Thursday, 19 March 2026 |
শিরোনাম
নারীর ক্ষমতায়ন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ অঙ্গীকারবদ্ধ : ড. খলিলুর রহমান নিইউয়র্কে টাইমস স্কয়ারের মঙ্গল শোভাযাত্রায় যোগ দিচ্ছেন ম্যানহাটান বরো প্রেসিডেন্ট ব্র্যাড হোয়েলম্যান নিউইয়র্কে স্ট্রিট ভেন্ডরদের জন্য নতুন আইন কার্যকর; জেল শাস্তি বাতিল, আরোপ করা হবে জরিমানা New York Attorney General James Leads Bipartisan Coalition Suing Predatory Lender OneMain for Scheme to Trap Consumers in Debt নিউইয়র্ক স্টেট সিনেট হাউসে ‘বাংলাদেশ ডে’ উদযাপন ২৩ মার্চ : আহ্বায়ক কমিটি গঠন বাংলাদেশে আওয়ামীলীগসহ সকল রাজনৈতিক দলের স্বাভাবিক রাজনীতির পরিবেশ সৃষ্টি করার দাবি নিউজার্সি স্টেট আওয়ামী লীগের নিউইয়র্কে ‘অল কাউন্টি হেলথকেয়ার গ্রুপ’র বার্ষিক ইন্টারফেইথ ইফতার পার্টি HUSBAND CHARGED WITH MURDER AND DISMEMBERMENT OF WIFE WHOSE REMAINS WERE FOUND IN SEPARATE LOCATIONS ALONG BROOKVILLE BLVD AND CROSS BAY BLVD নিউইয়র্কে জ্যাকসন হাইটসের গ্রাফিক্স ওয়ার্ল্ডে মাসব্যাপী ইফতার আয়োজন নিউইর্য়কে এনওয়াইপিডি মুসলিম অফিসার সোসাইটির বার্ষিক ইফতার ডিনার ও অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠিত
সব ক্যাটাগরি

অন্যরকম ঈদ

অনলাইন ডেস্ক পঠিত: 64 বার

প্রকাশিত: August 8, 2013 | 2:57 PM

মাহবুবা চৌধুরী: আমার শৈশব কেটেছে আরমানীটোলায়। আব্বার প্রেস এবং পাবলিকেশন্স ব্যবসা ছিল ইসলামপুরে। ফার্মগেটে আব্বা এবং চাচার বেশ কয়েকটা বাড়ি ছিল। সেগুলো ভাড়া দিয়ে আব্বা থাকতেন পুরনো ঢাকায়। আমাদের বাড়িটা ছিল সাত কামরার। একদিকে পাঁচ কামরা, মাঝখানে বিরাট উঠোন, অন্যপাশে দুই কামরা। ও দুটো বৈঠকখানা হিসেবেই ব্যবহার হতো, আর বাকি পাঁচ কামরা শোবার এবং খাবার ঘর। মাঝখানের উঠোনটা ছিল বিশাল। ওটাকে ‘উঠোন না বলে মাঠ বলাই ভালো। উঠোনের একপাশে ফুলের বাগান অন্যপাশে প্রকাণ্ড আম গাছ। স্কুল ছুটির পর খেলায় মেতে উঠতাম ক্রিকেট, ফুটবল, এক্কাদোক্কা, বৌছি, কোনটাই বাদ যেত না। বাসার সামনে আরমানীটোলা মাঠ। মাঠে কত রকম আয়োজন। কোথাও জাদু, কোথাও শারীরিক কসরত, আবার কোথাও চাদর পেতে হাড়গোড় সাজিয়ে ব্যথানাশক তেল, মলম বিক্রি। মানুষ ভিড় করে দেখছে, কেউ দু’চার পয়সা দিচ্ছে, কেউবা তাচ্ছিল্য ভরে চলে যাচ্ছে। অবসর সময়ে যখন ভাবী মনে হয় এ যেন সত্যি নয়Ñ স্বপ্ন।

আমাদের পরিবারে ঈদ উৎসব খুবই জাঁকজমকের সঙ্গে পালন করা হতো। শবেবরাতের পর থেকেই শুরু হয়ে যেত ঈদ আয়োজন। বাড়ি ঘরে রঙ করা, ঘরদোর ধোয়া-মোছা, নতুন আসবাবপত্র কেনা, আরও কত কি। প্রথম রোজা থেকেই শুরু হতো ঈদের কেনাকাটা। আমরা সব সময় নিউমার্কেটে কেনাকাটা করতাম। আব্বা ছোটদের নিয়ে একদিন যেতেন জামা-কাপড় কিনতে আর একদিন জুতো। কাপড় জামা এবং জুতো আলমারিতে তুলে রাখতাম, কাউকে দেখাতাম না। সেহরিতে উঠে জুতো পরে বিছানার ওপর দিয়ে হাঁটতাম। মাটিতে রাখলে পাছে ময়লা হয়ে যায়। আব্বা ছিলেন ভীষণ ভোজন রসিক। নিজে খুব একটা খেতেন না। কিন্তু অন্যকে খাওয়াতে পছন্দ করতেন। বাজারের সেরা মাছ- মাংস কেনা ছিল তার শখ। ইফতারে টেবিল ভর্তি খাবার না হলে আব্বার মন ভরতো না। মা তৈরি করতেন নানা পদের ইফতার, আব্বা কাজের ছেলেটাকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে যেতেন চকবাজারে। নিয়ে আসতেন ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সব ইফতার। টেবিলের এমাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত শুধু ইফতার আর ইফতার। রাতে কোনদিনই ভাত খাওয়া হতো না। ভাত খেতাম শুধু সেহরিতে। আমাদের পরিবারে ধর্মীয় মূল্যবোধগুলো ছোটবেলা থেকেই শিক্ষা দেয়া হতো। সে কারণে বাচ্চারা সাত বছর বয়স থেকেই রোজা রাখা, কোরআন শরীফ পড়া, নামাজ পড়ায় অভ্যস্ত হয়ে উঠতো। আমরা দশ ভাই-বোন। সাত বোন তিন ভাই। দু’বোন আমাদের চেয়ে অনেক বড়। আমাদের যত আবদার সবই ছিল ওদের কাছে। রোজার শুরু থেকেই দিন গুনতাম কবে ওরা আসবে। বড় দুলাভাই ছিলেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা আর মেজো দুলাভাই ব্যাংকার। দু’জনের পোস্টিংই ছিল ঢাকার বাইরে। দুই দুলাভাই-ই রোজার ঈদ করতেন ঢাকায়। বড় বোনদের ছেলেমেয়েরা বয়সে আমাদের কাছাকাছি। তাই ওরা এলে সারাবাড়িতে আনন্দের বন্যা বয়ে যেত। রোজার শুরু থেকেই দিন গুনতে শুরু করতাম। ওরা আসার পর প্রতিটা দিনই রঙিন।
