‘দ্য সাকসেসফুল ম্যাচ মেকার অব বাংলাদেশ’ আল-জাজিরায় ঘটক পাখি ভাই

তোহুর আহমদ: বিশ্ব ভালবাসা দিবসে মধ্যপ্রাচ্যের প্রখ্যাত টিভি নেটওয়ার্ক আল-জাজিরার বিশেষ রিপোর্ট। শিরোনাম ‘দ্য সাকসেসফুল ম্যাচ মেকার অব বাংলাদেশ।’ তিনি আর কেউ নন, ঘটক পাখি ভাই। সফল জুটি মেলানোর গোপন সূত্র সম্পর্কে পাখি ভাই বলেন, বিশ্বাস ও বিশ্বস্ততা। কোন বিষয় লুকিয়ে না রাখা। পাখি বলেন, আমি পাত্র ও পাত্রী পক্ষকে সব খুলে বলি। উভয় পরিবারের পরিচয় করিয়ে দিই। আমার কাজ শেষ। তারা নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলে সব ঠিক করেন। পছন্দ হলে বিয়ে হয়। না হলে হয় না। আর এভাবেই খ্যাতি পেয়েছেন ভালবাসার গুরু হিসেবে। জুটি মেলোনোর সফল কারিগর তিনি। পাখি ভাই। ঘটক। এখন পর্যন্ত জুটি মিলিয়েছেন ১০ হাজারেরও বেশি। মন্ত্রী, এমপি, পুলিশ, সরকারি কর্মকর্তার পরিবারে বিয়ে দিয়েছেন। নায়ক-নায়িকা, ফ্যাশন মডেলের বিয়ে দিয়েছেন। বা-মা তাদের সন্তান এমনকি নাতি-নাতনিরও বিয়ে হয়েছে পাখি ভাইয়ের মাধ্যমে। একটি পরিবারে ২৬টি পর্যন্ত বিয়েতে ঘটকালি করেছেন। দাম্পত্য জীবনে সুখ মন্ত্র হিসেবে তিনি বলছেন, বিশ্বাস আর সততা।
তবে তার আসল নাম কিন্তু পাখি নয়। কাজী আশরাফ হোসেন। অবশ্য এ নামে গত ৪০ বছরে কেউ তাকে ডাকেনি। নিজের আসল নামটা ভুলেই গেছি- বললেন পাখি ভাই। কেন তার নাম পাখি হলো? অকপট উত্তর- পাখির মতো এখানে সেখানে ছুটে বেড়াতাম। কেউ পাত্র বা পত্রী খুঁজছে জানতে পারলেই ছুটতাম তার বাড়ি। এ থেকেই মানুষ আমার নাম দিল পাখি। আমি হলাম ঘটক পাখি ভাই। এ নামেই এখন আমার কোম্পানির নাম। ‘ঘটক পাখি ভাই প্রাইভেট লিমিটেড।’
কোন ধরনের বিয়ে দিয়ে বেশি আনন্দ পান জানতে চাইলে তিনি বলেন- যখন একটা কালো, মোটা, শ্রীহীন মেয়ের জুটি মিলিয়ে দিতে পারি তখন আনন্দ হয়। মনে হয়, একটা ভাল কাজ করতে পারলাম। পাখি বলেন, মানুষের আসল সৌন্দর্য মনে। বাইরের সৌন্দর্য মেকি। তারপরও বেশিরভাগ মানুষ সুন্দর বউ চায়। বলে সুন্দর বউ না হলে বাইরে মুখ দেখানো যাবে না। কিন্তু সুন্দর বউ নিয়েই ঝামেলা বেশি।
সুখী সংসার কেমন জানতে চাইলে পাখি ভাই বলেন- কম টাকা, কম চাহিদা, একে অপরের প্রতি অগাধ বিশ্বাস আর ভালবাসা যদি থাকে তবে সেটাই সুখের সংসার। এমন সংসারের স্বাদ যে একবার পেয়েছে সে শুধু জানে জীবনে সে কি পেয়েছে। আর স্বামী যদি মদ খায়, নাইট ক্লাবে যায় তবে সংসারে অশান্তি অনিবার্য। একইভাবে স্ত্রী যদি পর পুরুষের সঙ্গে ঘোরে। ডিস্কোতে নাচে, মদ খায়, সিগারেট টানে তবে সুখ তাদের কাছ থেকে পালায়। সংসার থাকে নামে মাত্র। তারা দু’জনেই জানে তারা স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে অভিনয় করে চলেছে। জীবনভর এ অভিনয় করতে হয়। আবার পাত্রের যদি লোভ থাকে। শ্বশুরের কাছ থেকে অনেক কিছু নেবে- এমন মনোভাব থাকে তবে সে ঠকতে বাধ্য। আবার পাত্রীর মধ্যে যদি হাই-ফাই ভাব থাকে। অহঙ্কার-বড়াই থাকে তবে সেও ঠকবে।
