বিমান বাংলাদেশ এয়ার লাইন্স “আকাশে শান্তির নীড়” -এ লাঞ্চিত আমেরিকা প্রবাসী যাত্রী!
রেহানুজ্জামান : আমেরিকায় জুন মাসে লম্বা ভেকেশন শুরু হয় ঠিকই কিন্তু জুলাই আগষ্ট এই দুই মাসকে ভেকেশনের মাস বলা যায়। আমেরিকায় এই দুই মাসকই হলিডে সিজন বলে। এই দুই মাস স্কুল কলেজ পুরোপুরি বন্ধ থাকে তাই স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীরা এই দুটি মাসকে প্রাণভরে উপভোগ করে। বিত্তশালীদের বাবা-মা’ রা তাদের সন্তাসন্তিদের নিয়ে দেশের বাইরে ইউরোপ, এশিয়া বা আফ্রিকাতে ছুটি কাটানোর জন্য নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। না হয় দেশের ভিতরে অন্য কোন ষ্টেটে নির্ধারিত সময়ে আনন্দ উপভাগ করার জন্য সন্তানদের সাথে নিয়ে ঘুরে বেড়িয়ে সময় পার করে আবার আপন গন্তব্যে ফিরে আসে। এটা হল আমেরিকান বাৎসরিক ট্রেডিশন ফি বছর এই নিয়মে চলতেই থাকে। তবে একটি বিষয় হল ব্যায়বহুল ভেকেশন আমাদের মত আমেরিকান অনেক ফ্যামেলি বহন করতে পারেনা। যাদের দেশের বাইরে যাওয়া সম্ভপর হয়ে উঠেনা। তাই দেশের ভিতরেই আশেপাশে কোথাও কাটিয়ে দিয়ে ভোকেশনাল ডিউটি পালন করে থাকে। আমাদের বেলায় ঠিক তাদের মত না হলেও জুলাই আগষ্ট মাস আসার পুর্ব মাতৃভূমি বাংলাদেশ ঘুরে আসার একটা প্রস্তুতি নিয়ে থাকি।অবস্থাসম্পন্ন পরিবার বাংলাদেশের দিকে না গেলে বাচ্চাদেরকে বিনোদন দেওয়ার জন্য ইউরোপীয় কোন দেশে না হয় দুবাইর বা সিজ্ঞাপুরের মত সুন্দর কোন দেশে নিয়ে যান।অনেক নিম্ন আয়ের পরিবার দেশকে প্রাধান্য দেয় বেশী কারণ তাদের আর্থিক দিক বিবেচনা করতে হয়। অনেক পরিবার আছে তারা দীর্ঘদিন ধরে প্রবাস যাপন করছেন কিন্তু পরিবারের সদস্য সংখার আধিক্যের কারনে হউক বা অর্থের অভাবে হউক। বিরাট অর্থের বোঝা বহনে অক্ষমতর কারণে কোথাও যাওয়া সম্ভব হয় না। সে দিক দিয়ে বিবেচনা করে তারা দেশে যাওয়াকে গুরুত্ত দেন বেশী। ফি বছর দেশে যেতে না পারলেও একবার না হয় দেশে গিয়ে ঘুরে আসেন। অনেক পরিবার আছেন তারা মাতৃভূমিতে যাওয়াকে আরেকটি কারণকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। কারণ হল আমারিকায় জন্মগ্রহণকারি বাংলাদেশী আমেরিকান বংশদ্ভূত এই প্রজন্ম, তাদের পৃথিভুমি সম্মন্ধে কোন ধারণা রাখে না, বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি, কৃষ্টি কালচার, সামাজিক মূল্যবোধ, ধর্মকর্ম, ইসলামী মূল্যবোধের প্রতি একেবারে অজ্ঞতা পরিলক্ষিত হয়।অজ্ঞতার অন্যতম কারণ হল মাবাবার কর্মব্যস্ততার কারণে নিজ গৃহে প্রাথমিক শিক্ষার সবক দেওয়া হয় না। তাই অনেক মা-বাবা তাদের সন্তানদেরকে বাপ-দাদার ভিটেমাটি পরিদর্শন, আন্মীস্বজনের সাথে পরিচিত হওয়া, ভাষা শিক্ষা এবং দেশীয় কালচারের সাথে উপযোগী করার জন্য দেশে নিয়ে যাওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। সময়মত বাল্যশিক্ষার উপর গুরুত্ত না দেওয়ার কারণে আমেরিকান অনেক নতুন প্রজন্ম পুরোপুরি আমারিকান কালচারের সাথে মিসে যায়। আমার জানা মতে কয়েকটি পরিবার সন্তানদের প্রাপ্তবয়ষ্কের মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার পরও তাদের