কোন অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নেই মুহিত
মিজানুর রহমান: খুবই রসিক। অন্যকে হাসান, নিজেও হাসেন। কিন্তু নীতির ক্ষেত্রে কঠিন। আপসহীন। বয়স ছিয়াত্তর পূর্ণ করেছেন ক’মাস আগেই। ক্লান্তি, জরা, বার্ধক্য ছুঁতে পারেনি এখনও।
রাষ্ট্রীয় গুরুদায়িত্ব কিংবা ব্যক্তিগত পড়াশোনা বা লেখালেখি- সব কাজেই স্বতঃস্ফূর্ত তিনি। ডাকসাইটে আমলা থেকে পুরাদস্তুর রাজনীতিবিদ। তিনি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। দুনিয়ার অনেক দেশেই কাজ করেছেন। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র হলেও অর্থনীতিবিদ ও কূটনীতিক হিসেবেও সুখ্যাত। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় সৈনিক হিসেবে কারাবরণকারী আবুল মাল আবদুল মুহিত মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে চাকরির মোহ ত্যাগ করে যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও জনগণের সমর্থন আদায়ে কাজ করেছেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন আর অর্থনীতির ভিত রচনায় বঙ্গবন্ধু সরকারের পরিকল্পনা সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। চাপের মুখে কাজ করতে বাধ্য হয়েছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জেনারেল এরশাদের সঙ্গেও। অবশ্য এ জন্য চড়া মূল্য দিতে হয়েছে তাকে। পদত্যাগের পর শাসকগোষ্ঠীর তরফে জীবনের হুমকি এসেছে। বোমা হামলা হয়েছে তার বসতভিটায়। প্রাণনাশের আশঙ্কায় দেশ ছাড়তে হয়েছে। বেশ ক’বছর নির্বাসনেও কাটাতে হয়েছে। ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম, গণতন্ত্র আর আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার রাজনীতিতে নিবেদিত এ মানুষটির ব্যক্তিজীবন, সংসার, চাকরি, রাজনীতি সব কিছু যেন নিয়মে বাঁধা। কোন অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নেই তিনি। রাজনীতির মারপ্যাঁচও তেমন বোঝেন না। যেটুকু বিশ্বাস করেন তা অবলীলায় প্রকাশ করেন। তবে এর জন্য তাকে বিড়ম্বনায়ও পড়তে হয়। চাপ আসে ঘনিষ্ঠজনদের কাছ থেকে। দাতা কিংবা প্রেশার গ্রুপের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে দেনদরবার সে তো নিত্যদিনের ঘটনা। এসব নিয়েই গত কুড়ি মাসে সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে মোকাবিলা করেছেন বিশ্বমন্দার ধকল। বিশ্বের বহু উন্নয়নশীল দেশের চেয়ে বাংলাদেশ এখন অনেক এগিয়ে- দাবি তার। তবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি আর মাঠ পর্যায়ের দুর্নীতি নিয়ে বড়ই দুশ্চিন্তায় তিনি।
শত ব্যস্ততার পরও: মন্ত্রিত্বের জন্য তার ব্যস্ততা বেড়েছে। তবে তিনি আগেও ছিলেন সমান ব্যস্ত। দিনে এটা ওটা যে কোন কাজ নিয়েই ছিল তার ব্যস্ততা। এখন রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। রুটিনে তেমন একটা হেরফের হয়নি। বাইরে কর্মসূচি না থাকলে নির্ধারিত সময়ে সচিবালয়ে যান। যেটুকু সময় পান এর পুরোটাই কাজে লাগানোর চেষ্টা করেন। নির্ধারিত সময়ের আগেই কর্মসূচিগুলোতে অংশ নেয়ার তাগিদ থাকে তার। তবে কাজের চাপে অনেক সময় তা হয়ে ওঠে না। এ নিয়ে দুঃখবোধও আছে। ঘুম নিয়ে তার তেমন ঝামেলা নেই। অল্প ক’ঘণ্টা ঘুমান, তা-ও শেষ রাতে। সুযোগ পেলেই বই পড়তে বসেন। লেখালেখি করেন। অসুস্থ হলে তার এ দু’টি কাজ বেড়ে যায়। ভাইরাস জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ক’দিন আগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। আর এ সুযোগটাই কাজে লাগিয়েছেন একটা ঈদ সংখ্যার লেখার জন্য। হাসপাতালের বেডে শুয়ে শুয়ে ডিকটেশন দিয়েছেন। হাসপাতাল থেকে ছুটির পর আর কোন ঈদ সংখ্যার জন্য লিখতে পারেননি। মানবজমিন-এর পক্ষ থেকে তার সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল রাত ৯টায়। পৌনে ১০টার দিকে দোতলা থেকে নেমে এলেন ড্রয়িং রুমে। বললেন, দেরি হয়ে গেল, মেহমান ছিলেন, তাদের বিদায় দিয়ে একটু মেইল চেক করতে বসেছিলাম। গত দু’দিনে একটুও সময় বের করতে পারিনি। এরপর টানা পৌনে তিন ঘণ্টার আলাপ। পারিবারিক ঐতিহ্য, বেড়ে ওঠা, স্কুলে ভর্তি, শিক্ষাজীবন, চাকরি, রাজনীতি, নানা ঘটনা দুর্ঘটনা আর অভিজ্ঞতার কথা বললেন। দিন তারিখ স্থান সময়ই যেন তার মুখস্থ। কবে কার সঙ্গে কি কথা হয়েছিল এক-এক করে সব বলে গেলেন। ৫০-৬০ বছর আগের ঘটনা যেমন স্মরণে আছে, তেমনি ২০-২৫ বছর আগের ঘটনাও। কখনও একটু হাসলেন, আবার কখনও বেশ গম্ভীর গলায় ফেলে আসা দিনগুলোর বর্ণনা দিলেন। কথায় কথায় বেলা হয়ে যায়। অর্থমন্ত্রী হিসেবে তার গত বিশ মাসের সফলতা ব্যর্থতার মূল্যায়ন করলেন নিজেই। একই সঙ্গে জানালেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি, বিনিয়োগ আর অবকাঠামোগত উন্নয়নে তার সরকারের নেয়া পরিকল্পনার কথা। এ সময়ে একটু সমালোচনাও করলেন বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের। তবে স্বীকার করলেন তার নিজের এবং সরকারের সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও। প্রধানমন্ত্রীর আস্থা ও সহকর্মীদের সহযোগিতার কথা যেমন বললেন, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে ‘আপস’ করতে বাধ্য হওয়ায় বিষয়টিও স্বীকার করলেন। বললেন, সংসদীয় শাসন ব্যবস্থায় অনেক ক্ষেত্রে আপস করতে হয়। নীতি-আদর্শ আইন কানুনের মধ্যে থেকে তা করতে হয়। আমিও করি। এক প্রশ্নের জবাবে বললেন, সব মিলিয়ে ভাল আছি। রাত সাড়ে ১২টার পরে বিদায় দিলেন গেটের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে। হাঁটতে হাঁটতে বললেন, আমার এখনও আরেকটা কাজ বাকি রয়ে গেছে। ততক্ষণে জানা গেল পরদিন তার পাঁচটি প্রোগ্রাম। মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত কাজ তো আছেই।
ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার: ১৯৩৪ সালের ২৫শে জানুয়ারি সিলেট শহরের ঐতিহ্যবাহী এক পরিবারে জন্ম তার। পিতা আবু আহমদ আবদুল হাফিজ ছিলেন প্রথিতযশা আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ। সে সময়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলন, শিক্ষার প্রচার-প্রসার, বিশেষ করে গণভোটে তার গুরু দায়িত্ব ছিল। একজন শিক্ষানুরাগী হিসাবে সিলেট তথা আসামে সুখ্যাতি ছিল তার। নেতৃত্ব দিয়েছেন ভাষা আন্দোলনেও। মা সৈয়দা শাহারবানু ছিলেন নেতৃস্থানীয় সমাজ ও রাজনীতি সচেতন কর্মী। সিলেট মহিলা মুসলিম লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। বহুদিন এ সংগঠনের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। খাঁটি মুসলিম লীগ পরিবারে জন্ম আবুল মাল আবদুল মুহিতের। ৭ ভাই ৫ বোনের মধ্যে তার অবস্থান তৃতীয়। বড় ভাই ড. আবু আহমদ আবদুল মুহসি অধ্যাপনা করতেন। দু’বছর আগে প্রয়াত হয়েছেন। ছোট ভাইদের