অষ্ট্রেলিয়ার দাবানল-বিধ্বংসী ভয়াবহতা
রণেশ মৈত্র : অষ্ট্রেলিয়া আমার অন্যতম প্রিয় একটি দেশ। বলা চলে আমাদের সেকেন্ড হোম। ২০০০ সালে সেখানে প্রথমবার যাওয়ার সুযোগ হয়। কিছু দিনের মধ্যেই আমাদের নাতি অনির্বানের জন্ম হয় ওয়েষ্টমিড হাসপাতালে। জন্মের তিন-চার দিন পর নবজাতিককে কোলে নিয়ে মহা আনন্দে হাসপাতাল থেকে বাসায় এসেছিলাম। সেই ছবিটি এখনো চোখের সামনে ভাসে।
সিডনীতে সেবার আন্তর্জাতিক মেলা বসেছিল খেলার মেলা। অলিম্পিক নামে বিশ^জোড়া খ্যাতি তার। তখন সেখানে বেশ কিছুদিন আগে থেকেই টেলিভিশন ও সংবাদপত্রে বিশাল ংঢ়ধপব দিয়ে ঐ অলিম্পিকের জানা-অজানা বহু তথ্য, অলিম্পিক মশাল পৃথিবী ঘুড়ে সিডনী আসার আনন্দময় ছবি বিপুল আগ্রহ নিয়ে দেখতাম। ঐ মশালের শিখা দেখেই অনির্বান নাম রেখেছিলাম জন্মের ৩/৪ ঘন্টার এবং জানবার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই। অনির্বান আমাদের অনি আজ বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র এবং সম্ভাবনাময় এক তরুণ ক্রিকেটার। ওদেশে অনির্বানই প্রবাসী বাঙালি সন্তানদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ক্রিকেট খেলোয়ারের গৌরব অর্জন করেছে। পাবনা প্রবাসী বাঙালিরা ভুলে যান নি। দলাদলি বাঙালির চরিত্র তাই কিছুটা দলাদলির সাক্ষাত যেমন পাওয়া যায় তার চাইতে বহুগুণ বেশী পাওয়া যায় প্রবাসে বাঙালিত্ব রক্ষার প্রয়াস-বাঙালি সংস্কৃতি ধরে রাখার আপ্রাণ ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা।
অষ্ট্রেলিয়ায় পাঁচবার গিয়েছি সহধর্মিনী পূরবী মৈত্র সহ। নিয়ে গিয়েছে বড় ছেলে প্রবীর। প্রবীর বেশ কয়েক বছর আগে সর্বজনীন ভোটে নির্বাচিত হয়েছিল প্যারামাট্টা সিটি কাউন্সিলের কাউন্সিলার। লেবার পার্টি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে এবং প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যে প্রথম এ গৌরব অর্জন করেছিল প্রবীর। প্রবীর সেখানে আই.টি. ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত আন্তর্জাতিক মানের চিলড্রেন্স হাসপিট্যালে। পুত্রবধূ অপর্ণা গোস্বামী জনপ্রিয় চিকিৎসক।
অসাধারণ সুন্দর পরিবেশ দেখেছি সিডনীতে। ঐ শহরের আবহাওয়ায় যেমন জড়িত রয়েছে বাংলাদেশের আবহাওয়ার আদল, তেমনি রয়েছে স্বাস্থ্যকর পরিবেশও। গ্রীষ্ম, শীত উভয়ই আছে তবে কোনটাই সহ্যাতীত নয় বরং সহনশীল। বাঙালিদের দেখেছি বৈশাখী মেলার আয়োজন করতে, তেমনই দেখেছি একুশে ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ ১৬ ডিসেম্বরের মত জাতীয় দিবসগুলি উদযাপন করতে। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শহীদ মিনারও।
একটি বিশ^বিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরালও স্থাপন করা হয়েছে পরম শ্রদ্ধায় রবীন্দ্রনাথের মূর্তিও স্থাপিত হয়েছে বিশ^বিদ্যালয়ে ক্যাম্পাসে তার প্রবেশ পথে।
