বাংলাদেশে রাজনীতির সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ নিয়ে ড. মোমেনের সাক্ষাতকার
আব্দুল কাইউম আনোয়ার
এক.
তোষামোদের মানসে নয়, নৈতিকতার দায়িত্বেই দেখা করতে গেলাম চোখের আড়াল হওয়া এক সময়ের অতি জনপ্রিয় মুখ, উঁচু পর্যায়ের ব্যক্তিত্ব, জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত ও স্থায়ী প্রতিনিধি ডঃ এ. ক. এম. আব্দুল মোমেনের সংগে। গেলো সপ্তাহে আচমকা কানাডার
টরোন্ত থেকে তাঁকে নিয়ে আসা হয়েছে নিউইয়র্কে কারণ তাঁর শরীরে জীবনের এই প্রথম বড় ধরনের একটি রোগের প্রকোপ ধরা পড়েছে। আসলে এর আগের সপ্তাহে তাঁকে আমন্ত্রন করা হয়েছিলো কানাডায় যেখানে পুরো দুদিন ধরে চলছিলো বিশ্ব সিলেট সম্মেলন ২০১৮। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসই বলতে হবে, কিডনিতে পাথরের যন্ত্রণায় কাতর হয়েই কানাডা ছাড়তে হয়েছে তাঁকে।
যাহোক, নিউ ইয়র্কে পৌছার পরপরই তাঁকে ভর্তি করা হয়েছিলো ইউরোলজির বিশেষায়িত ক্লিনিকে যেখানে একাধিক বাংলাদেশী সার্জনদের টিম তাঁর তলপেটে প্রাথমিক অস্ত্রোপচার করেছেন এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের চিকিৎসার অপেক্ষায় আছেন। প্রসঙ্গতঃ, দীর্ঘ আট বছর জাতিসংঘে চাকরিরত
থাকাকালীন তিনি বসবাস করতেন জাতিসংঘের নিরাপত্তাবেস্তিত পরিমণ্ডলে। এখন তিনি উঠেছেন তারই আত্মজার লং আইল্যান্ডের বিলাস বহুল ভবনে। আশ্চর্য, জটিল রোগের প্রকোপেও তিনি ন্যুব্জ হননি, মনোবল অটুট আছে আগের মতো। হাসিমুখে সকল দর্শনার্থীকে স্বাগত জানাচ্ছেন, আলাপচারিতায় রত হচ্ছেন। এটিই তাঁর চিরদিনের স্বভাবসুলভ ব্যক্তিত্বের প্রকাশ।
দুই.
১১ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার, ২০১৮ ইং, বন্ধু তফাজ্জুল করিম ও আমি ফোন করে দেখা করার অনুমতি নিলাম মোমেন ভাইয়ের কাছ থেকে। পরদিন ১২ সেপ্টেম্বর আমরা দুই বন্ধু গিয়ে পৌঁছলাম লং আইল্যান্ডে মোমেন মোমেন ভাইয়ের আস্তানায়। বেলা তখন একটা। দরজায় কড়া নাড়তেই
গৃহ পরিচায়িকা মহিলা দরজা খুলে দিলেন। আমরা যখন বললাম আমরা এসেছি মোমেন ভাইয়ের সংগে দেখা করতে, সেই মহিলা পথ দেখিয়ে আমাদের নিয়ে গেলেন মোমেন ভাই যে রুমে বসে টিভি সংবাদ দেখছিলেন সেখানে। বাংলা কোন এক চ্যানেলে তখন বিশ্ব সংবাদ পরিবেশিত হচ্ছিল।
সম্বোধন পর্ব শেষে আমরা দুই বন্ধু বসলাম মোমেন ভাইয়ের দুপাশে। কুশলাদি জিজ্ঞেসের পরই আলাপ জমে উঠলো। প্রথমে বৈশ্বিক পরিস্থিতি, তারপর বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সার্বিক পরিস্থিতি। উনার মুখ থেকে জানার আগ্রহ নিয়েই বিভিন্ন প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছিলাম উনার প্রতি। উনি খুব স্বাচ্ছন্দে বিশ্লেষণ করে যাচ্ছিলেন। বিশ্লেষণে তিনি যে পারদর্শী, তা আমরা ভালো করেই জানি। জীবনের অনেক বছরই তো কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করে কাটিয়েছেন, তাই বিশ্লেষণের ধাত তৈরি হয়ে আছে মননে।
মোমেন ভাইয়ের সংস্পর্শে যারা এসেছে, তারা সবাই জানে তিনি যে ভীষণ দিলখোলা মানুষ। রাখঢাক করে বলার প্রয়োজন মনে করেন না। দুর্বলতা থাকলে তবে অনেক কিছু লুকাতে হয়। জাতিসংঘে থাকাকালীন নিউইয়র্কের আপামর বাংলাদেশী প্রবাসীরা কোন না কোনোভাবে তাঁকে চেনে, চেনার সুযোগ পেয়েছে। কারণ এমন কোন সপ্তাহ ছিল না যে মোমেন ভাই হয় ব্যক্তিগত, না হয় সামাজিক কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দেননি। যার ফলশ্রুতিতে এমন হয়েছিলো যে উনার বিদায়ের প্রাক্কালে শতাধিক বিদায় সম্ভাষণে তাঁকে উপস্থিত থাকতে হয়েছিলো। আপন জনের বিদায়ে ঘনিস্ত সবাইকে শোকে বিহ্বল হতে দেখেছি।
তিন.