সফল দাম্পত্য জীবনের মন্ত্র কি জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানেও বিশ্বাস। স্বামী-স্ত্রী যদি একে অপরের প্রতি বিশ্বস্ত থাকেন তবে সে সংসার কখনই ভাঙবে না। কিন্তু তারা যদি ক্রমাগত একে অপরকে মিথ্যা বলেন, কথা গোপন করেন তবে সে সম্পর্ক ভাঙতে বাধ্য। সামাজিক মর্যাদা রক্ষায় সম্পর্ক না ভাঙলেও দাম্পত্য জীবনের মৃত্যু ঘটবে। সুখ-শান্তি থাকবে না। তখনই মানুষ হয়ে যায় বাহির মুখী। সুখের খোঁজে মানুষ নদীর ওপারের পানে চেয়ে থাকে।
ঘটকের মাধ্যমে পাত্র-পাত্রী কারা চায় জানতে চাইলে পাখি ভাই বলেন, যে সব মেয়ে জিন্স প্যান্ট পরে, চুলে রং করে রাত-বিরেতে ঘোরে তাদের পাত্রের অভাব হয় না। তাদের অনেকের ৩-৪ বার করেও বিয়ে হয়। কিন্তু যারা নম্র, ভদ্র, লাজুক। যারা প্রেম করতে জানে না বা প্রেম করার ফুরসত পায়নি তারাই আমার পাত্রী। ছেলেদের ক্ষেত্রেও একই। আবার সংসার ভেঙে গেছে এমন পাত্র-পাত্রীও আছে অনেক।
ঘটক পাখি ভাইয়ের কাছে প্রতি মাসেই শ’ শ’ মানুষ আসে জুটি মিলিয়ে নেয়ার জন্য। এতসব মানুষের নাম, ঠিকানা, পছন্দ মনে রাখা কঠিন। তাই একটি কম্পিউটারে বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহার করেন তিনি। প্রতিটি ক্লায়েন্টের জন্য দেয়া হয় একটি পাসওয়ার্ড। পাসওয়ার্ড টিপলেই ক্লায়েন্টের সব তথ্য চলে আসে। অবশ্য পাত্র-পাত্রী সম্পর্কে কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়। চাইলেই যে কেউ যে কোন পাত্র বা পাত্রীর ব্যক্তিগত তথ্য জানতে পারে না। চাহিদা অনুযায়ী উপযোগী পাত্র-পাত্রীর ছবি, তথ্য জানানো হয়।
জুটি মেলাতে গিয়ে কখনও কোন ঝামেলা হয়েছে কি না জানতে চাইলে পাখি বলেন, একবার একটা বিয়ে নিয়ে ঝামেলা হয়েছিল। এক থানার ওসি আমাকে অনেক রাতে ফোন করেছিল। ঘুমের মধ্যে ওসির সঙ্গে একটু খারাপ ব্যবহার হয়ে গিয়েছিল। পরে ওসি আমাকে থানায় ডেকেছিল। হয়রানি হয়েছিল খুব।
৪২ বছর ধরে চলছে পাখি ভাইয়ের ঘটক জীবন। ঘটকালি করতে কেমন লাগে জানতে চাইলে পাখি বলছেন, এটা এখন আমার নেশা। পেয়ার, মহব্বতের কাজ। তাই শুক্রবারও অফিস করি। প্রচণ্ড জ্বর নিয়েও অফিসে বসেছি। একদিন অফিসে না এলে আমার দিন কাটে না। যখন আমার মাধ্যমে একটা বিয়ে হয় তখন শুকরিয়া আদায় করি। মনে হয় একটা সওয়াবের কাজ করলাম। দিনভর ব্যস্ত থাকেন পাখি ভাই। শ’ শ’ ফোন রিসিভ করতে হয়। এজন্য তিনি বেশ ক’জন সহকারী নিয়োগ করেছেন।
