আ’লীগের ছিটকেপড়া নেতারা নিষ্ক্রিয়
এমরান হোসাইন: রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন আওয়ামী লীগের ছিটকে পড়া নেতারা। আন্দোলন-সংগ্রাম-নেতৃত্ব ও সরকার পরিচালনায় অবদান রাখা এসব ডাঁকসাইটে নেতারা বর্তমানে রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়েছেন। রাজনীতির পরিবর্তে তারা ঝুঁকে পড়েছেন ছোট-বড় ব্যবসার দিকে। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটানোর পাশাপাশি সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন। কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে বাদ পড়া এ নেতাদের গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে দলে কোনো তত্পরতা নেই। বর্তমানে দলের কোনো দায়িত্বে না থাকায় দলীয় কর্মকাণ্ডেও এদের কোনো ভূমিকা নেই। তাছাড়া প্রটোকল সমস্যার কারণে ইচ্ছা থাকলেও তারা দলের কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারছেন না। সময়ের ব্যবধানে দলের সঙ্গে তাদের দূরত্বও বেড়ে যাচ্ছে। তবে, রাজনীতিতে নিজেদের নেহাত অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এলাকার জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন।
গত বছর জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে দল থেকে বাদ পড়া সাবেক নেতাদের সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে ও আলাপচারিতায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। বিগত জরুরি সরকারের সময় দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার মতের বিরুদ্ধে অবস্থান ও সংস্কারপন্থী হওয়ায় এই নেতারা কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে বাদ পড়েন বলে কথিত রয়েছে। আর জাতীয় কাউন্সিলে কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে বাদ পড়ার পর থেকেই মূলত এরা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন।
আগের কমিটি থেকে যেসব জাতীয় নেতা বাদ পড়েন তারা হচ্ছেন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমু, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুকুল বোস, সাংগঠনিক সম্পাদক সাবের হোসেন চৌধুরী এমপি, আবদুল মান্নান, মাহমুদুর রহমান মান্না, সুলতান মুহম্মদ মনসুর, বীর বাহাদুর এমপি, অর্থ পরিকল্পনা বিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক আলী আশরাফ এমপি, স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক অধ্যাপিকা নাজমা রহমান, কেন্দ্রীয় নেতা অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, আখম জাহাঙ্গীর হোসাইন, মির্জা সুলতান রাজা, হাবিবুর রহমান খান, অধ্যাপক মোহাম্মদ হানিফ প্রমুখ। তবে, এদের মধ্যে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমু, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও আবদুল জলিল দলের উপদেষ্টা পরিষদে স্থান পেয়েছেন। এর বাইরে আগের কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আখতারউজ্জামান ও আবদুর রহমান এমপির পদাবনতি হয়ে বর্তমান কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্যপদ পান।
সভাপতি থেকে বাদ পড়ে বর্তমানে উপদেষ্টা পরিষদে অন্তর্ভুক্ত হওয়া আমির হোসেন আমু বেশির ভাগ সময় ইস্কাটনের বাসায় সময় কাটান। এখানে বসে নির্বাচনী এলাকার জনগণের সঙ্গে কথা বলেন। সংসদ সদস্য হিসেবে জনগণের সমস্যার সমাধানের চেষ্টা চালান। আমির হোসেন আমু প্রায় প্রতি সপ্তাহে তার নির্বাচনী এলাকা ঝালকাঠি যান বলে তার পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে। সূত্র জানায়, আগে কেন্দ্রীয় কমিটির দায়িত্ব পালন করার কারণে এলাকায় কম যেতে পারতেন। এখন হাতে সময় থাকায় প্রায়ই যেতে পারেন। এলাকার প্রতিটি উন্নয়ন কাজ তদারকি করেন বলেও পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে। পাশাপাশি তিনি দলের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য হিসেবে সভানেত্রী অর্পিত দায়িত্ব পালন করেন। কমিটি গঠনের পর এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের দুটি সভায়ই তিনি উপস্থিত থেকে দলকে পরামর্শ দিয়েছেন।
