বাংলাদেশের কূটনীতিকদের গৃহকর্মী কেলেংকারির নেপথ্যের নানা কারণ : গৃহকর্মীর নামে আত্মীয়-স্বজন নিয়ে আসেন কূটনীতিকরা!
ইউএসএনিউজঅনলাইন.কম ডেস্ক, নিউইয়র্ক : সাম্প্রতিককালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের কূটনীতিকদের গৃহকর্মী কেলেংকারির নেপথ্যের নানা কারণ এখন প্রকাশ পাচ্ছে। কোনও প্রকার নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করে কূটনীতিক পদে সরাসরি রাজনৈতিক নিয়োগের বিষয়টি নিয়েও এক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে কূটনৈতিক পদে তাদের দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা নিয়ে। বলা হচ্ছে, রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত এইসব কূটনীতিকদের এই পেশার নিয়ম-কানুন সম্পর্কে যেমন কোনও জ্ঞান নেই তেমনি কোন প্রশিক্ষণও নেই। কোনও প্রকার পাবলিক সার্ভিস পরীক্ষা ছাড়াই সরাসরি নিয়োগ পাওয়ায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব কূটনীতিক দায়িত্ব পালনে যোগ্যতার পরিচয় দিতে পারেন না। আবার পেশাদার কূটনীতিকদেরও কেউ কেউ গৃহকর্মী পদে তাদের আত্মীয়-স্বজনদের নিয়োগ দিয়ে তাদের যুক্তরাষ্ট্রে এনে থাকার ব্যবস্থা করেছেন। এই সব কারণেই গৃহকর্মী সংক্রান্ত এহেন দুঃখজনক অনিয়মের সূত্রপাত। আবার গৃহকর্মীরা নিজেরাও নানা অজুহাতে কূটনীতিকদের বিরুদ্ধে মামলা করে যুক্তরাষ্ট্রে গ্রীন কার্ড পাওয়ার সুবিধা নিতে সচেষ্ট। সব মিলিয়ে গৃহকর্মী বিষয়ক জটিলতায় বাংলাদেশের ভাবমূর্তি মারাত্মক ক্ষুন্ন হচ্ছে।
নিউইয়র্কের ডেপুটি কনসাল জেনারেল শাহেদুল ইসলামের গৃহকর্মী তাকে উপযুক্ত পারিশ্রমিক না দেয়ার অভিযোগে মামলা দায়ের করেছেন। শাহেদুল ইসলামকে নিউইয়র্কে গ্রেফতার করা হয়। পরে তিনি জামিনে মুক্ত হন। শাহেদুল সম্পর্কে জানা যায়, প্রভাবশালী হওয়ার কারণে কোনও প্রকার পাবলিক সার্ভিস পরীক্ষা ছাড়াই তাকে ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিউইয়র্কে বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলে ডেপুটি কনসাল জেনারেল নিয়োগ দেয়া হয়। প্রায় ছয় বছরের বেশি সময় ধরে একই পদে নিযোজিত রয়েছেন। এত দীর্ঘ সময় কোনও পেশাদার কূটনীতিকেরও এক পদে নিযুক্ত থাকার ঘটনা বিরল। সাধারণত একজন কূটনীতিক বিদেশে একটি মিশনে তিন বছরের বেশি নিযুক্ত থাকেন না। অসাধারণ যোগ্য হলে ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে কেউ কেউ হয়ত চার-পাঁচ বছর একটি মিশনে থাকতে পারেন। কিন্তু শাহেদুল ইসলাম আওয়ামী লীগের একজন নেতা হওয়ায় তার ক্ষেত্রে কোনও নিয়ম প্রযোজ্য হচ্ছে না। গৃহকর্মী সংক্রান্ত মামলার মতো বড় কেলেংকারির পর সাধারণত অভিযুক্ত কূটনীতিককে দেশে ফিরিয়ে নেয়া হয়। ভারতের কূটনীতিক দেবযানি খোবরাগাড়ে এ ধরনের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়ার পর ভারত তাকে জামিনে মুক্ত হওয়ার পর পরই দেশে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে। একই ধরনের ঘটনা হলেও শাহেদুলকে দেশে ফিরিয়ে নেয়া তো দূরের কথা, তাকে কূটনৈতিক দায়মুক্তির আওতায় আনার জন্য তাকে পদোন্নতি দিয়ে স্থায়ী মিশনে কাউন্সিলর পদে নিয়োগ দেয়া হয়। তাকে আদৌ দেশে ফিরিয়ে আনা হবে কিনা সে ব্যাপারে কোনও সিদ্ধান্ত এখনও নেয়নি বাংলাদেশ সরকার। কিন্তু ফিরিয়ে আনা না হলে সৃষ্ট বিব্রতকর পরিস্থিতিতে আইনি জটিলতার কারণে নিউইয়র্কে তার পক্ষে কাজ করাও কঠিন হবে।
বিনা পরীক্ষায় কূটনীতিক নিয়োগ শুধু শাহেদুল ইসলাম একাই পাননি। নিউইয়র্কের এই একই কনস্যুলেট কার্যালয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে ২০০৯ সাল থেকে নিয়োজিত রয়েছেন এমন অরো একজন কর্মকর্তা যিনি গেজেটেড নন। পরীক্ষা ছাড়াই তিনিও ‘খাতিরি নিয়োগ’ পেয়েছেন। ফ্রান্সে বাংলাদেশ দূতাবাসে প্রথম সচিব (সংস্কৃতি) পদে ২০০৮ সালের এপ্রিল থেকে নিযুক্ত আছেন আনিসা আমিন। তিনি একইভাবে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিযুক্ত। অষ্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশ হাই কমিশনে প্রথম সচিব নাজমা আকতার নিয়োগ পান ২০১২ সালের মার্র্চে এবং একই মিশনে দ্বিতীয় সচিব শামীমা পারভিন নিযুক্ত হন ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে। তারা সরকারের কোনও গেজেটেড কর্মকর্তা নন। রাজনীতির গলিপথে তারা এখন কূটনীতিক!
যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টারে বাংলাদেশের সহকারী হাই কমিশনে কাউন্সিলর পদে ২০১০ সালের অক্টোবর থেকে নিযুক্ত আছেন মোঃ ওয়াহিদুর রহমান বিশ্বাস টিপু। তিনিও একই কায়দায় রাজনৈতিক বিবেচনায় নিযুক্ত। কানাডায় বাংলাদেশ হাই কমিশনে ২০১১ সাল থেকে প্রথম সচিব পদে নিযুক্ত আছেন অপর্না রানী পাল। তিনিও রাজনৈতিক কানেকশনে নিয়োগ পান। জার্মানীতে বাংলাদেশ দূতাবাসে প্রথম সচিব পদে ২০১১ সালের নভেম্বর থেকে নিযুক্ত আছেন কাজী তুহিন রাসেল। লন্ডনে বাংলাদেশ মিশনে দ্বিতীয় সচিব পদে ২০১১ সালের অক্টোবর থেকে নিযুক্ত আছেন শিরিন আক্তার। তারাও প্রভাবশালী হিসাবে সরাসরি রাজনৈতিক নিয়োগ পেয়েছেন।
বিশেষ যোগ্যতা সম্পন্ন কোনও ব্যক্তিকে বিদেশে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত পদে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেয়ার রেওয়াজ রয়েছে। তবে এই নিয়োগের সংখ্যা কোনওভাবেই বিদেশে বাংলাদেশের মোট রাষ্ট্রদূতের ১০ শতাংশের বেশি হবে না। এছাড়াও, প্রেস মিনিস্টারসহ কোনও কোনও বিশেষায়িত পদে চুক্তিভিত্তিতে সরাসরি নিয়োগের প্রচলন আছে। কিন্তু শুধু রাষ্ট্রদূত ছাড়া অন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনীতিক পদে বিসিএস ক্যাডার ছাড়া সরাসরি নিয়োগের ঘটনা যৌক্তিক নয় বলেই বিশেষজ্ঞ মহল মনে করেন। এসব পদ গেজেটভুক্তদের জন্য নির্ধারিত।এইসব গেজেটেড অফিসার পদে সরাসরি নিয়োগ দিয়ে ক্ষমতাসীন মহলের লোকদের কূটনৈতিক দায়িত্বে ঢোকানো হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় নিয়োগ পাওয়া কূটনীতিকরা ছয় থেকে নয় বছর পর্যন্ত একই মিশনে একই পদে নিযুক্ত থাকছেন। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা থেকে না যাওয়া পর্যন্ত তারা বহাল তবিয়তেই থাকবেন। বিশেসজ্ঞ মহলের মতে, রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ এভাবে প্রভাবশালীদের পেছনে বছরের পর বছর ব্যয় করা অনৈতিক। এসব কূটনীতিক কোনও পাবলিক পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হয়ে চাকুরীতে যোগ দেননি। তাই তাদের নিয়োগেরও কোন বৈধতা নেই।
লক্ষ্যনীয় যে, রাজনৈতিক বিবেচনায় সরাসরি নিয়োগ পাওয়া কূটনীতিকরা বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোতে নিযুক্ত হচ্ছেন। অপরদিকে, বিসিএস পাশ করে চাকুরিতে যোগ দেয়া পেশাদার কূটনীতিকরা তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ দেশে নিযুক্তি পাচ্ছেন। বলাই বাহুল্য, এ নিয়ে ফরেন সার্ভিসে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
এদিকে, এসব কূটনীতিক শুধু গৃহকর্মীর মামলার মতো বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যেই যে শুধু পড়ছেন তাই নয়, বরং আরও অনেক ধরনের কেলেংকারির ঘটনা ঘটিয়ে চলেছেন। কিছুদিন আগে মালয়েশিয়ায় রাজনৈতিক বিবেচনায় কূটনীতিক নিযুক্ত হয়েছিলেন যুব মহিলা লীগের সূচনা রানী হালদার। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমামের নির্দেশে তাকে কূটনীতিক হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয়। তাকে কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাই কমিশনে পাসপোর্ট দেখাশোনার দায়িত্ব দিলে তার তত্ত্বাবধানে থাকা বাংলাদেশের পাসপোর্টের পাঁচশ’ কপি হারিয়ে যায়। তারপর এ নিয়ে তদন্ত করে সরকার তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে তার নিয়োগের চুক্তি বাতিল করে।