আবহাওয়া এমনই যে কোনদিন হাজারো ছুটাছুটি করলেও, এমন কি গ্রীষ্মকালেও গা ঘামতে দেখি নি কারও আবার প্রবল শীতে কাবু হতে দেখিনি বয়োবৃদ্ধ কাউকেও। তরুণ-তরুণীরা তো প্যান্ট-সার্ট বা গেঞ্জি পরেই দিব্যি ঘুরে বেড়ায় রাস্তায়, পার্কে, বিপণী বিতানগুলিতে।
ধর্ম? হ্যাঁ ধর্ম আছে ব্যাপকভাবেই তবে তা নিয়ে সামান্যতম বাড়াবাড়ি নেই কোন সম্প্রদায়ের মধ্যেই। উপাসনালয় যেমন গীর্জা, প্যাগোডা, মসজিদ, মন্দির প্রভৃতি আছে-প্রার্থনা হয়-অনুষ্ঠানাদিও হয় কিন্ত সর্বত্র মাইক্রোফোনের ব্যবহার থাকলেও তার আওয়াজ উপাসনালয়ের বাইরে যায় না-শব্দ নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত কঠোর কিন্তু স্বত:ষ্ফূর্ত।
সর্বাধিক সামাজিকতা সেখানে প্রত্যক্ষ করেছি পঞ্চ-পানী, জীব-জন্তুর প্রতি ভালবাসা এবং তা যেন পশু-পাখী-জীব-জন্তুর পক্ষ থেকে মানুষের প্রতিও সমভাবে বিদ্যমান এমন অপূর্ব দৃশ্য সিডনীতে দেখার সুযোগ পেয়েছি।
কিন্তু সেই অষ্ট্রেলিয়া আজ কয়েক মাস ধরে জ¦লছে পুড়ছে অসংখ্য বৃক্ষ ও বন। গাছ-গাছালি পুড়ে ছাই হাজার হাজার বাড়ী-ঘর অগ্নিদগ্ধ বহু মানুষ ও আগুনে পুড়ে ধরাধাম থেকে বিদায় নিয়েছেন।
লক্ষ লক্ষ পশু পুড়ে যাওয়ার দৃশ্য পত্র পত্রিকায় বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখে, অপরাপর ক্ষয়ক্ষতির দৃশ্য একইভাবে দেখে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ভুগছি কোন কোন দৃশ্য দেখে চোখের জল সম্বরণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। অষ্ট্রেলিয়া নয় প্রাণবন্তু সিডনীও নয়। মনে হয় যেন এক ভীতির রাজ্য, আতংকের শহর ভেসে উঠছে চোখের সামনে। অবিশ^াস্য মনে হলেও করুণ সত্য ও বাস্তব ঐ দৃশ্যগুলো।
জানা যাচ্ছে, যে দেশের মানুষ ঢ়ড়ষষঁঃরড়হ কাকে বলে, তা জানেন না, কদাপি তা চোখেও দেখেন নি-সেই দেশের বাতাস আজ ঢ়ড়ষষঁঃবফ. চোখে মুখে মাস্ক পড়ে চলতে হয়। সকলেরই কম পক্ষে একটি করে গাড়ী থাকায় কিছুটা রক্ষা। কারণ বাড়ী থেকে বেরিয়ে রাস্তার ধারেই পার্ক করা গাড়ীতে উঠে নিজ নিজ কর্মস্থলে সকাল বেলায় যাওয়া সারাদিন কাজ শেষে সন্ধ্যায় বা রাতে একই ভাবে বাড়ী ফেরা। তাই দূষিত বাতাস নাকে-মুখে ঢুকতে পারে না কৃত্রিম ব্যবস্তার দ্বারা প্রতিরোধের কারণে।
উত্তপ্ত অষ্ট্রেলিয়া-উত্তপ্ত সিডনী। পাঁচ দফায় দীর্ঘ সাড়ে চার বছর সিডনীতে বাস করা কালে দেখেছি ঈষদুষও সিডনীকে। একটি হাফসার্ট পরারও দরকার বোধ করি বাসায় নিজেরা নিজেরা অবস্থান কালে। সেখানে আজ প্রচ- উত্তাপ ঠেকাতেই মোটা জামা পরতে হচ্ছে। যেন কোন মরুভূমির দেশ-উত্তপ্ত বালির দেশ। প্রকৃতির উত্তাপ যেখানে দুপুরে ২৭-২৮০ সেলসিয়াস অতিক্রম করত না সেখানে ঐ উত্তাপ ভোরের শীতলাত বলে আখ্যায়িত হচ্ছে দুপুরে তা বেড়ে ৪৫০-৫০” সেলসিয়াসে পৌঁছাচ্ছে। অষ্ট্রেলিয়ার তো বটেই পৃথিবীর কোন দেশই মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলি বাদে এমন পরিস্থিতির শিকারে পরিণত হয়েছেন কি না তা রীতিমত গবেষণার বিষয়।
