এখন নতুন পথের যাত্রার জন্যে নিজেদের উত্তরণ ঘটাচ্ছ। তোমাদের জন্যে আমরাও ওই প্রার্থনা- ক্ষুধার্ত থাক। বোকা থাক।
স্টিভ জবস- আপনি আজ আর নেই আমাদের মাঝে। নজরুলের জীবন দর্শন আপনার জীবনে শত ফুল ফুটিয়েছে- ‘হে দারিদ্র্য তুমি করেছ মহান, দানিয়াছ খ্রিষ্টের সম্মান।’ আপনি আমাদের এ প্রজন্মের জন্যে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি। আপনাকে ছাড়া আমাদের প্রাণবন্ত প্রযুক্তি জগৎ অসুন্দর হয়ে পড়ল।মানবজমিন
- নিউইয়র্কে অ্যাসাল ওজোন পার্ক চ্যাপ্টারের ইফতার ও অভিষেক
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ ল সোসাইটি ইউএসএ’র ইফতার মাহফিল: খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকার আহ্বান
- BOROUGH PRESIDENT GIBSON HOSTS FOURTH ANNUAL BRONX IFTAR DINNER DIALOGUE UNDER THE THEME “UNITY IN DIVERSITY”
- নিউইয়র্কে মানসিক সংকটে থাকা যুবককে গুলি: পুলিশ প্রশিক্ষণ এবং মানসিক সংকটসংক্রান্ত ৯১১ কল
- নিউইয়র্কে গ্রী ম্যাকানিকেল ইয়াঙ্কার্স এর ইফতার ও দোয়া মাহফিল
- নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গমাতা পরিষদ’র ইফতার ও দোয়া মাহফিল
- নিউইয়র্কে ঢাকা জেলা অ্যাসোসিয়েশনের ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত
- বাংলাদেশ সোসাইটি অব ব্রঙ্কস নিউইয়র্ক ইনকের কোরআন তেলাওয়াত প্রতিযোগিতা ও ইফতার মাহফিল








