Saturday, 7 March 2026 |
শিরোনাম
নিউইয়র্কে গোল্ডেন এইজ হোম কেয়ারের ইফতার মাহফিল নিউইয়র্ক বাংলাদেশি আমেরিকান লায়ন্স ক্লাবের ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ৭ মার্চ ঘড়ির কাঁটা এক ঘন্টা এগিয়ে যাবে নিউইয়র্কে জ্যামাইকা বাংলাদেশ ফ্রেন্ডস সোসাইটির বার্ষিক ইফতার ও দোয়া মাহফিল Radwan Chowdhury Announces Candidacy for Montgomery County Council At-Large, Launches “Five-Pillar Blueprint” for Accountable Governance. New York Attorney General James Reminds New Yorkers of SNAP Work Requirements নিউইয়র্কে ডিজিটাল ওয়ান ট্র্যাভেলস এবং বাংলা ট্র্যাভেলস এর ইফতার মাহফিল রূপসী চাঁদপুর ফাউন্ডেশন নিউইয়র্ক ইনক’র ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত মেরিল্যান্ডে বাংলাদেশ আমেরিকান ফাউন্ডেশনের ইফতার ও দোয়া মাহফিল নিউ জার্সির এগ হারবার সিটিতে শিবলীলা মঞ্চস্থ
সব ক্যাটাগরি

গণতন্ত্রে ভিন্নমত ও বিরোধী মতের কথা শুনতে হবে: নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে মার্কিন দূত- মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতনের জবাবদিহিতায় যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ

অনলাইন ডেস্ক পঠিত: 113 বার

প্রকাশিত: January 17, 2022 | 3:08 PM

তারিক চয়ন: আর্ল রবার্ট মিলার বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে শপথ নেন ২০১৮ সালের ১৩ই নভেম্বর। তিনি এর আগে বতসোয়ানা প্রজাতন্ত্রে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সিনিয়র ফরেন সার্ভিসের ক্যারিয়ার সদস্য মিলার ১৯৮৭ সালে পররাষ্ট্র দপ্তরে যোগ দেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কনসাল জেনারেল হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গসহ ভারত, ইরাক, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া এবং এল সালভাদরে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসে কাজ করেছেন। রাষ্ট্রদূত মিলার মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গ্র্যাজুয়েট এবং সাবেক মেরিন কোর কর্মকর্তা। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অসংখ্য সম্মানে তিনি ভূষিত হয়েছেন, যার মধ্যে আছে বীরত্বের জন্য পররাষ্ট্র দপ্তর পুরস্কার ও ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের শিল্ড অব ব্রেভারি পুরস্কার। রাষ্ট্রদূত মিলার ফ্রেঞ্চ, স্প্যানিশ ও ইন্দোনেশিয়ান ভাষা জানেন।
তিন বছর দুই মাসেরও বেশি সময় দায়িত্ব পালনের পর বাংলাদেশ থেকে বিদায় নিচ্ছেন মিলার।
ঢাকা থেকে বিদায় নেয়ার ঠিক আগে মানবজমিনকে দেয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রদূত দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের খোলামেলা জবাব দেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আমাদের সিনিয়র রিপোর্টার তারিক চয়ন। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারটির প্রথম পর্ব:
মানবজমিন: বাংলাদেশে অবস্থানকালে এই তিন বছরে কোন বিষয়টি আপনার সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে? এখানে আপনার সেরা অভিজ্ঞতাটা কি?
