বাংলাদেশের খাদ্য পরিস্থিতি, জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থার হুঁশিয়ারি
ঢাকা: ৬৪টি দেশের সরকার সমর্থিত ওয়াশিংটনভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (আইএফপিআরআই) বাংলাদেশে ভীতিকর খাদ্যাভাব দেখা দিতে পারে বলে হুঁশিয়ার করে দিয়েছে। বাংলাদেশের খাদ্য পরিস্থিতি বিষয়ে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (ফাও) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন কর্তৃক সদ্য প্রকাশিত এক যৌথ বুলেটিনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
তারাও কার্যত তা সমর্থন করে বলেছে, ‘এজেন্সিগুলো উচ্চমাত্রার খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা করছে।’ বুলেটিনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক সঙ্কট নেই। কিন্তু চাল ও গম আন্তর্জাতিক বাজার দরের চেয়ে ১৫ থেকে ১৭ ভাগ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। তবে বাংলাদেশের খাদ্য কর্তৃপক্ষ জোর দিয়ে বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে চড়া দাম সত্ত্বেও সরকার যথাসময়ে খাদ্যের নিরাপদ মজুত গড়তে ইতিমধ্যেই সর্বাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ফাও এবং ইইউ’র বুলেটিনেও (সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর-২০১০) বলা হয়েছে, হতদরিদ্রদের খাদ্য সমস্যা নিরসনে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা হাতে নিয়েছে।
ওই বুলেটিনে বলা হয়, ‘বাংলাদেশে খাদ্যশস্যের মূল্য গত কয়েক মাসে বৃদ্ধি পেয়েছে। চাল ও গমের দাম আন্তর্জাতিক বাজার মূল্যের চেয়ে ১৫ থেকে ১৭ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও দেশটিতে রাজনৈতিক সঙ্কট নেই। প্রধানত পৌনঃপুনিক দারিদ্র্যের কারণে খাদ্য নিরাপত্তা ব্যাহত হচ্ছে। এবং স্থানীয় বাজারে খাদ্যের উচ্চ মূল্যের কারণে এর আরও অবনতি ঘটতে পারে।
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি ২০ লাখ। যদিও ৭২ ভাগের বাস গ্রামে। জিডিপিতে কৃষির মূল্য সংযোজন প্রায় ১৮ ভাগ। অপুষ্টির অনুপাত ২৭ ভাগ।
ঢাকায় গত সেপ্টেম্বর থেকে চালের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে ক্রমাগত। এক কেজি চালের দাম ছিল ৩২.৮৩ টাকা। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে তা ৬ ভাগ পৃদ্ধি পেয়ে ৩৪.৯৩ টাকায় উন্নীত হয়। চালের জাতীয় গড় মূল্য আগস্টে ছিল ২৮.৯৫ টাকা। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩১.৩৬ টাকা। ডিসেম্বরজুড়ে এটা অবশ্য প্রায় স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু গমের দাম নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। গত আগস্টে ছিল ২২ টাকা ৯৫ পয়সা কেজি। গত সেপ্টেম্বরে তা ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২৭ টাকা ৬৩ পয়সায় দাঁড়ায়। পরের মাসগুলোতে তা অব্যাহত থাকে। ঢাকায় ডিসেম্বরে গমের খুচরা মূল্য ছিল টনপ্রতি ৩৮৩.৬৫ মার্কিন ডলার, এটা ছিল গমের (নাম্বার-২ হার্ড রেড উইন্টার) তখনকার আন্তর্জাতিক বাজার মূল্যের চেয়ে ১৭ গুণ বেশি। আন্তর্জাতিক বাজারে গত নভেম্বরে যে চাল (থাই এ-১ সুপার) বিক্রি হয়েছে টনপ্রতি ৪২২.২৫ মার্কিন ডলার সেই চাল বাংলাদেশে ওই সময়ে বিক্রি হয়েছে পনেরো গুণ বেশি দরে।