Friday, 24 July 2026 |
শিরোনাম
নিউইয়র্কের জ্যামাইকায় জল খাবার রেস্টুরেন্ট এর গ্র্যান্ড ওপেনিং New York Attorney General James Secures $375,000 from 1-800-Flowers for Deceiving Consumers About Automatic Subscription Renewals নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসে বাংলাদেশি আমেরিকা পুলিশ কর্মকর্তার নামে সড়ক ‘ডিটেকটিভ দিদারুল ইসলাম ওয়ে’ ECOSOC recommends UN General Assembly to take decision on Bangladesh and Nepal’s LDC graduation extension requests ইকোসকের সুপারিশ: বাংলাদেশ ও নেপালের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সাধারণ পরিষদ Bangladesh co-chairs multi-stakeholder panel session on Global Road Safety, calls for stronger institutions to save lives নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক বহুপক্ষীয় প্যানেল অধিবেশনে বাংলাদেশের যৌথ-সভাপতিত্ব; প্রাণহানি কমাতে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আহ্বান Road Transport Minister reaffirms Bangladesh’s commitment to halving road traffic deaths by 2030 বাংলাদেশে ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি অর্ধেকে নামিয়ে আনার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর ধুমকেতু ছিনিয়ে নেয় সম্মোহনী টিয়েম্পো: ইয়ামালের উদ্দেশ্যে ফুটবল পদাবলি
সব ক্যাটাগরি

‘মাস্টর, তোর ছাত্র কই’