আর্ল মিলার: বাংলাদেশের জনগণের আন্তরিকতা এবং উদারতা। আমি ৩৫ বছর ধরে আমেরিকান কূটনীতিক হিসেবে কাজ করছি। বাংলাদেশের মানুষের মতো এত অতিথিপরায়ণ, চিন্তাশীল এবং আন্তরিক মানুষ অন্য কোনো দেশে দেখিনি যারা এভাবে মানুষকে সাদরে বরণ করে নেয়।
বিস্ময়করভাবে বৈচিত্র্যময় এবং অপরূপ এই দেশের বিভিন্ন স্থান ভ্রমণ করে চমৎকার সব অভিজ্ঞতা হয়েছে, যেগুলো আমার স্মৃতিতে অমলিন। আমি দেশের আটটি বিভাগেই ঘুরেছি, সব জায়গাতেই ভালো লেগেছে। আমার হৃদয়ে, আমার স্মৃতিতে আমি আকর্ষণীয় এই দেশের রূপ, রস, রঙ, গন্ধ এবং বৈচিত্র্য বহন করবো। সিলেট, বরিশাল ও বান্দরবানের সবুজ, কক্সবাজারের অন্তহীন সমুদ্র সৈকত, সুন্দরবনের অপরূপ সৌন্দর্য, পুরান ঢাকার প্রাচীনত্ব ও আধুনিকতা বোধ (হেসে) আমি কিন্তু থামবো না…আমি যেখানেই গিয়েছি সেখানেই বাংলাদেশের মেধাবী তরুণদের সঙ্গে দেখা করার সৌভাগ্য হয়েছে। তারা আমাকে অনুপ্রাণিত করে। তাদের শক্তি, তাদের আশাবাদ, তাদের আবেগ আমাদের আশা জোগায়। পৃথিবীর জন্য যা খুবই দরকার।
মানবজমিন: চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি উদ্‌যাপিত হচ্ছে। আপনি এই সম্পর্ককে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? বর্তমানে ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্ককেই বা আপনি কীভাবে বর্ণনা করবেন?
আর্ল মিলার: যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক দৃঢ় এবং তা আরও মজবুত হচ্ছে। আমি ঢাকায় নবনিযুক্ত রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের প্রতি ঈর্ষান্বিত এই কারণে যে, তিনি আমাদের দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০তম বার্ষিকী উদ্‌যাপন করার সময়টায় এখানে থাকবেন। আহ! কি যে একটা উদ্‌যাপন হবে! আমাদের উভয় দেশের জন্য এই বিশেষ মাইলফলক উদ্‌যাপনে সত্যিকার অর্থেই উত্তেজনাপূর্ণ বেশকিছু অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করেছি।
কারণ বিগত পাঁচ দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমর্থক, সবচেয়ে বড় ভক্ত, সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য এবং ভরসা করার মতো সবচেয়ে বড় অংশীদার ও বন্ধু। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি উন্নয়ন সহায়তা প্রদান করেছে। আমরা সাহায্যের দিক থেকে বছরে ২০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি অবদান রাখি। টাইফুনের পর আমরা মানবিক সহায়তায় ছুটে এসেছি। আমরা করোনার বিরুদ্ধে একসঙ্গে যুদ্ধ করছি। যুক্তরাষ্ট্র বিনামূল্যে, ২৮ মিলিয়নের (২ কোটি ৮০ লাখ) বেশি করোনা ভ্যাকসিনের ডোজ দান করেছে। জনস্বাস্থ্য বিষয়ক অন্যান্য সহায়তায় দিয়েছে ১২১ মিলিয়ন (১২ কোটি ১০ লাখ) ডলারেরও বেশি।
স্বাধীনতার জন্য আমাদের ঐতিহাসিক সংগ্রাম থেকে শুরু করে মানুষের সঙ্গে মানুষের বন্ধন পর্যন্ত- আমাদের দুই দেশের মধ্যে অনেক মিল রয়েছে।
অর্থনৈতিক ইস্যু, উন্নয়ন, নিরাপত্তা এবং জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে আমাদের পারস্পরিক সহযোগিতা আমাদের শক্তিশালী অংশীদারিত্ব এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার কথাই তুলে ধরে।
একসঙ্গে কাজ করার ধারণা ঠিক করতে এবং পরবর্তী ৫০ বছর বা তারও অধিকতর সময়ে আমাদের অংশীদারিত্বের ভিত্তি স্থাপন করতে ২০২২ সালে আমরা দুই দেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি উচ্চপর্যায়ের সরকারি সফর এবং সংলাপের পরিকল্পনা করেছি।
যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশ জনগণের সঙ্গে জনগণের বন্ধনের মাধ্যমেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। হাজার হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনা করে। প্রকৃতপক্ষে, যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের সংখ্যার হিসেবে বিশ্বের সব দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৪তম।
বন্ধুদের ক্ষেত্রে যা হয়- আমাদের দুই জাতি, সবসময় সব বিষয়ে একমত হতে পারে না। কিন্তু সেক্ষেত্রেও আমাদের সম্পর্ক যেহেতু যথেষ্ট পরিপক্ব এবং দৃঢ় সেহেতু সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে খোলামেলা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে আমরা সেগুলোকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যেতে পারি।
মানবজমিন: এই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ আপনি কেমন দেখছেন? চলমান সম্পর্কের ক্ষেত্রে দুই দেশের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে পার্থক্য কি?