জানা গেছে, সভাপতিমণ্ডলী থেকে বাদ পড়া আবদুর রাজ্জাক এমপি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি নিয়ে ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করেন। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি আবদুর রাজ্জাক নিয়মিত জাতীয় সংসদ ভবনে তার অফিসে বসেন। এর বাইরে নাখালপাড়ায় তার ন্যাম ভবনের বাসায় বৃহস্পতি, শুক্র ও শনিবার এলাকার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এলাকার মানুষের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেন। আবদুর রাজ্জাক সময় পেলে নির্বাচনী এলাকায় যান বলেও জানা গেছে। এছাড়া মাঝে মধ্যে তিনি আওয়ামী ঘরানার বিভিন্ন সংগঠনের সভা-সেমিনারে অংশ নেন। শারীরিকভাবে কিছুটা অসুস্থ আবদুর রাজ্জাককে নিয়মিত চেকআপের জন্য ব্যাংককে যেতে হয় বলে তার পারিবারিক সূত্র জানায়।
সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থান না পেয়ে ও সভাপতিমণ্ডলী থেকে বাদ পড়ে অনেকটা অভিমানে রয়েছেন ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের নায়ক তোফায়েল আহমেদ। কিছুটা ক্ষুব্ধ এই নেতা নিজেকে দলের উপদেষ্টা পরিচয় দিতেও চান না। গণমাধ্যমে তাকে উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য উল্লেখ করলেও ক্ষুব্ধ হন বলে তার ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে। এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত দলের উপদেষ্টা পরিষদের কোনো বৈঠকেই উপস্থিত হননি তিনি। এ বছর এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত ভোলা-১ আসনের উপনির্বাচনে দলীয় প্রার্থী নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করে শাওনকে বিজয়ী করায় বেশ লাইমটাইটে আসেন তোফায়েল আহমেদ। তবে, কিছুদিন যেতে না যেতেই আবার নিভৃতচারী হয়ে যান তিনি। বর্তমানে তোফায়েল আহমেদ শিল্প মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বনানীর বাড়িতে বসে এলাকার মানুষের সঙ্গে নিয়মিত সাক্ষাত্ করছেন।
উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এতদিন নিষ্ক্রিয় থাকলেও সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটির কো-চেয়ারম্যান ও মুখপাত্র হওয়ার পর বেশ নড়ে-চড়ে উঠেছেন। সংবিধান সংশোধনসহ রাজনৈতিক বিভিন্ন ইস্যুতে সংসদের মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিক ডেকে কথা বলছেন। যুদ্ধাপরাধী ও সংবিধান সংশোধনসহ অন্যান্য ইস্যু নিয়ে তিনি সেমিনার সিম্পোজিয়ামে অংশ নিচ্ছেন। আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এর আগে দুই বিচারপতি বহিষ্কার ও পুনর্বহাল নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সংস্থাপন বিষয়ক উপদেষ্টা এইচটি ইমামের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থানের পর পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিলেন। তারপর থেকে বেশ কিছুদিন তিনি নিষ্ক্রিয় অবস্থায় ছিলেন। এদিকে স্থানীয় রাজনৈতিক গ্রুপিংয়ের কারণে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত নির্বাচনী এলাকায় কম যাওয়া-আসা করেন বলে জানা গেছে।
অনেকটা একলা চল নীতি অবলম্বন করছেন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল এমপি। অভিমানী আবদুল জলিল রাজনীতি থেকে পুরোটাই মুখ ফিরিয়ে নিজের ব্যাংক ব্যবসা নিয়ে সময় কাটাচ্ছেন। শুধু উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক নয় জাতীয় কোনো ধরনের কর্মসূচিতে অংশ নেন না তিনি। তবে, এলাকার রাজনীতিতে নিয়মিত অংশ নেন বলে জানা গেছে। গত বছর লন্ডনে একটি গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনাসহ দল সম্পর্কে বিতর্কিত মন্তব্য করার পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ হারান শেখ হাসিনার এক সময়কার ঘনিষ্ঠজন খ্যাত এই নেতা। ওই সময় দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তাকে পাগল বলেও আখ্যায়িত করেন। আর তারপর থেকেই নিশ্চুপ হয়ে পড়েন আবদুল জলিল। সংসদ সদস্য আবদুল জলিল মাঝে মধ্যে সংসদ অধিবেশনে গেলেও কারও সঙ্গে খুব একটা কথা বলেন না। এমনকি কুশলাদি বিনিময় করতেও দেখা যায় না তাকে।