মধ্যে শেলী আবদুল মুবদি নিউ ইয়র্কের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। আবু সালেহ আবদুল মুইজ (সুজন) বীমা বিশেষজ্ঞ ও সমাজকর্মী। ড. একে আবদুল মুবিন সাবেক সচিব। ড. একে আবদুল মোমেন লেখক, কলামনিস্ট এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সংগঠক। ছোট ভাই আবুল বাশার আবদুল মুমিত নিউ ইয়র্কে প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকার। বোন আয়েশা খাতুন ভাই বোনদের মধ্যে সবার বড়। দেশের প্রখ্যাত গাইনোলজিস্ট ডা. শাহলা খাতুন তার মেজ বোন। শিপা হাফিজা ব্র্যাকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। নাজিয়া খাতুন ও রিও হাফিজা দু’জনই উচ্চ শিক্ষিতা। ওই পরিবারের দুঃখ একটাই। বোন ফৌজিয়া খাতুন অকালে তাদের ছেড়ে পরপারে পাড়ি দিয়েছেন। সংসার জীবনে মুহিতের প্রেরণা তার সহধর্মিণী সাবিয়া মুহিত। ব্যক্তিজীবনে সুখী এ দম্পতির কন্যা সামিনা মুহিত জাকার্তায় আমেরিকার ম্যানহাটন ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। বড় ছেলে শাহেদ নিউ ইয়র্কে কর্মরত। ছোট ছেলে সামির যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষকতা করেন।
ছাত্রজীবন থেকেই মেধাবী: স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি দুনিয়া সেরা হাভার্ড ইউনিভার্সিটিতেও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। ১৯৫১ সালে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী মুরারীচাঁদ কলেজ থেকে রেকর্ড নম্বর পেয়ে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৫৪ সালে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স ডিগ্রি লাভ করেন। এ পরীক্ষায় তিনি প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। ১৯৫৫ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ডিগ্রি নেন। চাকরিরত অবস্থায় ১৯৫৭-৫৮ শিক্ষাবর্ষে তিনি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেন। ১৯৬৪ সালে হাভার্ড ইউনিভার্সিটি থেকে এমপিএ ডিগ্রি অর্জন করেন।
ছাত্রদের নেতা, তবে কোন দলে নেই: ছাত্রদের দাবি-দাওয়া নিয়ে কথা বলতেন। সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বাম প্রগতিশীল আন্দোলনের তৎকালীন পুরোধাদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ছাত্রনেতা হিসেবে সিকিউরিটি অ্যাক্টে তাকে আটক করা হয়। তখনও তিনি সরাসরি কোন দলীয় রাজনীতিতে ছিলেন না। স্কুলের শিক্ষার্থীদের নিয়ে মুকুলমেলা, মুকুল ফৌজ সংগঠন করেছিলেন। তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন এসব সংগঠনের। এর মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়েছেন। মনে মনে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। তবে কোন সদস্য ফরম পূরণ করেননি।
বাবা-মা মুসলিম লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় ছোটবেলা দেশের বরেণ্য নেতা-নেত্রীদের দেখেছেন মুহিত। তাদের সান্নিধ্য পেয়েছেন। বিশেষ করে সিলেটের গণভোটে অংশ নেয়া বঙ্গবন্ধুসহ অনেককেই দেখেছিলেন খুব কাছ থেকে। তিনি পাকিস্তানি মৌলভীদের সঙ্গে সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চলে গণসংযোগ করতে গিয়ে দোভাষীর কাজও করেছিলেন। ১৯৪৭ সালের গণভোটে স্কুলপড়ুয়া মুহিতের অংশগ্রহণ ছিল তার রাজনৈতিক জীবনের প্রথম সোপান। এ ধারাবাহিকতায় তিনি আজ এ অবস্থানে।