দেশে যাওয়ায় সুযোগ হয় নাই। এমনকি তাদের সন্তানরা গৃহকোণে তাদের সাথে ইংরেজিতে কথা বলে। তাদেরকে বাংলা ভাষা শিক্ষা ও দেওয়া হয় নাই। প্রবাসীরা প্রতি বছর দেশ সফর করতে না পারলেও অন্তত দুই তিন বছর পর তাদেরকে নিয়ে মাতৃভূমি ঘুরিয়ে আসা মঙ্গলজনক বলে আমি মনে করি। চলতি বৎসর স্কুল ছুটির সময় দেশে গিয়ে ভেকেশন কাটানোর জন্য আমারও মনোবৃত্তি কাজ করেছিল সাথে ছিল আরেকটি পুর্ব পরিকল্পিত কাজ, ভাতিজিকে পাত্রস্থ করা। রথ ও দেখা, কলা বেচার মত, এক সাথে দুটি কাজ সম্পন্ন করা। ঠিক পরিকল্পনা মতো জুলাই মাসের উনিশ তারিখের জন্য কাতার এয়ার ওয়েজের জে এফকে টু ঢাকার ১৪ টি টিকেট কিনলাম। আবার ঢাকা টু সিলেটের বিমানের টিকেট ও সংগ্রহ করলাম। কারণ বাই রোডে ঢাকা থেকে সিলেট এত বড় বহর নিয়ে যাওয়া কষ্টকর হবে, বিয়ের অনুষ্ঠানে সামিল হব বলে কথা, সাথে আরো দুই ভাইয়ের পরিবার ছোট ছোট বাচ্চারা ও সাথে আছে। লম্বা জার্নিতে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত হয়ে আরো অতিরিক্ত পাঁচ থেকে ছয় ঘন্টার জার্নিত আধমরা হবার উপক্রম হবে। বিধায় শারিরীক অবস্থা বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্তে উপিনিত হলাম।

যথাসময়ে জুলাই মাসের উনিশ তারিখ বিরাট এক বহর ও সাথে এক ট্রাক পরিমাণ লাগেজ নিয়ে দুরু দুরু বুকে দেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি। রাত ন’টায় কাতারের উদ্দেশ্যে তেরো ঘন্টার ফ্লাইটে যাত্রা শুরু হয়। কাতারের রাজধানী দোহায় যাত্রা বিরতি করে ঢাকার উদ্দেশ্যে আবার যাত্রা শুরু করতে হয়। বাংলাদেশে ঘুরতে যাওয়া আর নিজের শরীরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার শামিল। এতো লম্বা জার্নি করে দেশে যাওয়ার স্বাধ পতিমধ্যেই ফিকে হয়ে উঠে। ফিকে হলেই বা কি নিজের দেশে ঘুরতে যাওয়াতেই অন্যরকম এক আনন্দ মনের অজান্তেই ঘুরপাক খেতেই থাকে, আনন্দে মন উদ্বেলিত হতেই থাকে। ১৯৯৫ সালে ঢাকা হয়ে সিলেট, বিমানের ফ্লাইটে গিয়েছিলাম সে এক করুণ অভিজ্ঞতা নিয়ে। আমরা সিলেটের প্যাসেঞ্জার ছিলাম পঁচিশ জনের মত ভোরে অবতরণ করে সাতটার ফ্লাইটকে বেলা একটার সময় দিয়েছিল। এই ফ্লাইটে দিতে আমাদেরকে অনেক ঝগড়াঝাটি, আন্দোলনের মাধ্যমে ফ্লাইট দিতে তাদেরকে আমরা বাধ্য করিয়ে ছিলাম। সেদিন বৈস্বম্যমুলক আচরণের কারণ নাকি অন্য কোন রহস্য কাজ করেছিল জানিনা। তারপরও অনেক বার দেশে বেড়াইতে গিয়েছি, ঢাকা হয়ে আর কোনদিন যাওয়া হয়নি।এবারের যাত্রায় বিমান বাংলাদেশ এয়ার লাইন্স কর্তৃপক্ষর অসাধচরন, অসৌজন্যমূলক, ও অমানবিক কার্যকলাপের সম্মুখীন হয়ে খুব মর্মাহত হয়েছি।ভোর তিনটা চল্লিশ মিনিটে কাতার এয়ারওয়েজের এয়ারক্রাফট দেশের মাটি স্পর্শ করার সাথে সাথে মনের মধ্যে এক শিহরণ জেগে ওঠে। যে নাড়ির টানে দশ সহস্র মাইল অতিক্রম করেছি আজ সেই মাটির কোলে নিজেকে সমর্পণ করে ধন্য মনে করতেছি। ইমিগ্রেশ্নের কাজ সম্পন্ন করার জন্য দ্রুত সামনের দিকে অগ্রসর হয়ে লাইন ধরি, এদিকে চারটা চল্লিশ মিনিটের সিলেটের ফ্লাইট ধরতে হবে এই চিন্তায় মাতার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।