পাখির বাড়ি বরিশাল জেলার সদর থানায়। বাড়ি গেলে মানুষ আপনাকে কেমন চোখে দেখে? বাড়ি গেলে অনেকেই এগিয়ে এসে হাত মেলায়। সম্মান দেয়। আমার ছেলেমেয়েদের খোঁজ রাখে। তারা ভাবে আমি ভাল কাজ করি। মানুষের উপকার করি। জুটি মিলিয়ে দিতে পারলে কত টাকা পান? আমার কাছে টাকা বড় নয়। অনেক বিয়ে দিয়েছি যেখানে একটি টাকাও নিইনি। গরিব পরিবারের বিয়ে। আবার একটা বিয়ে দিয়েই ৪ লাখ টাকা পেয়েছি। ১-২ লাখ টাকা তো অহরহ পাই। সেদিনও একটা বিয়ে দিয়ে ২ লাখ টাকা পেলাম। এ আয় দিয়েই আমার সংসার চলে। বাড়ি-গাড়ি করতে পারিনি। তবে ডাল-ভাতের অভাব আমার সংসারে নেই। এখন পর্যন্ত কেমন পরিবারের বিয়ে দিয়েছেন? বিয়ে দিয়েছি মন্ত্রী-এমপির ছেলেমেয়ের, তাদের আত্মীয়দের। পুলিশ কর্মকর্তা, ম্যাজিস্ট্রেট, সাংবাদিক, বড় সরকারি চাকুরের বিয়ে দিয়েছি অসংখ্য। আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি ইউকেসহ বিশ্বের বহু দেশে বাস করা লোকজনের বিয়ে দিয়েছি। বাংলাদেশের এমন কোন জেলা নেই যে জেলায় আমি বিয়ে দিইনি। আবার এমনও আছে বাবা-মায়ের বিয়ে হয়েছে আমার হাতে। এখন তাদের ছেলেমেয়ে এমনকি নাতি-নাতনিরও বিয়ে দিয়েছি। একটি পরিবারের ২৬টি পর্যন্ত বিয়ে দিয়েছি। অনেক পরিবার আমাকে তাদের পরিবারেরই সদস্য মনে করে। আচারে অনুষ্ঠানে ডাকে। আবার এমন ঘটনা অহরহ হয় যে আমার মাধ্যমে পরিচয় হয়েছে, পছন্দ হয়েছে। কিন্তু আমাকে বলে পছন্দ হয়নি। কিন্তু পরে জানতে পারি আমাকে ফাঁকি দিয়ে বিয়ে করতে যাচ্ছে। তখন তাদের গিয়ে ধরি। বলি আমার পারিশ্রমিকটা দেন। এ সেদিনও এমন ঘটনা জানতে পেরে লোকজন নিয়ে হাজির হলাম এক কমিউনিটি সেন্টারে। তখন বলল, ভুলে গেছিলাম। সুড় সুড় করে টাকা বের করে দিল। অনেকে আবার আমার মাধ্যমে বিয়ে হয়েছে এটা লুকাতে চায়। আমাকে বলে বিয়েতে যাবেন না। কাউকে বলবেন না। পাখি ভাইয়ের অফিসে তার সহকারী হিসেবে সুশ্রী অনেক তরুণী কাজ করছেন। পাত্রী খুঁজতে এসে এসব তরুণীদের কেউ পছন্দ করে ফেলেন কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানে যেসব মেয়েকে আমি কাজ দিই তারা সবাই বিবাহিত। তারা আমার মেয়ের মতো। ১০-১২ বছর ধরে আমার এখানে অনেকেই কাজ করছেন। সম্পূর্ণ পেশাদারি মনোভাব নিয়েই কাজ করে তারা। পাখি ভাইকে নিয়ে দেশে তো বটেই বিশ্বের অনেক খ্যাতনামা মিডিয়ায় খবর প্রকাশিত-প্রচারিত হয়েছে। বিবিসি, এএফপি, সিএনএন, গার্ডিয়ান পত্রিকায় ফলাও করে ফিচার ছাপা হয়েছে তাকে নিয়ে। সর্বশেষ ফেব্রুয়ারি মাসের ১৪ তারিখ বিশ্ব ভালবাসা দিবসে আল জাজিরা তাকে নিয়ে বিশেষ রিপোর্ট প্রচার করেছে। আল জাজিরায় পাখিকে দেখা যায় ফুল হাতে স্ত্রীকে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বিভিন্ন পার্কে, লেকের ধারে। আসলেই কি এত সুখের সংসার তার? পাখি বলছেন, আমি বিয়ে করেছি দুটো। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়েছিল। তিনি এখনও আমার ঘরে আছেন। তবে ২৭ বছর ধরে তিনি অসুস্থ। পরে আরেক মেয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। প্রেমই বলতে পারেন। তবে তাতে আমার পরিবার বা তার পরিবারের কোন অসম্মতি ছিল না। প্রথম স্ত্রীর সম্মতি নিয়ে পারিবারিকভাবেই তাকে বিয়ে করেছি। আমার দ্বিতীয় স্ত্রীর ছেলেমেয়েদেরও বিয়ে দিয়েছি আমি। পাখি বলেন, আমার দুই স্ত্রী। কিন্তু দু’জনেই আমার কাছে সমান। প্রয়োজনের তাগিদে আমি আরেকটি বিয়ে করেছি। কিন্তু আমার সংসারে সুখের কমতি নেই। আল জাজিরায় রিপোর্ট প্রকাশের পর কেমন লাগছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি তো লেখাপড়া বেশিদূর জানি না। তাই জানতাম না আল জাজিরা কত বিখ্যাত টিভি। ওরা ৪ দিন ধরে স্যুটিং করল। রিপোর্ট প্রচারের পর বিশ্বের কত দেশ থেকে ফোন আসছে। সবাই অভিনন্দন জানাচ্ছে। আমার স্ত্রী যারপরনাই খুশি। কোটি টাকা দিয়েও তো এ সম্মান পেতাম না। পাখি ভাই বলেন, ১৯৭৩ সালে ঢাকায় এসেছি। তখন হেঁটে, বাসে চড়ে বিভিন্ন জায়গায় যেতাম। পরে পুরনো ঢাকায় অফিস নিলাম। সেখান থেকে ইস্টার্ন প্লাজা। এখানে আছি ২২ বছর ধরে। মানুষের ভালবাসা আর বিশ্বাস না থাকলে এতদিন টিকে থাকতে পারতাম না। পাখি ভাই বলেন, তবে সবাই এক নয়। ম্যারেজ মিডিয়ার নামে অনেকে প্রতারণার ব্যবসা খুলে বসেছেন। তাদের কারণে এ পেশার দুর্নাম হচ্ছে। ঘটক পাখি ভাইয়ের বয়স এখন ৭০ ছুঁই ছুঁই। ২ ছেলে ও ৩ মেয়ের জনক তিনি। দু’ছেলে ও দু’মেয়ের ভাল ঘরে বিয়ে দিতে পেরেছি বললেন পাখি। আরও বললেন, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এ কাজই করে যেতে চাই। মানবজমিন
- নিউইয়র্কে অ্যাসাল ওজোন পার্ক চ্যাপ্টারের ইফতার ও অভিষেক
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ ল সোসাইটি ইউএসএ’র ইফতার মাহফিল: খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকার আহ্বান
- BOROUGH PRESIDENT GIBSON HOSTS FOURTH ANNUAL BRONX IFTAR DINNER DIALOGUE UNDER THE THEME “UNITY IN DIVERSITY”
- নিউইয়র্কে মানসিক সংকটে থাকা যুবককে গুলি: পুলিশ প্রশিক্ষণ এবং মানসিক সংকটসংক্রান্ত ৯১১ কল
- নিউইয়র্কে গ্রী ম্যাকানিকেল ইয়াঙ্কার্স এর ইফতার ও দোয়া মাহফিল
- নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গমাতা পরিষদ’র ইফতার ও দোয়া মাহফিল
- নিউইয়র্কে ঢাকা জেলা অ্যাসোসিয়েশনের ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত
- বাংলাদেশ সোসাইটি অব ব্রঙ্কস নিউইয়র্ক ইনকের কোরআন তেলাওয়াত প্রতিযোগিতা ও ইফতার মাহফিল