সিএসপি হলেন যেভাবে: তখন তিনি মাস্টার্স পরীক্ষার্থী। ভাষা আন্দোলনে ছাত্রদের নেতৃত্ব দেয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় ছাত্রনেতা মুহিতকে। জেলে বসেই পরীক্ষার প্রস্তুতি নেন। শিক্ষা জীবনের শেষ পরীক্ষার পাশাপাশি কর্মজীবনের প্রবেশদ্বার পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস (সিএসপি) পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেন। মুহিত বলেন, তখন শিক্ষকরা প্রায়ই আমাদের দেখতে যেতেন। সান্ত্বনা দিতেন। সাহস যোগাতেন। জেলে যাওয়ার পর সিএসপি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। মনে হলো, সরকারের ভেতরে ঢুকেই তাকে আঘাত করতে হবে। জেলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আইনজীবী হওয়ার স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু জেল তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ১৯৫৬ সালে তিনি সিএসপি হিসেবে চাকরি জীবন শুরু করেন। ’৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখ সমরে নেতৃত্ব দেয়ার সুযোগ তার ঘটেনি। তবে তিনিই প্রথম প্রবাসী বাঙালি অফিসার যিনি যুদ্ধ শুরুর পর পরই নতুন সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন ঘোষণা দিয়ে। পাকিস্তান সরকারের চৌকস এ অফিসার চাকরি আর নিজের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা না করে যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্রোহ করেন পাকিস্তান দূতাবাসে। চাকরি ছেড়ে যোগ দেন মুক্তিকামী বাংলাদেশীদের পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনে।
শত ব্যস্ততার পরও: মন্ত্রিত্বের জন্য তার ব্যস্ততা বেড়েছে। তবে তিনি আগেও ছিলেন সমান ব্যস্ত। দিনে এটা ওটা যে কোন কাজ নিয়েই ছিল তার ব্যস্ততা। এখন রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। রুটিনে তেমন একটা হেরফের হয়নি। বাইরে কর্মসূচি না থাকলে নির্ধারিত সময়ে সচিবালয়ে যান। যেটুকু সময় পান এর পুরোটাই কাজে লাগানোর চেষ্টা করেন। নির্ধারিত সময়ের আগেই কর্মসূচিগুলোতে অংশ নেয়ার তাগিদ থাকে তার। তবে কাজের চাপে অনেক সময় তা হয়ে ওঠে না। এ নিয়ে দুঃখবোধও আছে। ঘুম নিয়ে তার তেমন ঝামেলা নেই। অল্প ক’ঘণ্টা ঘুমান, তা-ও শেষ রাতে। সুযোগ পেলেই বই পড়তে বসেন। লেখালেখি করেন। অসুস্থ হলে তার এ দু’টি কাজ বেড়ে যায়। ভাইরাস জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ক’দিন আগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। আর এ সুযোগটাই কাজে লাগিয়েছেন একটা ঈদ সংখ্যার লেখার জন্য। হাসপাতালের বেডে শুয়ে শুয়ে ডিকটেশন দিয়েছেন। হাসপাতাল থেকে ছুটির পর আর কোন ঈদ সংখ্যার জন্য লিখতে পারেননি। মানবজমিন-এর পক্ষ থেকে তার সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল রাত ৯টায়। পৌনে ১০টার দিকে দোতলা থেকে নেমে এলেন ড্রয়িং রুমে। বললেন, দেরি হয়ে গেল, মেহমান ছিলেন, তাদের বিদায় দিয়ে একটু মেইল চেক করতে বসেছিলাম। গত দু’দিনে একটুও সময় বের করতে পারিনি। এরপর টানা পৌনে তিন ঘণ্টার আলাপ। পারিবারিক ঐতিহ্য, বেড়ে ওঠা, স্কুলে ভর্তি, শিক্ষাজীবন, চাকরি, রাজনীতি, নানা ঘটনা দুর্ঘটনা আর অভিজ্ঞতার কথা বললেন। দিন তারিখ স্থান সময়ই যেন তার মুখস্থ। কবে কার সঙ্গে কি কথা হয়েছিল এক-এক করে সব বলে গেলেন। ৫০-৬০ বছর আগের