ঈদের আগের দিন প্রায় সারারাতই জেগে থাকতাম। ঈদের চাঁদ ওঠার সাথে সাথেই আব্বা কাজের ছেলেটাকে নিয়ে বাজারে চলে যেতেন। মাঝে-মধ্যে আমরা ছোটরা আব্বার সঙ্গে বাজারে যেতাম। আহা সেকি আনন্দ। মাংসের দোকানের সামনে উপচেপড়া ভিড়, সারা বাজার লোকে লোকারণ্য। সবার মুখেই হাসি। যেন সবাই সবার আপনজন। আব্বা বাজার থেকে ফিরলে মা সারারাত ধরে রান্না করতেন। বড় বোনরা কাবাব বানাতে বসে যেত, আমরা ছোটরাও হাত লাগাতাম যদি দু’ একটা বানানো যায়। রেডিওতে বাজতো ঈদের গান। আজকাল রেডিও এবং টিভি চ্যানেলে ঈদের এতো অনুষ্ঠান হয় তাতে ঈদ এবং ঈদের চাঁদের কথা তেমন একটা থাকে না। বড় বোনেরা মেহেদী পরিয়ে দিতো, আমরা দু’হাত রাঙিয়ে নিতাম মেহদী রঙে। মা’র রান্না শেষ হতে হতে ভোর চারটা হয়ে যেতো। আমরা সবাই জেগে থাকতাম। রান্না শেষ করে মা ঘণ্টাখানেক ঘুমিয়ে নিতেন, সেই সঙ্গে আমরাও। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে জেগে উঠতাম। যার আগে ঘুম ভাঙতো সে অন্যদের জাগিয়ে দিতÑ ‘তাড়াতাড়ি ওঠো আজ না ঈদ।’
কার আগে কে গোসল করবেÑ তা নিয়েও চলতো প্রতিযোগিতা। বড় দুই বোন আমাদের সাজাতে বসে যেত। জামা-জুতো পরিয়ে আমাদের রেডি করে দিয়ে নিজেরা তৈরি হতো। ছোটরা আব্বার সঙ্গে ঈদের নামাজে যেতাম। আরমানীটোলা মাঠে বিশাল ঈদের জামাত হতো। অবাক হয়ে দেখতাম আর ভাবতাম আহা প্রতিদিন যদি ঈদ হতো! নামাজ শেষে রঙবেরঙের বেলুন কিনে বাসায় ফিরতাম।
বাসায় ফিরে দেখতাম মা এবং বড় বোনেরা নতুন শাড়ি পরে সেজেগুজে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। মায়ের হাতের মুরগি-বিরিয়ানী খাসির রেজালা, টিকিয়া আর জর্দা যেন বেহেস্তের নিয়ামত। মা খুব ভালো রান্না করতেন। আত্মীয়-স্বজন বন্ধু- বান্ধবের মধ্যে তার রান্নার সুনাম ছিল।
একে-একে মেহমান আসা শুরু হতো সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত, চলতো খাওয়া-দাওয়া আর হাসি ঠাট্টা। মা সবাইকে হাসিমুখে খাওয়া তুলে দিচ্ছেন, আব্বা সব তদারকি করছেন, মেহমানদারিতে যেন কোন ক্লান্তি নেই তাদের। সন্ধ্যার পর ফার্মগেটে চাচার বাসায় বেড়াতে যেতাম। এ বাড়ি ও বাড়ি ঘুরে অনেক রাতে বাসায় ফিরতাম। ঈদের পরের ক’টাদিন দাওয়াত খাওয়া, সিনেমা দেখা আর আইসক্রিম খেয়েই কেটে যেত।
গত পনেরো বছর ঈদ হয় আমার বাড়িতে। প্রায় শ’খানেক মানুষের আয়োজন। সারাদিন খাওয়া-দাওয়া, লটারি, ঈদি চুুটিয়ে আড্ডা। এ না হলে যেন ঈদ পরিপূর্ণ নয়। ঈদের পরের দিন আব্বার বাসায় বিরাট আয়োজন। পরের সাতদিন প্রতিদিনই ভাইবোন কারো না কারো বাসায় দাওয়াত। ঈদের কথা ভাবলে এমনই একটা চিত্র চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
প্রথম ধাক্কা খেলাম দু’হাজার দশ সালে। ছেলে ব্যারিস্টারিতে চান্স পেয়েছে। রোজার মধ্যেই ইংল্যান্ডের নিউ ক্যাসেল যেতে হলো। একমাত্র সন্তান হলে যা হয়Ñ ছেলে আমাদের ছেড়ে থাকতে পারে না, আমরাও না। ছেলের সাথে আমরাও গেলাম নিউ ক্যাসেলে। রোজার মাস বোঝার কোন উপায় নেই। ঢাকার মতো কোথাও নেই ইফতারের পসরা, নেই কোন সংযম। ঈদ যতই ঘনিয়ে আসছে বুকের ভেতরটা কেমন হু হু করছে। মতিউরের বন্ধু মাহতাব ভাই নিউ ক্যাসেলে থাকেন। বড় ব্যবসায়ী। বললেন আপনারা মুসাফির, ঈদে কিছু করার দরকার নেই, সারাদিন আমার বাসায়ই ঈদ করবেন। ঈদের দিন আমার বাসায় কিছু হবে নাÑ এ তো ভাবাই যায় না। বললাম আপনার দাওয়াত কবুল করলাম, তবে দিনে নয়, রাতে। দুপুরে আমার বাসায় খাবেন। মাহতাব ভাই অবাক হয়ে বললেনÑ বলেন কি! মাত্র ক’দিন আগে এদেশে এসেছেন, কেন মিছে ঝামেলা করবেন। বললাম, এ আর কি ঝামেলা। দেশে তো এর দশগুণ ঝামেলা করি। ঝামেলা না করলে আমার যে মোটেই ভালো লাগে না। ঈদের আগের দিন সুপার মার্কেটে ঘুরছি, মোটে সন্ধ্যা হয়েছে। ছোটবোন শিরীন লন্ডন থেকে ফোন করলোÑ আগামীকাল ঈদ, এই মাত্র বাংলা টিভিতে দেখলাম। ও বললো আপা আমার এখানে চলে আস, দু’বোন মিলে একসঙ্গে ঈদ করবো। নিউ ক্যাসেল থেকে লন্ডন যেতে ট্রেনে সাড়ে তিন ঘণ্টা আর ফিরতে সাড়ে তিন ঘণ্টা। মোট সাত ঘণ্টা। স্টেশন থেকে ওর বাসা আধাঘণ্টা আবার ফিরতে আধাঘণ্টা। বললাম আট ঘণ্টাতো রাস্তায়ই চলে যাবে, ঈদ করবো কখন? ঢাকার ঈদের কথা মনে করে দু’জনেই নস্টালজিক হয়ে গেলাম। শিরীন ঈদ মোবারক বলে টেলিফোন রাখতেই বুক ফেটে কান্না এলো। বাসায় ফিরে রান্নাঘরে চলে গেলাম। রান্নার কাজ কিছুটা এগিয়ে রাখতে হবে। মতিউর আর মিশু ঘর গোছাতে লেগে গেল। ফজরের নামাজ পড়েই রান্না শুরু করলাম। সহজ রান্নাই বেছে নিলাম। পোলাও, ডিমের কোর্মা, মুরগি ভুনা, বাঁধাকপি মুরগি, সেমাই আর আলুর বাহারি চাটনি। মিশুর বন্ধু সাজিদ আপাতত আমার বাসায়ই উঠেছে। সেও ব্যারিস্টারি পড়ছে। সাড়ে আটটার দিকে মাহতাব ভাই এলেন গাড়ি নিয়ে। ওদের তিনজনকে নামাজে নিয়ে গেলেন। আমি সে ফাঁকে রেডি হয়ে নিলাম। দুপুরে মাহতাব ভাই এলেন, সঙ্গে মেয়ের জামাই ইমরান। ছেলেটি বড় ভালো, ভীষণ আলাপি, হাসিখুশি। খেতে খেতে বললো, মনে হচ্ছে আমার মায়ের হাতের রান্না খাচ্ছি। মতিউর, মিশু আর সাজিদ পরেছে পাঞ্জাবি, আর আমি শাড়ি। বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছি, বিদেশীরা উৎসুক দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে।
হঠাৎ চোখে পড়লো আলখেল্লা আর টুপি পরা একটা লোক ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। আমাকে দেখে মুখে একরাশ হাসি টেনে বললোÑ ঈদ মোবারক, আমিও হেসে জবাব দিলাম ঈদ মোবারক। লোকটাকে দেখে মনে হলো বাঙালি নয়। হতে পারে ইরানি, ইরাকি, আরবি অথবা পাকিস্তানি। বিদেশ বিভুঁইয়ে এ লোকটাকেই বড় আপন মনে হলো। ঢাকায় ফোন করে সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা জানালাম। রাতে সাজিদকে নিয়ে মাহতাব ভাইয়ের বাসায় দাওয়াত খেতে গেলাম।
রোজার ঈদের দু’দিন পরই মতিউর ঢাকা চলে গেল। মিশুও পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। আমি বড় একা নিঃসঙ্গ হয়ে গেছি। মতিউরের অপেক্ষায় দিন গুনছি। দু’মাস পর কোরবানি ঈদ। ঈদের দু’দিন আগেই মতিউর চলে এলো। এর মধ্যে মোটামুটি গুছিয়ে উঠেছি। ইউনিভার্সিটিতে মিশুর কিছু বন্ধুবান্ধব হয়েছে। ভাবলাম এবার ঈদের আয়োজনটা একটু বড় করেই করবো। ঢাকায় গরু খাসির হাট, পথে পথে কোরবানির পশুর ট্রাক, অলিতে-গলিতে কোরবানির পশুর বেচাকেনা, এদেশে এর কোনটাই নেই। তবে কেউ যদি কোরবানি দিতে চায়, মুসলিম কসাইখানায় কোরবানির পশুটি পছন্দ করে যার নামে কোরবানি হবে তার বা তাদের নাম দিয়ে আসতে পারে। কসাইখানায় কোরবানি হয়ে মাংস রেডি হয়ে থাকবে। নির্ধারিত সময়ে মাংস সংগ্রহ করতে হবে।
ঈদের দিন সকালে মাহতাব ভাই মতিউর আর মিশুকে নামাজে নিয়ে গেলেন। আমি রান্না-বাড়া সেরে তৈরি হয়ে নিলাম। সকাল সকাল সাজিদ চলে এলো ওর বন্ধু গাজাইনকে নিয়ে। গাজাইন পাকিস্তানি ছেলে। এরপর একে একে তাজুল, তামীম, ইলেন, পেইয়ী ও দেমেদার সিং এলো।
