একাত্তরের প্রিয় কণ্ঠ বাংলাদেশবান্ধব সাংবাদিক-লেখক মার্ক টালি
এম এ মোমেন: একাত্তরের প্রিয় বন্ধু ও প্রিয় কণ্ঠ মার্ক টালি। একাত্তরে দুজন সচেতন বাঙালির দেখা হলেই একটি প্রশ্ন উঠে আসত— বিবিসি শুনেছেন?
তারপর কী বলেছেন মার্ক টালি? মুক্তিরা নাকি ওদের যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছে! ইয়াহিয়ার বারোটা বাজতে আর বাকি নেই! ঢাকায় পাওয়ার স্টেশন উড়িয়ে দিয়েছে! কে আবার—আমাদের ছেলেরাই।
নিত্যদিনের এসব খবরের জোগানদার ছিলেন মার্ক টালি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে রেডিওর এরিয়াল তুলে শর্টওয়েভে স্টেশনের নব ঘুরিয়ে বিবিসিতে স্থির হয়ে সকাল-সন্ধ্যা কী বলছেন মার্ক টালি, তা শোনার জন্য উৎকণ্ঠিত থাকত বাংলাদেশ। তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের ভেতরের ও বাইরের রণাঙ্গনে কী ঘটছে, মার্ক টালি যেন সবই জানতেন।
১৯৭১-এ মার্ক টালির বয়স ৩৫ বছর। জন্ম ধনাঢ্য ইংরেজ পরিবারে, জন্মস্থান কিন্তু কলকাতা। ১০ বছর কাটে বাঙালি পরিবেষ্টিত আঙিনায়। তারপর ফিরে যান ইংল্যান্ডে। পড়াশোনা করেন মার্লবরো ও কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজে। পাদরি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ভর্তি হলেন লিঙ্কন থিওলোজিক্যাল কলেজে, কিছু দূর এগোলেনও। তারপর বুঝতে পারলেন এই পাদরিজীবন তাঁর নয়। তাঁর চাই গতিময় ও অনুসন্ধিৎসু জীবন। ১৯৬৪-তে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে বিবিসি রেডিওতে যোগ দিলেন। ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের প্রতিনিধি হিসেবে ১৯৬৫-তে চলে এলেন দিল্লিতে। তখন থেকেই শুরু হলো তাঁর পূর্ব পাকিস্তান পর্যবেক্ষণ।
একাত্তরের অবরুদ্ধ বাংলাদেশে বিবিসি শোনা মানেই ছিল আরও খানিকটা উজ্জীবিত হওয়া, বিজয়কে আরও একটু এগিয়ে নেওয়া। সে সময় বিবিসি টিমে যাঁরা কাজ করেছেন, তাঁদের অগ্রনায়ক মার্ক টালি।
২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর—বাংলাদেশের রক্তাক্ত এগিয়ে যাওয়ার দিনগুলোতে মার্ক টালিকে প্রতিদিনই কোনো না কোনোভাবে পাওয়া গেছে। ঢাকা থেকে মার্ক টালি, কলকাতা শরণার্থী শিবির থেকে মার্ক টালি, দিল্লি থেকে মার্ক টালি, পার্লামেন্ট ভবন ওয়েস্ট মিনস্টার থেকে মার্ক টালি, ব্রিটিশ পত্রপত্রিকায় পাকিস্তান পরিস্থিতি আলোচনা করছেন মার্ক টালি…প্রতিদিনই সকাল ও সন্ধ্যায়।
২৫ মার্চের পাকিস্তানি হত্যাযজ্ঞের পরপরই তিনি বললেন ‘পাকিস্তানের দুই অংশের আর সহাবস্থানের সুযোগ নেই। পূর্ব পাকিস্তান কার্যত পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েই গেছে।’
১৫ এপ্রিল ১৯৭১ ডেইলি টেলিগ্রাফ-এর প্রতিবেদক ডেভিড লোশাকের সূত্র ধরে মার্ক টালি বলছেন, ‘বর্ষা মৌসুম আসার আগেই বাঙালিদের সব ধরনের প্রতিরোধ যেকোনো মূল্যে গুঁড়িয়ে দিতে জেনারেল ইয়াহিয়ার পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও অস্ত্র ও রসদ অপর্যাপ্ত, প্রতিরোধ যোদ্ধাদের মনোবল অটুট রয়েছে। তবে খাদ্যসামগ্রী দুর্লভ হয়ে পড়ায় কৃষকদের মনোবল ভেঙে যাওয়ার কথা। পাকিস্তানি বাহিনী যেকোনো এলাকায় সম্ভাব্য সর্বাধিক তছনছ করে সর্বোচ্চ ভোগান্তি সৃষ্টির মাধ্যমে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করার কর্মকৌশলই অবলম্বন করছে।’
