দেশের বাইরে থাকলেই সবাই ট্যাক্সি চালায় না, আর চালালেই বা দোষের কী?
মাহবুব মিঠু : বেশ কয়েকমাস আগে একটি পত্রিকায় যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী এক সাংবাদিক লিখেছিলেন তার প্রবাসী হওয়া নিয়ে নিকট কিছু বন্ধুর বিভিন্ন কটাক্ষমূলক মন্তব্যের কথা। এক স্থানে তিনি লিখেছিলেন, আমেরিকার যেকোনো নেতিবাচক সিদ্ধান্ত শুনে বন্ধুদের কেউ কেউ এমন মন্তব্য করে, মনে হয়Ñ ওবামা বোধহয় তার সঙ্গে আলাপচারিতা করে সকল বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। লেখাটা পড়ে বেশ হেসেছিলাম।
এত গেল প্রবাসীদের বিড়ম্বনার এক দফা। বিভিন্ন কারণে পত্রিকার অনেক সাংবাদিক কিংবা কলামিস্ট প্রবাসী হয়েছেন। সেখান থেকেই শত ব্যস্ততার মাঝেও দেশের কথা ভাবেন এবং তাই স্বাভাবিক কারণেই কম-বেশি লিখেও থাকেন। মতের মিল হলে তো ভালো, না হলেই হুলুস্থুল। একটা কথা বেশ চালু হয়ে গিয়েছে, প্রবাসী মানেই ট্যাক্সি ড্রাইভার কিংবা সেই ধরনের কিছু একটা কাজে যুক্ত। যদিও যাদের কথা বলেন, তাদের সবাই বাস্তবে সেটা নয়ও। আর হলেই ক্ষতি কী? ট্যাক্সি ড্রাইভাররা কি মানুষ নন? এরা ব্যাঙ্গ করে বোঝাতে চান, যেহেতু ট্যাক্সি ড্রাইভার, তাই ‘নীচু পেশার’ লোকদের কলম নিয়ে নাচানাচি কেন? জ্ঞান-গরিমার চর্চা কিংবা দেশ নিয়ে ভাবার একচেটিয়া ঠিকাদারি তো সাদা প্যান্ট পড়া সাহেবি চাকরি করা লোকদের কম্ম!
অর্থাৎ দেশে যারা রিকশা চালায় তারাও উনাদের কারো কারো দৃষ্টিতে ‘ছোটলোক’। কাজেই এই সব ছোটলোকদের দেশ নিয়ে ভাবনার কোনো সুযোগ কিংবা অধিকার নেই। কিংবা যারা গার্মেন্ট শ্রমিক, যাদের শ্রমের টাকায় দেশের অর্থনীতির চাকা গতিশীল এবং সেই অর্থে আমরা কেউ কেউ ‘ভদ্দর লোকের’ চাকরি করে দু’পয়সা কামিয়ে সাহেবি হালে চলতে-ফিরতে পারছি, সেই পোশাক কারখানার শ্রমিকরাও অচ্ছুত! এত বড় সাহস কই পেলেন?
আশরাফ-আতরাফ বোধ আমাদের এখনো অনেককে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। অনেকের ধারণাই নেই, উন্নত বিশ্বের ট্যাক্সি ড্রাইভার কেন, কারখানার শ্রমিকও মহাবিশ্বের জটিল থিওরি সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন। তারা নিজ দেশের মন্ত্রী, নেতা কিংবা পাতিনেতাদের নাম বলতে না পারলেও সমসাময়িককালের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের খবর রাখেন।
আরেকজন বন্ধু সেদিন কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, কারো কারো নাকি ধারণা, প্রবাসীদের কোনো দেশপ্রেম নেই। কারণ তারা দেশের মায়া ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। দেশপ্রেমের পূর্বশর্ত হিসেবে কোথাও স্থানিক অবস্থানের কথা লেখা নেই। অক্সফোর্ড ডিকশনারির সংজ্ঞা মতে, ‘খড়াব ড়ভ ুড়ঁৎ পড়ঁহঃৎু ধহফ রিষষরহমহবংং ঃড় ফবভবহফ রঃ’
তাহলে দেশপ্রেমিক কে? এক স্থানে লেখা আছে, ‘ঢ়ধঃৎরড়ঃরপ সবধহং ধংশরহম যিধঃ ুড়ঁ পধহ ফড় ভড়ৎ ুড়ঁৎ পড়ঁহঃৎু, হড়ঃ যিধঃ ুড়ঁৎ পড়ঁহঃৎু পধহ ফড় ভড়ৎ ুড়ঁ. ওঃ রং রিষষরহমষু ঢ়ধুরহম সড়ৎব ঃধীবং ংড় াবঃবৎধহং ফড়হ’ঃ ফরব রহ ঢ়ড়াবৎঃু.’