জাতীয় এসব নেতার মতো দল থেকে ছিটকে পড়া অন্যরাও নিভৃতচারীর মতো দিন যাপন করছেন। তাদের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যেমন ভূমিকা নেই। তেমনি দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামেও ভূমিকা রাখার কোনো সুযোগ নেই। বাদ পড়াদের মধ্যে সাবের হোসেন চৌধুরী, আবদুল মান্নান, বীর বাহাদুর, ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন ও অধ্যাপক আলী আশরাফ দলীয় মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় এলাকার লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সংসদ অধিবেশনে অংশ নেয়ার মধ্যেই এদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রয়েছে।
তবে, সংস্কারপন্থী হওয়ার অভিযোগে পদ হারানো সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সাবের হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে দলের হাইকমান্ডের সম্পর্ক নতুন করে মোড় নিচ্ছে বলে একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে। সাবের হোসেন চৌধুরী ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেতে নানা চেষ্টা তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন। আওয়ামী লীগের দলীয় জরিপসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার জরিপে জনপ্রিয়তার দিক থেকে সাবের হোসেন দলের সম্ভাব্য অন্য প্রার্থীদের চেয়ে এগিয়ে থাকার কারণে প্রধানমন্ত্রী ইদানীং তার বিষয়ে কিছুটা নমনীয় বলে ওই সূত্র নিশ্চিত করেছে।
‘বর্তমান দিনকাল কেমন চলছে’ জানতে চাইলে আগের কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুকুল বোস বলেন, দিন চলে যাচ্ছে। বাসায় থেকে পারিবারিক কাজকর্মের মধ্য দিয়ে সময় কাটাই। ছোটোখাট ব্যবসা আছে, সেটা দেখাশুনা করি। আওয়ামী লীগের পরীক্ষিত এই নেতা কিছুটা আক্ষেপ করে বলেন, দলের কর্মসূচিতে আমাকে বলা হয় না। সেজন্য আমি যাইও না। তবে এলাকার লোকজনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করি। বাইরে থেকে রাজনীতি পর্যবেক্ষণ করি।
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থা জানতে চাইলে কিছুটা হতাশা প্রকাশ করে সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ডাকসুর সাবেক ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, রাজনীতিতে যা হচ্ছে তা তো দেখছ-ই। নিজের অবস্থা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভালোই আছি। সময় সুন্দরভাবেই কেটে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে এমন ব্যস্ত থাকি যে পেরে উঠি না। পুরনো অভ্যাসমত পড়াশোনা করি। টিভিতে একটা অনুষ্ঠান করি (রাজনৈতিক টক-শো)। সভা সেমিনারে অংশ নেই। নিজের একটা ব্যবসা রয়েছে, সেটা মাঝে ভালো ছিল না। এখন আবার এটাকে নতুন করে শুরু করেছি। সময় পেলে এলাকায় গিয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেন বলে জানান মান্না।
বিগত কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক এক সময়কার তুখোড় ছাত্র নেতা সুলতান মুহাম্মদ মনসুর আহমেদ জানান, তিনি বর্তমানে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পরিবেশে দিন কাটাচ্ছেন। সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার পাশাপাশি সুযোগ হলে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তবে, এক্ষেত্রে কিছু প্রটোকলের ব্যাপার থাকায় সব অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারেন না। তবে, সমাজিক কর্মকাণ্ডে থাকার চেষ্টা করেন বলে জানান তিনি। রাজনীতি নিয়ে আগামী দিনগুলো কাটিয়ে দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে তিনি বলেন, যে চিন্তা ও আদর্শ নিয়ে রাজনীতি শুরু করেছি। সে আদর্শ ও চিন্তা নিয়ে সামনের দিনগুলো কাটাতে চাই।
সম্প্রতি ঘোষিত মৌলভীবাজার জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য পদে নাম না রাখায় কোনো খেদ নেই সুলতান মনসুরের। তিনি বলেন, আমি আওয়ামী লীগের সাংঠনিক সম্পাদক ছিলাম। সেই পদে তো থাকতে পারলাম না। জেলা কমিটিতে থাকলাম কি থাকলাম না সেটা নিয়ে আর মাথাব্যথার কী আছে।
সাবেক এক কার্যনির্বাহী সদস্য ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা দলের কোনো কর্মসূচিতে গেলে ঢুকতে পারি না। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর কাছে আমাদের নামের তালিকা থাকে না। বাধার মুখে পড়তে হয়। তাদের কাছে সভানেত্রীর কার্যালয়ের কর্মচারীরা আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয় আগের কমিটিতে ছিল, ঢোকার অনুমতি দেবেন কিনা আপনাদের ব্যাপার। এর পরে আমাদের অবস্থান কী হতে পারে সেটা তো বলার অপেক্ষা থাকে না।
