Sunday, 8 March 2026 |
শিরোনাম
নিউইয়র্কে গোল্ডেন এইজ হোম কেয়ারের ইফতার মাহফিল নিউইয়র্ক বাংলাদেশি আমেরিকান লায়ন্স ক্লাবের ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ৭ মার্চ ঘড়ির কাঁটা এক ঘন্টা এগিয়ে যাবে নিউইয়র্কে জ্যামাইকা বাংলাদেশ ফ্রেন্ডস সোসাইটির বার্ষিক ইফতার ও দোয়া মাহফিল Radwan Chowdhury Announces Candidacy for Montgomery County Council At-Large, Launches “Five-Pillar Blueprint” for Accountable Governance. New York Attorney General James Reminds New Yorkers of SNAP Work Requirements নিউইয়র্কে ডিজিটাল ওয়ান ট্র্যাভেলস এবং বাংলা ট্র্যাভেলস এর ইফতার মাহফিল রূপসী চাঁদপুর ফাউন্ডেশন নিউইয়র্ক ইনক’র ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত মেরিল্যান্ডে বাংলাদেশ আমেরিকান ফাউন্ডেশনের ইফতার ও দোয়া মাহফিল নিউ জার্সির এগ হারবার সিটিতে শিবলীলা মঞ্চস্থ
সব ক্যাটাগরি

মুজিবনগর সরকার ও বাংলার স্বাধীনতার দৃপ্তমান সূর্য

অনলাইন ডেস্ক পঠিত: 184 বার

প্রকাশিত: April 18, 2021 | 2:04 AM

জি.এম.আরিফুজ্জামান: ১৯৬৬ সালের ০৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় জাতীয় সংহতি সম্মেলনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের সামাজিক, রাজনৈতিক , অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষে “ছয় দফা ‘ দাবী পেশ করেন, যা বাংলার ইতিহাসে বাঙালি জাতির “মুক্তির সনদ” বা ম্যাগনাকার্টা নামে পরিচিত । এই ছয় দফা দাবির আলোকে বাংলার স্বাধীনতার বীজ বপিত হয়। ১৯৬৮ সালের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ( রাষ্ট্রদ্রোহিতা বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য ) ফলে দেশের ছাত্র সমাজ ও আপামর জনসাধারণ তৎকালীন পাকিস্তানী  শাসক জেনারেল আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলে। ১৯৬৯ সালের গনঅভ্যুথানের ফলে জেনারেল আইয়ুব খান বাধ্য হয় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বাতিল করতে এবং বঙ্গবন্ধুসহ সকল বন্দিদের মুক্তি দিতে। বঙ্গবন্ধুর ০৬ দফা এবং  ছাত্র সমাজের ১১ দফার আলোকে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে দূর্বার প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ফলে, আইয়ুব খান নতি স্বীকার করে ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানের তৎকালীন সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খানের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা গ্রহনের পর প্রবল চাপের মুখে জন প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দেন। ১৯৭০ সালের ০৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামীলীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেন, ১৬৯ টি আসনের মধ্যে ১৬৭ আসন লাভ করে।  কিন্তু, ১৯৭১ সালের ০১ মার্চ ইয়াহিয়া খান আওয়ামীলীগকে সরকার গঠনের সুযোগ না দিয়ে জাতীয় পরিষদ অধিবেশন অনিদিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেন। পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকট আরও ঘনীভূত হতে থাকে। ১৯৭১ সালের ০৭ মার্চ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানের ( বর্তমান সোহরাওয়াদী উদ্যান) বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ভাষণে বাঙালি জাতিকে পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য দৃপ্ত আহবান করেন। বাংলাদেশের ভূখণ্ডে পাকিস্তানের অবস্থান সুসংহত করণের জন্য পাকিস্তানের জান্তা সরকার ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ “ অপারেশন সার্চলাইট “ নামে সারা দেশব্যাপী জেনোসাইড পরিচালনা করে এবং রাত ০১ টা ৩০ মিনিটের দিকে বঙ্গবন্ধুর ৩২ নং ধানমণ্ডির বাসা থেকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের পূর্বেই বঙ্গবন্ধু মধ্যরাতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং ওয়্যারলেস যোগে চট্রগ্রামে বার্তা প্রেরণ করেন। বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের দোসরদের হাত থেকে রক্ষার জন্য পার্শ্ববর্তী ভারতে আশ্রয় শিবিরে অবস্থান নেয়। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতারের পরে নেতৃত্বশুন্য বাংলাদেশের স্বাধীনতার  জন্য অবধারিত হয়ে ওঠে একটি প্লাটফর্ম । সে লক্ষে ১০ এপ্রিল ১৯৭১ নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে আগরতলায় “ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার” গঠন করে। এই দিনই আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষনাকে কার্যকরণের জন্য “ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা আদেশ” জারি করেন।