আলাপচারিতায় এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে, টেরই পাইনি আমরা। ঘোর আলাপে মগ্ন। ভেতর থেকে চলে এলো নাস্তার সম্ভার। ফলমূল এমনকি চকলেট কেকও। মোমেন ভাই নিজ হাতে পরিবেশন শুরু করলেন। মজা করে খাচ্ছি আর আলাপ চালিয়ে যাচ্ছি। এক ফাঁকে আমি মোমেন ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আগামী জাতীয় নির্বাচনে আপনার মনোনয়ন কতোখানি পাকাপোক্ত?’ মুচকি হেঁসে এক শব্দে জবাব দিলেন, ‘অনিশ্চিত’। পাল্টা প্রশ্ন করলাম, ‘কেন?’ আবার সংক্ষিপ্ত উত্তর, ‘প্রচুর টাকা নেই’। কতো টাকা? ‘কমপক্ষে দু’চার কোটিতো বটেই’। তাই নাকি! আমরা দুই বন্ধু একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করলাম বিস্ময়ে। ব্যাখা দিতে থাকলেন মোমেন ভাই, কেন এবং কীভাবে এত বড় অংক প্রয়োজন হয়। উনার বক্তব্য শোনার এক পর্বে আমি মন্তব্য করলাম, ‘আপনার বেলায় কেন মনোনয়ন বাণিজ্য করতে হবে? আপনি তো স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসেই দেশে ফিরে গিয়েছিলেন। আর এখন যখন নির্বাচনের পালা মঞ্চস্থ হবে, তখন প্রধানমন্ত্রী আপনার প্রতি মুখ ঘুরাবেন কেন? দলের মনোনয়ন পেতে আপনাকে কেন টাকার মূলধন খাটাতে হবে? বিষণ্ণতায় মুখের চেহারা খানিকটা মলিন হয়ে গেছে দেখে অতিরিক্ত প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকলাম। পরিষ্কার বুঝে নিলাম যে বাংলাদেশের নির্বাচনে আজকাল প্রচুর মূলধন খাটাতে হয়, নতুবা সেই বাণিজ্যে সফল হবার সম্ভাবনা আদৌ থাকে না। নির্বাচনে কার কি যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা কিংবা সততা সেটার পরিমাপ করা হয় না বা প্রয়োজন পড়ে না। মনোনয়ন কিনতে পারলে পরে ভোট ও কেনা যায়।
চার.
ঘুরেফিরে এই নির্বাচন নিয়েই শেষ প্রশ্ন করলাম, একাদশ জাতীয় নির্বাচনে কি ফল আশা করছেন? আওয়ামীলীগ জিতবে তো? প্রত্যুতরে বললেন, ‘জিততে তো হবেই নয়তো প্রতিফল ভোগ করতে হবে’।
আমার বন্ধু তখন যে মন্তব্যটি যোগ করলেন, ‘আপনার মুখেই বলছেন যে এবার বিরোধী দল জোরেশোরে মাথা বেঁধে মাঠে নেমেছে সুতরাং আল্লাহ না করুক যদি আওয়ামীলীগকে গদি ছাড়তে হয়, তবেকি গাজী কালুর পুথির সেই কাহিনীর প্রতিফল আমাদের দেখতে হবে? গৃহযুদ্ধের রণাঙ্গনে শহীদ হবে “কাতারে কাতার”? খনিকের জন্যে হলেও দেহে শিহরন জাগছিল ভেবে যে সত্যই কি বাংলাদেশে একটি গৃহযুদ্ধ সমাগত, কে জানে!