তাজুল, তামিম বাংলাদেশী, ইলেন ও পেইয়ী চাইনিজ, দেমেদার সিং মরিশাসের। দুপুরের ট্রেনে ভাসুরের মেয়ের জামাই আজাদ এলো লন্ডন থেকে। কিছুক্ষণ পর মাহতাব ভাই এবং ভাবী। আমার ছোট্ট বাড়িটা হাসি-ঠাট্টায় মুখরিত হয়ে উঠলো। টেবিলে খাওয়া দিলাম। লক্ষ্য করলাম চাইনিজ মেয়ে দুটো মোবাইল ফোনে প্রতিটি খাবারের ছবি তুলছে। বললো তোমাদের উৎসবে কত মজার মজার খাবার খেয়েছি বাবা মাকে দেখাবো। আজই ই-মেইল করবো। গাজাইন খাবার টেবিলে বসেই মাকে ফোন করলো। বললো, তুমি মন খারাপ করো না আমি এক আন্টির বাসায় দাওয়াতে এসেছি, অনেক মজার মজার খাবার খাচ্ছি, আন্টি খুব ভালো রান্না করেনÑ ঠিক তোমার মতো।
সারাদিন খাওয়া-দাওয়া, গল্প- গুজব আর হাসি-ঠাট্টায় কাটলো। রাতে যে যার বাড়িতে ফিরে গেল। বাংলাদেশী চ্যানেলে ঈদের অনুষ্ঠান দেখতে দেখতে রাত আড়ইটা। নাহ্ এবার ঘুমাতে হবে। শুয়ে শুয়ে ভাবলাম এবারে ঈদটা ঢাকার মতো না হলেও খুব একটা খারাপ কাটেনি। 
ঈদের একদিন পর মিসেস মাহতাব ঈদ রি-ইউনিয়নের দাওয়াত দিলেন। রোববার দুপুরে স্থানীয় কমিউনিটি সেন্টারে। মিসেস মাহতাব, মিসেস রহমান এবং মিসেস চৌধুরী তিন গিন্নি মিলেই এই বিশাল আয়োজন করেছেন। জনপ্রতি দশ পাউন্ড। তবে আমাদের কোন পয়সা দিতে হয়নি। আমরা ছিলাম মিসেস মাহতাবের গেস্ট। বিরাট কমিউনিটি সেন্টার। বেলুন আর ঈদ মোবারক ব্যানার দিয়ে সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে। বাজছে খাঁটি বাংলাদেশী গান। হলরুমের এক পাশে বিক্রির জন্য রাখা হয়েছে বাংলাদেশী হস্তশিল্প। প্রচণ্ড শীত উপেক্ষা করে পুরুষরা পরেছে পাঞ্জাবি আর মহিলারা শাড়ি। পুরো পরিবেশটাতেই রয়েছে দেশীয় ছাপ। থরে থরে সাজানো রয়েছে নানা ধরনের খাবার, বিরিয়ানি, রেজালা, পাকোড়া, সমুচা, সবজি, সালাদ বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি, জুস, আইসক্রিম, নানারকম ফল আরও কত কি। সারাদিন খাওয়া-দাওয়া আর হৈ-হুল্লোড় করে সন্ধ্যার পর যে যার বাড়িতে ফিরে গেলাম। 
এরই মধ্যে ছেলে ব্যারিস্টারি পাস করেছে। আমরা দেশে ফিরে এসেছি। দু’দুটো ঈদও আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব নিয়ে আগের মতোই পালন করেছি। জীবন চলছে একই নিয়মে। এরই মধ্যে খবর এলো মিশু ডারহাম ইউনিভার্সিটিতে চান্স পেয়েছে। মাস্টার্সের জন্য আবেদন করেছিল, ওরা অফার লেটার পাঠিয়েছে। ডারহাম ইংল্যান্ডের প্রথম পাঁচটা ইউনিভার্সিটির একটা। এখানে সুযোগ পাওয়া সহজ নয়। মনটা খুশিতে ভরে গেল।
মিশু বড় লক্ষ্মী ছেলে, আমাদের সব স্বপ্নই সে পূরণ করার চেষ্টা করছে। স্বপ্ন ছিল ব্যারিস্টার হবে, হয়েছে। মাস্টার্স করে পিএইচডি করবে। এখন সে সে পথেই এগুচ্ছে।
দু’হাজার বারো সালের সতেরই সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ডের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়লাম। ডারহাম সম্পর্কে তেমন একটা ধারণা নেই। শুধু এটুকু জানি ইংল্যান্ডের উত্তরে এ শহরটি। এখানে কোন বিমানবন্দর নেই। নিউ ক্যাসেলে নেমে ট্রেন অথবা বাসে যেতে হয়। নিউ ক্যাসেল থেকে ডারহাম যেতে ট্যাক্সিতে পঁয়তাল্লিশ মিনিট। তখন বেলা একটা। ট্যাক্সি ছুটে চলেছে। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে আছি বাইরের দিকে। কি সুন্দর দৃশ্য। রাস্তার দু’পাশে শুধু পাহাড় আর পাহাড়, পাহাড়ের গা ঘেঁষে গড়ে উঠেছে হালকা জনবসতি। চারদিকে ঘন সবুজের ছড়াছড়ি। সমতল ভূমিতে চরে বেড়াচ্ছে গরু, ঘোড়া আর ভেড়ার পাল। চোখে পড়লো বিরাট সাইনবোর্ড, ওয়েলকাম ডারহাম। বুঝলাম আমরা ডারহামে এসে গেছি। এ শহরে আমাদের পরিচিত কেউ নেই। মিশু ইন্টারনেটে বাড়ি ভাড়া করেছে। বাড়ির ছবি দেখেছি, বাস্তবে কেমন জানি না। বাড়িওয়ালা নিকোলাস পার্কার থাকেন নিউ ক্যাসেলে। পড়ান নিউ ক্যাসেল ইউনিভার্সিটিতে। তার বাবা জেফ পার্কার থাকেন চেস্টারলি স্ট্রিটে, ডারহাম থেকে গাড়িতে বিশ মিনিট। জেফ পার্কার রিটায়ার্ড মানুষ, বাসার চাবি নিয়ে তিনিই থাকবেন। প্লেন থেকে নেমেই ফোন দেয়া হয়েছে, ভদ্রলোক দরজা খুলে বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। গাড়ি দেখেই ইশারায় থামতে বললেন।