স্কুল-কলেজ-বিশ^বিদ্যালয় স্বাভাবিকভাবে চলছে কিনা জানি না-তবে সর্বত্রই প্রতিরোধক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, তেমন অনুমান করাটা উন্নত ঐ দেশটির জন্য স্বাভাবিক। তদুপরি মাধ্যমিক পর্য্যায়ের উপরের শিক্ষার্থীদের প্রায় সবারই নিজস্ব গাড়ী থাকায় বায়ু দূষণের হাত এড়ানো সম্ভব হচ্ছে বলে অনুমান করছি।
সেখানে থাকাকালে নিয়মিত পার্কে যেতাম ব্যায়াম করতে। যে দিন সকালে প্যারামাট্টা পার্ক নামক বিশাল পার্কে যেতাম-দেখতাম গাছ-গাছালির শীর্ষেই শুধু নয় মাঠের ঘাশের উপর অসংখ্য নানা জাতীয় পাখী বসে আছে-লাফাচ্ছে অথবা মাটি থেকে খুঁটে খুঁেট খাবার সংগ্রহ করছে। পাশ দিয়ে যে মানুষজন চলাচল করছে, সেদিকে তাদের আদৌ কোন নজর নেই। তারা বোধ হয় ভাবে মানুষ তো পশু-পাখী-জন্তু-জানোয়ারের শত্রু নয় বরং বিশ^স্ত বন্ধু। মানুষও তেমনটাই ভাবে তাই একটি ঢিলও ছোঁড়ে না কেউ কোন পশু-পাখী-জীব-জন্তুর প্রতি। তাই জীবজন্তু পশু পাখী সমগ্র অষ্ট্রেলিয়ার এক অমূল্য সম্পদ। ভাবতে কষ্ট লাগে আজ সেগুলি কী যন্ত্রণায় আগুনে পুড়ছে দাপাদাপি করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে।
গরু-মহিষ-উঁট হাতী ঘোড়া প্রভৃতিও অসংখ্য ঐ দেশটিতে। কিন্তু তাদের জন্য বন ও জলের দরকার। বন তো পুড়ে ছাই-তাই তারা আশ্রয়হীন। বাঁচানো কঠিন বা অসম্ভব বিবেচনায় উঁটের মত বৃহদ্দাকার জন্তুকে গুলি করে মারা হচ্ছে বলে সামাজিক মাধ্যমে দেখেছি। কারণ উঁট নাকি অত্যধিক জল যায় কিন্তু বর্তমানের পরিবেশগত কারণে বিশুদ্ধ পানীর জলেরও অভাব।
এখনও অনেক অঞ্চলে জরুরী অবস্থা জারী করে হাজার হাজার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে লক্ষাধিক বাড়ী কোটি কোটি গাছ পুড়ে ছাই। অষ্ট্রেলিয়া যেন অগ্নিকু-ের মাথায় দাঁড়িয়ে যে কোন দুর্ঘটনা, বড় সড় রকমের, যে কোন সময়ই ঘটে যেতে পারে এবং জনজীবন মারাত্মকভাবে বিপর্য্যয়ের মুখে পড়তে পারে।
ঐ দেশে নানা ধরণের মাংশ প্রায় সবাই খেয়ে থাকেন। মুরগীর মাংস, বিশেষ করে ব্রয়লার মুরগী সর্বাধিক পরিমাণে বাজারে বেচাকেনা হতে দেখেছি। আমরা যাকে ‘দেশী মুরগী’ বলি সেটাও পাওয়া যায় তবে তার সরবরাহ কম এবং সর্বত্র পাওয়া যায় না। কিন্তু সেই মুরগীর প্রতিও কত আদর। চারটা মুরগী বা একটি মুরগীও শত করে পা বেঁধে ঝুলিয়ে নেওয়া নিষিদ্ধ কারণ তার দ্বারা পশু-নির্য্যাতন হয়-যা সে দেশের আইনে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
পশু-পাখীর প্রতি এমন আদর, এমন ¯েœহ, এমন গুরুত্ব দিতে আর কোথাও দেখি নি। অষ্ট্রেলিয়ার মানুষ অত্যন্ত প্রাণী বান্ধব, জীব-জন্তু-বৃক্ষ বান্ধব বলেই এমনটি সম্ভব হয়েছিল। পরিবেশ সার্বিকভাবেই সবার জন্যে স্বাস্থ্য সম্মত ছিল।