মার্ক টালি তখন ঢাকায়। ১ জুলাই ১৯৭১। বিশ্ব সংবাদে মার্ক টালি। ‘ঢাকা এবং ঢাকার আশপাশে বিভিন্ন এলাকায় ব্যবসায়ী, সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলার পর আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সর্বশেষ রাজনৈতিক কর্মসূচি পূর্ব পাকিস্তানের জন্য আরও হতাশাব্যঞ্জক হয়ে উঠছে…পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণ ও সেনাবাহিনীকে উৎসাহ দেওয়ার জন্যই তাঁর ভাষণটি তৈরি করা হয়েছে। সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি তাঁর প্রশংসাকে ভীষণ সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। ইসলাম নিয়ে তাঁর জোরালো বক্তব্য সময়োচিত হয়নি। প্রকৃত সত্য হচ্ছে, যুক্তিসংগত কারণে বাঙালিরা সেনাবাহিনীকে মোটেও বিশ্বাস করছে না। এরই মধ্যে সেনাবাহিনী ঢাকা থেকে ৫০ মাইল উত্তর-পশ্চিমে আটটি গ্রাম ধ্বংস করে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করল, প্রতিহিংসায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কৌশল থেকে তারা এখনো সরে আসেনি।’
মার্ক টালির দেখা ঢাকা: ‘ঢাকার রাস্তায় সন্ত্রস্ত অবস্থা বিরাজ করছে। চলছে পাঞ্জাবি পুলিশের টহল, একটু পরপর সেনাবাহিনী মেশিনগান উঠিয়ে শহর চষে বেড়াচ্ছে। টেলিগ্রাম অফিসে ঢোকার পথে তল্লাশি করা হচ্ছে। তল্লাশি চলছে রাস্তাঘাটে, শহরের সর্বত্র। আমি যাদের সঙ্গে কথা বলছি, তারা সবাই ভীত হয়ে পড়ছে, পাছে তারা সেনাবাহিনীর চোখে পড়ে যায়…রাত্রিকালীন রাস্তাঘাট জনশূন্যেই থাকছে। অফিসে হাজিরা একটু বাড়লেও হিন্দু কর্মচারীদের কেউই ফেরেনি। উর্দুভাষী ও বাঙালিদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিরোধ তীব্র। এই অবস্থায় মূলত পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সরকারের জনগণের আস্থা ফিরে পাওয়া সম্পূর্ণ অসম্ভব।’
মার্ক টালির উপস্থিতিতেই ঢাকা শহর সারা রাত আঁধারে ডুবে ছিল। ৫ জুলাই ১৯৭১ বিশ্ব সংবাদে মার্ক টালি: ‘পূর্ব পাকিস্তানে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসার বিরুদ্ধে অভিযান চলছে বলেই মনে হচ্ছে। গত শুক্রবার বিদ্যুতের লাইন আবার নাশকতার শিকার হয়েছে। লক্ষণীয়, এবার আক্রমণ হয়েছে ঢাকায়। ঢাকার একাংশে ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ ছিল না। বেশ কটি বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।’
ভারতে তখন ৪০ লাখ শরণার্থী; প্রতিদিন বাড়ছে এ সংখ্যা। দিল্লি থেকে মার্ক টালি জানাচ্ছেন, ‘পাকিস্তানের এই সমস্যাটি এখন ভারত এবং বিশ্বের সমস্যায় পরিণত করছে। পাকিস্তানকে যথাসময়ে নিয়ন্ত্রণ না করার দায় এখন সবার।’
ব্রিটিশ প্রেস পর্যালোচনায় গার্ডিয়ান উদ্ধৃত করে মার্ক টালি জানাচ্ছেন, ‘ইয়াহিয়া খানই সব ভণ্ডুল করে দিয়ে স্বায়ত্তশাসনের একটি আন্দোলনকে স্বাধীনতা আন্দোলনের দিকে ঠেলে দিয়েছেন—সেখান থেকে ফেরার আর কোনো পথই নেই।’
বাংলাদেশবান্ধব এই সাংবাদিক ও লেখককে আমরা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সম্মান দিইনি, কিন্তু ভারত তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ ও ‘পদ্মভূষণ’ খেতাব দিয়েছে।প্রথম আলো
- DRIVER CHARGED WITH MANSLAUGHTER IN DEADLY HIT-AND-RUN IN MARCH ON JAMAICA AVENUE
- নিউইয়র্কে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক সাংসদ অধ্যাপক সেলিম ভূঁইয়াকে সংবর্ধনা, কুমিল্লা বিভাগ শুধু সময়ের ব্যাপার
- UN General Assembly Adopts Bangladesh-Led Culture of Peace Resolution
- বাংলাদেশের উত্থাপিত ‘শান্তি ও সহাবস্থানের সংস্কৃতি’ বিষয়ক প্রস্তাব গ্রহণ করল জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ
- নিউইয়র্কের জ্যামাইকায় জল খাবার রেস্টুরেন্ট এর গ্র্যান্ড ওপেনিং
- New York Attorney General James Secures $375,000 from 1-800-Flowers for Deceiving Consumers About Automatic Subscription Renewals
- নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসে বাংলাদেশি আমেরিকা পুলিশ কর্মকর্তার নামে সড়ক ‘ডিটেকটিভ দিদারুল ইসলাম ওয়ে’
- ECOSOC recommends UN General Assembly to take decision on Bangladesh and Nepal’s LDC graduation extension requests