ভেতরে ঢুকতেই বললেন পথে কোন অসুবিধা হয়নি তো? বললাম জার্নি ভালই ছিল। জেফ তার স্ত্রীর সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। ভদ্র মহিলা মিষ্টি হেসে করমর্দন করলেন। দু’জনে মিলে ঘুরে ঘুরে বাড়ি দেখালেন। বাড়িটা বেশ সুন্দর, সামনে-পিছে বাগান। দোতলা বাড়ি, নিচতলায় ড্রইং কাম ডাইনিং, কিচেন, স্টোর আর বড়সড় একটা কনজারভেটরি। কনজারভেটরি হচ্ছে পুরো কাচের তৈরি কামরা। ইংরেজরা বৃষ্টির সময় কাচের ঘরে বসে বৃষ্টি উপভোগ করে, খাওয়া দাওয়ার পর্বও সারে এখানে বসেই। দোতলায় শোবার ঘর তিনটি। বেশ বড়সড় টয়লেট কাম বাথরুম। লক্ষ্য করলাম জেফ কথায় কথায়ই ইনশাআল্লাহ, মাশাল্লাহ কথাগুলো উচ্চারণ করছে। তার মুখে এই শব্দগুলো শুনে বেশ অবাক হচ্ছিলাম। জেফ বললেন, আমার মেয়ে মুসলমান, ওমানি ছেলেকে বিয়ে করে এখন ওমান থাকে। প্রতিবছরই আমার এখানে বেড়াতে আসে। আমার নাতি-নাতনীদের নাম আলীয়া মোহাম্মদ, আহাম্মদ। নামাজের কেবলা কোনদিকে সেটাও দেখিয়ে দিলেন জেফ। বিলাতে ভাড়াটিয়াদের একটা সুবিধা আছেÑ প্রতিটা বাড়িই ওয়েল ফার্নিস্ট।
খাট-পালং, আলমারি, সোফা, ডাইনিংসেট, কার্পেট সবই থাকে। শুধু তাই নয়, ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ, ইলেকট্রিক, ওভেন, ডিনার সেট, আয়রন এমনকি ক্রোকারিজও থাকে। লেপ, বালিশ আর চাদরটাই শুধু নিজেদের কিনতে হয়।
নিউ ক্যাসেলে মাহতাব ভাই আমাদের জন্য বাড়ি ভাড়া করে রেখেছিলেন। বাড়ির চাবি নিয়ে এয়ারপোর্টে অপেক্ষা করছিলেন। তিনিই পথ চিনিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিলেন। দুপুরে মাহতাব ভাইয়ের বাসায় খাবার ব্যবস্থা হয়েছিল। বিকালে মতিউরকে নিয়ে গিয়েছিলেন লেপ, চাদর বালিশ আর প্রয়োজনীয় জিনিসপাতি কিনতে। ভদ্রলোক এত ভালো যে, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের একটা লিস্ট করে এনেছিলেন। যাতে প্রথম দু’-চারদিন আমরা কোন অসুবিধায় না পড়ি। প্রথম দিনই আমরা মোটামুটি গুছিয়ে উঠেছিলাম।
ডারহামে পরিচিত কেউ নেই। এই শহরে কোথায় দোকানপাট, কোথায় ট্রেন, বাস বা ট্যাক্সি কিছুই জানি না। মনে মনে ভাবছি কি করা যায়? জেফ বললেন চলুন আপনাদের শহরটা ঘুরে দেখাই, তারপর আমরা মার্কেটে যাব। আপনারা চাদর, বালিশ, লেপ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে পারবেন। তার কথায় অবাক হয়ে গেলাম, এতো ভালো মানুষ হয়। ভদ্রলোক চাবি বুঝিয়ে দিয়েই তো চলে যেতে পারতেন। আমরা ভিনদেশী মানুষ তার কি ঠ্যাকা পড়েছে আমাদের শহর ঘুরিয়ে দেখানো। শপিং মলে নিয়ে যাওয়ার। কৃতজ্ঞতায় মাথা নুইয়ে এলো। বললেন, চলুন আমার সাথে গাড়ি আছে।
গাড়িতে উঠে বসলাম। যতই  দেখছি ততই অবাক হচ্ছি। কি সুন্দর এই শহর, নিরিবিলি ছিমছাম, রাস্তার দু’পাশে সারি সারি একই নকশার বাড়ি, প্রতিটি বাড়ি ডুপ্লেক্স, টালির ছাদ। নিচের দিকে ঢালু অনেকটা আমাদের দেশের টিনের চালের মতো। প্রতিটি ছাদের ওপর ধোঁয়া বেরুবার চিমনি। ইংল্যান্ড শীত প্রধান দেশ, বছরে প্রায় ছ’ মাসই বরফ পড়ে, বরফ গলে পানি গড়িয়ে পড়ার জন্যই এই ব্যবস্থা। ইংল্যান্ডে সবচেয়ে বেশি শীত পড়ে উত্তরে।
ডারহাম উত্তরেরই একটা শহর। শুনেছি শীতের সময় লন্ডনের চেয়ে দশগুণ বেশি শীত পড়ে এখানে। ডারহাম ইউনিভার্সিটি কেন্দ্রিক শহর, এ শহরের লোকসংখ্যা তেঁতাল্লিশ হাজার। এর মধ্যে সতের হাজারই স্টুডেন্ট। সারা পৃথিবী থেকে ছেলেমেয়েরা এখানে পড়তে আসে। ডারহাম ইংল্যান্ডের প্রাচীনতম ইউনিভার্সিটির একটি। আঠারশ’ বত্রিশ সালে এ ইউনিভার্সিটির জন্ম। বিগত ছয়শ’ বছর এটা স্কুল হিসেবেই পরিচালিত হতো।
