সেই ডিআইজি আনিছ যুক্তরাষ্ট্রে পলাতক : স্ত্রী জেলে, সাত শিশুর রহস্যের জট খুললেও ৭ কিশোরের ঘটনা আড়ালেই থেকে গেল
শংকর কুমার দে ॥ বহুল আলোচিত সেই একসঙ্গে কথিত সাত শিশুর জন্মদানকারী পুলিশের ডিআইজি আনিছুর রহমান, তাঁর স্ত্রী আনোয়ারা রহমান ও সাত শিশু এখন কোথায় আছে, কেমন আছে? যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত পুলিশের ডিআইজি আনিছুর রহমান এখন পলাতক জীবনযাপন করছেন আমেরিকায়। তাঁর স্ত্রী আনোয়ারা রহমান যাবজ্জীবন সাজা খাটছেন এখন জেলখানায়। সাত শিশুর মধ্যে এক শিশু মারা গেছে। অপর ছয় শিশু আছে জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির আশ্রয়খানায়। নিম্ন আদালতে যাবজ্জীবন সাজার বিরুদ্ধে আনোয়ারা রহমানের পক্ষে হাইকোর্টে আপীল করার মামলাটি এখনও বিচারাধীন। আট বছর আগে ’০৬ সালে একসঙ্গে সাত শিশু জন্মদানের আলোড়ন সৃষ্টিকারী সেই ঘটনার নেপথ্যের অনেক ঘটনাই এখনও রয়ে গেছে রহস্যের আড়ালে।
রাজধানীর বাড্ডা থানাধীন বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় পুলিশের ডিআইজি আনিছুর রহমানের ঘরে ১৪ শিশু ও কিশোরের খেলাধুলা, অবস্থান নিয়ে প্রথমে বসুন্ধরা এলাকায় মানুষজনের মধ্যে সন্দেহ দেখা দেয়। এর মধ্যে ৭ শিশুর বয়স প্রায় এক থেকে দেড় বছরের বয়সী। অপর ৭ কিশোরের বয়স হচ্ছে ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী। সন্দেহ থেকে কৌতূহল। এক কান থেকে দুই কান হয়ে এই ঘটনা প্রিন্টিং মিডিয়া ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় প্রচার হয়। প্রচার, সন্দেহ ও জিজ্ঞাসার উত্তরে মুখ খোলেন ডিআইজি আনিছুর রহমান। তিনি জানান, তার দ্বিতীয় স্ত্রী আনোয়ারা রহমানের ঘরে জন্ম হয়েছে এক সঙ্গে ৭ শিশুর। অপর ৭ কিশোর প্রসঙ্গেও নানা ধরনের তথ্যের মুখে তাদের সরিয়ে ফেলা হয় লোকচক্ষুর অন্তরালে। কিন্তু ৭ শিশুকে এক সঙ্গে জন্ম দিলে সাধারণত জমজ হয়। জমজ সন্তান হলে শিশুদের মুখায়ব এক হওয়ার কথা। কিন্তু ডিআইজি আনিছুর রহমানের দ্বিতীয় স্ত্রী আনোয়ারা রহমানের ঘরে এক সঙ্গে জন্ম নেয়া ৭ শিশুর মুখায়ব এক রকম দেখা যায়নি। সুতরাং শিশু সাতটি জমজ নয়। শুধু তাই নয়, সাত শিশুর বয়সও এক নয়। বয়সেরও হেরফের বলে অনুমিত হয়।
এতে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। সন্দেহ ঘনীভূত হওয়ার পর ঘটনার তদন্তে যান বাংলাদেশ মানবাধিকার সংস্থার সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও বর্তমানে বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী এ্যাডভোকেট এলিনা খান। এই ঘটনা ২০০৬ সালের।
আনিছুর রহমান কোন সাধারণ ব্যক্তি নন, তিনি পুলিশের ডিআইজি। সুতরাং তদন্ত করলেই যে সহজে বের হয়ে আসবে তা নয়। এসব তদন্ত টদন্ত পাত্তাই দিচ্ছেন না পুলিশের এই ডিআইজি। তারপর পুলিশের অধস্তন অনেক কর্মকর্তারাও তার পক্ষাবলম্বন করবেন এটাই স্বাভাবিক। মানবাধিকার নেত্রী এ্যাডভোকেট এলিনা খান বাদী হয়ে বাড্ডা থানায় এই বিষয়ে জিডি করেন গত ২/২/২০০৬ সালে। এক সঙ্গে ৭ শিশুর বিষয়টি সন্দেহজনক। এটা তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। জিডি করার পরের দিন ঢাকা মহানগর আদালতে আবেদন করা হয় ডিএনএ টেস্টের জন্য। ডিএনএ টেস্টের আদেশ হয়। ডিএনএ টেস্ট নিয়ে শুরু হয় আরেক নাটক। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ডিএনএ টেস্টের আয়োজন করা হয়। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে ডিএনএ টেস্টের জন্য গঠন করা হয় ৪ সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ড। গত ১৫/৬/২০০৬ সালের কথা। ডিআইজি আনিছুর রহমান তার সাত শিশু নিয়ে হাজির হন মেডিক্যাল বোর্ডের সামনে। কিন্তু তাঁর স্ত্রী আনোয়ারা রহমান অসুস্থতার কথা বলে চিঠি দিয়ে হাজির হননি। ডিএনএ টেস্ট করার বিষয়টি কৌশলে ভ-ুল করে দেয়া হয়।
মানবাধিকার নেত্রী এ্যাডভোকেট এলিনা খান এবার ৭ শিশুর রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য দ্বারস্থ হন আদালতের। তিনি বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা করেন আদালতে।
অবৈধভাবে আটক ও পাচারের উদেশ্যে ৭ শিশুকে জড়ো করার অভিযোগে মামলা করে এবার ডিএনএ টেস্ট করার জন্য আবারও আদালতে আবেদন জানান এলিনা খান। কিন্তু জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে হাইকোর্টে রিট করা হয় এই মর্মে যে, ৭ শিশুর ডিএনএ টেস্ট করাতে হবে সিঙ্গাপুরে। এই বিষয়ে আদেশ দেন হাইকোর্ট বেঞ্চ। হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেই ডিএনএ টেস্ট করানোর জন্য সুপ্রীমকোর্টে আপীল বিভাগে রিভিশন করেন এ্যাডভোকেট এলিনা খান। সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ডিএনএ টেস্ট করানোর বিষয়ে ‘সিবলিং’ করার আদেশ দেন। সিবলিং করার আদেশটি হচ্ছে, ৭ শিশু তারা ভাইবোন কিনা? ডিএনএ টেস্টে প্রমাণিত হয়, ৭ শিশু ভাই বোন নয়। উচ্চ আদালত থেকে সিবলিং ডিএনএ টেস্টের পাশাপাশি আদেশ দেয়া হয় যে, নিম্ন আদালতে দায়ের করা নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলাটি চলবে।
১৮/০৪/২০১২ সালের কথা। নিম্ন আদালতে মামলার রায় হলো। পুলিশের ডিআইজি আনিছুর রহমান ও তার স্ত্রী আনোয়ারা রহমানের যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদ- ও ৫ লাখ টাকা জরিমানা। অনাদায়ে আরও ১ বছর সশ্রম কারাদ-। আদালতের রায় ঘোষণার দিন ডিআইজি আনিছুর রহমান আদালতে হাজির ছিলেন না। তিনি আগেই জামিন নিয়ে পলাতক ছিলেন। আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, পলাতক আনিছুর রহমান যেদিন গ্রেফতার হবেন সেই দিন থেকেই তার সাজার মেয়াদ শুরু হবে। স্ত্রী আনোয়ারা রহমানকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। সেই থেকে তিনি আছেন জেলে। আর ৭ শিশুকে দেয়া হয় জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির আশ্রয় কেন্দ্রে। জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির আশ্রয় কেন্দ্রে থাকাকালে এক শিশু মারা যায়।
কথিত একসঙ্গে জন্ম নেয়া ৭ শিশুর নাম হচ্ছে, আনাছ আকন আনিছ, দায়ান রহমান আনিস (উসাদ), নাফিস আকন আনিছ, আইমান রহমান আনিছ (উসাফ), জান্নাতুল আনিস রহমান নাবিলা, জান্নাতুল মারিয়াম নাফিসা ও জান্নাতুল মারিয়াম নাজিফা। জাতীয় মাহিলা আইনজীবী সমিতির আশ্রয় কেন্দ্রে আছে ৭ শিশুর মধ্যে ৬ শিশু। এক শিশু মারা গেছে আশ্রয় কেন্দ্রে। পুলিশের ডিআইজি আনিছুর রহমান বলেছিলেন, তার দ্বিতীয় স্ত্রী আনোয়ারা রহমানের ঘরে জন্ম নিয়েছিল ৭ শিশু যা ডিএনএয়ে-এর সিবলিং টেস্টে