গত বছর জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে দল থেকে বাদ পড়া সাবেক নেতাদের সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে ও আলাপচারিতায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। বিগত জরুরি সরকারের সময় দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার মতের বিরুদ্ধে অবস্থান ও সংস্কারপন্থী হওয়ায় এই নেতারা কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে বাদ পড়েন বলে কথিত রয়েছে। আর জাতীয় কাউন্সিলে কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে বাদ পড়ার পর থেকেই মূলত এরা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন।
আগের কমিটি থেকে যেসব জাতীয় নেতা বাদ পড়েন তারা হচ্ছেন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমু, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুকুল বোস, সাংগঠনিক সম্পাদক সাবের হোসেন চৌধুরী এমপি, আবদুল মান্নান, মাহমুদুর রহমান মান্না, সুলতান মুহম্মদ মনসুর, বীর বাহাদুর এমপি, অর্থ পরিকল্পনা বিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক আলী আশরাফ এমপি, স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক অধ্যাপিকা নাজমা রহমান, কেন্দ্রীয় নেতা অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, আখম জাহাঙ্গীর হোসাইন, মির্জা সুলতান রাজা, হাবিবুর রহমান খান, অধ্যাপক মোহাম্মদ হানিফ প্রমুখ। তবে, এদের মধ্যে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমু, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও আবদুল জলিল দলের উপদেষ্টা পরিষদে স্থান পেয়েছেন। এর বাইরে আগের কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আখতারউজ্জামান ও আবদুর রহমান এমপির পদাবনতি হয়ে বর্তমান কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্যপদ পান।
সভাপতি থেকে বাদ পড়ে বর্তমানে উপদেষ্টা পরিষদে অন্তর্ভুক্ত হওয়া আমির হোসেন আমু বেশির ভাগ সময় ইস্কাটনের বাসায় সময় কাটান। এখানে বসে নির্বাচনী এলাকার জনগণের সঙ্গে কথা বলেন। সংসদ সদস্য হিসেবে জনগণের সমস্যার সমাধানের চেষ্টা চালান। আমির হোসেন আমু প্রায় প্রতি সপ্তাহে তার নির্বাচনী এলাকা ঝালকাঠি যান বলে তার পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে। সূত্র জানায়, আগে কেন্দ্রীয় কমিটির দায়িত্ব পালন করার কারণে এলাকায় কম যেতে পারতেন। এখন হাতে সময় থাকায় প্রায়ই যেতে পারেন। এলাকার প্রতিটি উন্নয়ন কাজ তদারকি করেন বলেও পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে। পাশাপাশি তিনি দলের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য হিসেবে সভানেত্রী অর্পিত দায়িত্ব পালন করেন। কমিটি গঠনের পর এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের দুটি সভায়ই তিনি উপস্থিত থেকে দলকে পরামর্শ দিয়েছেন।
জানা গেছে, সভাপতিমণ্ডলী থেকে বাদ পড়া আবদুর রাজ্জাক এমপি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি নিয়ে ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করেন। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি আবদুর রাজ্জাক নিয়মিত জাতীয় সংসদ ভবনে তার অফিসে বসেন। এর বাইরে নাখালপাড়ায় তার ন্যাম ভবনের বাসায় বৃহস্পতি, শুক্র ও শনিবার এলাকার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এলাকার মানুষের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেন। আবদুর রাজ্জাক সময় পেলে নির্বাচনী এলাকায় যান বলেও জানা গেছে। এছাড়া মাঝে মধ্যে তিনি আওয়ামী ঘরানার বিভিন্ন সংগঠনের সভা-সেমিনারে অংশ নেন। শারীরিকভাবে কিছুটা অসুস্থ আবদুর রাজ্জাককে নিয়মিত চেকআপের জন্য ব্যাংককে যেতে হয় বলে তার পারিবারিক সূত্র জানায়।
সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থান না পেয়ে ও সভাপতিমণ্ডলী থেকে বাদ পড়ে অনেকটা অভিমানে রয়েছেন ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের নায়ক তোফায়েল আহমেদ। কিছুটা ক্ষুব্ধ এই নেতা নিজেকে দলের উপদেষ্টা পরিচয় দিতেও চান না। গণমাধ্যমে তাকে উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য উল্লেখ করলেও ক্ষুব্ধ হন বলে তার ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে। এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত দলের উপদেষ্টা পরিষদের কোনো বৈঠকেই উপস্থিত হননি তিনি। এ বছর এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত ভোলা-১ আসনের উপনির্বাচনে দলীয় প্রার্থী নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করে শাওনকে বিজয়ী করায় বেশ লাইমটাইটে আসেন তোফায়েল আহমেদ। তবে, কিছুদিন যেতে না যেতেই আবার নিভৃতচারী হয়ে যান তিনি। বর্তমানে তোফায়েল আহমেদ শিল্প মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বনানীর বাড়িতে বসে এলাকার মানুষের সঙ্গে নিয়মিত সাক্ষাত্ করছেন।
উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এতদিন নিষ্ক্রিয় থাকলেও সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটির কো-চেয়ারম্যান ও মুখপাত্র হওয়ার পর বেশ নড়ে-চড়ে উঠেছেন। সংবিধান সংশোধনসহ রাজনৈতিক বিভিন্ন ইস্যুতে সংসদের মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিক ডেকে কথা বলছেন। যুদ্ধাপরাধী ও সংবিধান সংশোধনসহ অন্যান্য ইস্যু নিয়ে তিনি সেমিনার সিম্পোজিয়ামে অংশ নিচ্ছেন। আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এর আগে দুই বিচারপতি বহিষ্কার ও পুনর্বহাল নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সংস্থাপন বিষয়ক উপদেষ্টা এইচটি ইমামের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থানের পর পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিলেন। তারপর থেকে বেশ কিছুদিন তিনি নিষ্ক্রিয় অবস্থায় ছিলেন। এদিকে স্থানীয় রাজনৈতিক গ্রুপিংয়ের কারণে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত নির্বাচনী এলাকায় কম যাওয়া-আসা করেন বলে জানা গেছে।
অনেকটা একলা চল নীতি অবলম্বন করছেন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল এমপি। অভিমানী আবদুল জলিল রাজনীতি থেকে পুরোটাই মুখ ফিরিয়ে নিজের ব্যাংক ব্যবসা নিয়ে সময় কাটাচ্ছেন। শুধু উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক নয় জাতীয় কোনো ধরনের কর্মসূচিতে অংশ নেন না তিনি। তবে, এলাকার রাজনীতিতে নিয়মিত অংশ নেন বলে জানা গেছে। গত বছর লন্ডনে একটি গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনাসহ দল সম্পর্কে বিতর্কিত মন্তব্য করার পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ হারান শেখ হাসিনার এক সময়কার ঘনিষ্ঠজন খ্যাত এই নেতা। ওই সময় দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তাকে পাগল বলেও আখ্যায়িত করেন। আর তারপর থেকেই নিশ্চুপ হয়ে পড়েন আবদুল জলিল। সংসদ সদস্য আবদুল জলিল মাঝে মধ্যে সংসদ অধিবেশনে গেলেও কারও সঙ্গে খুব একটা কথা বলেন না। এমনকি কুশলাদি বিনিময় করতেও দেখা যায় না তাকে।
জাতীয় এসব নেতার মতো দল থেকে ছিটকে পড়া অন্যরাও নিভৃতচারীর মতো দিন যাপন করছেন। তাদের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যেমন ভূমিকা নেই। তেমনি দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামেও ভূমিকা রাখার কোনো সুযোগ নেই। বাদ পড়াদের মধ্যে সাবের হোসেন চৌধুরী, আবদুল মান্নান, বীর বাহাদুর, ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন ও অধ্যাপক আলী আশরাফ দলীয় মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় এলাকার লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সংসদ অধিবেশনে অংশ নেয়ার মধ্যেই এদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রয়েছে।
তবে, সংস্কারপন্থী হওয়ার অভিযোগে পদ হারানো সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সাবের হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে দলের হাইকমান্ডের সম্পর্ক নতুন করে মোড় নিচ্ছে বলে একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে। সাবের হোসেন চৌধুরী ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেতে নানা চেষ্টা তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন। আওয়ামী লীগের দলীয় জরিপসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার জরিপে জনপ্রিয়তার দিক থেকে সাবের হোসেন দলের সম্ভাব্য অন্য প্রার্থীদের চেয়ে এগিয়ে থাকার কারণে প্রধানমন্ত্রী ইদানীং তার বিষয়ে কিছুটা নমনীয় বলে ওই সূত্র নিশ্চিত করেছে।