আর্ল মিলার: আমি আগেই বলেছি, আমাদের সম্পর্ক দৃঢ় এবং সেটা আরও মজবুত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ অংশীদারিত্ব কেবল উভয় দেশের ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তার জন্যই নয়, একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্যও অপরিহার্য।
আমরা স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা থেকে উত্তরণ হতে শুরু করে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির প্রতি আমাদের প্রশংসা জানানো এবং সমর্থন করা অব্যাহত রাখবো। আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক হুমকি মোকাবিলায় একসঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবো এবং জলবায়ু-সংবেদনশীল দেশগুলোর মধ্য থেকে শক্তিশালী নেতৃত্বের জন্য বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে থাকবো।
বাংলাদেশ তার নিজের যোগ্যতাতেই আমাদের গুরুত্বপূর্ণ এবং মূল্যবান অংশীদার। কিন্তু এটি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ক্রমবর্ধমানভাবে গুরুত্বপূর্ণভাবে নেতৃত্বের ভূমিকাও পালন করছে। যে অঞ্চলে বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ বাস করে, যে অঞ্চলে বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতিগুলোর কয়েকটির অবস্থান (অবশ্যই, আপনারাও রয়েছেন)। বৈশ্বিক জিডিপি’র প্রায় ৪০ শতাংশই এই অঞ্চলের। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের কেন্দ্রবিন্দু।
মানবজমিন: বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অবস্থা কেমন বলে আপনি মনে করেন? বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে প্রধান রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো কি কি?
আর্ল মিলার: স্বাধীনতার জন্য আমাদের দুই দেশের সংগ্রামের দিকে ফিরে তাকালে যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অংশীদার। আমাদের প্রতিষ্ঠিত আদর্শ এবং নীতিগুলো মেনে চলার দিক দিয়ে সমস্ত গণতন্ত্রের গল্পই এক, আর তা হলো গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম চলছে, গণতন্ত্র সম্পূর্ণ নয় এবং এই প্রক্রিয়া চলমান। উদাহরণস্বরূপ, সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য সংবাদপত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অপরিহার্য। গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ, বিরোধী দলের সদস্য এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীদের অবশ্যই তাদের মতামত প্রকাশ করার, প্রতিশোধ নেয়ার ভয় ছাড়াই পরিবর্তনের পক্ষে কাজ করার সক্ষমতা থাকতে হবে। ভিন্নমত ও বিরোধী মতের কথা শুনতে হবে এবং সম্মান করতে হবে। শক্তিশালী গণতন্ত্র নিয়মিত এবং প্রাণবন্ত বিতর্কের মাধ্যমেই বিকাশ লাভ করে।
মানবজমিন: বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্র প্রচারে কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্র। বন্ধু দেশ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহ, সুশাসন ইত্যাদির বিকাশে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে পারে? আপনার দৃষ্টিতে এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রধান সমস্যাগুলো কি কি?
