সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি ও বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলায় নিউইয়র্কে ২ বিলিয়ন ডলারের মহাপ্রকল্প
ইউএসএনিউজঅনলাইন.কম ডেস্ক, নিউইয়র্ক : এক দশকেরও বেশি আগে হারিকেন স্যান্ডির ভয়াবহ আঘাতে বিপর্যস্ত হয়েছিল নিউইয়র্ক। ২০১২ সালের অক্টোবরে শক্তিশালী ওই ঝড়ে নগরীতে প্রাণ হারান ৪৪ জন। বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েন প্রায় ২০ লাখ মানুষ। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৯ বিলিয়ন ডলার। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও উপকূলীয় বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলায় এবার বড় ধরনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলছে নিউইয়র্ক সিটি।
ম্যানহাটনের ইস্ট রিভার উপকূলজুড়ে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে আধুনিক বন্যা প্রতিরোধ প্রকল্প। এর লক্ষ্য শুধু ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের জলোচ্ছ্বাস ঠেকানো নয়, বরং সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত জোয়ারের পানিতে নগরীর নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিও কমানো। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক সরেজমিন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে প্রকল্পটির প্রকৌশলগত বৈশিষ্ট্য, পরিবেশগত পরিকল্পনা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এর গুরুত্ব।
পার্কের আড়ালে শক্তিশালী বন্যা প্রতিরক্ষা
প্রকল্পটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ম্যানহাটনের ঐতিহাসিক ইস্ট রিভার পার্ক। উইলিয়ামসবার্গ ব্রিজের কাছাকাছি এই এলাকায় চলছে ব্যাপক নির্মাণকাজ। নদী থেকে আনা বিপুল পরিমাণ মাটি ব্যবহার করে পার্কটির ভূমি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ ফুট বা ৩ মিটার উঁচু করা হচ্ছে। এর ফলে জলোচ্ছ্বাসের পানি সরাসরি পার্ক ও আশপাশের এলাকায় প্রবেশের ঝুঁকি কমবে।
তবে প্রকল্পটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ দৃশ্যমান অবকাঠামোর নিচে। নদীর তীর বরাবর মাটির গভীরে প্রায় ১০০ ফুট পর্যন্ত কংক্রিট ও ইস্পাতের পাইল স্থাপন করা হয়েছে। এসব কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে নির্মিত হচ্ছে শক্তিশালী বন্যা প্রতিরোধক দেয়াল বা ফ্লাডওয়াল। ফলে পার্কটি বাইরে থেকে সবুজ বিনোদনকেন্দ্রের মতো দেখালেও এর ভেতরে রয়েছে আধুনিক উপকূলীয় প্রতিরক্ষা অবকাঠামো।
স্বয়ংক্রিয় ফ্লাডগেটে ঠেকানো হবে জলোচ্ছ্বাস
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি নিউইয়র্কের জন্য ক্রমবর্ধমান হুমকি হয়ে উঠেছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ সালের পর বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রায় ৫২০ মাইল উপকূলরেখাবিশিষ্ট নিউইয়র্কের জন্য এ পরিস্থিতি বিশেষ উদ্বেগের।
নিউইয়র্ক সিটির ব্যুরো অব কোস্টাল রেজিলিয়েন্সের সহকারী কমিশনার ক্যাথরিন প্রিবিলস্কির মতে, উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে না তুললে নিয়মিত জোয়ারের পানিতেই নগরীর বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে যান চলাচল, শিক্ষা কার্যক্রম ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
এ ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রকল্পে যুক্ত করা হয়েছে স্বয়ংক্রিয় বন্যা প্রতিরোধ প্রযুক্তি। বড় ধরনের ঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের পূর্বাভাস পাওয়া গেলে উপকূলের বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত ১৮টি বিশাল স্লাইডিং ফ্লাডগেট বন্ধ হয়ে যাবে। পাশাপাশি দক্ষিণ অংশে মাটির নিচে স্থাপিত প্রায় ১০০টি যান্ত্রিক ফ্লিপ-আপ ব্যারিয়ার ওপরে উঠে পানির প্রবেশপথ বন্ধ করবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব প্রতিরক্ষা কাঠামো সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা আরও ৩০ ইঞ্চি বাড়লেও সুরক্ষা দিতে সক্ষম হবে।
প্রকল্পটির প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৭ সালের মধ্যে পুরো কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে নগর কর্তৃপক্ষ।
জলবায়ু সুরক্ষায় বৈশ্বিক বৈষম্যের প্রশ্ন