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি-ডব্লিউএফপি বাংলাদেশে তার চলমান কর্মসূচি আরও এক বছরের জন্য বৃদ্ধি করেছে। এর লক্ষ্য হলো বিশ লাখের বেশি ক্ষুধার্ত, দুর্বল ও অপুষ্টির শিকার লোককে সহায়তা দেয়া এবং ২০১১ সালের শেষ পর্যন্ত চরম দারিদ্র্যসীমায় থাকা জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা উন্নত করা। ফাও-এর প্রাক্কলন অনুযায়ী মোটামুটি উচ্চমাত্রার অপুষ্টিজনিত পরিস্থিতি সৃষ্টি এবং ওঋচজও ধিৎহং ড়ভ ধহ ধষধৎসরহম ংরঃঁধঃরড়হ ড়ভ যঁহমবৎ অর্থাৎ আইএফপিআরআই বিপজ্জনক মাত্রায় খাদ্যাভাব দেখা দিতে পারে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে।
ওই বুলেটিনে অবশ্য বলা হয়, দেশের উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে স্বাভাবিক থেকে খুবই ভাল মাত্রায় শাকসবজির উৎপাদন ও সরবরাহ আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রিটিক্যাল বা শঙ্কাপূর্ণ নয়, দেশটি ধীরগতিতে হলেও ঘূর্ণীঝড় আইলা পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠছে। ওই প্রাকৃতিক দুর্যোগে ২০০৯ সালের মে মাসে বাংলাদেশের ১১টি উপকূলীয় জেলা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়।
বাংলাদেশে ধান উৎপাদনের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে যে, ২০১০ সালে এর উৎপাদন ৫০.২৫ মিলিয়ন টনে উন্নীত হবে। এটা হবে ২০০৯ সালের চেয়ে শতকরা ৩ ভাগ বেশি। এই মওসুমে উৎপাদনের ভাল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক বাজারে খুবই সক্রিয় রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি ভিয়েতনাম থেকে এক লাখ টন এবং ভারত থেকে পাঁচ লাখ টন চাল ও গম সরবরাহের বিষয়ে আলাপ-আলোচনা চালাচ্ছে। ২০১০ সালে খাদ্যশস্য আমদানির পরিমাণ ৪০ লাখ টনে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে বাংলাদেশ সরকারের ধান চাল ক্রয়ের কর্মসূচির বিষয়ে ওই বুলেটিনে (প্রাইস মনিটরিং অ্যান্ড এনালাইসিস কান্ট্রি ব্রিফে) আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, কৃষকদের কাছ থেকে আমন চাল ক্রয়ে সরকার কোন পরিকল্পনা করছে না। এর পরিবর্তে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আমদানি বৃদ্ধি করে খাদ্যশস্য মজুত করার দিকেই তার ঝোঁক। স্বল্প আয়ের দশ লাখের বেশি লোকের জন্য ন্যায্যমূল্যে চাল বিক্রির কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। সরকারি চ্যানেলে খাদ্যশস্য পৌঁছাতে সরকার তার কর্মসূচি অব্যাহত রাখার লক্ষ্য হলো খাদ্য দ্রব্যের ঊর্ধ্বমূল্যের লাগাম টানা। সে জন্য সরকারি ভাবে ২০১০-২০১১ সালে প্রায় ৩০ লাখ টন খাদ্যশস্য বিতরণ করবে।
রয়টার্স রিপোর্ট: উল্লেখ্য যে, গত ২৪শে জানুয়ারি রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের খাদ্য আমদানির পরিমাণ ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৭৫ বিলিয়ন টাকায় (১০০ কোটি ডলার) পৌঁছাতে পারে। কারণ, সরকার খাদ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিশ্ববাজারে খাদ্যশস্যের দাম চড়া থাকা সত্ত্বেও অধিকতর আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০১০-২০১১ অর্থবছরের (জুলাই থেকে জুন) জাতীয় বাজেটে খাদ্য আমদানির পরিমাণ ছিল ৬৫ বিলিয়ন টাকা। বাংলাদেশের খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আহমেদ হোসেন খান রয়টার্সকে বলেছেন, খাদ্যশস্য আমদানির