ভাই-বোন নয় বলে পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে। ডিআইজি আনিছুর রহমানের দ্বিতীয় স্ত্রী আনোয়ারা রহমান এখন কারাগারে আছেন। আনোয়ারা রহমানের প্রথম স্বামীর ঘরে আছে আরও তিন সন্তান, যারা এখন ইতোমধ্যেই বড় হয়েছেন। আর ডিআইজি আনিছুর রহমানের প্রথম স্ত্রীর ঘরেও আছে আরও সন্তান, যারা এখন বড় হয়ে গেছেন। পুলিশের ডিআইজি আনিছুর রহমানের দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরে কথিত এক সঙ্গে ৭ শিশুর জন্ম হওয়ার ঘটনার বিষয়টির রহস্যের জট খুললেও আরও যে ৭ কিশোর পাওয়া গিয়েছিল তা এখনও রহস্যে ঢাকা রয়ে গেছে। অপর ৭ কিশোর এখন কোথায় কেমন আছে কারও জানা নেই, কেউ রহস্যের জট খোলার জন্য খোঁজখবরও রাখেন না।
জানতে চাইলে মানবাধিকার নেত্রী বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী এ্যাডভোকেট এলিনা খান জানান, পুলিশের ডিআইজি আনিছুর রহমানের দ্বিতীয় স্ত্রী আনোয়ারা রহমানের ঘরে এক সঙ্গে জন্ম ৭ শিশু জন্ম নেয়ার ঘটনাটি ডিএনএ এর সিবলিং টেস্টে তারা ভাই-বোন নয় বলে প্রমাণিত হয়েছে। অবৈধভাবে আটক ও পাচারের উদ্দেশ্যে তাদের রাখা হয়েছিল বলে নিম্ন আদালতে প্রমাণিত হওয়ার যাবজ্জীবন সাজা হয়েছে পুলিশের ডিআইজি আনিছুর রহমান ও তার দ্বিতীয় স্ত্রী আনোয়ারা রহমানের। যাবজ্জীবন সাজা হওয়ার বিষয়ে স্বামী আনিছুর রহমান পলাতক থাকায় তার পক্ষে কোন আপীল করা হয়নি। শুনেছি আমেরিকায় পালিয়ে বেড়াচ্ছেন পুলিশের ডিআইজি আনিছুর রহমান। তার স্ত্রী আনোয়ারা রহমান কারাগারে সাজা খাটায় তার পক্ষে আইনজীবী হাইকোর্টে আপীল করেছেন। আপীলের শুনানি হবে নির্দিষ্ট দিনে। ডিআইজি আনিছুর রহমান ও তার স্ত্রী আনোয়ারার ঘরে রাখা ১৪ শিশু ও কিশোরের মধ্যে ৭ শিশুর ঘটনা নিয়ে তদন্ত ও মামলা হওয়া তার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয়ে থাকার শিশুরা এখন বড় হয়েছে। এই শিশুদের বয়স প্রায় নয় বছর। এই শিশুদের রহস্য উদ্ঘাটিত হলেও সে সময়ে তাদের সঙ্গে একত্রে থাকা অপর ৭ কিশোরের বয়স ছিল তখন বারো থেকে চৌদ্দ। এখন তাদের বয়স বেড়ে প্রায় বিশ হয়েছে। তারাও কি ভাই বোন কিনা, বা পরিচয় কি, এখন কোথায় আছে, কেমন আছে জানা নেই, সবই রয়ে গেছে রহস্যে ঢাকা।জনকণ্ঠ
- New York Attorney General James Secures More Than $480,000 and Debt Relief for New York Homeowners
- এই জীবন চিরস্থায়ী নয়, একদিন মরে যাবো
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে; ১৭ ডিসেম্বর উভয় পক্ষকে তথ্য-উপাত্ত জমার নির্দেশ
- নিউইয়র্কে নৃত্যশিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠক তাহসিন ফেরদৌসের অকালমৃত্যু, বাংলাদেশি কমিউনিটিতে শোকের ছায়া
- নিউইয়র্কে আবেয়া’র দ্বিবার্ষিক সম্মেলন ও ফ্যামিলি নাইট: প্রযুক্তি সেমিনার, জব ফেয়ার, বিজ্ঞান মেলা ও সাংস্কৃতিক উৎসব
- Global Anticipation Builds as Dr. Mostofa Sarwar’s Sunflower Wounds Debuts with Successful Houston Open House and Worldwide Pre-Order Milestone
- যুক্তরাষ্ট্রে ৭৫ দেশের অভিবাসী ভিসায় অনিশ্চয়তা, আদালতের নির্দেশের পরও কাটেনি জট
- Human Rights Must Be at the Heart of Economic Governance and Policies: Ambassador Irene Khan