কিন্তু আগুন তার সর্বগ্রাসী রুদ্রতা নিয়ে গোটা অষ্ট্রেলিয়া বিশেষ করে তার গোটা তিনেক রাজ্যে যে ভয়াবহ তা-ব চালাচ্ছে তার ফলে যে কোটি কোটি গাছ, পশু-পাখী, জীবজন্তু পুড়ে ছাই হয়ে গেল-আবহাওয়াকে যেভাবে উত্তপ্ত করে তুললো-তাতে বহুদিনের জন্য ঐ দেশে পরিবেশ বিপর্য্যয় অবশ্যসম্ভাবী। নিশ্চিন্তে যে দেশে শ^াস প্রশ^াস নিতে পারতো মানুষ ও প্রাণীকূল তার উপর যে প্রতিক্রিয়া পড়বে তাও মারাত্মক। শিশুদের উপর তাৎক্ষণিক কোন প্রতিকূল প্রতিক্রিয়া না পড়লেও তাদের বিকাশের অনুকূল পরিবেশ তারা পাবে কি না-স্বাস্থ্য বিদেরাই তা বলতে পারেন।
মনে পড়ে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে সর্বশেষ সিডনী যাই নাতনি ঈহিতার (বাঁধন) বিয়ে উপলক্ষে। শত শত নিমন্ত্রিত মানুষের কি উজ্জ্বল আনাগোনা। কত নিশ্চিন্ত নির্ভাবনা মানুষের মুখগুলি। যদি ভবিষ্যতে কখনও আবার সিডনী যাই দেখবো কি তেমন মুখ?
প্রতি সপ্তাহে দুটি সাপ্তাহিক ছুটির দিন শনি ও রবিবারে কত বাড়ীতেই না নিমন্ত্রন খেলাম-কত সামাজিক রাজনৈতিক-সংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেই না যোগ দিলাম টেলিভিশনের সাক্ষাৎকার দিলাম, দেশ থেকে যাওয়া কত অতিথির সম্বর্ধনা সভায় যোগ দিলাম, দুর্গাপূজা, সরস্বতী পূজা এবং অন্যান্য উৎসবে যোগ দিলাম তেমন পরিবেশ কি আজও আছে সেখানে?
জানি, প্রশ্ন করে লাভ নেই।
তবে উৎসাহিত হই, এই বিশাল অগ্নিকা-ে যাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাঁদের ক্ষয়ক্ষতির সাধ্যমত লাঘব করার জন্য অষ্ট্রেলিয়াবাসী উদারহস্তে দান করছেন, বাঙালি কমিউনিটিও তাঁদের মত করে ত্রান সংগ্রহে আত্মনিয়োগ করেছেন জেনে।
মানব দরদী সকলের প্রতি আন্তরিক সমর্থন জানাই।
একাত্মতা ঘোষণা করি অগ্নিদদ্ধ ক্ষতিগ্রস্ত, যন্ত্রণাক্লিষ্ট অষ্ট্রেলিয়াবাসীর প্রতি।
-লেখক, রণেশ মৈত্র
সাংবাদিকতায় একুশে পদক প্রাপ্ত।
- DRIVER CHARGED WITH MANSLAUGHTER IN DEADLY HIT-AND-RUN IN MARCH ON JAMAICA AVENUE
- নিউইয়র্কে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক সাংসদ অধ্যাপক সেলিম ভূঁইয়াকে সংবর্ধনা, কুমিল্লা বিভাগ শুধু সময়ের ব্যাপার
- UN General Assembly Adopts Bangladesh-Led Culture of Peace Resolution
- বাংলাদেশের উত্থাপিত ‘শান্তি ও সহাবস্থানের সংস্কৃতি’ বিষয়ক প্রস্তাব গ্রহণ করল জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ
- নিউইয়র্কের জ্যামাইকায় জল খাবার রেস্টুরেন্ট এর গ্র্যান্ড ওপেনিং
- New York Attorney General James Secures $375,000 from 1-800-Flowers for Deceiving Consumers About Automatic Subscription Renewals
- নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসে বাংলাদেশি আমেরিকা পুলিশ কর্মকর্তার নামে সড়ক ‘ডিটেকটিভ দিদারুল ইসলাম ওয়ে’
- ECOSOC recommends UN General Assembly to take decision on Bangladesh and Nepal’s LDC graduation extension requests