বর্ধিত ব্যয় মেটাতে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন টাকার দরকার পড়বে। বাংলাদেশ ২০০৮ সালে বিশ্বখাদ্য বাজারের তেজী ভাবের কারণে যথেষ্ট মাশুল দিয়েছিল। আগামী জুনের মধ্যে সরকার যখন ২২ লাখ টন খাদ্যশস্য আমদানির পরিকল্পনা করছে তখন খাদ্যদ্রব্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার জন্য আওয়ামী লীগ সরকার সমালোচনার সম্মুখীন হচ্ছে। খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেছেন, বর্তমানে ১৫ লাখ টন খাদ্যশস্য মজুত রাখার মতো সরকারি গুদাম রয়েছে। আগামী তিন বছরের ব্যবধানে মজুত রাখার সামর্থ্য বাড়াতে হবে। যাতে এক সঙ্গে ২২ লাখ টন খাদ্যশস্য গুদামে রাখা সম্ভব হয়। তিনি আরও তথ্য দেন যে, আমরা ভারত থেকে তিন লাখ টন, থাইল্যান্ড থেকে দুই লাখ টন চাল এবং পাকিস্তান থেকে দুই লাখ টন গম আমদানির বিষয়ে সরকার টু সরকার চুক্তি করতে আলোচনা করছে।
বাংলাদেশ সরকার ভিয়েতনাম থেকে আড়াই লাখ টন চাল আমদানি করতে উচ্চমূল্য পরিশোধ করছে। গত আগস্টে বাংলাদেশ যে চাল টনপ্রতি ৩৮৯ মার্কিন ডলারে আমদানি করেছে, সে চাল এখন টনপ্রতি ৫৪৫ ডলার দিয়ে আমদানি করতে হচ্ছে। এই দামে বাংলাদেশ আমদানি করবে দুই লাখ টন। বাংলাদেশ বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম চাল উৎপাদনকারী দেশ। ৩৪ মিলিয়ন টন চাল উৎপাদনকারী দেশটি চলতি বছরে অন্যতম শীর্ষ চাল আমদানিকারক দেশ হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে।
রয়টার্স প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত মাসের গোড়ায় জাতিসংঘের খাদ্য সংস্থা ফাও বলেছে, ডিসেম্বর মাসে খাদ্যশস্যের মূল্য ২০০৮ সালের পরিস্থিতিকে ছাড়িয়ে গেছে।
বাংলাদেশের খাদ্য মূল্যস্থিতি গত নভেম্বরে প্রায় ‘জোড়া ডিজিটে’ পৌঁছায়। এবং বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন যে, বিশ্ববাজারের পণ্য মূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে অভ্যন্তরীণ বাজারও উত্তপ্ত হতে পারে। রাজধানী ঢাকার হাজার হাজার বাসিন্দা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের বিতরণকৃত ন্যায্যমূল্যের চাল সংগ্রহে দীর্ঘ লাইন দিচ্ছে।মানবজমিন।
- নিউইয়র্কের জ্যামাইকায় জল খাবার রেস্টুরেন্ট এর গ্র্যান্ড ওপেনিং
- New York Attorney General James Secures $375,000 from 1-800-Flowers for Deceiving Consumers About Automatic Subscription Renewals
- নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসে বাংলাদেশি আমেরিকা পুলিশ কর্মকর্তার নামে সড়ক ‘ডিটেকটিভ দিদারুল ইসলাম ওয়ে’
- ECOSOC recommends UN General Assembly to take decision on Bangladesh and Nepal’s LDC graduation extension requests
- ইকোসকের সুপারিশ: বাংলাদেশ ও নেপালের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সাধারণ পরিষদ
- Bangladesh co-chairs multi-stakeholder panel session on Global Road Safety, calls for stronger institutions to save lives
- নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক বহুপক্ষীয় প্যানেল অধিবেশনে বাংলাদেশের যৌথ-সভাপতিত্ব; প্রাণহানি কমাতে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আহ্বান
- Road Transport Minister reaffirms Bangladesh’s commitment to halving road traffic deaths by 2030