কচ্চপ গতির ইমিগ্রেশনের কাজ চলছে, কবে যে শেষ হবে এ দিকে হাতে অল্প সময়ের মধ্যে সিলেটের ফ্লাইট ধরতে পারব কিনা, তার পরও লাগেজ পিকাপের কাজ বাকি। ইমিগ্রেশনের কাজ সম্পন্ন করে তড়িঘড়ি করে লাগেজ পিকাপের জন্য ব্যাল্টের দিকে অগ্রসর হচ্ছি পথিমধ্যে কিছু দালালরা উপদ্রব শুরু করে দেয়, ট্রলী হাতে নিয়ে পিছু ছাড়ছেনা তারা নাকি লাগেজ পিকাপ করে বাহির পর্যন্ত পৌছিয়ে দিবে। আমাদের কোন সাহায্য লাগবেনা বললেও কথা শুনতেই চায় না। দেশের প্রধান একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কিছু ছিচকে বদমায়েশরা যাত্রীদেরকে অহেতুক হয়রানী করে, ছলচাতুরী করে, নাজেহাল করে পয়সা আদায় করতে চায়, যেন তাদেরকে বিমান কর্তৃপক্ষ ডিউটিতে রেখেছে।এইসব অপদ্রব দেখার মত যেন কেউ নেই।বিশ্বের কোন বিমানবন্দরে এমন দৃশ্য কেউ দেখছেন কি আমার মনে হয়না। তারা আমাদের পিছু ছাড়েনি ট্রলীতে করে কিছু লাগেজ এক জায়গায় এনে জড়ো করেছি তার মধ্যে একটি লাগেজ লাপাত্তা, অপেক্ষা না করে চলে আসলাম। এখন দালাল’রা পয়সা দাবি করে তাদেরকে কিছু দিতে হবে। কি আর করব এই কঠিন সময়ে ঝামেলায় না জড়িয়ে কিছু দিয়ে বিদায় করি।কি বিশ্রী ব্যাপার!! চল্লিশটির মত লাগেজ নিয়ে লকেল ফ্লাইটের কাউণ্টারে উপস্থিত হই খোজ নিয়ে জানতে পারলাম সকাল আটটার সময় কাউণ্টার খুলবে। যাইহোক কিছুটা স্বস্তী পেলাম তাহলে বিমানের দর্শন লাভের আশা আছে। আহ! এত ক্লান্ত পরিশ্রান্ত শরীরে যদি গা মেলে ধরার একটু সুযোগ পেতাম তাহলে নিজেকে মেলে ধরতাম। আরো ঘন্টা দুয়েক অপেক্ষা করতে হবে। কি আর করা অপেক্ষাতো করতেই হবে। অপেক্ষা, অপেক্ষায় যাত্রাপথ সমাপ্তির পালাআরো কিছু সময় অপেক্ষা করতে অসুবিধা কি। সকাল আট বিমানের ছোট একটি অফিস কামরা খুলে একজন বিমান কর্মকর্তা বসলেনধীরগতিতে ভাতিজাকে নিয়ে অফিসে ঢুকলাম। জিজ্ঞেস করলাম বিমান ছাড়তে আর কত সময় বাকি?তিনি উত্তর দিলেন বিমানের ফ্লাইট ছেড়ে চলে গেছে, আরে এ কি বলেন একজন বললেন আটটার পরে ফ্লাইট হবে তার পর আপনি এইমাত্র অফিস খুললেন অফিসবিহীন বিমানের কার্জক্রম কি এভাবে চলে? লোকটির চোখেমুখে রাগান্বিত ভাবে উত্তর দেয় আমি কি করব আপনারা ফ্লাইট মিস করেছেন আমাদের কিচ্ছু করার নেই। তাকে জিজ্ঞাসা করি ভাই আমরা অনেক যাত্রী আমেরিকা থেকে এসেছি সাথে ছোট ছোট বাচ্ছা আমাদের টিকেট আছে। মিস করেছি ওকে আমাদেরকে পরবর্তী ফ্লাইটে দেন। সোজাসাপটা উত্তর না আর কোন ফ্লাইট নেই। অতচ আমার জানামতে একের অধিক ফ্লাইট এই রুটে চলাচল করে। তাহলে লোকটি কি ডাহা মিত্যে কথা বলছে নাকি? আমার বুঝে আসছেনা। বিমান অফিসের লোকটির অমানবিক আচরণ আমাদেরকে বেশ আহত করেছে। আমাদের যাত্রাপথে এত বিড়ম্বনার স্বীকার হচ্ছি তা জেনেও লোকটি একটবারের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেনি। তার মধ্যে নেই কোন সৌজন্যবোধ, নেই মানবতাবোধ, সব্যতাভব্যতা শিষ্টাচারের কোন কিছুই লক্ষ্য করা জায়নি। অন্তত আমাদেরকে শান্তনা দিতে পারত আমাদেরকে কি করতে হবে না হবে বা কোন পথ বাতলে দিতে পারত না কোন কিছুই লোকটি করেনি। ভাবখানা এমন সমস্যায় পড়েছ ত আমি কি করব?
