জনপ্রিয় কথাসাহ্যিতিক হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট চরিত্র হিমু, তরুণদের ভাবনা

রিয়াদ খন্দকার : যে বয়সে তরুণরা সুপার ম্যান, স্পাইডারম্যান কিংবা ফেলুদা হতে চায়, সে সময়ই অনেকই হতে চায় হিমু। জনপ্রিয় কথাসাহ্যিতিক হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট চরিত্র এই হিমু তরুণদের মনে প্রভাব ফেলেছে একেবারে গোড়া থেকেই। জীবনের অনেক অস্বাভাবিক অধ্যায়গুলোকে যে চরিত্রটিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে একেবারেই স্বাভাবিকভাবে। যা তরুণদের মনে গেঁথে গেছে একেবারে চিরস্থায়ীভাবে। তরুণদের এই হিমু ভাবনা নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজনে লিখেছেন রিয়াদ খন্দকার
জানেন তো মধ্যবিত্তের ড্রয়িংরুম থেকে দামি শো পিস কখনও চুরি হয় না, কেবল হুমায়ূন আহমেদের বই খোয়া যায়। তরুণদের মাঝে এমনই জনপ্রিয় হুমায়ূন আহমেদ। হয়তো দেখা গেল আপনার টেবিলে হুমায়ূন আহমেদের ‘কুটু মিয়া’ উপন্যাসটি পড়ে আছে। সে বইয়ের প্রথম পাতায় লেখা ‘নওরিনের জন্মদিনে শাফিনের উপহার’। কে এই নওরিন, কেইবা এই শাফিন, এদের আপনি হয়তো চেনেন না। কিন্তু নওরিন-শাফিন একত্রে আপনার টেবিলে যে পরে আছে এই ঘটনা একমাত্র হুমায়ূন আহমেদ ছাড়া আর কে ঘটাতে পারে বলুন। মধ্যবিত্তের চিন্তার জগতে যিনি খেলা করেছেন প্রতিনিয়ত। একজন নিভৃতচারী হয়েও যিনি তরুণদের ভেতরের সমস্যাগুলো খুব সহজেই তুলে এনেছেন তার লেখায়। তার উপন্যাসের চরিত্রগুলোকে পড়ার সময় পাঠকের প্রায়ই মনে হয়, ‘আরে এ তো আমিই’। খুব সহজ কথার চেয়েও সহজ একজন হুমায়ূন আহমেদ তরুণদের এই বই পড়ার অভ্যাসটি বানিয়ে তুলেছেন সহজ থেকে আরও সহজতর।
হুমায়ূন আহমেদ তার ব্যক্তিগত জীবন দর্শনের ছায়া ফেললেন একজন যুক্তিহীন যুবকের উপর আর সেই যুক্তিহীন যুবকটি স্থান দখল করে লক্ষ লক্ষ তরুণের ভেতর। হ্যাঁ হিমুর কথাই বলছি, হুমায়ূন আহমেদের অমর সৃষ্টি হিমু। যারা কখনও সাহিত্যের ধারে কাছেও ভিড়তেন না তাদের হাতে হিমু সিরিজের বই জোর করে তুলে দিলে তারাও হয়ে গেলেন বাংলা সাহিত্যের একজন পাঠক। সাদাসিদে উপস্থাপনায় বিশ্লেষিত হিমু চরিত্রটি একেকটি তরুণের বুকের ভেতর জায়গা দখল করে নিল সেই তরুণ নিজেও বুঝতে পারল না। এই হচ্ছে আমাদের হিমু যার ভালো নাম হিমালয়। হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পর স্তম্ভিত হয়ে যায় বাংলা সাহিত্যের পাঠকেরা, শঙ্কিত হয়ে পড়ে হিমু ভক্তরা। হুমায়ূনের মৃত্যুর সাথে কি হিমুরও প্রস্থান ঘটল। আসলে হিমুদের প্রস্থান নেই। হিমুরা বেঁচে থাকে যুগ যুগ ধরে শত শত হিমুর মাঝে।