আর্ল মিলার: খুব চমৎকার প্রশ্ন করেছেন। আমরা গণতন্ত্র, মানবাধিকার, শাসন পদ্ধতি নিয়ে আমাদের দূতাবাস এবং অন্যান্য (কূটনৈতিক) চ্যানেলের মাধ্যমে দুই দেশের রাজধানী এবং দৈনন্দিন কাজের মধ্য থেকে নিয়মিতভাবে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা করে থাকি। আমরা আলোচনা করি কীভাবে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো আইনের শাসনকে এগিয়ে নিতে পারে এবং কীভাবে দায়মুক্তির সংস্কৃতি যেকোনো দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে দেয়। আমাদের এখানে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং বিনিময় কর্মসূচি রয়েছে যেগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশি স্কলার, সাংবাদিক এবং সরকারি কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রে পরিদর্শন করে দেখেন কীভাবে আমরা গণতান্ত্রিক এবং শাসন পদ্ধতির চ্যালেঞ্জগুলোকে মোকাবিলা করি। আমাদের ইতিহাসে (এমনকি আমাদের অতি সামপ্রতিক ইতিহাসে) যুক্তরাষ্ট্র কখনো কখনো গণতন্ত্র এবং সুশাসনের জন্য লড়াই করেছে। প্রেসিডেন্ট বাইডেন দেশে এবং বিদেশে গণতন্ত্রকে স্বাভাবিক অবস্থায় প্রত্যাবর্তন করা, টিকিয়ে রাখা এবং ক্রমবর্ধমান করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমার দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্রে সব প্রতিভাবানদের দ্বারা তৈরি ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ করার দুর্দান্ত এক সরকার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে এটিও একেবারে নিখুঁত বা নির্ভুল নয়। আমরা সে দাবিও করি না। কিন্তু, আমরা সেসব নিয়ে কাজ করছি, সবসময় কাজ করছি। বন্ধু হিসেবে আরও নিখুঁত ‘ইউনিয়ন’ গড়তে যুক্তরাষ্ট্র (বাংলাদেশের সঙ্গে) নিজেদের ওইসব অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পারে।
মানবজমিন: ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিতে বাংলাদেশের (অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা সামরিক) ভূমিকাকে কীভাবে দেখেন? গুজব রয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ভূ-রাজনৈতিক বা কৌশলগত কারণে বাংলাদেশকে অন্য কারও চোখে দেখে…
আর্ল মিলার: যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি কাজ করে, অবশ্যই অন্য কারও দৃষ্টিতে দেখে না।
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র এই সময়ের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার জন্য অংশীদার, মিত্র এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে এক করছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে করোনা, জলবায়ু পরিবর্তন, উদীয়মান প্রযুক্তি, নিয়মতান্ত্রিক পথে বাণিজ্য ও অর্থনীতি, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামোতে বিনিয়োগ এবং সন্ত্রাস দমনে আধুনিক পদ্ধতি। এই সমস্ত ক্ষেত্র ছাড়াও অন্যান্য ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ একটি মূল অংশীদার।
আমাদের আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো শক্তিশালী অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করার জন্য সবসময়ই আশাবাদী যাতে সমস্যাগুলো খোলাখুলিভাবে মোকাবিলা করা যায়; নিয়মগুলো স্বচ্ছ এবং ন্যায্যভাবে প্রয়োগ করা হয়; পণ্য, ধারণা এবং মানুষ ভূমি, সাইবার স্পেস, এবং খোলা সমুদ্রে অবাধে বিচরণ করে।

ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত আর্ল আর মিলার তিন বছরের বেশি সময় দায়িত্ব পালন শেষে বাংলাদেশ থেকে বিদায় নিচ্ছেন। বিদায়ের আগমুহূর্তে মানবজমিনকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে নানা প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের শেষ পর্ব:
মানবজমিন: দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে কীভাবে দেখেন?
আর্ল মিলার: দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ইতিবাচক প্রভাব বাড়ানোতেই আমার মনোযোগ। চীনের সঙ্গে আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা সেখানেই, যেখানে না করলেই নয়। চীনের সঙ্গে আমরা সেখানেই একসঙ্গে কাজ করি, যেখানে কিছু করার সুযোগ থাকে।
প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করেছিলেন। আমি মনে করি, সেটা এই অঞ্চলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। প্রেসিডেন্ট কেনেডি বলেছিলেন, একটি শান্তিপূর্ণ পৃথিবীর জন্য মুক্ত ও স্বাধীন রাষ্ট্রের জনগণ তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ এবং তাদের নিজেদের ব্যবস্থা বেছে নেয়ার বিষয়ে স্বাধীন, যতক্ষণ না তা অন্যের স্বাধীনতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
মানবজমিন:শিগগিরই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন নিয়ে আপনি কি আশাবাদী? এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থান কি?
আর্ল মিলার: যুক্তরাষ্ট্র এটা বুঝে যে, ৯ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয়দান বাংলাদেশের সরকার এবং জনগণের উপর বিশাল বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা বাংলাদেশের উদারতা এবং মানবতার প্রশংসা করি। আপনারা বিশ্বে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

রাষ্ট্রদূত হিসেবে আমার শীর্ষ অগ্রাধিকারের একটি ছিল- রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটে বাংলাদেশকে সাহায্য করা। সংকট মোকাবিলায় এখন পর্যন্ত মানবিক সহায়তার দিক থেকে অবদান রাখার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র অগ্রণী ভূমিকায় রয়েছে। ২০১৭ সালের আগস্টে সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে আমরা ১.৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি সহায়তা প্রদান করেছি। ওই সহায়তার বেশির ভাগই খরচ করা হয়েছে বাংলাদেশের ‘হোস্ট কমিউনিটি’র ৪ লাখ ৭২ হাজারেরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে ঘোষিত অতিরিক্ত মানবিক সহায়তার পরিমাণ প্রায় ১৮০ মিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে ১৫৮ মিলিয়ন ডলারই বরাদ্দ করা হয় বাংলাদেশের কর্মসূচির জন্য।
সংকটের শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র আহ্বান জানিয়ে আসছে: রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষেরা যেন স্বেচ্ছায়, নিরাপদে, মর্যাদাপূর্ণভাবে ও স্থায়ীভাবে প্রত্যাবর্তন করতে পারেন এবং এই দুর্বল জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য দায়ীদের যেন জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়। বার্মার (মিয়ানমারের) সামপ্রতিক ঘটনাগুলো এসব ক্ষেত্রে গুরুতর চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
বাস্তুচ্যুতির মূল কারণগুলোর সমাধান করা হয়নি। বার্মায় সামরিক অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেয়া ব্যক্তিদের অনেকেই রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নৃশংসতার জন্য দায়ী। এই নির্যাতিত জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করার জন্য আমরা বাংলাদেশের প্রশংসা করি, বিশেষ করে এই সময়ে যখন তাদের প্রতি ঝুঁকি বেড়েছে।
মানবজমিন: জিএসপি সুবিধা কেন প্রত্যাহার করা হয়েছিল এবং এটি ফিরে পেতে বাংলাদেশের কি করা দরকার? বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়া কি মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশাধিকারকে প্রভাবিত করবে?