গৃহকর্মী নিয়ে কেলেংকারির মতো ঘটনায় পেশাদার কূটনীতিকদের কর্মকান্ডও কম নয়। বিগত ৪০ বছরে পেশাদার কূটনীতিকরা গৃহকর্মী হিসাবে নিজের আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে গিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রেখে এসেছেন। ফরেন সার্ভিসের এক কর্মকর্তা নিউইয়র্কে পোষ্টিং নিয়ে দুইজন গৃহকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন। তাদের দু’জনকেই তিনি জ্যাকসন হাইটসে রেখে আসেন। এই কূটনীতিক মিলানে নতুন করে পোষ্টিং নেয়ার সময়ে আবার গৃহকর্মী নিয়োগের জন্যে অনুমতি চান। ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া গৃহকর্মীদের সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জবাব দেন যে, তার সঙ্গে ওই গৃহকর্মীদের দুই বছরের চুক্তি ছিল। দুই বছরের চুক্তির পর তারা কোথায় গেছেন সেটা তার দেখার বিষয় নয়! বাংলাদেশের আরেক পেশাদার কূটনীতিক লস অ্যাঞ্জেলসে পোষ্টিং থাকাকালে তার আপন ভাইকে গৃহকর্মী হিসাবে নিয়ে সেখানে রেখে আসেন। নিউইয়র্কে আরেক পেশাদার কূটনীতিক তার আপন ভাতিজাকে গৃহকর্মী হিসাবে নিয়ে রেখে আসেন। এসব কর্মকান্ড চলেছে গত ৪০ বছর ধরে। এখন এইসব গৃহকর্মীরা বিদেশে তাদের রেখে না আসলেই তারা পালিয়ে যান। তারপর কূটনীতিকের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এভাবে তারা যুক্তরাষ্ট্রে গ্রীণকার্ড পেয়ে যান। ভারতীয় কূটনীতিক দেবযামী খুবরাগাড়ে এবং বাংলাদেশের কূটনীতিক মনিরুল ইসলামের নামে তাদের গৃহকর্মীরা মামলা করে গ্রীণকার্ড পেয়েছেন। বর্তমানে লস এঞ্জেলসে কর্মরত বাংলাদেশের পেশাদার এক কূটনীতিকের গৃহকর্মী গত ছয় মাস যাবত পালিয়ে আছেন। ভবিষ্যতেও এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটনা আশঙ্কা কেউই উড়িয়ে দিচ্ছেন না।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তিনটি কূটনৈতিক মিশন ওয়াশিংটন, নিউইয়র্ক ও লস অ্যাঞ্জেলসে যেসব কর্মচারীকে পোস্টিং দেওয়া হয় তারা নিজেরাও তাদের চাকুরী শেষ করে আর দেশে ফিরে যান না। এমন অনেক কর্মচারী আছেন যারা দেশে ফেরার জন্যে সরকারী টাকা উঠিয়েছেন কিন্তু তারপর আর ফিরে যাননি। এসব ঘটনাই একের পর এক গৃহকর্মীর মামলা দায়েরে উৎসাহিত করেছে। তাছাড়া, গৃহকর্মীদের মামলা দায়েরে সংশ্লিষ্ট কোনও কোন মহলও উৎসাহ দিচ্ছেন বলেও ধারণা করা হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে, বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা যাদের দায়িত্ব তারাই দেশের মুখে কালিমা মেখে দিচ্ছেন। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারকে নির্বিকার বলে মনে হচ্ছে। আজকাল
- সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি ও বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলায় নিউইয়র্কে ২ বিলিয়ন ডলারের মহাপ্রকল্প
- দুই তরুণী রোগীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ; নিউইয়র্কে বাংলাদেশি-আমেরিকান চিকিৎসক ডা. ফজলুল ইউসুফ গ্রেপ্তার, জামিনে মুক্ত
- বাংলাদেশে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফনে বাধার প্রতিবাদ, ‘শিখা অনির্বাণ’ প্রজ্জ্বলিত রাখার দাবি নিউইয়র্কে
- শান্তি প্রতিষ্ঠায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের সব পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ জরুরি: জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির প্রচার সম্পাদক রিজুর পিতার ইন্তেকাল
- যুক্তরাষ্ট্রের ডিভি লটারি ফের স্থগিত, নিম্ন আদালতের আদেশে আপিল আদালতের বাধা
- যুক্তরাষ্ট্রে ডেলাইট সেভিং টাইমের অবসান, ১ নভেম্বর ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা পেছাবে
- নিউইয়র্কে ন্যাশনাল ইমিগ্র্যান্টস ডে উদ্যাপন; বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি, সাত বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সম্মাননা প্রদান