প্রসঙ্গান্তরে আমি মোমেন ভাইকে জানালাম, আগামী মাসে আমি দেশে যাবার পরিকল্পনা করছি। যদি সেই সময় আপনার কোন কাজে লাগতে পারি, কৃতজ্ঞ হবো। এই প্রবাসে উনাকে যতোটুকু জেনেছি, উনি কেবল গণিত এবং অর্থশাস্ত্রের পণ্ডিত হিসাবে পিএইস.ডি. ডিগ্রী লাভ করেননি, আমেরিকার সর্বপ্রধান বিশ্ববিদ্যালয় হার্ভার্ডে অধ্যাপনা করে নিজের যোগ্যতা প্রমান করে ছেড়েছেন। অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে কি কম যান উনি? দেশে বিদেশে সরকারী উচ্চ পদে চাকরী করেছেন। রাষ্ট্রদূত হিসাবে সৌদি আরবে থাকাকালীন প্রবাসী বাংলাদেশীদের কল্যাণে নিজেকে কাজে লাগিয়েছেন। চাকরী জীবনের সর্বশেষ পর্যায়ে জাতিসংঘে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও স্থায়ী প্রতিনিধি হিসাবে দায়িত্বে থাকাকালীন নিজ দেশের রাষ্ট্রদূতের নিজস্ব কার্যালয় ও থাকার জন্যে বাড়ি ক্রয় করার উদ্যোগ নিয়ে সফলকাম হয়েছেন। শুনতে সাধারন ঘটনা মনে হলেও বাস্তবে এই প্রচেষ্টাকে সফলকাম করতে গিয়ে যে কতো কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে, সংশ্লিষ্ট সবাই জানেন।
পাঁচ.
ইদানিং সংবাদ মাধ্যমে একটি সংবাদ প্রচারিত হয়েছে যে বর্তমান অর্থমন্ত্রী জনাব আবুল মাল আব্দুল মুহিত যেহেতু আগামী জাতীয় নির্বাচনে সিলেট ১নং আসন থেকে নিজে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না, সুতরাং তাঁর আসনে কাকে দেখতে চান, সাংবাদিকদের সেই প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘আমি আমার ছোট ভাই মোমেনকেই সেই আসনে যোগ্য প্রার্থী মনে করি। মোমেনের বিষয়ভিত্তিক গ্ব্যান ও অভিজ্ঞতা অন্য যে কোন প্রার্থীর তুলনায় উন্নত’। আগামিতে যদি জনাব মুহিতের কথার সত্যতা প্রমাণিত হয়, আমরা শুভাকাঙ্ক্ষীরা সর্বাগ্রে আত্মতৃপ্তি লাভ করবো।
নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার মত আর সব গুণই আছে মোমেন ভাইয়ের, নাই শুধু ধনবল। অসৎ পথে ধন উপার্জনের ধান্দা করেননি কোনদিন। বিবেককে বিকিয়ে দেবার আগ্রহ তাঁকে প্রলোভিত করেনি। আর তাইতো যখন জানতে চাইলাম, ভাবীকে কেন সংগে আনেন্নি? পরিষ্কার উত্তর দিলেন, ‘বিদেশে বিলাস ভ্রমনের অর্থ সংকুলান হয়নি, তাই’। বেলা চারটার দিকে আমরা দুই বন্ধু মোমেন ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিলাম।
পরিশেষে, আমি ডঃ মোমেনের একান্ত শুভাকাঙ্ক্ষী হিসাবে শুধু যে আমার বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনকে বলবো তাই নয়, অগনিত দেশবাসীকেও অনুরোধ করবো আপনারা সকলে ডঃ মোমেনের মত একজন সৎ ও যোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন ও নির্বাচনে জয়ী করানোর জন্যে সকলে মিলে ভোট দেবেন। এতে ভবিষ্যতে দেশ ও জাতি উপকৃত হবে।

সাক্ষাতকার গ্রহণে -আব্দুল কাইউম আনোয়ার, নিউইয়র্ক
- New York Attorney General James Secures More Than $480,000 and Debt Relief for New York Homeowners
- এই জীবন চিরস্থায়ী নয়, একদিন মরে যাবো
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে; ১৭ ডিসেম্বর উভয় পক্ষকে তথ্য-উপাত্ত জমার নির্দেশ
- নিউইয়র্কে নৃত্যশিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠক তাহসিন ফেরদৌসের অকালমৃত্যু, বাংলাদেশি কমিউনিটিতে শোকের ছায়া
- নিউইয়র্কে আবেয়া’র দ্বিবার্ষিক সম্মেলন ও ফ্যামিলি নাইট: প্রযুক্তি সেমিনার, জব ফেয়ার, বিজ্ঞান মেলা ও সাংস্কৃতিক উৎসব
- Global Anticipation Builds as Dr. Mostofa Sarwar’s Sunflower Wounds Debuts with Successful Houston Open House and Worldwide Pre-Order Milestone
- যুক্তরাষ্ট্রে ৭৫ দেশের অভিবাসী ভিসায় অনিশ্চয়তা, আদালতের নির্দেশের পরও কাটেনি জট
- Human Rights Must Be at the Heart of Economic Governance and Policies: Ambassador Irene Khan