রিপাবলিকানদের দখলে কংগ্রেস

নুরুল ইসলাম: প্রার্থীর মতো প্রচারণায় সারাদেশ চষে বেড়িয়েও দলের পরাজয় ঠেকাতে পারলেন না প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। রাজনীতি থেকে অনেকটা দূরে সরে গিয়েও ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রচারণার হাল ধরেছিলেন দলের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। তার সম্মোহনও কাজে আসেনি। ফলে জনমত জরিপে যা আশঙ্কা করা হচ্ছিল, তা-ই হলো। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভ বা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারালো ওবামার ডেমোক্রেটিক পার্টি। ৪৩৫ আসনের প্রতিনিধি পরিষদে সর্বশেষ ফলাফল অনুযায়ী ডেমোক্রেটিক পার্টি পেয়েছে মাত্র ১৮৫ আসন। আর প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান পার্টি ২৩৯ আসন। বাকি ১১ আসনের
ফল এখনও ঘোষণা হয়নি। প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ২১৮ আসন। সে হিসাবে এরই মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার চেয়ে ২১ আসন বেশি পেয়েছে রিপাবলিকানরা। অথচ ২০০৮ সালের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের দখলে ছিল প্রতিনিধি পরিষদের ২৫৫ আসন, রিপাবলিকানদের ১৭৮। দুটি আসন ছিল শূন্য। চার বছর পর প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেল রিপাবলিকানরা। আর পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেটে এবার ৬ আসন হারিয়েও কোনোমতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রেখেছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। ১০০ আসনের সিনেটে সর্বশেষ হিসাবে ডেমোক্র্যাটদের আসন ৫১ আর রিপাবলিকানদের ৪৬। তিনটি আসনের ফল ঘোষণা এখনও হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি দু’বছর পর সিনেটের এক-তৃতীয়াংশ আসনে এবং প্রতিনিধি পরিষদের সব আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সে অনুযায়ী এবার সিনেটে নির্বাচন হয়েছে ৩৭ আসনে। এগুলোর ১৯টি ছিল ডেমোক্র্যাটদের আর ১৮টি রিপাবলিকানদের। কিন্তু এর মধ্যে ৬টি আসন হারিয়ে বসেছে ডেমোক্র্যাটরা। ২০০৮ সালের নির্বাচনে সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের আসন ছিল ৫৭টি। এছাড়া দু’জন স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন তাদের পক্ষে। সব মিলিয়ে তাদের ছিল ৫৯ আসন। এবার তা এসে ঠেকেছে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় নূ্যনতম ৫১ আসনে। অর্থাৎ দলের এক বা একাধিক সিনেটর বেঁকে বসলে সিনেটেই যে কোনো কর্মসূচি অনুমোদন করাতে বেগ পেতে হবে প্রেসিডেন্ট ওবামাকে। আর প্রতিনিধি পরিষদে তো ডেমোক্র্যাটরা হেরেছেন গো-হারা। গতবারের ৬০টি আসন খুইয়েছে তারা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মধ্যবর্তী নির্বাচনে কোনো প্রেসিডেন্টের দল কংগ্রেসে এত বিশাল ব্যবধানে হারেনি। মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বিপর্যয়ের কারণ ২০০৭ সালে শুরু হওয়া অর্থনৈতিক মন্দাবস্থা এখন পর্যন্ত কাটিয়ে উঠতে না পারা। অর্থনৈতিক মন্দায় জনগণের হতাশা আর ক্ষোভকে কাজে লাগিয়েছে ‘টি-পার্টি’ নামে পরিচিত রিপাবলিকান পার্টির একটি কট্টরপন্থি গ্রুপ। ডেমোক্র্যাটদের হারাতে এ নির্বাচনে তারা ঢেলেছে প্রায় আড়াইশ’ কোটি ডলার। নির্বাচনে এ বিপর্যয়ের পর প্রেসিডেন্ট ওবামাকে এখন যে কোনো কর্মসূচি বা আইন অনুমোদন করাতে অবশ্যই রিপাবলিকানদের সঙ্গে সমঝোতা করতে হবে। বুধবার দুপুরে হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতিতে ভোটারদের হতাশার কথা স্বীকার করে প্রেসিডেন্ট ওবামা বলেছেন, আমাদের অবশ্যই আরও ভালো করতে হবে। তবে এ নির্বাচনে জনগণ তার এজেন্ডা সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে_ এটা মানতে নারাজ ওবামা।
কংগ্রেসের উভয় কক্ষ ছাড়াও মঙ্গলবার নির্বাচন হয়েছে ৩৭টি রাজ্যের গভর্নর এবং বিভিন্ন রাজ্যের স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পদে। গভর্নর নির্বাচনেও রিপাবলিকানদের জয়জয়কার। সর্বশেষ হিসাব মতে, ৩৭টি রাজ্যে গভর্নর নির্বাচনের পর রিপাবলিকানদের দখলে চলে গেছে সংখ্যাগরিষ্ঠ ২৯ রাজ্য। ১৬টি আছে ডেমোক্র্যাটদের কব্জায়। ৪ রাজ্যের ফল ঘোষণা এখনও হয়নি। রোড আইল্যান্ডের গভর্নর হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী। ডেমোক্র্যাটরা হারিয়েছে গতবারের ৮টি গভর্নর পদ। যুক্তরাষ্ট্রের এ মধ্যবর্তী নির্বাচনে হোয়াইট হাউসের ক্ষমতার পালাবদল না হলেও প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণের হাতবদল হচ্ছে। প্রতিনিধি পরিষদের নতুন স্পিকার হচ্ছেন ওহাইও থেকে নির্বাচিত জন এ বোয়েহনার। জানুয়ারিতে নতুন দায়িত্বে অভিষিক্ত হবেন তিনি। মঙ্গলবার রাতে নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরই সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে তাকে অভিনন্দন জানান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। এ সময় ওবামা তাকে একযোগে ‘কমন গ্রাউন্ড’ বা অভিন্ন কর্মসূচি খুঁজে বের করতে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। আর সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে নির্বাচনে জয়লাভের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় সরকারের আকার কমানো এবং সরকারি ব্যয় কাটছাঁট করার অঙ্গীকার করেন জন বোয়েহনার। নিজের এবং রিপাবলিকান পার্টির বিজয়ের আনন্দে অশ্রুসজল বোয়েহনার বলেন, ‘ভোটাররা ওবামা সাহেবকে গতি পরিবর্তনের বার্তা দিয়েছেন।’ তিনি বলেন, এখন যেভাবে সরকার চলছে তারা আর সেভাবে চলতে দেবেন না। সেজন্য জনগণের পার্লামেন্টে তারা জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর চেষ্টা করবেন। প্রতিনিধি পরিষদে স্পিকার হিসেবে জন বোয়েহনার স্থলাভিষিক্ত হবেন ডেমোক্র্যাট ন্যান্সি পেলোসির।
যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ম অনুযায়ী প্রতি দু’বছর পর প্রতিনিধি পরিষদের সব আসন, সিনেটের এক-তৃতীয়াংশ আসন এবং বিভিন্ন রাজ্যে গভর্নর ও স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দু’বছর পর এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় এটাকে বলে মধ্যবর্তী নির্বাচন। তবে এ নির্বাচনে পরাজয় মানেই যে বড় কোনো বিপর্যয় তা নয়। ১৯৩৮ সাল থেকে অনুষ্ঠিত ১৮টি মধ্যবর্তী নির্বাচনে মাত্র দুটি ব্যতিক্রম ছাড়া সবগুলোতেই প্রেসিডেন্টের দল খারাপ ফল করেছে। এ দুটি ব্যতিক্রম হলো প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের দ্বিতীয় মেয়াদে (১৯৯৮ সালে) এবং প্রেসিডেন্ট জর্জ ডবি্লউ বুশের প্রথম মেয়াদের (২০০২ সালে) নির্বাচনে। অর্থাৎ প্রথম মেয়াদের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বুশ ছাড়া কোনো প্রেসিডেন্টের দলই সাফল্য পায়নি। ২০০২ সালে বুশের আমলে রিপাবলিকানদের সাফল্যের কারণ ছিল ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার পর আফগান যুদ্ধ। দেশের ওই ক্রান্তিলগ্নে ক্ষমতার পালাবদলে উৎসাহী ছিলেন না আমেরিকানরা।
প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা থাকায় কংগ্রেসের উভয় কক্ষ বিরোধী দলের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও হোয়াইট হাউসের ক্ষমতা বদল হয় না। তবে এর ফলে এমনকি যে কোনো জনপ্রিয় এবং দেশের জন্য অত্যাবশ্যক কর্মসূচি কংগ্রেসে অনুমোদন করাতেও বেগ পেতে হয় প্রেসিডেন্টকে। সিনেট এবং প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুবাদে গত দুটি বছর অত্যন্ত নিরাপদে কাটিয়ে দিলেও এবার পদে পদে হোঁচট খেতে হবে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে। প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় সরকারের আকার ও সরকারি ব্যয় কমানোর ঘোষণার মধ্য দিয়েই তার একটা হুশিয়ারি সংকেত পাওয়া গেল।