এখানে অনেক ক্যাসেল চোখে পড়লো। শত শত বছর আগের ক্যাসেল, পুরনো হলেও জরাজীর্ণ নয়। ইউনিভার্সিটির অনেক ক্লাসই ক্যাসেলের ভিতর হয়। চারদিকে প্রচুর সবুজ গাছগাছালি আর ফুলের বাগান। বোঝা গেল এ শহরের মানুষ খুবই প্রকৃতিপ্রেমী। একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম, এ শহরের মানুষগুলো খুবই ডিসিপ্লিনড। ফুটপাতে একজন লোক দেখামাত্রই এরা গাড়ির গতি কমিয়ে দেয়। পথচারী পার না হওয়া পর্যন্ত গাড়ি থামিয়ে বসে থাকে। ইংল্যান্ডের বহু শহর ঘুরেছি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গিয়েছি, কিন্তু এত সুন্দর নিয়ম কোথাও দেখিনি। জেফ পার্কার আমাদের টেসকোতে নামিয়ে দিয়ে বললেন, আপনাদের যতক্ষণ সময় লাগে নিন, কোন রকম ইতস্তত করবেন না। আমি এবং আমার স্ত্রী এই মলেই থাকবো। আমরা লেপ-বালিশ, চাদর প্রয়োজনীয় দু’-একটা জিনিস এবং রাতের জন্য দুধ, কলা, রুটি, মাখন, জুস এবং বিস্কুট কিনে নিলাম। আজকের মতো এটুকু হলেই চলবে। জেফ বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে বললেন, আপনাদের কোন অসুবিধা হলে আমাকে জানাবেন। আমি চলে আসবো। ডারহাম থেকে চেস্টারলি স্ট্রিট খুব একটা দূরে নয়। আমার কোন অসুবিধা হবে না। জেফ চলে যেতেই রাতের খাবার খেয়ে নিলাম। বড় ক্লান্ত লাগছে। বিছানায় গিয়েই ঘুমিয়ে পড়লাম। বাসার খুব কাছে বাসস্ট্যান্ড, দু’ মিনিটের পথ। মিশু রাতেই ইন্টারনেট থেকে সবকিছু জেনে নিয়েছে। গুগলের কল্যাণে সবকিছুই এখন হাতের মুঠোয়। দুপুরের আগেই বেরিয়ে পড়লাম। কি সুন্দর বাস, মনে হয় যেন প্লেনের সিটে বসে আছি। এদেশের বেশিরভাগ মানুষ প্রতিদিনই মাইলকে মাইল হাঁটে। বেশি দূরের পথ হলে বাসে যাতায়াত করে। গাড়ি থাকলেও সব সময় গাড়ি চড়ে না। কারণ দুটোÑ এক সাশ্রয়, দুই কার পার্কিং। আমাদের দেশের মতো যেখানে-সেখানে গাড়ি পার্ক করা যায় না। 
কার পার্কিংয়ের নির্দিষ্ট স্থান রয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কার পার্ক করে বেশ খানিকটা হেঁটে গন্তব্যে যেতে হয়। সে কারণে অনেকেই গাড়ি নিয়ে যায় না। কার পার্কিংয়ের জন্য প্রতি ঘণ্টায় বেশ মোটা অংকের টাকাও গুনতে হয়।
এছাড়া আরও একটি কারণ রয়েছে। এদেশের মানুষ খুবই স্বাস্থ্য সচেতন, হাঁটা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী এ কথাটা মাথায় রেখেই এরা প্রচুর হাঁটে।
সিটি সেন্টারে বাস থামলো। মিশুর ইউনিভার্সিটি এখান থেকে পাঁচ মিনিটের পথ। ঠিক করলাম আগে ইউনিভার্সিটি যাবো, তারপর সিটি সেন্টার ঘুরে দেখবো। পাহাড় কেটে কেটে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। তাই কোথাও উঁচু আবার কোথাও ঢালু। হাঁটতে বেশ কষ্ট হচ্ছিলো। লক্ষ্য করলাম, দু’পাশের ইমারতগুলো বহু পুরনো। কয়েকশ’ বছর তো হবেই। কিন্তু এগুলোকে এমনভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে, কোথাও কোন জরা জীর্ণতার ছাপ নেই। ঘুরে ঘুরে দেখলাম হাজার বছরের পুরনো সব ক্যাসেল। সিটি সেন্টারে এসেই দুপুরের খাওয়া খেয়ে নিলাম। সিটি সেন্টার ইংল্যান্ডের অন্যান্য শহরের মতো বিশাল নয়। উঁচু-নিচু পাহাড়ের ওপর গড়ে ওঠা মলটি খুবই নয়নাভিরাম। মলের দু’দিকে প্রকাণ্ড লেক। লেকে সাঁতরে বেড়াচ্ছে পাতি হাঁস, রাজহাঁস, বালী হাঁস আরও কত নাম না জানা পাখি। মলে প্রায় সবক’টি নামী ব্র্যান্ডের দোকান রয়েছে। রয়েছে সুলভমূল্যের কিছু দোকানপাটও। মনে মনে ভাবলাম কেনাকাটায় তেমন কোন অসুবিধা হবে না।
মিশুর ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। প্রতিদিনই সকালে যায় আর বিকালে ফেরে। আমি আর মতিউর প্রতিদিনই মিশুর সাথে বেরিয়ে যাই। আমরা সিটি সেন্টারে কেনাকাটা করি, ঘুরে বেড়াই। মিশু লাঞ্চ ব্রেকে আমাদের সাথে লাঞ্চ সেরে ক্লাসে ফিরে যায়। আমরা ওর জন্য অপেক্ষা করি, বিকালে ছুটি হলে একসাথে বাড়ি ফিরি। 