ঘটনা যেমন স্মরণে আছে, তেমনি ২০-২৫ বছর আগের ঘটনাও। কখনও একটু হাসলেন, আবার কখনও বেশ গম্ভীর গলায় ফেলে আসা দিনগুলোর বর্ণনা দিলেন। কথায় কথায় বেলা হয়ে যায়। অর্থমন্ত্রী হিসেবে তার গত বিশ মাসের সফলতা ব্যর্থতার মূল্যায়ন করলেন নিজেই। একই সঙ্গে জানালেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি, বিনিয়োগ আর অবকাঠামোগত উন্নয়নে তার সরকারের নেয়া পরিকল্পনার কথা। এ সময়ে একটু সমালোচনাও করলেন বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের। তবে স্বীকার করলেন তার নিজের এবং সরকারের সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও। প্রধানমন্ত্রীর আস্থা ও সহকর্মীদের সহযোগিতার কথা যেমন বললেন, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে ‘আপস’ করতে বাধ্য হওয়ায় বিষয়টিও স্বীকার করলেন। বললেন, সংসদীয় শাসন ব্যবস্থায় অনেক ক্ষেত্রে আপস করতে হয়। নীতি-আদর্শ আইন কানুনের মধ্যে থেকে তা করতে হয়। আমিও করি। এক প্রশ্নের জবাবে বললেন, সব মিলিয়ে ভাল আছি। রাত সাড়ে ১২টার পরে বিদায় দিলেন গেটের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে। হাঁটতে হাঁটতে বললেন, আমার এখনও আরেকটা কাজ বাকি রয়ে গেছে। ততক্ষণে জানা গেল পরদিন তার পাঁচটি প্রোগ্রাম। মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত কাজ তো আছেই।
ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার: ১৯৩৪ সালের ২৫শে জানুয়ারি সিলেট শহরের ঐতিহ্যবাহী এক পরিবারে জন্ম তার। পিতা আবু আহমদ আবদুল হাফিজ ছিলেন প্রথিতযশা আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ। সে সময়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলন, শিক্ষার প্রচার-প্রসার, বিশেষ করে গণভোটে তার গুরু দায়িত্ব ছিল। একজন শিক্ষানুরাগী হিসাবে সিলেট তথা আসামে সুখ্যাতি ছিল তার। নেতৃত্ব দিয়েছেন ভাষা আন্দোলনেও। মা সৈয়দা শাহারবানু ছিলেন নেতৃস্থানীয় সমাজ ও রাজনীতি সচেতন কর্মী। সিলেট মহিলা মুসলিম লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। বহুদিন এ সংগঠনের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। খাঁটি মুসলিম লীগ পরিবারে জন্ম আবুল মাল আবদুল মুহিতের। ৭ ভাই ৫ বোনের মধ্যে তার অবস্থান তৃতীয়। বড় ভাই ড. আবু আহমদ আবদুল মুহসি অধ্যাপনা করতেন। দু’বছর আগে প্রয়াত হয়েছেন। ছোট ভাইদের মধ্যে শেলী আবদুল মুবদি নিউ ইয়র্কের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। আবু সালেহ আবদুল মুইজ (সুজন) বীমা বিশেষজ্ঞ ও সমাজকর্মী। ড. একে আবদুল মুবিন সাবেক সচিব। ড. একে আবদুল মোমেন লেখক, কলামনিস্ট এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সংগঠক। ছোট ভাই আবুল বাশার আবদুল মুমিত নিউ ইয়র্কে প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকার। বোন আয়েশা খাতুন ভাই বোনদের মধ্যে সবার বড়। দেশের প্রখ্যাত গাইনোলজিস্ট ডা. শাহলা খাতুন তার মেজ বোন। শিপা হাফিজা ব্র্যাকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। নাজিয়া খাতুন ও রিও হাফিজা দু’জনই উচ্চ শিক্ষিতা। ওই পরিবারের দুঃখ একটাই। বোন ফৌজিয়া খাতুন অকালে তাদের ছেড়ে পরপারে পাড়ি দিয়েছেন। সংসার জীবনে মুহিতের প্রেরণা তার সহধর্মিণী সাবিয়া মুহিত। ব্যক্তিজীবনে সুখী এ দম্পতির কন্যা সামিনা মুহিত জাকার্তায় আমেরিকার ম্যানহাটন ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। বড় ছেলে শাহেদ নিউ ইয়র্কে কর্মরত। ছোট ছেলে সামির যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষকতা করেন।