কাজেই, দেশের বাইরে অবস্থান করেও দেশের সেবা করা সম্ভব। পত্রিকার খবর অনুযায়ী, ২০১১-১২ অর্থবছরে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন প্রায় ১ হাজার ২৮৫ কোটি ডলারের সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা এবং যার কারণে প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৩০ শতাংশে। বিগত বছরগুলোর অবদানগুলোও তাৎপর্যপূর্ণ। কাজেই, দেশের মাটিতে না থেকেও সুদূর প্রবাসে বসেও একজন বাংলাদেশি নাগরিক তার দেশের অর্থনীতির উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। এটা কি দেশপ্রেম নয়?
এখন প্রশ্নÑ দেশে যারা বর্তমানে আছেন বা যারা ছিলেন কিন্তু এখন প্রবাসী তারা কতজনে ঠিকমতো ট্যাক্স দিয়ে থাকেন? দেশ যখন অর্থনৈতিক সমস্যায় থাকে তখন দেশের তৈরি জিনিস কেনা একজন দেশপ্রেমিকের বৈশিষ্ট্য। আমরা ক’জন সেই কাজটি করি? উল্টো প্রশ্নও আসতে পারে। কেন দেশের তৈরি জিনিস কিনব? যেখানে মান নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা নেই, গুণগত মান ঠিক না থাকলে নালিশ করার জায়গা নেই, সেখানে কম দামে বিদেশি ভালো জিনিস কিনব না কেন? তাহলে যে ব্যবসায়ী বা শিল্প মালিক সে কোনোভাবে দেশের মানুষের সাথে প্রতারণা করছে, তাই নয় কি? এটা কি দেশপ্রেম?
কিংবা কয়জন আমরা পানি, বিদ্যুৎ অথবা গ্যাসের অপব্যবহারের প্রতি সচেতন? একজন দেশপ্রেমিক কখনো তার দেশবাসীকে ঘৃণা করতে পারে না। তাই নিজ দেশের প্রবাসী ভাইয়ের দেশপ্রেম নিয়ে যারা প্রশ্ন তোলেন, তাদের দেশপ্রেমের নৈতিকতাই প্রশ্নের সম্মুখীন।
অনেকের অনুযোগ, প্রবাসীরা দেশে কেন ইনভেস্ট করে না। প্রশ্নটা নিজের সাথেই প্রতারণাপূর্ণ। একজন প্রবাসী টাকা খাটাতে দেশে আসার পথে প্রথমেই বিমানবন্দরে যে অভিবাদনটা পায় সেখানেই তার আগ্রহ অর্ধেকটা কমে যায়। ব্যবসা করতে গিয়ে মাস্তান থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট অফিসগুলোয় টাকা এবং আনুষঙ্গিক ভোগান্তি পোহাতে হয়। এত কিছুর পরেও ঝামেলাবিহীন ব্যবসা করার গ্যারান্টি কোথায়?
