ভালবাসার লেলিহান উৎসব

ড. মাহফুজ পারভেজ: ১৪ ফেব্রুয়ারী ‘বিশ্ব ভালবাসা দিবস’: স্মৃতির জাগরণ আর প্রতিশ্রুতির পুনরুচ্চারণে যুথবদ্ধ-তারুণ্য-যৌবনের লেলিহান উৎসব। বসন্তের উদ্দাম বাতাসে রঙিন ফুল ও প্রজাপতির মেলায় উৎসব ছাড়া অন্য কোনভাবেই মানবসমাজই বাঁচে না। বাঙালি তো বাঁচেই না। হয়তো বারো মাসে তেরো পার্বণের ইমেজটি এদেশে হালে উপকথা বা অতিশয়োক্তিতে পরিণত হয়েছে; তথাপি অতি-অগ্রসর, অতি-যান্ত্রিক, ধনতন্ত্রের কিছু কিছু ক্ষয়িষ্ণু মানুষ ও সমাজের দেশছাড়া বিশ্বের সব দেশের মতোই বাংলাদেশেও ‘ভালবাসা দিবস’ প্রবলভাবে উৎসবমুখর। ঢাকাসহ সমগ্র দেশ আজ সাজবে ভালবাসার বহুবর্ণা সাজে।
তত্ত্বের ভাষা: বৃষ্টি, জল, চাষাবাসের সঙ্গে শ্রমের সংযোগ যেখানে গভীর আর প্রত্যক্ষ, সেখানেই উৎসব। সেখানেই মানুষ মুখর, সেখানেই মানুষ মিশতে চায়, একের সঙ্গে অপরকে মেলাতে চায়। যদিও আমাদের প্রধান উৎসব ধর্মীয়, তবুও মানুষের সমপ্রদায়মুক্ত মনুষ্যত্বের টানে সমপ্রদায়-নিরপেক্ষ আবহ যে উৎসবে প্রধান হয়ে ওঠে, তার নাম ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’ বা ‘ভালবাসা দিবস’ বা ব্যাপকার্থে ‘ভালবাসা উৎসব’।
‘ভালবাসা দিবস’ বা ‘ভালবাসা উৎসব’ আমাদের দৈনন্দিন গ্লানি-যাতনা-অপ্রাপ্তিকে যেমন ভুলিয়ে দেয়, তেমনি দিনযাপনের পাতায় পাতায় সঞ্চারিত করে অন্য এক সুর-ব্যঞ্জনা। আমাদের সাদামাটা দিনগুলোর রঙ বদলায়। ভালবাসাকে ঘিরে অন্তরে-বাহিরে জেগে ওঠে এক মহাসমুদ্র। স্মৃতির জাগরণে যার উত্থান, প্রতিশ্রুতির পুনরুচ্চারণে যার পুনরাবৃত্তি।
মহাচীনের প্রাচীন দার্শনিক চুয়াংৎসে-এর কথাই ধরা যাক, যার দর্শন-কথাবার্তা-ভাবনা-চিন্তার ধরনই ছিল আলাদা। ভালবাসা তার কাছে ছিল আত্মমগ্ন-নীরব প্রার্থনার প্রতীক। স্ত্রীর মৃত্যুর পর গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে বন্ধুকে বলেছিলেন, “আঃ, বোকার মতো শোক জানাতে এসেছো কেন? আমি যাকে হারালাম সে তো দিব্যি আমার অন্দর-মহলের ঘরে শুয়ে ঘুমিয়ে আছে।” সামপ্রতিক সময়ে এমনই আত্মমগ্নতার ধ্বনি শোনা গেছে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্য’ পর্বের কবিতায়।
আসলেই তো, জীবনকে ঠিকভাবে বুঝে নিতে হলে তাকে বারেবারে বিপরীত প্রেক্ষিত থেকে দেখে নেয়া দরকার। মৃত্যুর মাধ্যমেই তো জীবনের তাৎপর্য ও গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়। অন্ধকারকে দিয়েই তো আলোর মূল্য ঠিকভাবে নির্ণয় করা যায়। বিষাদেই সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট হয়- প্রেম, ভালবাসা।
প্রেম ও বিষাদের পরীক্ষায়, প্রাচীন ও মধ্যযুগের মতো বাংলা ভাষার আধুনিক কবিগণও বিশেষ পারঙ্গমতা দেখিয়েছেন: ‘লিপস্টিক বুলানো ঠোঁটের/মখমলে চেপে ধরি ঠোঁট, হৃৎকম্পন বেড়ে যায়, স্তব্ধ হয়/পৃথিবীর গতি;/সে মুহূর্তে জঙ্গি ট্যাঙ্ক আমার ওপর দিয়ে চলে গেলে কিছুই পাবো না/টের, শুধু ঠায়/থাকবো দাঁড়িয়ে খাজুরাহো মুগ্ধতায়।’ (শামসুর রাহমান: নিভৃতে আমার অগোচরে)
কিংবা আরও গভীর কোন কাব্যাক্রান্ত উচ্চারণের ভেতর দিয়ে শুনতে পাওয়া যায়: ‘কালেভদ্রে একটুখানি দেখার জন্য/ঘুরে বেড়াই যত্রতত্র, দাঁড়িয়ে থাকি/পথের ধারে।/রোদের আঁচে পুড়ে যায়/যখন তখন/জল-আঁচড়ে আত্মা থেকে রক্ত ঝরে;/দূর দিগন্ত আস্তেসুস্থে রক্ত চাটে।’ (শামসুর রাহমান: কালেভদ্রে একটুখানি)
