মুক্তিযোদ্ধা গণসংগীত শিল্পী মাহবুবুল হায়দার মোহনকে স্মরণ ছড়াকার মনজুর কাদেরের: ‘আমার মোহনদা’
মনজুর কাদের : আটাশির বানভাসিতে সারাদেশ থৈ থৈ। ঢাকা শহর পানির নীচ থেকে কোন রকম নাক জাগিয়ে বেঁচে আছে। নগরবাসীর কষ্টের সীমা নেই।

স্কুল কলেজ বন্ধ। অফিস আদালতের কর্মচারীদের অশেষ দুর্ভোগ। অফিস কামাই চলবে না। শহরে নৌকা চলা শুরু হলো। কর্মচারীরা প্যান্ট শার্ট ব্যাগে পুরে লুঙ্গি পড়ে নৌকায় অফিসে এসে কাপড় বদলে নেয়।
এরকম নৌকায় একদিন মোহনদা’র সাথে পরিচয়। জানলাম দুজনেই এক অফিসে চাকরি করি। সেদিন থেকেই মোহনদা আমার বড়ভাই, বন্ধু, সুহৃদ।
এমন নিঃস্বার্থ পরোপকারী মানুষ আমি ঢাকায় কম দেখেছি। নিজের নাওয়া খাওয়ার খবর নেই, কোনও সহকর্মী অসুস্থ হলে মোহনদা উদ্যোগী হয়ে হাসপাতালে পাঠায়, চিকিৎসার খরচ কিভাবে যোগান হবে সে আয়োজনে ব্যস্ত হয়। এসব ব্যস্ততার জন্য অফিসে কোনদিন তাঁকে ঠিকসময়ে দুপুরের খাবার খেতে দেখিনি।
সদাহাস্য মোহনদা তখন নবগঠিত ‘ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠী’র সভাপতি । আমাকে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক এর দায়িত্ব দেয়া হলো। সেই থেকে দুজনে অনেক পথ হেঁটেছি, অনেক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করেছি। একদিন বললেন, “বন্যাদুর্গতদের জন্য কিছু করা দরকার” “কিভাবে করবেন”?
“সারাদিন ভিক্ষা করবো, রাতে বানের পানিতে আটকে পড়া পরিবারগুলোকে যতটুকু সাধ্যে কুলায় খাবার দিয়ে আসবো”।
আমরা কাজে লাগলাম। মোহনদা আর নিলুফার বানু লিলির (সদ্য প্রয়াত) কণ্ঠের সাথে জলে ভেজা রাস্তায় গান ধরতাম “মায়ের দেয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নে রে ভাই, দ্বীন দুখিনী মা যে আমার এর বেশী আর সাধ্য নাই” অথবা “বঙ্গ আমার জননী আমার ধাত্রী আমার, আমার দেশ,…” আর নগরবাসীর কাছে হাত পাততাম। ছেলেদের প্যান্ট আর মেয়েদের শালোয়ার শাড়ীর অর্ধেকটা ভিজে একাকার হতো । যারা বয়সে নবীন ছিল তাদের সে কি উৎসাহ । ওঁদের বাবা মা স্বজনদেরও ডেকে আনত এবং ভিক্ষায় শামিল করত। নাহিদ, কাজল খন্দকার, পলাশ, তুলি, মাধুরী, কবিতা, মিলন, আখের, মামুনসহ ক্রান্তির ক্রান্তিকালীন বন্ধুদের ত্যাগের কথা মনে হলে আজও চোখের কোনে জল আসে।
নগরবাসীও আমাদের যারপরনাই উৎসাহ দিতেন এবং সাধ্যমত দান করতেন। একদিন একজন শ্রদ্ধেয় নাগরিক আমাদের হাতে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে কিছুটা স্নেহমাখা ধমকের সুরে বললেন, “চিল্লাইয়া তো গলা ভাঙছ, শেষে তো জ্বর বান্ধাইয়া বিছনায় পরবা, আইজকা চিল্লানি খান্ত দেও“। ওইদিন আমরা এগারোটা নৌকা ভাড়া করেছিলাম। তাঁর কৃত্রিম ধমকের আড়ালে স্নেহের কথা আজও কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করি।