অনলাইন ডেস্ক পঠিত: 170 বার

প্রকাশিত: August 16, 2011 | 1:34 AM

বিডিনিউজ: পঁচাত্তরের ১৪ই আগস্ট রাতে শেষবার শিশু রাসেলকে পড়িয়েছিলেন তিনি। ফিরে যাওয়ার সময় একটি বারের জন্যও মনে হয়নি আর কখনও পড়ানো হবে না, দেখা হবে না। ৩৬ বছরের ‘পুরনো’ সে কষ্টস্মৃতি হাতড়ে বলছিলেন শেখ রাসেলের গৃহশিক্ষিকা গীতালি দাশগুপ্তা, যিনি ’৭২ থেকে তিন বছর পড়িয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছোট ছেলে রাসেলকে। বঙ্গবন্ধু পরিবারের সঙ্গে তার ছিল নিবিড় সম্পর্ক। বাহাত্তরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় স্নাতকোত্তর শ্রেণীর ছাত্রী ছিলেন তিনি। ওই বছরের আগস্ট বা সেপ্টেম্বর থেকে তিনি রাসেলকে পড়ানো শুরু করেন। এরপর বদরুন্নেসা কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন ’৭৪ সাল থেকে। সেই সূত্রে শেখ রেহানার শিক্ষিকাও ছিলেন গীতালি।
কষ্টস্মৃতির সেই কথা বলতে গিয়ে বারবার কণ্ঠ কেঁপে উঠেছে গীতালি দাশগুপ্তার।
‘আমাকে রাসেল ডাকতো আপু বলে। আর আমার কাছে ওর নাম ছিল বুচু। ওইদিন রাত সাড়ে ১১টার দিকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িটি থেকে পড়িয়ে বের হই। কথা ছিল পরদিন আবার পড়াতে যাবো।
‘ওইদিন সন্ধ্যা ৭টার দিকে আমি তাকে পড়াতে যাই। আমাকে জানানো হলো, রাসেল আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাসায় গেছেন। ফোন করলেই ফিরে আসবে। একটু পর বঙ্গবন্ধু এসে আমাকে বসে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন- মাস্টর, তোর ছাত্র কই? তুই একা কেন?’
এরপর বঙ্গবন্ধু নিজেই সেরনিয়াবাতের বাসায় ফোন করে রাসেলকে আসতে বলেন, বলেন গীতালি। ‘ফোন রেখেই আমাকে বললেন, ‘মাস্টর তোমার ছুটি নাই।’ এটাই ছিল আমাকে বলা বঙ্গবন্ধুর শেষ বাক্য। অথচ তাকেই ছুটি দিয়ে দিলাম আমরা।’ গীতালি দাশগুপ্তের এই কথাগুলোতে একটু ক্ষোভ কী ঝরে পড়লো না! আবার বলতে শুরু করেন সেই শেষ দিনের কথা। শেষ পড়ানোর কথা। ‘শেষ দিন রাসেল পড়লো আমার কাছে। ফিরে আসার আগে অনেক্ষণ কথা হলো বেগম মুজিবের সঙ্গে, যাকে আমি কাকিমা বলে ডাকতাম। বিশ্বাস করে আমাকে অনেক কথা বললেন। এতো বিশ্বাস একটা মানুষকে কীভাবে করে। রাত ১১টার পর বঙ্গবন্ধুর এক নিরাপত্তাকর্মী গাড়িতে করে আমাকে পৌঁছে দেন।’
এরপরের কথা সবার জানা। সপরিবারে খুন করা হয় বঙ্গবন্ধুকে। দেশে না থাকার কারণে বেঁচে যান দু’মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। ঊনসত্তরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াকালীন খরচ চালানোর জন্য গ্রহশিক্ষিকার দায়িত্ব নেন গীতালি দাশগুপ্ত। প্রথমে তিনি আওয়ামী লীগের তৎকালীন কোষাধ্যক্ষ মোহাম্মদ মহসিনের তিন মেয়েকে পড়ানোর দায়িত্ব নেন। আর মহসিনের সুপারিশেই রাসেলকে পড়ানোর দায়িত্ব, দেয়া হয় তাকে।
‘ফোরেই শেষ হলো রাসেলের পড়া’
ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সেই বাড়িতে প্রথম যাওয়ার কথা তুলে ধরে গীতালি বলেন, ’৭২ সালের আগস্ট কী সেপ্টেম্বর মাসে তিনি ওই বাড়িতে যান। প্রথম দিন সকাল ১০টার দিকে যান তিনি বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে। তাকে নিয়ে বসানো হয় দোতলার পেছনের দিককার বসবার ঘরে।
‘রাসেলের পড়াশোনা নিয়ে খুবই চিন্তিত ছিলেন বেগম মুজিব। কোন শিক্ষকেই পছন্দ হতো না রাসেলের। কাকিমা এসে আমার সঙ্গে পরিচিত হয়ে রাসেলকে ডেকে পাঠালেন। ছোট একটা ছেলে। সাড়ে পাঁচ, কী ছয় বছরের হবে। পায়জামা আর হাউজ কোট পরা। মাথার চুল এলোমেলো।’
বইয়ের ঝোলা নিয়ে রাসেল আসতেই বেগম মুজিব তার ছোট ছেলেকে গীতালির পাশে বসিয়ে দিলেন। রাসেল তখন ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলের ছাত্র ছিল।
গীতালি স্মৃতি হাতড়ে বললেন, ‘আমি কাকিমাকে বললাম, আমি রাসেলকে পড়াতে পারবো না। তখন তিনি ১৫-২০ মিনিটের জন্য হলেও পড়াতে বললেন। আমি বললাম, আমার তো বাসায় ফিরতে রাত হয়ে যাবে। তিনি আমার বাসায় পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব নিলেন। পরের দিন থেকেই রাসেলকে পড়াতে শুরু করি।
‘এভাবেই আমার শুরু। ও তো আর ফাইভে ওঠা হলো না। ফোরেই সব শেষ হয়ে গেলো।’
ছাত্র রাসেল সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘পড়ানো শুরু করার ২৭/২৮ দিনের মধ্যে বুঝতে পেরেছেলাম, ওর ভেতরে আমি জায়গা করে নিতে পেরেছি। আমরা সঙ্গে ওর রাগ ছিল, ওর ক্ষোভ ছিল। তবে আমার প্রতি ওর অসম্ভব ভালোবাসাও ছিল।’
প্রিয় ছাত্রের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কখনো থেমে গেছেন। কখনও, চোখের কোণে পানি আর বাষ্পরূদ্ধ কণ্ঠে কথা বলেছেন।