উদাহরণ দেয়া যায় রফিক আজাদের বহুখ্যাত ‘ভালবাসার সংজ্ঞা’ কবিতার পঙ্ক্তি থেকেও: “ভালবাসা মানে দু’জনের পাগলামি,/পরস্পরকে হৃদয়ের কাছে টানা/ভালবাসা মানে শেষ হয়ে-যাওয়া কথার পরেও/মুখোমুখি বসে থাকা।”
যথার্থ প্রেমের কবিতার প্রতিচ্ছবি রফিক আজাদেরই ‘নৈশ প্রার্থনা’ কবিতায় আরও সর্বাত্মকভাবে উদ্ভাসিত, যেখানে প্রেমের সমান্তরালে খেলা করে বিষাদের ভেলা: “কোথাও অনিন্দ্য গোলাপ ফুটুক আজ/কোনও নৈশ নীরব বাগানে; আমি একা সঙ্গোপনে/ঘ্রাণ নেবো বিশ্বস্ত হাওয়ায়।”
‘দুঃখ-কষ্ট’ কবিতায় উচ্চারিত পঙ্ক্তিতে প্রেমের সঙ্গে সঙ্গে অব্যক্ত বেদনাও হৃদয় খুঁড়ে জাগিয়ে তুলেছেন রফিক আজাদ: ‘তুমি চলে গেলে দূরে/নিঃস্ব রিক্ত পাখির পালকসম একা পড়ে থাকি।’
জীবনানন্দ দাশ, যিনি কবিতায় অদ্বিতীয়, মৃত্যু-পরবর্তীতে প্রকাশিত ‘বিভা’ উপন্যাসেও লিখেছেন প্রেমময় আখ্যান: “বিভার মুখের লাবণ্য বেশ উচ্চ জাতীয়। সচরাচর এ রকম সৌন্দর্য্য চোখে পড়ে না। খুব অবর্ণনীয় সৌন্দর্য্য নয়- কিন্তু এর বিশেষ ধরনটা আমার কাছে বড্ড চিত্তাকর্ষক। অনেক নারীই তো দেখেছি- কিন্তু একটা মেয়ের কথা মনে পড়ে যায়, মুখ অনেকটা এই বিভার মতো। সেই মেয়েটি ষোল সতের বছরে মারা যায়। মৃত্যু বড় করুণ। তার মৃত্যুর পর আমার মনে হয়েছিল যুবাবয়সের সৌন্দর্য্যের একটা বিশেষ বিকাশ পৃথিবী থেকে মুছেই গেল বুঝি বা-। তারপর এই বিভাকে দেখলাম। মনে পড়ে প্রায় সাত বছর আগে বায়স্কোপে (চার আনার সিটে) বসে রুথ চ্যাটারটনকে দেখেছিলাম। আজ মনে হচ্ছে গঙ্গাসাগরের মেলা দেখতে গিয়ে মৃত সেই পাড়াগাঁর মেয়েটি, বিভা আর রুথ, এই তিনজনের মুখে একই আদল লেগে রয়েছে যেন- একটা ছিপছিপে নিমীলিত চাঁপাফুল কিংবা শীর্ণ একটা উন্মুখ চাঁপার কলির মতো নারীর আঙুলের দিকে তাকালে এ সৌন্দর্য্যের উপলব্ধি করতে পারা যায়।”
অতবএব ভালবাসা যেমন স্মৃতির জাগরণ, তেমনি প্রতিশ্রুতিরও পুনরুচ্চারণ। ভালবাসা দিবসের উৎসবে আমরা হৃৎকমলের স্মৃতি মাখি, তারই প্রতিশ্রুতি পুনরুচ্চারণ করি স্মৃতি-সত্তার গভীর অন্তর্মূল থেকে বর্তমান হয়ে ভবিষ্যতের দিকে প্রবহমান ভালবাসা নামের একটি রোমাঞ্চকর নদীতে ভাসতে ভাসতে… I মানবজমিন
ড. মাহফুজ পারভেজ: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক; আশি দশকের কবি। [email protected]
- বাংলাদেশ ল’ সোসাইটি ইউএসএ’র সভাপতি ওয়াহিদ ও সাধারণ সম্পাদক কামালকে অব্যাহতি; ব্যারিষ্টার আকমাম ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও শাবু ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে
- SUSPENDED ATTORNEY CHARGED WITH GRAND LARCENY FOR STEALING MORE THAN $1 MILLION FROM BORROWERS, DIME COMMUNITY BANK
- Six Bangladeshi Peacekeepers Posthumously Awarded UN Dag Hammarskjöld Medal
- নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ড্যাগ হ্যামারশোল্ড পদকে ভূষিত ছয় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী
- যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া স্টেট সিনেট নির্বাচনে বাংলাদেশি-আমেরিকান শেখ রহমানের টানা পাঁচবার জয়
- A Star Dimmed: Mourning the Loss of Tofail Ahmed, Architect of Our History
- নিউইয়র্ক ষ্টেট অ্যাসেম্বলী ডিষ্ট্রিক্ট-৩০’র প্রাইমারী নির্বাচনে শামসুল হকের সমর্থনে জ্যামাইকায় ফান্ড রেইজিং
- Bangladesh Secures Historic Victory in UNGA Presidency