মূলত, প্রবাসীরা কেউ আসমান থেকে আসেনি। যারা বিভিন্ন কারণে কটূক্তি করেন, তাদের কারো না কারো আত্মীয়ই হবেন তারা। এরপরেও কিছু সংখ্যক লোকের নানা কারণে খেদ আছে। কেউ করে সেকেলে দেশাত্মবোধ থেকে। আর কেউ করে অন্য কারণে। এক প্রবাসী তার দেশের বাড়ির সম্পত্তি দেখাশুনা করার জন্য দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়কে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তাকে বাড়িঘর দেখভাল করার জন্য প্রতি মাসে মোটা অংকের টাকাও পাঠাতেন। বহু বছর পরে তিনি দেশে ফিরে দেখেন, তার আত্মীয় যেসব কাজ দেখিয়ে টাকা নিয়েছিল এর কোনো কাজই সে করেনি। বরং তার পাঠানো টাকা দিয়ে সে নিজে সম্পদ বানিয়েছে এবং বাজারের সেরা সেরা মাছ কিনে খেয়েছে। সব দেখেশুনে ওই প্রবাসী টাকা পাঠানো বন্ধ করে দেন। এরপর থেকে তিনি ওই আত্মীয়ের কাছে জগতের সবচেয়ে খারাপ মানুষ বনে যান। কী অদ্ভুত চরিত্র আমাদের! ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ফুটবল খেলা নিয়ে অবলীলায় আমরা এক বন্ধু আরেক বন্ধুর মাথা ফাটাই। একদল আরেক দলকে ভারত কিংবা পাকিস্তানের দালাল বলে কলার ধরি। এমনকি দেশের যেকোনো স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যাপারে চোখের পলকে দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাই। বিভক্তির পালকে দয়া করে দেশজ এবং প্রবাসী এই বিভক্তি আনবেন না। দেশটা যারা দেশে থাকেন তাদের যেমন, ঠিক তেমনি যারা বিভিন্ন কারণে স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে প্রবাসী হয়েছেনÑ তাদেরও। দেশপ্রেম বা দেশপ্রেমিকের সংজ্ঞা অনুযায়ী ওপরের আলোচনা থেকে এটুকু ধারণা করা যায়, দেশকে ভালবাসা বা না বাসা সেটা কোনো অবস্থানের উপরে নির্ভর করে না। বরং একজন ব্যক্তি তার প্রতিদিনকার কাজে, ভাবনার মাধ্যমেই প্রমাণ করে সে কতটুকু দেশপ্রেমিক কিংবা আদৌ দেশপ্রেম তার আছে কি না! সেটা প্রবাসে যারা থাকেন, তাদের বেলায় যেমন সত্য, ঠিক তেমনি দেশে যারা অবস্থান করছেন তাদের বেলাও সমভাবে প্রযোজ্য। দেশের ভেতরেই ভাসানী, মুজিব, তাজউদ্দিন ছিলেন। তাদের কাছাকাছি কিন্তু গোলাম আযম কিংবা নিজামীদের মতো দেশদ্রোহীও ছিল এবং এখনো আছে। ঠিক তেমনি দেশের বাইরেও ভালো-মন্দ দুই প্রকারের বাংলাদেশিই বসবাস করেন। তাই ঢালাওভাবে প্রবাসীদের সম্পর্কে কটাক্ষ করে ছোট মানসিকতার পরিচয় না দিয়ে মনটাকে উদার করুন। এটাই দেশপ্রেমিক হওয়ার অন্যতম শর্ত।
দেশের বাইরে থাকলেই সবাই ট্যাক্সি চালায় না। আর চালালেই বা দোষের কী? ই-মেইল : : [email protected]
- ওয়ার্ল্ড হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট ইউএসএর সাধারণ সম্পাদক ড. সাদিয়া আফরিন এরা
- চরমোনাই পীরের যুক্তরাষ্ট্র সফর উপলক্ষে নিউইয়র্কে দোয়া মাহফিল, কুরআন-সুন্নাহর আলোকে বয়ান
- New York Attorney General James Secures Reimbursements for T-Mobile Customers Whose Rates Were Unjustly Raised
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে কুনু-ফিরোজ পরিষদের সাত দফা ইশতেহার ঘোষণা; কমিউনিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠা, সাশ্রয়ী ফিউনারেল সেবা, বিমানের সরাসরি ফ্লাইট ও আর্থিক স্বচ্ছতায় অঙ্গীকার
- ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের পূর্ণ সমর্থন: জাতিসংঘে রাষ্ট্রদূত আইরিন খান
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে প্রথমবারের মতো বিতর্ক, গুরুত্ব পেল স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি
- New York Attorney General James Warns New Yorkers About AI-Generated Election Misinformation Ahead of November Elections
- Bangladesh calls for global treaty to protect victims of crimes against humanity