হুমায়ূন আহমেদ সৃষ্ট এই জনপ্রিয় চরিত্র হিমুর আসল নাম হিমালয়। এ নামটি রেখেছিলেন তার বাবা। হিমু একজন বেকার যুবক যার আচরণ কিছুটা অজাগতিক। হিমু যখন ছোট ছিল তখন তার বাবা তার নাম রেখেছিলেন হিমালয়, যা হিমালয় পর্বতের ন্যায় মহত্ব প্রকাশ করে। হিমুর বাবা তাকে একজন মহাপুরুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তাই তিনি তার ছেলের এমন নাম রেখেছিলেন। পরে ছাত্রজীবনে এই নাম নিয়ে তাকে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। তার দাদা (পিতামহ) তার অন্য নাম রাখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু হিমু তার বাবার দেওয়া নামই রাখে। হিমুর বাবার বিশ্বাস ছিল ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার যদি প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করা যায় তবে একইভাবে মহাপুরুষও তৈরি করা সম্ভব। তার একটি মহাপুরুষ তৈরির স্কুল ছিল যার একমাত্র ছাত্র ছিল তার সন্তান হিমু। হিমুর বয়স ১৮-২৫ বছরের মধ্যে। সে দেখতে যে খুব সুন্দর তা নয়, বরং তার পোশাক ও গেট-আপ অনেকটাই বিরক্তিকর। সে সবসময় হলুদ রঙের পাঞ্জাবি (অধিকাংশ সময়ে যেটার পকেট থাকে না) পরে। হিমুর জীবন যাপন অনেক অদ্ভুত। তার জীবন অনেকটা বাউণ্ডুলে ধরনের। সে মেসে তার বন্ধু-বান্ধবের সাথে থাকে। তার কোনো পেশা নেই। হিমুর বেশকিছু বিত্তবান আত্মীয় রয়েছে। হিমু প্রায়ই তার বিত্তবান আত্মীয়দের কাছ থেকে উপহার এবং অর্থসাহায্য পায়। হিমু স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের অধিকারী। সে প্রায়ই যুক্তি-বিরোধী মতানুসারে আচরণ করে, এবং মানুষকে বিভ্রান্ত করে এবং তার এ রকম অযৌক্তিক ব্যক্তিত্বের কারণে সে অনেক সম্ভাব্য বিপদ থেকে রক্ষা পেয়ে যায়। তার এরূপ আচরণ অনেক মানুষকে তাকে মহাপুরুষ ভাবতে প্রভাবিত করে। ঢাকার পথে পথে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ানো তার কর্মকাণ্ডের মধ্যে অন্যতম। মাঝে মাঝে তার মধ্যে আধ্যাত্মিক ক্ষমতার প্রকাশ দেখা যায়। যদিও হিমু নিজে তার কোনো আধ্যাত্মিক ক্ষমতার কথা স্বীকার করে না। কিন্তু বিভ্রান্ত করা হিমুর অত্যন্ত প্রিয় একটি কাজ।
উপন্যাসে হিমুর কিছু ভক্তশ্রেণীর মানুষ থাকে যারা হিমুকে মহাপুরুষ মনে করে। এদের মধ্যে হিমুর খালাতো ভাই বাদল অন্যতম। মেস ম্যানেজার বা হোটেল মালিক—এ রকম আরও কিছু ভক্ত চরিত্র প্রায় সব উপন্যাসেই দেখা যায়। হিমুর একজন বান্ধবী আছে, যার নাম রূপা; যাকে ঘিরে হিমুর উপন্যাসে অজানা রহস্যময়তা আবর্তিত হয়।
হিমুর প্রথম উপন্যাস ময়ূরাক্ষী। এর প্রাথমিক সাফল্যের পর হিমু বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন উপন্যাসে প্রকাশিত হতে থাকে। হিমু চরিত্রটি এতটাই প্রাচুর্যতা পায় যে বাংলাদেশের অনেক তরুণ-তরুণীদের মনে হিমু বা হিমি বাস করে।
অস্বাভাবিক আচরণের প্রতি মানুষের যে ধরনের ভালোলাগা আছে; অনেকেই সেই ভালোলাগাকে প্রশ্রয় দিতে উত্সাহী হয়েছেন। কারণ হিমুর আচরণের মধ্যে কিছু দর্শন আছে। যা মানুষকে সহজে বিমোহিত করতে পারে; আর হিমু চরিত্র নির্ধারণে সেই কাজটিই করেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। হিমু হওয়া কিংবা হিমু জ্বরে ভোগার কোনো নির্দিষ্ট বয়স আছে বলে মনে হয় না। তবে ইন্টারমিডিয়েট থেকে অনার্স পর্যন্ত-এই সময়টায় হিমুর বই পড়ে অনেকেরই হিমুর মতো হয়ে যেতে ইচ্ছা করে। হিমু হতে কোনো নির্দিষ্ট যোগ্যতা বা