ছাত্রজীবন থেকেই মেধাবী: স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি দুনিয়া সেরা হাভার্ড ইউনিভার্সিটিতেও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। ১৯৫১ সালে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী মুরারীচাঁদ কলেজ থেকে রেকর্ড নম্বর পেয়ে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৫৪ সালে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স ডিগ্রি লাভ করেন। এ পরীক্ষায় তিনি প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। ১৯৫৫ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ডিগ্রি নেন। চাকরিরত অবস্থায় ১৯৫৭-৫৮ শিক্ষাবর্ষে তিনি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেন। ১৯৬৪ সালে হাভার্ড ইউনিভার্সিটি থেকে এমপিএ ডিগ্রি অর্জন করেন।
ছাত্রদের নেতা, তবে কোন দলে নেই: ছাত্রদের দাবি-দাওয়া নিয়ে কথা বলতেন। সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বাম প্রগতিশীল আন্দোলনের তৎকালীন পুরোধাদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ছাত্রনেতা হিসেবে সিকিউরিটি অ্যাক্টে তাকে আটক করা হয়। তখনও তিনি সরাসরি কোন দলীয় রাজনীতিতে ছিলেন না। স্কুলের শিক্ষার্থীদের নিয়ে মুকুলমেলা, মুকুল ফৌজ সংগঠন করেছিলেন। তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন এসব সংগঠনের। এর মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়েছেন। মনে মনে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। তবে কোন সদস্য ফরম পূরণ করেননি।
বাবা-মা মুসলিম লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় ছোটবেলা দেশের বরেণ্য নেতা-নেত্রীদের দেখেছেন মুহিত। তাদের সান্নিধ্য পেয়েছেন। বিশেষ করে সিলেটের গণভোটে অংশ নেয়া বঙ্গবন্ধুসহ অনেককেই দেখেছিলেন খুব কাছ থেকে। তিনি পাকিস্তানি মৌলভীদের সঙ্গে সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চলে গণসংযোগ করতে গিয়ে দোভাষীর কাজও করেছিলেন। ১৯৪৭ সালের গণভোটে স্কুলপড়ুয়া মুহিতের অংশগ্রহণ ছিল তার রাজনৈতিক জীবনের প্রথম সোপান। এ ধারাবাহিকতায় তিনি আজ এ অবস্থানে।
সিএসপি হলেন যেভাবে: তখন তিনি মাস্টার্স পরীক্ষার্থী। ভাষা আন্দোলনে ছাত্রদের নেতৃত্ব দেয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় ছাত্রনেতা মুহিতকে। জেলে বসেই পরীক্ষার প্রস্তুতি নেন। শিক্ষা জীবনের শেষ পরীক্ষার পাশাপাশি কর্মজীবনের প্রবেশদ্বার পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস (সিএসপি) পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেন। মুহিত বলেন, তখন শিক্ষকরা প্রায়ই আমাদের দেখতে যেতেন। সান্ত্বনা দিতেন। সাহস যোগাতেন। জেলে যাওয়ার পর সিএসপি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। মনে হলো, সরকারের ভেতরে ঢুকেই তাকে আঘাত করতে হবে। জেলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আইনজীবী হওয়ার স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু জেল তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ১৯৫৬ সালে তিনি