দীর্ঘ প্রায় ৪২ বছর পর যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে দেশে ফিরে গেলেন বাউল দাদা খ্যাত সানোয়ার আহমেদ (ভিডিও সহ)
সাখাওয়াত হোসেন সেলিম, ইউএসএনিউজঅনলাইন.কম : দীর্ঘ প্রায় ৪২ বছর পর যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে বাংলাদেশে ফিরে গেলেন বাউল দাদা খ্যাত সানোয়ার আহমেদ। জীবনের শেষ সময়টুকু বাংলাদেশে পরিবারের সাথে কাটাতে তিনি দেশে ফিরে যান। স্থানীয় সময় ২ জুন বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা ২০ মিনিটে অ্যামিরাটর্সের একটি বিমানে জেএফকে থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রহওনা দেন বাউল দাদা খ্যাত অশীতিপর সানোয়ার আহমেদ।
নিউইয়র্কে বাংলাদেশী অধ্যুষিত জ্যাকসন হাইটসের ৭৩ স্টিটে ব্যস্ত এলাকায় বহু বছর ধরে রাস্তার ধারে ঝালমুড়ি আর পান বিক্রি করে সবার নজর কাড়েন বাউল দাদা। রোদ-বৃষ্টি-শীত-বরফ উপেক্ষা করে বছরের পর বছর বাংলাদেশ প্লাজার সামনের জায়গায় সরব অবস্থান ছিল বাউল দাদার। এই প্রবাসে তিন-চার ফুট পরিসরের এই খোলা জায়গাটিই যেন ছিল বাউল দাদার আপন আস্তানা। তবে তার এই প্রিয় স্থানটিতে সব সময় নিরাপদ-নিশ্চিন্তে থাকতে পারেনেনি তিনি। তার জন্য পোড়াতে হয়েছে অনেক কাঠ খোড়। কখনও কখনও তার ওপর নেমে আসে প্রশাসনের খড়গ। স্বদেশীরা তার প্রতিপক্ষ হন কেউ কেউ। ফুটপাথ থেকে বারবার উচ্ছেদের শিকার হন তিনি। ঝালমুড়ি ও পান বিক্রির সরঞ্জাম কেড়ে নিয়ে যায় প্রশাসনের লোকজন। কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ, নাগরিক অধিকার আন্দোলনের কর্মীদের সহায়তায় আবার তা ফিরেও পান তিনি। অনেক ঝড়-ঝাপটা উপেক্ষা করেও ৭৩ স্ট্রিটের ওই জায়গাটুকু আঁকড়ে ধরে ছিলেন বাউল দাদা। দীর্ঘ সময় ধরে ৭৩ স্ট্রিটে ঝাল মুড়ি আর পান বিক্রি করেন। কিন্তু করোনা মহামারির কারণে এ ব্যবসায় আর টিকে থাকা সম্ভব হয়ে ওঠেনি তার। করোনা আর অসুস্থতার কারণে দেশে যাওয়ার আগ পর্যন্ত করেছেন অবসর জীবন-যাপন।
যুক্তরাষ্ট্র অভিবাসী হয়েই রেস্টুরেন্টে ডিশ ওয়াশার আর শেফের কাজ করেন দীর্ঘ সময়। বৃদ্ধ বয়সে কেউ কাজে রাখতে চায় না। তাই বাধ্য হয়েই রোদ-বৃষ্টি-ঝড়, প্রচন্ড গরম ও ঠান্ডার মধ্যেও সপ্তাহে সাত দিন ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে ঝালমুড়ি ও পান বিক্রির ব্যবসা চালিয়ে যান।
বাউল দাদা খ্যাত সানোয়ার আহমেদ জানান, দীর্ঘ ৪২ বছরের একাকী প্রবাস জীবনের অবসান ঘটিয়ে স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। যুবক বয়সে উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে তিনি আমেরিকায় এসেছিলেন। সে সময় কাজকর্মেরও সুযোগ ছিলো, পেয়েছিলেন ওয়ার্ক পারমিটও। কিন্তু পাননি এদেশে বসবাসের আইনি অধিকার। রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছিলেন, তাতেও সফল হননি। শেষ জীবনে এসে ওয়ার্ক পারমিটও হারিয়েছেন আইনি জটিলতায় পড়ে। যে সোনার হরিণের জন্য এসেছিলেন সেটির নাগাল না পেয়ে অনেকটা মানবেতর জীবন যাপনকে বেছে নিতে হয় তাকে। যে আমেরিকান স্বপ্নের জন্য স্ত্রী, সন্তানকে ছেড়ে আসলেন, গ্রীণকার্ড নামক সেই সোনার হরিণ না পেয়েই তাকে ফিরতে হলো নিজ দেশে। বললেন, এদেশে বেওয়ারিশভাবে মৃত্যুবরণ করতে চান না বাউল দাদা। জীবনের শেষ সময়টুকু স্ত্রী ও সন্তানদের সাথে কাটাতে চান। তার দেশে ফেরাসহ সব বিষয়ে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে মানবাধিকার সংগঠন ড্রাম।