‘বর্তমান দিনকাল কেমন চলছে’ জানতে চাইলে আগের কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুকুল বোস বলেন, দিন চলে যাচ্ছে। বাসায় থেকে পারিবারিক কাজকর্মের মধ্য দিয়ে সময় কাটাই। ছোটোখাট ব্যবসা আছে, সেটা দেখাশুনা করি। আওয়ামী লীগের পরীক্ষিত এই নেতা কিছুটা আক্ষেপ করে বলেন, দলের কর্মসূচিতে আমাকে বলা হয় না। সেজন্য আমি যাইও না। তবে এলাকার লোকজনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করি। বাইরে থেকে রাজনীতি পর্যবেক্ষণ করি।
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থা জানতে চাইলে কিছুটা হতাশা প্রকাশ করে সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ডাকসুর সাবেক ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, রাজনীতিতে যা হচ্ছে তা তো দেখছ-ই। নিজের অবস্থা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভালোই আছি। সময় সুন্দরভাবেই কেটে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে এমন ব্যস্ত থাকি যে পেরে উঠি না। পুরনো অভ্যাসমত পড়াশোনা করি। টিভিতে একটা অনুষ্ঠান করি (রাজনৈতিক টক-শো)। সভা সেমিনারে অংশ নেই। নিজের একটা ব্যবসা রয়েছে, সেটা মাঝে ভালো ছিল না। এখন আবার এটাকে নতুন করে শুরু করেছি। সময় পেলে এলাকায় গিয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেন বলে জানান মান্না।
বিগত কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক এক সময়কার তুখোড় ছাত্র নেতা সুলতান মুহাম্মদ মনসুর আহমেদ জানান, তিনি বর্তমানে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পরিবেশে দিন কাটাচ্ছেন। সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার পাশাপাশি সুযোগ হলে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তবে, এক্ষেত্রে কিছু প্রটোকলের ব্যাপার থাকায় সব অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারেন না। তবে, সমাজিক কর্মকাণ্ডে থাকার চেষ্টা করেন বলে জানান তিনি। রাজনীতি নিয়ে আগামী দিনগুলো কাটিয়ে দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে তিনি বলেন, যে চিন্তা ও আদর্শ নিয়ে রাজনীতি শুরু করেছি। সে আদর্শ ও চিন্তা নিয়ে সামনের দিনগুলো কাটাতে চাই।
সম্প্রতি ঘোষিত মৌলভীবাজার জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য পদে নাম না রাখায় কোনো খেদ নেই সুলতান মনসুরের। তিনি বলেন, আমি আওয়ামী লীগের সাংঠনিক সম্পাদক ছিলাম। সেই পদে তো থাকতে পারলাম না। জেলা কমিটিতে থাকলাম কি থাকলাম না সেটা নিয়ে আর মাথাব্যথার কী আছে।
সাবেক এক কার্যনির্বাহী সদস্য ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা দলের কোনো কর্মসূচিতে গেলে ঢুকতে পারি না। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর কাছে আমাদের নামের তালিকা থাকে না। বাধার মুখে পড়তে হয়। তাদের কাছে সভানেত্রীর কার্যালয়ের কর্মচারীরা আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয় আগের কমিটিতে ছিল, ঢোকার অনুমতি দেবেন কিনা আপনাদের ব্যাপার। এর পরে আমাদের অবস্থান কী হতে পারে সেটা তো বলার অপেক্ষা থাকে না।
সর্বশেষ সংবাদ
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশি আমেরিকা পুলিশ কর্মকর্তার নামে সড়ক ‘ডিটেকটিভ দিদারুল ইসলাম ওয়ে’
- ECOSOC recommends UN General Assembly to take decision on Bangladesh and Nepal’s LDC graduation extension requests
- ইকোসকের সুপারিশ: বাংলাদেশ ও নেপালের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সাধারণ পরিষদ
- Bangladesh co-chairs multi-stakeholder panel session on Global Road Safety, calls for stronger institutions to save lives
- নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক বহুপক্ষীয় প্যানেল অধিবেশনে বাংলাদেশের যৌথ-সভাপতিত্ব; প্রাণহানি কমাতে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আহ্বান
- Road Transport Minister reaffirms Bangladesh’s commitment to halving road traffic deaths by 2030
- বাংলাদেশে ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি অর্ধেকে নামিয়ে আনার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর
- ধুমকেতু ছিনিয়ে নেয় সম্মোহনী টিয়েম্পো: ইয়ামালের উদ্দেশ্যে ফুটবল পদাবলি