সিএসপি হিসেবে চাকরি জীবন শুরু করেন। ’৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখ সমরে নেতৃত্ব দেয়ার সুযোগ তার ঘটেনি। তবে তিনিই প্রথম প্রবাসী বাঙালি অফিসার যিনি যুদ্ধ শুরুর পর পরই নতুন সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন ঘোষণা দিয়ে। পাকিস্তান সরকারের চৌকস এ অফিসার চাকরি আর নিজের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা না করে যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্রোহ করেন পাকিস্তান দূতাবাসে। চাকরি ছেড়ে যোগ দেন মুক্তিকামী বাংলাদেশীদের পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনে।
যেভাবে আওয়ামী লীগে যোগদান
সাবেক স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর আকস্মিক মৃত্যুতে সিলেট-১ আসনে প্রার্থী নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়ে আওয়ামী লীগ। হেভিওয়েট প্রার্থীদের আসন বলে পরিচিত এ আসনে বিএনপির সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যোগ্য প্রার্থী খুঁজতে থাকে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব। আলোচনায় আসে আবুল মাল আবদুল মুহিতের নাম। তিনি তখন জাতিসংঘের এসাইনমেন্টে আমেরিকায় কর্মরত। বঙ্গবন্ধুর সরকারের বিশ্বস্ত অফিসার হিসাবে দলের তৎকালীন শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আগে থেকেই তার সুসম্পর্ক ছিল। তাদের তরফে দেশে ফেরার আমন্ত্রণ পেয়ে জাতিসংঘের এসাইনমেন্ট জমা দিয়ে তড়িঘড়ি ঢাকায় ফেরেন। দেখা করেন দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে। ২০০১ সালের ১লা অক্টোবরের নির্বাচনের আগে ৮ই আগস্ট দলে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদেন এবং সিলেট-১ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পান। কিন্তু ভোটের মাঠে তিনি খুব সুবিধা করতে পারেননি। ২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচনে প্রায় ৩৮ হাজার ভোটের ব্যবধানে সাইফুর রহমানকে হারিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৯ সালের ৬ই জানুয়ারি তিনি মহাজোট সরকারে অর্থমন্ত্রী হিসেবে যোগ দেন।
সর্বশেষ সংবাদ
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশি আমেরিকা পুলিশ কর্মকর্তার নামে সড়ক ‘ডিটেকটিভ দিদারুল ইসলাম ওয়ে’
- ECOSOC recommends UN General Assembly to take decision on Bangladesh and Nepal’s LDC graduation extension requests
- ইকোসকের সুপারিশ: বাংলাদেশ ও নেপালের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সাধারণ পরিষদ
- Bangladesh co-chairs multi-stakeholder panel session on Global Road Safety, calls for stronger institutions to save lives
- নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক বহুপক্ষীয় প্যানেল অধিবেশনে বাংলাদেশের যৌথ-সভাপতিত্ব; প্রাণহানি কমাতে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আহ্বান
- Road Transport Minister reaffirms Bangladesh’s commitment to halving road traffic deaths by 2030
- বাংলাদেশে ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি অর্ধেকে নামিয়ে আনার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর
- ধুমকেতু ছিনিয়ে নেয় সম্মোহনী টিয়েম্পো: ইয়ামালের উদ্দেশ্যে ফুটবল পদাবলি