সানোয়ার আহমেদ ওরফে বাউল দাদার জন্ম সিলেটের মোলভী বাজারের দক্ষিণ বালিগ্রামে। বিয়ে করেছিলেন ১৯৭১ সালে। প্রায় ৪২ বছর আগে দালাল ধরে ভ্রমণ ভিসায় আমেরিকায় এসেছিলেন। সেই সময় দালালকে তিনি তিন লাখ টাকা দিয়েছিলেন। দেশে রেখে এসেছিলেন স্ত্রী ছায়া বেগম, দুই মেয়ে ছানারা বেগম, রায়না বেগম, ছেলে ছোবান মিয়া, পারভেজ মিয়া এবং মজনু মিয়া। এর মধ্যে ছেলে মজনু মিয়া নিখোঁজ রয়েছেন। এক মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন। ২০১১ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় বড় মেয়ের স্বামী মারা যায়। সেই সময় তিনি অনুমতি নিয়ে বাংলাদেশে গিয়েছিলেন। ৪২ বছরে এই একবারই স্ত্রী এবং সন্তানদের দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। দেশে ছিলেন সাড়ে ৪ মাস। আবারো চলে আসেন আমেরিকায়। পরে ছোট মেয়ের স্বামীও মারা যায়।
অনেক দিন পর্যন্ত ওয়ার্ক পারমিট ছিলো সানোয়ার আহমেদের, কিন্তু কয়েক বছর আগে তাও বাতিল হয়ে যায়। সিএসএস লুলাকে আবেদন করে অনেকে গ্রীণ কার্ড পেলেও তার ভাগ্যে তা জোটেনি। আবার কারো কারো পরামর্শে রাজনৈতিক আশ্রয়ও চেয়েছিলেন, কিন্তু তাতেও সফল হননি। বাউল দাদা জানান, ম্যানহাটানের ৬ স্ট্রিটের ক্যালকাটা রেস্টুরেন্ট, গান্ধি রেস্টুরেন্ট, রক ফেলার সেন্টারের বোম্বে মাসালায় শেফ হিসাবে কাজ করেছেন। পেনসিলভেনিয়া এবং মিনিসোটায় গান্ধিমহল রেস্টুরেন্টেও শেফের কাজ করেন তিনি। ১২ বছর আগে নিউইয়র্কে চলে আসেন। কাজ খুঁজেছেন, কিন্তু বয়সের কারণে কেউ তাকে কাজ দেয়নি। অবশেষে সংসার এবং জীবন চালাতে জ্যাকসন হাইটসের ফুটপাথে ঝালমুড়ি বিক্রি শুরু করেন সবার প্রিয় বাউল দাদা। জ্যাকসন হাইটসেরই একটি বেসমেন্টে থাকতেন আরো কয়েকজনের সাথে শেয়ার করে। পরে করোনা শুরুর কিছু দিন আগে চলে যান ওজনপার্কে। দেশে যাওয়ার আগ পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন।
তিনি জানান, এখন এই বুড়ো বয়সে খালি হাতে দেশে চলে যেতে হচ্ছে। দেশের বাড়িতে থাকার জন্য শুধু একটি ঘর করেছেন। তবে অন্যদের সহযোগিতায় পুরুষ ও মহিলাদের জন্য দুটো পৃথক মসজিদ তৈরী করেছেন।
আহমেদ সারোয়ারের দেশে ফিরে যাওয়ার সব দায়িত্ব নিয়েছেন মানবাধিকার সংগঠন ড্রামের সাংগঠনিক পরিচালক কাজী ফৌজিয়া। তিনি জানান, বাউল দাদা জীবনের শেষ সময়টুকু বাংলাদেশে নিজ পরিবারের সাথে কাটাতে চান। তাই আমরাও তাকে সহযোগিতার সিদ্ধান্ত নেই।
বাউল দাদার বিদায়ের খবর শুনে অনেকেই আবেগপ্রবণ হয়ে উঠেন। তার সাথে দেখা করে তাদের সহানুভূতি জানিয়েছেন। দেশে যাওয়ার প্রাক্কালে ১ জুন বিকেলে নিউইয়র্কে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল ড. মো. মনিরুল ইসলামের সাথে বাউল দাদার বিদায়ী সাক্ষাত হয়। নিউইয়র্ক বাংলাদেশ কনস্যুলেট ভবনে বাউল দাদাকে আপ্যায়িত করা হয়। এসময় ইউএসএনিউজঅনলাইন.কম সম্পাদক ও নিউজ২৪ইউএসএ.কম’র প্রধান সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন সেলিম সহ কনস্যুলেটের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এদিন বিকেলে বাউল দাদাকে নিউইয়র্কে ব্রঙ্কসের ‘রূপসী বাংলা ফ্যাশন হাউস’ এর স্বত্ত্বাধিকারী মো. জমির উদ্দিন হাওলাদার উপহার সামগ্রী প্রদান করেন।