একই নিয়মে চললো বেশ ক’টা দিন। হঠাৎ ঘটলো এক ঘটনা। দুপুরে লাঞ্চ করে ক্লাসে চলে গিয়েছে মিশু। আমি আর মতিউর সিটি সেন্টারে ঘুরছি। সপ্তাহের পাঁচদিন সিটি সেন্টার বিকাল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত খোলা থাকে। আর ছুটির দিনে বিকাল চারটা। মাঝে-মধ্যে আমার ভীষণ বিরক্ত লাগে। আমি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দেখেছি কম করে হলেও রাত ন’টা পর্যন্ত দোকানপাট খোলা থাকে। আমেরিকায় কিছু কিছু মল সারারাত। এদেশে আমাদের কোন আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব নেই, সন্ধ্যার পর হাত-পা গুটিয়ে বাসায় বসে থাকতে হয়। দোকানপাট খোলা থাকলে সেখানে অন্তত যাওয়া যেত। মিশুর ছুটি ছ’টায়। তখন প্রায় সাড়ে পাঁচটা। আস্তে আস্তে দোকানপাটগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আকাশ মেঘলা, এরই মধ্যে চারদিক অন্ধকার হয়ে গেছে। রাস্তার বাতি জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। মনে হচ্ছে রাত হয়ে গেছে। মতিউর বললো মিশুর আসার সময় হয়ে যাচ্ছে, চলো মল থেকে বেরিয়ে রাস্তায় দাঁড়াই। বেশ কিছু কেনাকাটা করেছিলাম, সেগুলো মতিউরের হাতে দিয়ে বললাম তুমি বস আমি ওয়াশরুম থেকে আসছি। মলের ভেতরে বেশ কিছু বেঞ্চ পাতা রয়েছে। ক্রেতারা কেনাকাটা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে ওখানে বসে জিরিয়ে নেয়। 
মলের একেবারে শেষ মাথায় ওয়াশরুম। মতিউর একা বসে আছে, আশপাশে কেউ নেই। মলটি এখন প্রায় ফাঁকা। আমি হাঁটতে হাঁটতে ওয়াশরুমে চলে গেলাম। ওখানে পাশাপাশি চারটা টয়লেট, সবক’টির দরজা খোলা। একেবারে জনশূন্য। আমি একটাতে ঢুকে পড়লাম। দরজা খুলে বেরুবার আগ মুহূর্তে হঠাৎ দেখলাম পাশের টয়লেট থেকে একটা হাত কি যেন চাইছে। এ দেশের পাশাপাশি টয়লেটগুলোর পার্টিশন একবারে নিচ পর্যন্ত থাকে না। এক টয়লেট থেকে অন্য টয়লেটের মানুষটির পা দেখা যায়। পার্টিশনের ফাঁক দিয়ে সুন্দর একটি ফর্সা হাত কি যেন চাইছে। ভাবলাম পাশের টয়লেটে টিস্যু নেই। তাই বেশ খানিকটা টিস্যু ছিঁড়ে ওর হাতে দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে হাতটা সরে গেল। দরজা খুলে বেরিয়েই বুকের ভেতরটা ধক্ করে উঠলো। এই মাত্র যার হাতে টিস্যু দিলাম সে কোথায়? চারটা বাথরুমই তো খোলা। আশপাশে কেউ নেই। মানুষটা কি এক মুহূর্তে হাওয়া হয়ে গেল। ভয়ে হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে এলো। পড়িমরি করে ছুটতে ছুটতে মতিউরের কাছে এলাম। ও আমাকে দেখে ঘাবড়ে গেল বললোÑ অমন করে দৌড়াচ্ছ কেন? বললাম তাড়াতাড়ি চলো, পরে বলবো। বাসায় ফিরে ছোটবোন শিরীনকে লন্ডনে টেলিফোন করলাম। সবকিছু শুনে বললো, এদেশে এমন অনেক ঘটনা ঘটে, যার কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই। আমার ঘটনা শুনলে তো তুমি বিশ্বাসই করতে চাইবে না। বললাম, আমি শুনতে চাই সেই ঘটনা।
শিরীন থাকে সেন্ট্রাল লন্ডনে। বেশ বড়সড় একটা ভাড়া বাড়িতে। বাড়িটার সামনে বাগান পিছনে বেশ বড় একটা ব্যাক-ইয়ার্ড। ব্যাক-ইয়ার্ডের এক পাশে স্টোর রুম। স্টোরের একটা চাবি ওদের কাছে, অন্যটা বাড়িওয়ালার কাছে। শিরীনের বিছানার চাদর থেকে শুরু করে ডিনারসেট, ক্রোকারিজ, কাটলারিজ, হাঁড়ি-পাতিল সবই ওই স্টোরে। দরকার মতো বের করে ব্যবহার করে। মাস দুয়েক আগে ওরা ঢাকা বেড়াতে গিয়েছিল। ঢাকা থেকে ফিরে তো শিরীন রেগে অস্থির।
ওদের অবর্তমানে বাড়িওয়ালা স্টোরে ঢুকে মালপত্র সরিয়ে পুরনো এক সেট সোফা রেখেছে। ওদের জিনিসগুলো একটার ওপর একটা গাদাগাদি করে রেখে দিয়েছে। শিরীনের বর এহমার বাড়িওয়ালার বাসায় ফোন করলো। বাড়িওয়ালা বাসায় ছিল না, তার স্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করে বললো, ভুল হয়ে গেছে, তোমাদের অবর্তমানে এটা করা মোটেও উচিত হয়নি। ভবিষ্যতে আর কখনও এমনটি হবে না। শিরীনের ছেলে-মেয়েরা সবাই স্কুল-কলেজে পড়ে। ওর বর এহমার একটা বিদেশী সংস্থায় চাকরি করে। দুপুর বেলা শিরীন ছাড়া বাড়িতে কেউ থাকে না। একদিন দুপুরে স্টোর খুলে তো সে হতবাক। স্টোরের ভিতর সবকিছু তছনছ। ওলট-পালট হয়ে পড়ে আছে ক্রোকারিজ, ডিনারসেট, বেডকভার, হাঁড়ি-পাতিল, লেপ-তোষক। এ নিশ্চয়ই বাড়িওয়ালার কাজ। রাগে গজ গজ করতে করতে শিরীন এহমারকে ফোন করলো। বললোÑ এর একটা হেস্তনেস্ত তোমাকে করতেই হবে। ওই ছোটলোকের বাসায় আর থাকবো না।