১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমার ভবেরপাড়া গ্রামের বৈদ্যনাথ তলায়  বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্তরা  শপথ গ্রহন করেন এবং মেহেরপুরকে প্রথম অস্থায়ী রাজধানী ঘোষণা করা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপ- রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমেদকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দেয়া হয়। ক্যাপ্টেন মুনসুর আলীকে অর্থ ,বাণিজ্য ও শিল্প, এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে স্বরাষ্ট্র, সরবরাহ,ত্রান এবং পুনর্বাসন, কৃষি  ও খন্দকার মোশতাক আহমেদকে পররাষ্ট্র ,আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হয়। মুজিবনগর সরকার মোট ১২ টি মন্ত্রণালয় নিয়ে যাত্রা শুরু করে।  এই সরকারের অস্থায়ী সচিবালয় কলকাতার ০৮ নং থিয়েটার রোডে স্থাপিত হয়। এই সরকার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে অভ্যন্তরীণ বাবস্থাপনা এবং বহির্বিশ্বের সাথে যোগাযোগের দিক থেকে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পেরেছিলেন বলেই বাংলাদেশের বিজয় অর্জনের জন্য খুব বেশী দিন অপেক্ষা করতে হয়নি। অভ্যন্তরীণ বাবস্থাপনার মধ্যে রয়েছে যুদ্ধকৌশল নির্ধারণ, ভারতে আশ্রয় নেয়া ১ কোটি বাঙ্গালীর বিষয়াদি, বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন কাঠামো প্রনয়ন ইত্যাদি। মুজিবনগর সরকার বাংলাদেশকে প্রথমে ০৪ টি অঞ্চলে বিভক্ত করেন। পরবর্তীতে , ১০-১৭ জুলাই ১৯৭১ সালে প্রধানমন্ত্রী সভাপতিত্বে বাংলাদেশকে ১১ টি সেক্টর ও ৬৪ টি সাব সেক্টরে বিভক্ত করা হয়। প্রতিটি সেক্টর ০১ জন করে  সেক্টর কম্যান্ডারের অধীনে কাজ করতে থাকে। যুদ্ধকালীন মোট ১৬ জন সেক্টর কম্যান্ডার পরিচালনা করেন। প্রধান সেনাপতি হিসেবে জেনারেল এম এ জি আতাউল গণি ওসমানী দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও, সম্মুখ যুদ্ধের অংশ হিসেবে প্রধান সেনাপতির নেতৃত্বে জেড ফোস , এস ফোস এবং কে ফোস  নামক তিনটি ব্রিগেড গঠন করা হয়। নৌযুদ্ধের জন্য বিশেষ কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া হয়। এই সকল কাজের সমন্বয়ে মুজিবনগর সরকার সফলভাবে কাজ করতে সমর্থ হয়েছিলো। ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ পাকিস্তান বাহিনীর বোমাবর্ষণের ফলে চট্টগ্রামে বেতার কেন্দ্রের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে, বাংলাদেশ সরকারের প্রচেষ্টায় ২৫ মে ১৯৭১ সালে কলকাতার বালিগঞ্জ থেকে নিয়মিত সম্প্রচার শুরু করে। ‘চরমপত্র’ ও ‘জল্লাদের দরবার’ নামক দুটি জনপ্রিয় অনুষ্ঠান প্রচারিত হত, যার ফলে মুক্তিযুদ্ধের সার্বিক অবস্থা এবং পাকিস্তান শাসকদের অত্যাচারের রূপ ফুটিয়ে তোলা হত। ভারতে আশ্রয় নেয়া ০১ কোটি মানুষের বিভিন্ন মৌলিক চাহিদা এবং পরবর্তীতে দ্রুত ও কার্যকরী প্রত্যাবর্তনের জন্য এই সরকার কাজ করে গিয়েছিলো। যুদ্ধকালীন সরকারের প্রশাসনিক কার্যক্রমকে পরিচালনা করার লক্ষে সচিবালয় গঠন করে আর্থিক ও বিভিন্ন সিদ্ধান্তের যথাযথ রূপ দান করতে সমর্থ হয়েছিলো এই সরকার।