‘মাস্টর, তোর ছাত্রের খবর কী’
গীতালি দাশগুপ্তা যখন রাসেলকে পড়ানো শুরু করেন তখনও পুতুলের জন্ম হয়নি। শুধু রাসেলের শিক্ষক হিসেবে বাড়ির প্রতিটি লোক তাকে একটু আলাদা চোখেই দেখতেন।
‘বঙ্গবন্ধু সবার শ্রদ্ধার, সবার কাছেই ছিলেন নমস্য। তখন তো বয়সে ছোট ছিলাম। বুঝতাম না। আমার প্রতি যে কৃতজ্ঞতা বোধ, কাকার (বঙ্গবন্ধু) আর কাকিমার। ওই বাড়ির প্রতিটি লোকের যে কৃতজ্ঞতা বোধ- আমি এরকমটি দেখিনি।’ ‘বঙ্গবন্ধু যে কী ধরনের মানুষ ছিলেন, যারা তাকে কাছ থেকে না দেখেছে- তারা বুঝবে না। আমি জানি না- এটা আমার ভাগ্য, না দুর্ভাগ্য। আমি মনে করি এটা আমরা দুর্ভাগ্য। এতো কষ্ট পাচ্ছি কেন? এই কষ্টটা পাওয়ার জন্যই মনে হয় ওনাদের সঙ্গে সম্পর্ক,’ বললেন গীতালি। ‘আমার সঙ্গে দেখা হলেই বঙ্গবন্ধু বলতেন- মাস্টর তোর ছাত্রের খবর কী? আর, তোর কী খবর?’ বঙ্গবন্ধুর সাধারণ জীবনযাপনের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর জন্য যে ট্রলিতে করে খাওয়া নিয়ে যেতে আমার জন্যও সেই ট্রলিতেই খাওয়া আসতো।’ গীতালি জানালেন, একবার রাসেলের খুব জ্বর হয়েছিল। সে জ্বরের সময়েও তাকে সময়ে অসময়ে যেতে হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে। কারণ রাসেল খাচ্ছিল না। তিনি খাওয়ার পর রাসেলে গলা দিয়ে খাবার ঢুকতো। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও তার ছোট বোন শেখ রেহানা সম্পর্কে জানালেন, খুবই প্রাণবন্ত ছিলেন শেখ হাসিনা। সেই সঙ্গে দুষ্টুমিও বেশ করতেন তিনি। আর বদরুন্নেসা কলেজে পড়তো শেখ রেহানা। ওর আচরণে কেউ বুঝতেই পারতো না- ও কার মেয়ে।’
‘আপু, আপনি আব্বাকেও পড়াইছেন?’
গিতালী দাশগুপ্তা বলেন, বঙ্গবন্ধুর আন্তরিকতা ছিল অন্য রকমের। উনি বাড়িতে ছিলেন, আর আমার সঙ্গে দেখা হয়নি- এমনটি কোন দিনও হয়নি। আর, ওনাকে দেখে কোন দিন দাঁড়াতে পারিনি। উনি কাঁধে ধরে বসিয়ে দিতেন। বলতেন, বয় বয় বয়। তুই তোর জায়গায় বয় মাস্টর। খোঁজ নিতেন ছেলের লেখাপড়ার।
‘বঙ্গবন্ধু প্রায়ই একটা কথা বলতেন- রাসেল, ও শুধু তোমার টিচার না। ও আমারও টিচার। বঙ্গবন্ধু ঘর থেকে গেলেই রাসেল বলতো, আপু আপনি কী আব্বাকেও পড়াইছেন?’
‘জেঠুর ওপর অনেক রাগ হয়’
‘৭৫ সালের প্রথম দিকে গীতালি একবার কলকাতায় গিয়েছিলেন। সেখানে তার জেঠু রাসেলের কুণ্ডলী হিসেব করে জানিয়েছিলেন- বেঁচে থাকলে রাসেল অনেক বড় হবে। এখন সেই জেঠুর ওপর গীতালির অনেক রাগ।
গীতালি বললেন, ‘আমি ঢাকায় এসে ওই কথাটা কাকিমা্থকে বললাম, সামনে হাসু আপাও (শেখ হাসিনা) ছিলেন। হাসু আপা বললেন, গীতালি আমি সব লিখে দেবো, তুমি একটু পাঠিও তো। সেই সুযোগ তো এলো না। তার আগেই সব শেষ হয়ে গেলো।’ ছোট রাসেলের বড় মনের পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি বলেন, সে কতো বড় মনের অধিকারী ছিল- তা বলে বোঝানো যাবে না। বিশেষ একদিনের ঘটনা বর্ণনা দিয়ে বললেন, ‘রাসেলকে একদিন গৌতম বুদ্ধ সম্পর্কে বললাম। পরের দিন ওই বাড়িতে যেতেই বঙ্গবন্ধু বললেন, তুই আমার সর্বনাশ করছস। পাশে কাকিমা আর তা গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিল রাসেল। বঙ্গবন্ধু আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত দিয়ে কাকিমাকে বললেন- কামালের মা তোমারে আমি বলছিলাম না, যে ঠিক টিচার আমি পায়া গেছি। বঙ্গবন্ধু বললেন, রাসেল তাকে আগের রাতে বলেছে- উনি কেন গৌতম বুদ্ধ হয়ে যান না।’
‘পরের বার বিষ খায়ো’
গীতালি জানান, রাসেল একবার হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষায় অংকে ফেল করে। তাতে ওর অনেক মন খারাপ হয়। শেখ রেহানা ছোট ভাইয়ের ফল নিয়ে হাসাহাসি করছে। ‘আমি রাসেলকে বললাম, আমি বিষ খাবো। আর, তোমাকেও পড়তে হবে না। রাসেল কাঁদতে কাঁদতে বললো, তুমি এবার বিষ খায়ো না। পরের বার খায়ো। পরে বার্ষিক পরীক্ষার ফল দেখিয়ে বলেছিল- বললাম না বিষ খায়ো না। আমি পাস করছি।’ রাসেল যে গীতালিকে কতো পছন্দ করতো তা তিনি জানতে পেরেছিলেন শেখ কামালের বিয়ের সময়। ‘জ্বর ছিল বলে আমি শেখ কামালের বিয়ের অনুষ্ঠানে যেতে পারিনি। পরে কাকিমার মুখে শুনেছি- বিয়ের প্রায় পুরো সময়টাতেই রাসেল গেইটে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল আমরা অপেক্ষায়।’ রাসেলের এ শিক্ষক বর্তমানে আজিমপুরে নিজের বাড়িতে অবসর দিন যাপন করছেন। কয়েক বছর হলো নোয়াখালী কলেজ থেকে অবসরে যান তিনি।মানবজমিন

বিজ্ঞাপন / স্পন্সরড কন্টেন্ট
ট্যাগ:
সর্বশেষ সংবাদ
Situs Streaming JAV