আর্ল মিলার: জিএসপি সুবিধা ফিরে পেতে, বাংলাদেশকে অবশ্যই মার্কিন কংগ্রেসের আইনে বর্ণিত শ্রমিকদের অধিকার সহ জিএসপি পাওয়ার যোগ্য হওয়ার শর্তাবলী পূরণ করতে হবে।
জিএসপি লাভের যোগ্যতা নির্ধারণ করে কংগ্রেস এবং বাংলাদেশ বর্তমানে জিএসপি সুবিধা ফিরে পাওয়ার মানদণ্ড পূরণ করছে না। এই মানদণ্ড- সমস্ত জিএসপি সুবিধাভোগী দেশের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য যেগুলোর মধ্যে রয়েছে: আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শ্রম অধিকার রক্ষা এবং বাজারে মার্কিন পণ্যের প্রবেশাধিকার ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ রক্ষা অধিকারের মতো বিষয়গুলো।
বাংলাদেশে শ্রম অধিকার রক্ষার জন্য কী কী পরিবর্তন প্রয়োজন তা নিয়ে আলোচনা করতে আমাদের দুই দেশের সরকার প্রতি বছর বেশ কয়েকবার বৈঠক করে এবং সেটা অব্যাহত থাকবে। বাংলাদেশ সরকার আমাদের বলছে যে, আসছে বছর বা তারপর শ্রম আইনের আরও সংশোধনী আনা হবে। আমাদের বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা জিএসপি পাওয়ার মানদণ্ড পূরণ করার নির্দেশনা দিতে প্রস্তুত।
আমি মনে করি, এটা মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, মার্কিন আইন বেশির ভাগ টেক্সটাইল, গার্মেন্টস, ফুটওয়্যার এবং লেদার অ্যাপারেলের ক্ষেত্রে জিএসপি সুবিধা দেয়া থেকে বিরত রাখে। সেটা যেকোনো দেশের ক্ষেত্রেই এবং তার পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা কম।
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) মর্যাদা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ মার্কিন বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলবে না। কিছু এলডিসিভুক্ত দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে শুল্কমুক্ত বা কম শুল্কে পণ্য আমদানি করা হয়। তবে ওই যোগ্যতা অর্জনের জন্য দেশটিকে অবশ্যই জিএসপি পাওয়ার যোগ্য হতে হবে।
মানবজমিন: সামপ্রতিক মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত কি মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদে দুই দেশের সম্পর্ককে প্রভাবিত করবে?
আর্ল মিলার: আমাদের আলোচনায় এসেছে এমন সব বিষয়েই আমাদের সম্পর্ক মজবুত এবং তা ক্রমবর্ধমান। মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদে তা শক্তিশালী থেকে আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠতে থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বের গুরুত্ব অনেক। আমরা বিশ্বাস করি গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রতি অভিন্ন প্রতিশ্রুতি শক্তিশালী অংশীদারিত্বের ভিত্তি। মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং নির্যাতনের বিরুদ্ধে জবাবদিহিতা নিশ্চিতে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তা বিশ্বের যেখানেই বা যখনই ঘটুক না কেন।
মানবজমিন: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগে আপনি বাংলাদেশে এসেছিলেন। ওই নির্বাচনের প্রসঙ্গে আপনি বলেছিলেন, ‘আমরা আশা করি আগামী নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, বিশ্বাসযোগ্য এবং শান্তিপূর্ণ হবে।’ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কি? যুক্তরাষ্ট্র এখানে কি ধরনের নির্বাচন দেখতে চায়?
আর্ল মিলার: যুক্তরাষ্ট্র অবাধ, সুষ্ঠু, বিশ্বাসযোগ্য, পুরোপুরি অংশগ্রহণমূলক এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচনকে সমর্থন করে যা জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটায়। প্রত্যেক যোগ্য প্রার্থীর প্রচারণার সমান সুযোগ থাকা উচিত। প্রত্যেক যোগ্য ভোটারের নির্বাচনে সমান সুযোগ থাকতে হবে। নিজ নিজ রাজনৈতিক দল বা আদর্শ নির্বিশেষে প্রত্যেকেরই শান্তিপূর্ণ ও দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত। সব পক্ষকে অবশ্যই সহিংসতা এড়াতে এবং তার নিন্দা জানাতে হবে। সহিংসতা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। এতে তাদেরই লাভ হয় যারা গণতন্ত্রকে ক্ষুণ্ন করতে চায়।
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের কোনো বিশেষ দলকে সমর্থন করে না; আমরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সমর্থন করি এবং বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের পছন্দকে গুরুত্ব দেই।
গণতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পারস্পরিক সহনশীলতা। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক দলগুলো কর্তৃক নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের বৈধ অংশগ্রহণকারী হিসেবে মেনে নেয়া এবং পরবর্তী সরকারের সম্ভাব্য নেতা হিসেবে নির্বাচন করা। মানবজমিন

ট্যাগ:
Situs Streaming JAV