এহমারের অফিস কাছেই। বললো একটু ধৈর্য ধর আমি দশ মিনিটের মধ্যে আসছি। তুমি কোন কিছুতে হাত দিও না, যেভাবে আছে থাক, আমি এসে দেখবো, তারপর বাড়িওয়ালার স্ত্রীকে ডেকে এনে দেখাবো। শিরীন স্টোরের দরজা বন্ধ করতেই দশ মিনিটের মধ্যে এহমার এলো। স্টোরের দরজা খুলে স্তম্ভিত হয়ে গেল শিরীন। একি দেখছে সে, ওর মাথা ঘুরছে চোখে অন্ধকার দেখছে, স্টোরের সবকিছু পরিপার্টি, ছিমছাম, প্রতিটি জিনিস জায়গা মতো রাখা। 
এ কি করে হতে পারে। এহমার একটু বিরক্ত হয়ে বললো, সবই তো ঠিকঠাক। ভালো যে আমি বাড়িওয়ালাকে ফোন করিনি। শুধু শুধু লজ্জা পেতাম। বিশ্বাস করো সবকিছু তছনছ ছিল, আমি দশ মিনিট আগেই দেখেছি, এটা কি করে সম্ভব আমি বুঝতে পারছি না। শিরীনের অসহায় অবস্থা দেখে এহমার বললো, আমি বিশ্বাস করেছি, এবার ঘরে চলো।
মতিউর ঢাকা চলে গেল। আবার সেই একা জীবন, আমরা দু’জনই দু’জনের ওপর এতো বেশি নির্ভরশীল যে, একজন আরেকজনকে ছাড়া চলতে পারি না। আমি একটু ভয়-কাতুরে। একটুতেই ভয় পাই। ভূত-প্রেতে বিশ্বাস করি না। আবার একা ঘরে থাকতে ভয় পাই। এখন রাতে একা থাকতে হয়। প্রায় রাতেই ভয়ের স্বপ্ন দেখে চমকে উঠি।
দেখতে দেখতে কোরবানি ঈদ এসে গেলো। ঈদের আগের দিন মতিউর এলো। আমি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। আর আমাকে একা ঘুমাতে হবে না। নিউ ক্যাসেলে অনেক এশিয়ান আছে, বাংলাদেশী, ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানি, চাইনিজ, কোরিয়ান ও জাপানি।
ডারহামে এশিয়ান নেই বললেই চলে। প্রায় তিন মাস এখানে এসেছি। আজ পর্যন্ত কোন বাংলাদেশী, ভারতীয় বা পাকিস্তানি চোখে পড়েনি। যদিও জাপানিজ, চাইনিজ এবং কোরিয়ান মাঝে-মধ্যে দেখেছি। নিউ ক্যাসেলে মিশুর অনেক বাংলাদেশী, পাকিস্তানি ও ভারতীয় বন্ধুবান্ধব ছিল। ডারহাম ইউনিভার্সিটিতে এখনও তেমন কাউকেই খুঁজে পায়নি।
মতিউর দুপুরে পৌঁছানোর পর খাওয়া-দাওয়া সেরে লম্বা ঘুম দিয়েছে। আমি রান্নায় ব্যস্ত হয়ে উঠলাম। ঈদ বলে কথা। মিশুকে বললাম ইন্টারনেটে দেখ কোথায় মসজিদ, ঈদের নামাজ হবে নাÑ তা তো হয় না। মিশু ইন্টারনেট ঘেঁটে বললো এই শহরে কোন মসজিদ নেই। মনটা খারাপ হয়ে গেল। তাহলে কি ওরা ঈদের নামাজ পড়তে পারবে না? নামাজ না পড়তে পারলে আবার ঈদ কিসের? কিছুক্ষণ পর মিশু বললো, আম্মু গুড নিউজ। আমাদের পাশের একটা শহরে মসজিদ আছে, ওখানে ঈদের নামাজ হয়। খবরটা শুনে আশ্বস্ত হলাম, যাক দূরে হলেও ঈদের নামাজ পড়া হবে।
রাতেই ঘরদোর সুন্দর করে গুছিয়ে ফেললাম, যদিও ঈদের দিন আমাদের বাড়িতে কেউ বেড়াতে আসবে না, আমরাও যাবো না কোন দাওয়াতে। ঈদের দিন খুব ভোরে ঘুম ভাঙলো, চটজলদি রান্নাঘরে চলে গেলাম, পোলাও আর সেমাই রান্না করলাম, ডিম, মাংস, সবজি আগের দিনই করে রেখেছি। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিতে হবে, আমরা সবাই নামাজে যাব। আমরা যেখানে যাচ্ছি সে শহরের নাম বো বার্ন। ডারহাম থেকে বেশ দূরে। 
আমাদের ট্যাক্সিতে যেতে হবে। মিশু ওই শহরের মুসলিম কমিউনিটির সাথে যোগাযোগ করেছিল ই-মেইলে। ওরা বলেছে এ মসজিদে মহিলাদেরও নামাজের ব্যবস্থা আছে। আমি এর আগে কখনো মসজিদে গিয়ে ঈদের নামাজ পড়িনি, তাই বেশ উৎসাহ বোধ করছি। মতিউর ঢাকা থেকে সেমাই পোলাওর চাল, ঈদের কাপড়-চোপড় সবই নিয়ে এসেছে। আমরা গোসল সেরে নতুন কাপড় পরে তৈরি হয়ে নিলাম। মতিউর আর মিশু পরেছে পাজামা-পাঞ্জাবি আর আমি সালোয়ার-কামিজ। ইদানীং ইংল্যান্ডের কিছু কিছু জায়গায় শাড়ি এবং সালোয়ার-কামিজ পরা খুবই বিপজ্জনক।মানবজমিন

ট্যাগ:
সর্বশেষ সংবাদ
Advertisements
karnafully1
TEKSERV

Situs Streaming JAV