ম্যাচিউরিটি লাগে না। তবে মনে কিছু জটিল অংক বা দর্শন লাগে যা বাহির থেকে মনে হয় ডালভাত। হিমু হতে হলে কী করতে হবে জানেন তো, হলুদ পাঞ্জাবি পড়তে হবে, খালি পায়ে হাঁটতে হবে, পাঞ্জাবির কোনো পকেট থাকতে পারবে না, চুল দাড়ি কাটা যাবে না। হিমুর গায়ের রং শ্যামলা বা কালো এবং ঝাকড়া চুল। এই চরিত্রকে প্রথমেই হলুদ রঙের পোশাক পরিয়ে মনে একধরনের দেওয়ানা ভাব তৈরি করা হয়েছে। আকস্মিক বিষয়গুলোকে লেখক এমনভাবে ঘটান যেখানে আশ্চর্য হতেই হয়। গভীর ভালোবাসা আবার খুব সহজেই সেখান থেকে বের হয়ে আসা। যে কাজ করতে সবাই ভয় পায় কিন্তু সহজেই হিমুর পক্ষে যখন করা সম্ভব হয় তখন অবাক আর ভালোলাগা তৈরি না হয়ে পারে না। হাজার তরুণদের মাঝখানে নিজেকে আলাদা তরুণ-যুবক হিসেবে এই যে ভাবতে শেখা আর নিজের ভেতরে লুকিয়ে রাখা ভালোলাগা এখান থেকেই হিমুর প্রতি জন্মে তারুণ্যের এই ভালোবাসা। হিমুর নায়িকাও হন অন্য আচরিক নারী। হিমুর সঙ্গে তার কথোপকথন স্বাভাবিক হয় না। ‘ভালোবাসি’ না বললেই যেখানে অন্য রকম আবহ তৈরি হয়। ফিরে যাওয়ার পথের দিকে না তাকালে যেখানে আরেক ভালোলাগা তৈরি হয় সেখানেই হিমু সফল হয়ে ওঠেন। ঘরের চেয়ে রাস্তা যেখানে প্রিয়, দিনের চেয়ে রাত যেখানে বেশি কাব্যিক সেখানেই হিমুর প্রতি আসক্তি বাড়তেই থাকে। হিমুর নায়িকারা বড্ড একা। আর এই একাই যখন নায়িকার কাছে আরোধ্য হয় তখন হিমু সার্থক হয়। তাই হয়তো হিমুরা সহজেই বলতে পারে, ‘হিমুরা কারও হাতে হাত রাখে না’। কী কষ্টের কথা অথচ তরুণদের কাছে তাই যেন কাঙ্ক্ষিত। তখন বিচ্ছেদের ভেতরে তৈরি হয় আরেক ভালোলাগার অধ্যায়। সার্থক হয় হিমু। এভাবেই কত যে হিমু তৈরি হয়েছেন তার হিসাব মেলা ভার। অনেকেই ভেতরে লালন করেন হিমু হিমু ভাব। অনেকে আবার হিমু হওয়ার যোগ্যতায় গর্ববোধও করেন। তবে বাস্তবতায় সত্যিকার অর্থে হয়তো খুব বেশি লাভ হয়নি তবে ব্যক্তিগতভাবে বিপন্ন হননি কেউই। যারা বিপন্নতাকে ভালোবাসতে পারেন তাদের কাছে হিমু আরোধ্য ভীষণ। হুমায়ূন আহমেদের হিমু সার্থক কিনা জানি না তবে আমিও যদি হিমু হতে পারতাম তবে ভালোই হতো।ইত্তেফাক
- নিউইয়র্কে অ্যাসাল ওজোন পার্ক চ্যাপ্টারের ইফতার ও অভিষেক
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ ল সোসাইটি ইউএসএ’র ইফতার মাহফিল: খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকার আহ্বান
- BOROUGH PRESIDENT GIBSON HOSTS FOURTH ANNUAL BRONX IFTAR DINNER DIALOGUE UNDER THE THEME “UNITY IN DIVERSITY”
- নিউইয়র্কে মানসিক সংকটে থাকা যুবককে গুলি: পুলিশ প্রশিক্ষণ এবং মানসিক সংকটসংক্রান্ত ৯১১ কল
- নিউইয়র্কে গ্রী ম্যাকানিকেল ইয়াঙ্কার্স এর ইফতার ও দোয়া মাহফিল
- নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গমাতা পরিষদ’র ইফতার ও দোয়া মাহফিল
- নিউইয়র্কে ঢাকা জেলা অ্যাসোসিয়েশনের ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত
- বাংলাদেশ সোসাইটি অব ব্রঙ্কস নিউইয়র্ক ইনকের কোরআন তেলাওয়াত প্রতিযোগিতা ও ইফতার মাহফিল








