নিউইয়র্ক থেকে দেড়যুগ পর বাংলাদেশে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন মা ও মেয়ে

শহীদুল ইসলাম: ১৮ বছর আগে মায়ের হাত ধরে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিল দেড় বছর বয়সের ছোট্ট শিশু নাদিয়া। এখন সে নিউইয়র্কের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে অভিবাসী সমাজে। কিন্তু নিষ্ঠুর অভিবাসন আইনের কারণে নাদিয়াকে দেশটি থেকে বিতাড়ন (ডিপোর্টেশন) করা হচ্ছে। যে মায়ের হাত ধরে যুক্তরাষ্ট্রে আসা, সেই নাজমিন হাবিবকেও ফিরে যেতে হচ্ছে বাংলাদেশে। তবে ইমিগ্রেশন জজ সদয় হলে বাবা ও অন্য তিন ভাই-বোনের সঙ্গেই মার্কিন যুক্তরাষ্টেই স্থায়ী ঠিকানা হতে পারে নাদিয়ার। নিউইয়র্কের স্টোনিব্রুক ইউনিভার্সিটির ছাত্রী নাদিয়া হাবিব ও তার মা নাজমিন হাবিবকে স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার মধ্যে দেশে ফেরার সব প্রস্তুতি নিয়ে লোয়ার ম্যানহাটনের ইমিগ্রেশন দফতর ফেডারেল প্লাজায় হাজির থাকতে বলেছে ইউএস ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট। সেখান থেকে তাদের বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হবে। যে মুহূর্তে প্রেসিডেন্ট ওমাবা অবৈধ অভিবাসীদের বিতাড়ন প্রক্রিয়া স্থগিতের নির্দেশ দিয়েছেন, সেই মুহূর্তে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের এই অমানবিক সিদ্ধান্তে তোলপাড় চলছে নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে। মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচারিত হচ্ছে নাদিয়া ও তার মায়ের বিতাড়নের খবরটি। এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবিতে মানবাধিকার সংগঠন পাশে দাঁড়িয়েছে নাদিয়ার পরিবারের। ইমিগ্রেশন ও মানবাধিকারবিষয়ক সংগঠন নিউইয়র্ক স্টেট ইয়ুথ লিডারশিপ কাউন্সিল এবং লোয়ার ম্যানহাটনের ডাউন টাউন বিজনেস অ্যাসোসিয়েশনসহ সর্বস্তরের প্রবাসী বাংলাদেশিরা স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে ফেডারেল প্লাজার সামনে মানববন্ধন করবে। পাশাপাশি তারা সংবাদ সম্মেলন করে এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানাবে। সংগঠনটি নিউইয়র্ক থেকে নির্বাচিত ইউএস সিনেটর চাক শ্যুমার এবং গিলিব্রান্ডকে এ বিতাড়ন রুখতে প্রাইভেট বিল উত্থাপনের দাবি জানিয়েছে। তারা নিউইয়র্কের সব জায়গায় নাদিয়ার পক্ষে ফ্লায়ার তৈরি করে তা বিতরণ করছে।
নাদিয়ার এ ঘটনাটি বাংলাদেশি কমিউনিটিতেও বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। কারণ প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনেকের বিরুদ্ধেই এ ধরনের বিতাড়নের খড়গ ঝুলছে। মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন নাদিয়ার ছোট তিন ভাই-বোন, যারা জন্মসূত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। দেশে পাঠিয়ে দেয়া হলে মা আর বড় বোনকে ছাড়া কীভাবে কাটবে তাদের দিন। এসব চিন্তায় হতবিহ্বল পরিবারের প্রধান কর্তাব্যক্তি নাদিয়া বাবা জোয়াদ হাবিব। একাধিকবার তিনি যোগাযোগ করেছেন ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। তারা এ ব্যাপারে কোনো আশার বাণীই শোনাতে পারেননি। তবে তারা বলেছেন, ইমিগ্রেশন জজ শেষ মুহূর্তে সদয় হলে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারেন, ঘুরতে পারে তাদের ভাগ্যের চাকা। বাংলাদেশ ককাসের ভাইস চেয়ারম্যান ডেমোক্রেট দলের কংগ্রেসম্যান জোসেফ ক্রাউলির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চালাচ্ছেন জোয়াদ হাবিব।
জানা গেছে, ১৯৯৩ সালে শিশুকন্যা নাদিয়াকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন নাজমিন হাবিব। জেএফকে বিমানবন্দরেই তিনি রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেন। কিন্তু আদালতে তা প্রত্যাখ্যাত হলে ঐ বছরই নাজমিন হাবিব আবার রাজনৈতিক আশ্রয় চান। আবারো আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে কয়েক দফা আইনি লড়াই চালান তিনি। সর্বশেষ গত ১০ সেপ্টেম্বর আদালতের নির্দেশে ইউএস ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট এক চিঠিতে তাদের বিতাড়নের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়। এ সিদ্ধান্তে কান্নার রোল পড়ে যায় অসহায় পরিবারে। এবিসি নিউজসহ বিভিন্ন মিডিয়ায় এ খবর প্রচারিত হলে তোলপাড় শুরু হয় নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে। ২৪ ঘণ্টার জনপ্রিয় রেডিও চ্যানেল ১০-১০ উইনে নাদিয়ার বক্তব্য প্রচারিত হয়। গত এক সপ্তাহ ধরে সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট ফেসবুক ও টুইটারে চলছে এ নিয়ে অসংখ্য বার্তা চালাচালি। এসব বার্তায় নাদিয়া ও তার মাকে বিতাড়নের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানানোসহ অসহায় পরিবারের প্রতি সমাবেদনা জানানো হয়েছে। নাদিয়ার এক শুভাকাঙ্ক্ষী লিখেছে, ‘আমেরিকা, অন্য দেশ থেকে এলেও আমরা তোমার সন্তান। আমরা আমাদের স্কুলে তোমার পতাকা তুলে ধরি। অথচ তুমি আমাদের অগ্রাহ্য করছ। তুমি আমাদের ভুলে গেলে?’ নাদিয়ার সহপাঠীরাও প্রতিদিন লং আইল্যান্ডের স্টোনিব্রুক ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে নাদিয়াকে বিতাড়নের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে। তারা নাদিয়ার পক্ষে বিভিন্ন স্লোগান তুলে ধরে বলছে, ‘প্রত্যেকেই তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের অধিকার রাখে’। খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (স্বরাষ্ট্র) মন্ত্রী জ্যানেট নেপোলিতানো নাদিয়া ও তার মায়ের বিতাড়নের সিদ্ধান্তের খবরে সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ‘এ ব্যাপারে তাদের কিছুই করণীয় নেই। যুক্তরাষ্ট্রের ভঙ্গুর ইমিগ্রেশন-নীতির কারণে বহু পরিবার এভাবেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। আমরা এটা চলতে দিতে পারি না। আমরা চাই নাদিয়া ও তার মা এদেশেই থাকুক।’
অসহায় এ পরিবারটিকে দেখতে প্রবাসী বাংলাদেশিরা ভিড় করছেন তাদের নিউইয়র্ক সিটির উডসাইডে বাসায়। মঙ্গলবার বিকালে ঐ বাসায় গিয়ে দেখা গেছে, নাদিয়াকে দেখতে এসেছেন তার সহপাঠী আর বন্ধুরা। স্বভাব-সুলভভাবেই বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে সে। অথচ একদিন পরেই নিষ্ঠুর পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে তাকে। এখনো সে ভাবতে পারে না, যে দেশে দীর্ঘ ১৮ বছর কেটেছে, সেই দেশটি তার আপন নয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে চোখেমুখে হতাশা নেমে আসে নাদিয়ার। তবুও সে জানায়, ‘জানি না আমি বাংলাদেশে গিয়ে কীভাবে বাঁচব। আমি তো বাংলায় ঠিকমতো কথাই বলতে পারি না। বাবা আর ভাই-বোনদের ছেড়ে আমি কীভাবে থাকব?’ বাংলাদেশে নাদিয়ার গ্রামের বাড়ি রাজধানীর অদূরে ঢাকার কেরানীগঞ্জের তেঘড়িয়া ইউনিয়নে।
প্রবাসের অন্যতম আঞ্চলিক সংগঠন কেরাণীগঞ্জ ফাউন্ডেশনের সভাপতি আব্দুস সামাদ চঞ্চল এ প্রসঙ্গে জানান, নাদিয়ার পরিবারের এ দুর্দিনে বহু মার্কিনি পাশে দাঁড়িয়েছে। তারা এ সিদ্ধান্ত বাতিলের জন্য মার্কিন সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছে। এ ব্যাপারে গণজাগরণ তৈরি করতে পারলেই ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আসতে পারে। তিনি জানান, লোয়ার ম্যানহাটনের (চায়না টাউন) প্রবাসী বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের বৃহত্ সংগঠন ডাউন টাউন বাংলাদেশি বিজনেস অ্যাসোসিয়েশন নাদিয়ার পাশে আছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে মানববন্ধনে অংশ নেবে বলে তিনি জানান।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৩ লাখ লোক বিতাড়নের অপেক্ষায় দিন গুনছেন। তবে যারা অপরাধের সঙ্গে জড়িত নয়, তাদের ব্যাপারে সদয় হওয়ার আদেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ওবামা। তারপরও একের পর এক ঘটছে এ ধরনের ঘটনা।ইত্তেফাক
- ওয়ার্ল্ড হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট ইউএসএর সাধারণ সম্পাদক ড. সাদিয়া আফরিন এরা
- চরমোনাই পীরের যুক্তরাষ্ট্র সফর উপলক্ষে নিউইয়র্কে দোয়া মাহফিল, কুরআন-সুন্নাহর আলোকে বয়ান
- New York Attorney General James Secures Reimbursements for T-Mobile Customers Whose Rates Were Unjustly Raised
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে কুনু-ফিরোজ পরিষদের সাত দফা ইশতেহার ঘোষণা; কমিউনিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠা, সাশ্রয়ী ফিউনারেল সেবা, বিমানের সরাসরি ফ্লাইট ও আর্থিক স্বচ্ছতায় অঙ্গীকার
- ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের পূর্ণ সমর্থন: জাতিসংঘে রাষ্ট্রদূত আইরিন খান
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে প্রথমবারের মতো বিতর্ক, গুরুত্ব পেল স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি
- New York Attorney General James Warns New Yorkers About AI-Generated Election Misinformation Ahead of November Elections
- Bangladesh calls for global treaty to protect victims of crimes against humanity