কে কোথায় জিতলেন
ডেমোক্র্যাটদের পরাজয়ের ক্ষতকে অধিকতর বেদনাদায়ক করে ইলিনয় রাজ্যে প্রেসিডেন্ট ওবামার সাবেক সিনেট আসন ছিনিয়ে নিয়েছেন একজন রিপাবলিকান। তবে সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হ্যারি রিড রিপাবলিকান টি-পার্টি নেত্রী শ্যারন অ্যাঙ্গলকে হারিয়ে তার নেভাদার আসনটি ধরে রেখেছেন। রিপাবলিকান পার্টির উগ্র রক্ষণশীলদের তথাকথিত টি-পার্টির শীর্ষনেতাদের বেশিরভাগই হেরেছেন। তবে তাদের কারও কারও বিজয় প্রমাণ করেছে দলের অভ্যন্তরে তারা এখন অন্যতম শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। ওয়াশিংটন, আলাস্কা, কলোরাডো_ এ তিন অঙ্গ রাজ্যের সিনেট নির্বাচনের ফল এখনও ঘোষণা হয়নি। ইলিনয়ের মতো রিপাবলিকান পার্টি পেনসিলভানিয়া, উইসকনসিন, আরকানসাস, নর্থ ডাকোটা এবং ইন্ডিয়ানার সিনেট আসনও ডেমোক্র্যাটদের দখল থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে। আরকানসাসে জিতেছেন রিপাবলিকান জন বুজম্যান। কেনটাকিতে জিতেছেন রিপাবলিকান টি-পার্টির র্যান্ড পল। ফ্লোরিডার সিনেটে জিতেছেন একই দলের মার্কো রুবিও। তবে রিপাবলিকান টি-পার্টির ক্রিস্টিন ও ডোনেল ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর কাছে হেরেছেন ডেলাওয়ার অঙ্গরাজ্য। ডেমোক্র্যাট জো ম্যানচিন জিতেছেন ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ায়, কানেকটিকাট আসনে রিচার্ড ব্লুমেনঙ্গল। ক্যালিফোর্নিয়া এবং নিউইয়র্কেও সিনেটে জিতেছে ডেমক্র্যাটরা। গভর্নর পদে সবচেয়ে আলোচিত ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যে রিপাবলিকান মেগ হোয়াইটম্যানকে হারিয়ে জয়ের মালা পরেছেন ডেমোক্র্যাট জেরি ব্রাউন। ওহাইওতে গভর্নর হয়েছেন রিপাবলিকান জন কাসিশ। নিউইয়র্কের নতুন গভর্নর ডেমোক্র্যাট অ্যান্ড্রু কিউমো। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল মধ্যবর্তী নির্বাচন হয়েছে এবার। কমপক্ষে সাড়ে তিনশ’ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে এবারের নির্বাচনে।
টেক্সাস, নেব্রাস্কা এবং সাউথ ডাকোটার গভর্নর পদ বহাল রেখেছে রিপাবলিকান পার্টি। মঙ্গলবার পর্যন্ত ২৬ রাজ্যে গভর্নর ছিলেন ডেমোক্র্যাটরা, ২৪ রাজ্যে রিপাবলিকানরা। ৩৭ রাজ্যে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর এখন রিপাবলিকানদের দখলে ২৯ রাজ্যের গভর্নর পদ, আর মাত্র ১৬ রাজ্য ডেমোক্র্যাটদের দখলে। ৪ রাজ্যে গভর্নর নির্বাচনের ফল এখনও ঘোষণা হয়নি। হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভে নিউইয়র্কের ৫টি আসনসহ হেভিওয়েট প্রায় সব আসনেই জিতেছেন রিপাবলিকানরা। পেলসিলভানিয়া, ওহাইওতেও ৫টি করে আসনের সবগুলোই রিপাবলিকানদের। এছাড়া ইলিনয়, ফ্লোরিডা, টেনেসি এবং ভার্জিনিয়ায় ৩টি করে আসন পেয়েছে তারা। দুটি করে আসন পেয়েছে আরকানসাস, কলোরাডো এবং মিসিসিপিতে।
- A Star Dimmed: Mourning the Loss of Tofail Ahmed, Architect of Our History
- নিউইয়র্ক ষ্টেট অ্যাসেম্বলী ডিষ্ট্রিক্ট-৩০’র প্রাইমারী নির্বাচনে শামসুল হকের সমর্থনে জ্যামাইকায় ফান্ড রেইজিং
- Bangladesh Secures Historic Victory in UNGA Presidency
- New York Attorney General James Secures Refunds for All New Yorkers Cheated by Nissan Dealerships’ Lease Overcharge Schemes
- নিউইয়র্কে নতুন সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘হৃদয় বীণা সংগীতালয়’র যাত্রা শুরু
- শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাত বার্ষিকীতে নিউইয়র্কে ‘জ্যাকসন হাইটস এলাকাবাসী’র দোয়া মাহফিল
- জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বিজয়
- নিউইয়র্কে ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী পরিবার নিউইয়র্ক সিটি’র উদ্যোগে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ৪৫ তম শাহাদাত বার্ষিকী পালন