নিউইয়র্কের এই উদ্যোগ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় উন্নত নগরগুলোর সক্ষমতার পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয়টিও সামনে এনেছে। নিউইয়র্ক, মায়ামি কিংবা চীনের গুয়াংজুর মতো বড় শহরগুলো বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলেও উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর পক্ষে একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া অনেক কঠিন।
বিশেষ করে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার নিচু উপকূলীয় অঞ্চলগুলো সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, জলোচ্ছ্বাস ও ভূমিক্ষয়ের কারণে ক্রমবর্ধমান ঝুঁকিতে রয়েছে। উপকূলীয় জনপদে বসবাসকারী মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি ও বসতভিটা হুমকির মুখে পড়ছে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ফিজি ও ভানুয়াতুর মতো দ্বীপরাষ্ট্রগুলোও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অস্তিত্বের সংকটে রয়েছে।
জাতিসংঘের প্রতিনিধি নাভিদ হানিফের বক্তব্য অনুযায়ী, নিউইয়র্কের এই প্রকল্প অন্য শহরগুলোর জন্য অনুকরণীয় হলেও জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দরিদ্র দেশগুলোর জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় আর্থিক সক্ষমতার বৈষম্য শেষ পর্যন্ত কোটি মানুষের বাস্তুচ্যুতির কারণ হতে পারে।
প্রতিরক্ষা অবকাঠামোর সঙ্গে নাগরিক সুবিধা
প্রকল্পটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, বন্যা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি নাগরিকদের জন্য আধুনিক বিনোদন ও উন্মুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা। উঁচু করে গড়ে তোলা ইস্ট রিভার পার্কে থাকছে সবুজ মাঠ, হাঁটা ও দৌড়ানোর পথ, শিশুদের খেলার জায়গা, ফুটবল মাঠ এবং বারবিকিউয়ের ব্যবস্থা।
ফলে প্রকল্পটি একদিকে যেমন সমুদ্রের পানির বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেবে, অন্যদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য তৈরি করবে নতুন নাগরিক পরিসর। উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ও নগরজীবনের সুবিধাকে একই পরিকল্পনায় যুক্ত করার এ উদ্যোগ নগর পরিকল্পনায় নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করছে।
সব মিলিয়ে হারিকেন স্যান্ডির ধ্বংসযজ্ঞের অভিজ্ঞতা থেকে নিউইয়র্কের শিক্ষা স্পষ্ট—জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় কেবল দুর্যোগের পর পুনর্গঠন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তি ও আগাম বিনিয়োগ। প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্প সেই প্রস্তুতিরই বড় উদাহরণ। তবে এর পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য সমানভাবে জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত না হলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির বিপদ মোকাবিলায় বৈশ্বিক বৈষম্য আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।
- সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি ও বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলায় নিউইয়র্কে ২ বিলিয়ন ডলারের মহাপ্রকল্প
- দুই তরুণী রোগীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ; নিউইয়র্কে বাংলাদেশি-আমেরিকান চিকিৎসক ডা. ফজলুল ইউসুফ গ্রেপ্তার, জামিনে মুক্ত
- বাংলাদেশে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফনে বাধার প্রতিবাদ, ‘শিখা অনির্বাণ’ প্রজ্জ্বলিত রাখার দাবি নিউইয়র্কে
- শান্তি প্রতিষ্ঠায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের সব পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ জরুরি: জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির প্রচার সম্পাদক রিজুর পিতার ইন্তেকাল
- যুক্তরাষ্ট্রের ডিভি লটারি ফের স্থগিত, নিম্ন আদালতের আদেশে আপিল আদালতের বাধা
- যুক্তরাষ্ট্রে ডেলাইট সেভিং টাইমের অবসান, ১ নভেম্বর ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা পেছাবে
- নিউইয়র্কে ন্যাশনাল ইমিগ্র্যান্টস ডে উদ্যাপন; বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি, সাত বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সম্মাননা প্রদান