এদিকে, বাউল দাদা দেশে যাওয়ার আগে সৃষ্টি করে যান এক ইতিহাস। ব্রুকলিনের একটি মিউজিয়াম তার স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়। বাউল দাদার ব্যবহৃত খাটসহ অন্যান্য জিনিসপত্র স্থান পেয়েছে ব্রুকলিনের ফুড এ্যান্ড ড্রিংকস মিউজিয়ামে। এগুলো সেখানেই সংরক্ষিত রয়েছে। জানা গেছে, মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ জিনিষপত্রগুলো তার কাছ থেকে গ্রহণ করে মিউজিয়ামে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে। সে সময় মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ বাউল দাদাকে নিয়ে একটি অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করে।
কাজী ফৌজিয়া জানান, বাউল দাদার জীবনী নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি তৈরী করেছেন ব্রিটেন থেকে আসা মোহাম্মদ আলিয়া রসম। দীর্ঘদিন ধরেই ব্রিটেনে ইমিগ্রান্ট বাঙালিদের কৃষ্টি-কালচার এবং জীবনী নিয়ে কাজ করা আলিয়া রসম কয়েক বছর আগে আমেরিকায় এসেছিলেন। তখন তিনি বাউল দাদাকে নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি তৈরী করেন। ওই ডকুমেন্টারী ব্রুকলিনের মিউজিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত হয়।
এদিকে সানোয়ার আহমেদ ওরফে বাউল দাদা দেশে ফিরে যাওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রে সর্বশেষ মিডিয়ার মুখোমুখি হন ৩১ মে, ২০২২। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় গণমাধ্যম ইউএসএনিউজঅনলাইন.কম’র টকশো ‘ইউএসএনিউজঅনলাইন জার্নালে (৮৪৫ তম পর্ব, ৩১ মে, ২০২২) তা সরাসরি সম্প্রচারিত হয়। ইউএসএনিউজঅনলাইন.কম সম্পাদক এবং নিউজ২৪ইউএসএ.কম’র প্রধান সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন সেলিমের উপস্থাপনায় এ অনুষ্ঠানে বাউল দাদা তার জীবনের না বলা অনেক কথাই বলে যান।
এদিকে দেশে ফিরে যাওয়ার প্রাক্কালে ড্রামের কাজী ফৌজিয়া ২ জুন বৃহস্পতিবার সকালে জেএফকে বিমান বন্দরে বাউল দাদাকে বিদায় জানান।
- নিউইয়র্কে গোল্ডেন এইজ হোম কেয়ারের ইফতার মাহফিল
- নিউইয়র্ক বাংলাদেশি আমেরিকান লায়ন্স ক্লাবের ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত
- নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ৭ মার্চ ঘড়ির কাঁটা এক ঘন্টা এগিয়ে যাবে
- নিউইয়র্কে জ্যামাইকা বাংলাদেশ ফ্রেন্ডস সোসাইটির বার্ষিক ইফতার ও দোয়া মাহফিল
- Radwan Chowdhury Announces Candidacy for Montgomery County Council At-Large, Launches “Five-Pillar Blueprint” for Accountable Governance.
- New York Attorney General James Reminds New Yorkers of SNAP Work Requirements
- নিউইয়র্কে ডিজিটাল ওয়ান ট্র্যাভেলস এবং বাংলা ট্র্যাভেলস এর ইফতার মাহফিল
- রূপসী চাঁদপুর ফাউন্ডেশন নিউইয়র্ক ইনক’র ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত