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একটি বৃহৎ অংশ জুড়ে রয়েছে কূটনৈতিক তৎপরতা। বাংলাদেশের বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন আদায়ের জন্য বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরে বিদেশী মিশন স্থাপন করেন। যেমন- কলকাতায় জনাব হোসেন আলী, দিল্লীতে জনাব হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী, ওয়াশিংটনে এম আর সিদ্দিকী, যুক্তরাজ্যের বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। বাংলাদেশের প্রথম মিশন স্থাপিত হয় কলকাতায়। এই সমস্ত মিশনের সমন্বয়ে বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশের পক্ষে  আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে সমর্থ হয়েছিলো।  বাংলাদেশের পক্ষে পৃথিবীর বৃহৎ শক্তি রাশিয়া এবং ভারতের সরাসরি সমর্থন আদায় ছিল এই সরকারের অন্যতম একটা বৃহৎ সফলতা। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে রাশিয়ার ভেটো প্রদান বাংলাদেশ সরকারের জন্য একটি বিশাল কূটনৈতিক বিজয়। বাংলাদেশের মুক্তি বাহিনীর সাথে ভারতীয় বাহিনীর যৌথযুদ্ধের ফলে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান বাহিনী মিত্র বাহিনীর হাতে আত্মসমর্পণ করে এবং পরাজয় বরণ করে। এছাড়াও বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান,শিল্পী কলাকৌশলী , মিডিয়ার সমর্থনে বাংলাদেশ সরকারের নেয়া গৃহীত পদক্ষেপ বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথকে ত্বরান্বিত করে এবং পূর্ব পাকিস্তানের উপর পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর মদদপুষ্ট সেনাবাহিনীর এবং তাদের দেশীয় দালালদের মুখোশ  বিশ্বের কাছে উন্মোচন করতে সক্ষম হয়েছিলো।  

মুজিবনগর সরকারের নানামুখী সমন্বিত, যুগোপযোগী পদক্ষেপের সঠিক ফল হিসেবে আমার পেয়েছি স্বাধীন বাংলাদেশ ,পেয়েছি পাকিস্তানের শোষণ থেকে মুক্তি। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বিনির্মাণের নতুন সূর্য উদিত হয়েছিলো বাংলার আকাশে। আজকের এই দিনে মুজিবনগর সরকারের সকল সদস্যেকে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি এবং সম্মান প্রদর্শন করি। ১৭ এপ্রিল দিনটিকে “ বাংলাদেশের প্রজাতন্ত্র দিবস “ ঘোষণার জোর দাবী জানাই।

লেখকঃ গবেষণা সহযোগী, সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইলঃ [email protected]

ট্যাগ:
Situs Streaming JAV