সারাদিনের সংগৃহীত অর্থে চাল ডাল নুন মোমবাতি আর পানি শোধক বড়ি কিনে পলিথিন প্যাকেট করে সন্ধ্যায় ভাড়া করা নৌকায় ঢাকা শহরের ঢালে আটকে পড়া দুর্গতদের মাঝে পৌঁছে দিতাম। পুরো বিষয়টা তত্বাবধান করতেন মোহনদা। সারাদিন অফিস করে বিকেলে ভিক্ষে করে সন্ধ্যায় বাড়ী বাড়ী ত্রান বিলাতে গিয়ে আমাদের মধ্যে অনেকেই অসুস্থ্য হয়ে পড়লেন। একদিন আমারও জ্বর এলো। মোহনদার কাছে ছুটি চাইলে তিনি অনুনয় করলেন, “দেখুন কিছু পরিবার আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে, আমরা ত্রান নিয়ে গেলে ওঁদের বাচ্চাদের সারাদিনের উপোষ ভাঙে“।
জ্বর নিয়েই গেলাম। নৌকায় মোহনদা বমি করলেন, আমি মাথায় হাত দিয়ে দেখলাম গায়ে জ্বর।
“কতদিন ধরে?”
“চার পাচদিন”
একদিন সিলেটে বদলির আদেশ পেলাম। ক্রান্তি অফিসে ঘটা করে বিদায়ের আয়োজন হোল। আমাকে একপাশে ডেকে নিয়ে মোহন দা বাচ্চাদের মতো ফুফিয়ে কাদলেন, “আমদের ছেড়ে চলে যাবেন, আমার একটা হাত ভেঙে গেলো”। টপ করে আমার বাহুতে মোহন দার চোখের পানির ফোঁটা পড়লো। বড় বেশী তপ্ত আর ভারী ছিল সেটি।
সহজ সরল আপাদমস্তক এই সাধু পুরুষটি এখন আমাদের কাছে স্মৃতি। মাঝে মধ্যে মোহন দার জন্য মন কেমন করে। কারো সাথে শেয়ার করতে পারি না।আমার বাহুতে যেখানে মোহন দার মমতা ভরা চোখের জল পড়ে ছিলো, সেইখানটায় আলতো করে হাত বুলাই। আমি মোহন দার উষ্ণতা অনুভব করি।
– লেখক ও ছড়াকার, নিউইয়র্ক।
- ওয়ার্ল্ড হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট ইউএসএর সাধারণ সম্পাদক ড. সাদিয়া আফরিন এরা
- চরমোনাই পীরের যুক্তরাষ্ট্র সফর উপলক্ষে নিউইয়র্কে দোয়া মাহফিল, কুরআন-সুন্নাহর আলোকে বয়ান
- New York Attorney General James Secures Reimbursements for T-Mobile Customers Whose Rates Were Unjustly Raised
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে কুনু-ফিরোজ পরিষদের সাত দফা ইশতেহার ঘোষণা; কমিউনিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠা, সাশ্রয়ী ফিউনারেল সেবা, বিমানের সরাসরি ফ্লাইট ও আর্থিক স্বচ্ছতায় অঙ্গীকার
- ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের পূর্ণ সমর্থন: জাতিসংঘে রাষ্ট্রদূত আইরিন খান
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে প্রথমবারের মতো বিতর্ক, গুরুত্ব পেল স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি
- New York Attorney General James Warns New Yorkers About AI-Generated Election Misinformation Ahead of November Elections
- Bangladesh calls for global treaty to protect victims of crimes against humanity