এই হল বাংলাদেশ বিমানের যাত্রীসেবার নমুনা। তখনই মনে পড়ে গেল বিমানের সেই আকষর্ণীয় বিজ্ঞাপনের কথা “বিমান বাংলাদেশ এয়ার লাইন্স আকাশে শান্তির নীড়” এই নীড়ে কি যে হচ্ছে, কেউ জানুক আর না জানুক যাত্রীরা ঠিকই টের পাচ্ছে। সেই নীড় এখন দুর্নীতিবাজদের আখড়ায় পরিণত হয়েছেঃ দলবদ্ধভাবে দুর্নীতিবাজরা লুটেপুটে খেয়ে বিমান বাংলাদেশকে ফতুর করে ছেড়েছে, তা নাহলে এমনিতেই কি ছোট হয়ে আসছে পৃথিবীতে, ছোট হয়ে যাচ্ছে বিমানের পরিধি? যেখানে বিশ্বের নতুন নতুন এয়ার লাইন্স তথ্যপ্রযুক্তির বিশ্বে ধাপটের সাথে ব্যাবসা চালিয়ে যাচ্ছে এর একমাত্র কারণ হল এয়ার লাইন্সের মানসম্মত যাত্রীসেবা। যে দেশের রিমিটেন্স যোদ্ধারা জীবনবাজি রেখে দেশে রিমিটেন্স পঠাচ্ছে, প্রবৃদ্ধি বাড়াচ্ছে। সরকারের নিযুক্ত অসভ্য কিছু কর্মকর্তা, কর্মচারীরা যাত্রীদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করে, অবহেলা করে, অপমানিত করে, লাঞ্চিত করে, যাত্রীদের কানাকড়ির মুল্য দেয় না, যে দেশের এয়ার লাইন্স সে দেশের প্রবাসী যাত্রীদেরকে একটুও সম্মান করে না এর চেয়ে দুঃজনক আর কি হতে পারে। অনেক চেষ্টা তদ্বির করে যখন উড়াল দিয়ে যাওয়া আর হল না তখন সড়কপথে দলবল নিয়ে গন্তব্যের পথে রওনা দিলাম। আহারে! বাংলাদেশ বিমান আর কত দিন এভাবে খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলবে। – রেহানুজ্জামান, নিউইয়র্ক।
- নিউইয়র্কে আমেরিকান ট্রাভেল এজেন্ট এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’র ইফতার ও দোয়া মাহফিল
- নিউইয়র্কে অ্যাসাল ওজোন পার্ক চ্যাপ্টারের ইফতার ও অভিষেক
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ ল সোসাইটি ইউএসএ’র ইফতার মাহফিল: খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকার আহ্বান
- BOROUGH PRESIDENT GIBSON HOSTS FOURTH ANNUAL BRONX IFTAR DINNER DIALOGUE UNDER THE THEME “UNITY IN DIVERSITY”
- নিউইয়র্কে মানসিক সংকটে থাকা যুবককে গুলি: পুলিশ প্রশিক্ষণ এবং মানসিক সংকটসংক্রান্ত ৯১১ কল
- নিউইয়র্কে গ্রী ম্যাকানিকেল ইয়াঙ্কার্স এর ইফতার ও দোয়া মাহফিল
- নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গমাতা পরিষদ’র ইফতার ও দোয়া মাহফিল
- নিউইয়র্কে ঢাকা জেলা অ্যাসোসিয়েশনের ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত








