Thursday, 22 October 2026 |
শিরোনাম
New York Attorney General James Secures Reimbursements for T-Mobile Customers Whose Rates Were Unjustly Raised নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে কুনু-ফিরোজ পরিষদের সাত দফা ইশতেহার ঘোষণা; কমিউনিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠা, সাশ্রয়ী ফিউনারেল সেবা, বিমানের সরাসরি ফ্লাইট ও আর্থিক স্বচ্ছতায় অঙ্গীকার ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের পূর্ণ সমর্থন: জাতিসংঘে রাষ্ট্রদূত আইরিন খান নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে প্রথমবারের মতো বিতর্ক, গুরুত্ব পেল স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি New York Attorney General James Warns New Yorkers About AI-Generated Election Misinformation Ahead of November Elections Bangladesh calls for global treaty to protect victims of crimes against humanity নিউইয়র্কে জাতিসংঘে মুহাম্মদ নওশাদ জমির এমপি: মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রতিরোধে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সনদ প্রণয়নের আহ্বান সোশ্যাল মিডিয়ার তথ্য গোপন করলে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাখ্যান, আবেদনপত্রে চাওয়া তথ্য সঠিক ও সম্পূর্ণভাবে দেওয়ার নির্দেশনা মার্কিন দূতাবাসের ভার্জিনিয়ায় অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক হারুন চৌধুরীকে দেখতে গেলেন বাংলাদেশি কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ New York Attorney General James Issues Voter Guidance to Inform New Yorkers of Their Rights Ahead of November Election
সব ক্যাটাগরি

মনে হয় সেদিন মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট না নিয়ে ভুল করেছিলাম : মতিউর রহমান চৌধুরী

অনলাইন ডেস্ক পঠিত: 96 বার

প্রকাশিত: December 14, 2020 | 4:12 PM

মনে হয় সেদিন মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট না নিয়ে ভুল করেছিলাম। এখন প্রতিনিয়ত ভাবি, সার্টিফিকেট নেয়াই বোধকরি দরকার ছিল। প্রচণ্ড আবেগ কাজ করেছিল তখন। ভাবিনি দেশের জন্য কিছু করে সুবিধা নিতে হবে। এখন হাড়ে হাড়ে তা টের পাচ্ছি। মাঝে মধ্যে অসহায়ও লাগে। একটা সার্টিফিকেটের যে কতো প্রয়োজন! এমন তো নয়, সার্টিফিকেট পাওয়া কঠিন ছিল। সুযোগ ছিল, যোগ্যতাও ছিল।

১৯৭১ সনের ২৬শে মার্চ। সাত বন্ধু মিলে আগের দিন বিকালেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, পাক বাহিনীকে আটকাতে রাস্তায় ব্যারিকেড দিতে হবে। গুঞ্জন ছিল, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ২৫শে মার্চ রাতে মৌলভীবাজার শহরে প্রবেশ করবে। মাত্র দু’দিন আগেই ঢাকা থেকে ফিরেছি। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভোরবেলা বন্ধুরা মিলে গাছ কেটে মৌলভীবাজার সরকারি হাইস্কুলের সামনে রাস্তায় ব্যারিকেড দিচ্ছি। এমন সময় পেছন থেকে একটা ট্রাক এসে দাঁড়ালো। ‘হল্ট’ বলতেই সবাই দাঁড়িয়ে গেলাম। পাক সেনারা হুড়মুড় করে ট্রাক থেকে নামলো। ভয়ে বুক কাঁপছে। আমাদেরকে একে একে ট্রাকে উঠতে বললো। চোখ বেঁধে ফেললো তখন সবার। জানি না কী হবে? ট্রাক ছুটলো পাহাড়ের দিকে। সার্কিট হাউস পার হয়ে পিটিআই ভবনে গিয়ে থামলো। পাক বাহিনী সেখানেই ক্যাম্প করেছে। ট্রাক থেকে নামিয়ে সবাইকে কাতারবন্দি হতে বললো। ভাবলাম, এই বুঝি শেষ। একটা বড় রুমে ঢুকিয়ে হাত বেঁধে ফেললো। একজন মেজর আসলেন। রেগেমেগে অস্থির। মেজরের কণ্ঠে একটা শব্দই বারবার শুনছিলাম, ‘ওরা সব গাদ্দার’। বসার কোনো সুযোগ নেই। ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। এক পর্যায়ে মার শুরু হলো। লাঠি দিয়ে সজোরে আঘাত হাতে-পায়ে। আমাদের চিৎকারে বাতাস ভারী হয়ে গেল। মাঝে বিরতি। আবার লাঠির শব্দ শুনে বুক কেঁপে উঠলো। দুপুর হয়ে গেছে তখন। একজন সিপাই এসে নাম-পরিচয় লিখতে বললো। লিখলাম। পরিচয় দিলাম না। এর কিছুক্ষণ পর দু’জন সিপাই এসে হাত খুলে দিলো। ভাবলাম, এখনই মনে হয় ক্রসফায়ারে নিয়ে যাবে। আশঙ্কা ভুল হলো। দু’টো রুটি, একটু হালুয়া রেখে গেল। খাবারের ইচ্ছে নেই। তারপরও বন্ধুরা খাচ্ছে দেখে একটা রুটি খেলাম। কিছুক্ষণ পর আবার হাত বেঁধে দিলো। বসার অনুমতি নেই। কতক্ষণ আর দাঁড়িয়ে থাকা যায়। বাথরুমেও যেতে দিচ্ছে না। বুদ্ধি করে একযোগে আমরা শব্দ করতে থাকলাম। এরপর এলেন একজন ক্যাপ্টেন। উর্দুতে জানতে চাইলেন, কেন এই চেঁচামেচি। বাথরুমের কথা বলতেই ক্যাপ্টেনের মন গললো। কী মনে করে পারমিশন দিলেন। তবে শর্ত, একজন একজন করে যেতে হবে। সিপাই-এর কড়া পাহারার মধ্যে বাথরুমে গেলাম। এভাবেই চললো। রাতেও দু’খানা রুটি আর ভাজি। ভোর হয়ে গেল। হাত খুলে দিয়ে আবার লাঠিপেটা। অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ। দুপুরের দিকে আমাদেরকে আলাদা করে ফেললো। কারও সঙ্গে যোগাযোগ নেই। ফিসফিস করে কথাবার্তার সুযোগও বন্ধ হয়ে গেল। একি নিষ্ঠুরতা! বন্দিদশা থেকে মুক্তি পাবো এমনটা ভাবছি না। প্রতিমুহূর্তেই মনে হচ্ছে, এই বুঝি শেষ। স্থানীয় এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা এলেন। জানতে চাইলেন, আসলে আমরা কে, কী করি। এবার বলতে হলো, পড়াশোনা করি। রাজনীতি করি না। অথচ সে সময় আমি ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয়। তথ্য গোপন করা অপরাধ। বাঁচার তাগিদে তাই বললাম। ক্যাপ্টেনের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হলো না। কারণ যারা রাস্তায় ব্যারিকেড দিতে যায় তারা নিশ্চয়ই বিচ্ছিন্নতাবাদী ও দেশের শত্রু। এবার অনেকটা নিশ্চিত হয়ে গেলাম, মুক্তি নেই। ওরা পরিচয় জেনে গেছে। বাইরের দুনিয়ায় কী হচ্ছে জানি না। শুধু এটুকু বুঝি, পাক বাহিনীর পুরো নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে মৌলভীবাজার। শক্তিও বৃদ্ধি করেছে তারা। পাক্কা দু’দিন মার খেতে খেতে একদম কাহিল। শরীরে বিন্দুমাত্র শক্তি নেই। মায়ের কথা বারবার মনে পড়ছে। গ্রামের বাড়িতে আমার গ্রেপ্তারের খবর গেছে কিনা জানি না। গেলে মায়ের কি অবস্থা! এসবই নীরবে ভাবছি। কারও সঙ্গে শেয়ারও করতে পারছি না। তৃতীয় দিন বিকালে শুনলাম, আমাদের চার বন্ধুকে ট্রাকে উঠিয়ে নিয়ে গেছে সেনারা। কোথায় নিয়ে গেল জানবো কী করে! মনের ভেতর আশঙ্কা জমাট হচ্ছে। এদের ভাগ্যে না জানি কী ঘটছে! অন্যদের কথা কি বলবো! নিজের কথা ভেবেই তো অস্থির। গভীর রাতে একজন অফিসার এসে আমার হাত খুলে দিতে বললেন। মনে হলো আমাকেও অজানা কোনো এক গন্তব্যে নিয়ে যাবে। কোথায় সে গন্তব্য? রাত তিনটার কিছু পরে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে আমাকে হেঁটে যেতে বললো। ভয়ে তখন হাত-পা থরথর করে কাঁপছে। শুনেছিলাম, পেছন থেকে নাকি ওরা গুলি করে। হাঁটতে পারছি না ভয়ে, আশঙ্কায়। কিছুদূর হেঁটে মনে হলো, পেছনে কেউ নেই। আমি মুক্ত। পা যে আর চলছে না। তিনদিন, তিনরাত হাত বাঁধা অবস্থায় একটা মানুষের শরীরে শক্তিইবা কতদূর থাকে! ভোরের সূর্য উঁকি দিচ্ছে। আজানের শব্দ শোনা যাচ্ছে। মৌলভীবাজার কলেজের পেছনে বর্শিজোড়া গ্রামে যখন পৌঁছেছি তখন দেখা হলো এক ভদ্রলোকের সঙ্গে। মসজিদে নামাজ পড়তে যাচ্ছেন। সাত সকালে এমন একজনকে দেখে মনে হবে- চোর-ডাকাত। ভদ্রলোক পরিচয় জানতে চাইলেন। শুনে বললেন, ভাই আপনাদের কথা শুনেছি। জানেন বোধহয়, চারজনকে মনু নদীর সেতুর ওপর দাঁড় করিয়ে পাকবাহিনী ব্রাশ ফায়ার করেছে। না ভাই, জানবো কী করে? কারও সঙ্গে কারও যোগাযোগ ছিল না। ভদ্রলোক বললেন, শহরে মনে হয় এখনো আর্মি আছে। বুঝে পা ফেলবেন কিন্তু। তিনি ছোট করে এটাও বললেন, কেন ভাই আপনারা এতো বড় ঝুঁকি নিলেন? রাস্তায় ব্যারিকেড দিতে গেলেন কেন? কি আর বলবো! বঙ্গবন্ধুই তো ডাক দিয়েছিলেন যার যা কিছু আছে তাই দিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে। মগজে বঙ্গবন্ধুর সে ডাক আমাদেরকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। জীবনকে তুচ্ছ ভেবেই সেদিন ক্ষমতাধর পাক বাহিনীর গতিরোধ করতে চেয়েছিলাম।
যাই হোক, সেটা এখন অতীত। বেঁচে আছি এটা বিস্ময়কর। কিছুটা পথ বাসে, কিছুটা পথ হেঁটে যখন বাড়ি পৌঁছলাম তখন আরেক দৃশ্য। গ্রামে ঢোকার পথে একের পর এক প্রশ্ন। ‘ওমা আপনি বেঁচে আছেন! আপনার বাড়িতে কুলখানি হয়ে গেছে। সবাই জানে আপনাকে পাক বাহিনী মেরে ফেলেছে’। মায়ের আহাজারির মধ্যেই বাড়ি পৌঁছলাম। গ্রামের লোকজন তখন ভিড় করেছে। সবাই শুনতে চায়- কি হয়েছিল? বলতে বলতে ক্লান্ত। মা তখন নামাজের পাটিতে। হইচই শুনে মা তখনও বুঝতেই পারেননি, আমি এসেছি। পরের খবর আর কী বলবো। মায়ের হাসি-কান্নায় কেটে গেল অনেকটা সময়। বাড়িতেও থাকতে পারলাম না। পালিয়ে থাকতে হতো। দেশ স্বাধীন হলো। কলেজে ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়ে গেলাম। ছাত্রলীগ থেকে আমিই প্রথম ভিপি হয়েছিলাম। এর আগেই অবশ্য সাংবাদিকতায় যোগ দিয়েছি। তারও একটা ইতিহাস রয়েছে। প্রয়াত রাষ্ট্রচিন্তাবিদ ও রাজনীতিক শেখ ফজলুল হক মণির (মণি ভাই) নির্দেশেই সাংবাদিক হয়েছিলাম। তার নির্দেশ ছিল- যুদ্ধ শেষ হয়েছে। এখন নতুন করে যুদ্ধে নামতে হবে। পিকিংপন্থিদের হাত থেকে সাংবাদিকতাকে মুক্ত করতে হবে। পিকিংপন্থি এখন অতীত, ইতিহাসের অংশ। আগে অনেক লেখায় লিখেছি। ছাত্র রাজনীতিতেও ছিলাম সক্রিয়। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির গবেষণা ও প্রকাশনা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছি। আমাদের কমিটির প্রায় সবাই রাজনীতি করছেন। অনন্য খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। অনেকে মন্ত্রী ও এমপি হয়েছেন। আমার পথ সম্পূর্ণ আলাদা। কারও বন্ধু হতে পারলাম না। বার কয়েক চাকরি হারালাম। জেলেও গেলাম। বিদেশেও থাকতে হলো।
যাই হোক, এরমধ্যে উল্লেখ করতেই হয় সফল রাজনীতিবিদ ও সজ্জন ব্যক্তিত্ব প্রয়াত সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের কথা। তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন। আরেক বন্ধু ওবায়দুল কাদের এখন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। তার সঙ্গে বন্ধুত্ব অটুট। আমি তার ভালো কাজে প্রশংসা করি। সমালোচনাও করি নিঃসংকোচে। অযথা প্রতিক্রিয়া দেখান না। কষ্ট পেলেও প্রকাশ করেন না। মনিরুল হক চৌধুরী ছিলেন আমাদের সভাপতি। রাজনীতি আর ব্যবসা নিয়ে ভালোই আছেন। তবে ভিন্নস্রোতে। শুরুটা করেছিলাম মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট নিয়ে। সার্টিফিকেট পাইনি। এতে কোনো দুঃখবোধ নেই। কারও প্রতি ক্ষোভও নেই। মাঝে মধ্যে শুধু মনে হয়, সার্টিফিকেট থাকলে ভালোই হতো। একটা দেশের স্বাধীনতার জন্য এটুকু অবদান খুবই সামান্য। সেদিন শহীদও হয়ে যেতে পারতাম। তখন প্রতিষ্ঠিত কেউ ছিলাম না। হয়তো কেউই মনে রাখতো না। তবে দেশের কাছে আমি ঋণী। কারণ দেশ স্বাধীন না হলে প্রধান সম্পাদক হতে পারতাম না। এটা নিশ্চিত করেই বলতে পারি। মানবজমিন

বিজ্ঞাপন / স্পন্সরড কন্টেন্ট
ট্যাগ:
সর্বশেষ সংবাদ