নন্দিত লেখক হুমায়ূন আহমেদের শেষ দিনগুলো : ক্যান্সার নয় ইনফেকশনে মৃত্যু

বিশ্বজিত সাহা, অতিথি লেখক ,নিউইয়র্ক : হুমায়ূন আহমেদ যুক্তরাষ্ট্র থেকে শেষবারের মত দেশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেলেন নিইয়র্ক সময় রাত ১১টা ২৬ মিনিটে। মাকে দেখতে, মাতৃভূমিকে দেখতে, নুহাশ পল্লীতে অবকাশ জীবন কাটাতে। পার্থক্য এটুকুই হুমায়ূন আহমেদ এবার আর যুক্তরাষ্ট্রে ফিরবেন না। ডা. জেইন বা ডা মিলারের কাছে কর্কট রোগ নিরাময়ের জন্য আর যাবেন না। হুমায়ূন আহমেদ আর চঞ্চল হয়ে উঠবেন না, ব্যতিবস্ত হয়ে ওঠবেন না দেশে ফিরে যেতে। নিউইয়র্ক থেকে ফোন করে জিজ্ঞেস করবেন না, ঐ গাছটি কেমন আছে? হুমায়ূন আহমেদ আর কারো কাছে কিছু প্রশ্ন করবেন না, জিজ্ঞেস করবেন না, আজ তিনি সব কিছুর উর্ধ্বে গিয়ে এমির্যােটস এর রাতের ফ্লাইটে করে বাংলাদেশ রওয়ানা হয়ে গেলেন। তবে গেলেন সাদা কফিনে করে একজন ‘সাদা মানুষ’ হয়ে। সাথে গেলেন স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন, দুই পুত্র নিষাদ, নিনিত, শ্বাশুড়ী বেগম তহুরা আলী, শ্যালিকা সেজুতি এবং অন্য প্রকাশের স্বত্বাধিকারী মাযহারুল ইসলাম। নিউইয়র্ক সময় রাত সাড়ে ৭টায় ওজোনপার্কের বাসা থেকে সবাই জেএফকে বিমানবন্দরে পৌছায়। তবে হুমায়ূন আহমেদ আসেন জেএফকে বিমানবন্দরে বিকেল ৪টায়। সরাসরি ফার রকওয়ের ইসলামিক ব্যুরোরাল ফিউনারেল হোম থেকে। হুমায়ূন আহমেদকে বিদায় জানাতে উপস্থিত ছিলেন জাতিসংঘের স্থায়ী প্রতিনিধি আব্দুল মোমেন, কনসাল জেনারেল সাব্বির আহমেদ, মুক্তধারার কর্ণধার বিশ্বজিত সাহা , পরিচালক রুমা সাহা, যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতিসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবৃন্দ এবং হুমায়ূন আহমেদ-এর ভক্তবৃন্দ। এর আগে সকাল ১১টায় মেহের আফরোজ শাওন, শাওনের মা এবং কয়েকজন আত্মীয়স্বজনসহ প্লেন ছাড়ার আগে শেষবারের মত হুমায়ূন আহমেদকে দেখতে যান ফিউনারেল হোমে। দুপুর ১টায় সবাই ওজোনপার্কের বাসায় ফিরে আসেন। ১৪ অক্টোবর ২০১১। নন্দিত লেখক হুমায়ূন আহমেদ কর্কট রোগের চিকিৎসার জন্য নিউইয়র্কে আসেন। সেদিন তিনি প্রথমবারের মত চিকিৎসা করাতে নিউইয়র্কে আসেন। আসার আগে অনিশ্চয়তা, দুঃশ্চিন্তার মধ্যে হুমায়ূন আহমেদ প্রথমে ওঠেন এনটিভি ভবনের গেস্ট হাউসে। কয়েকদিন থাকার পর জ্যামাইকাতে বাসা ভাড়া নিয়ে নিজস্ব বাসায় ওঠেন। এরপর তিন সপ্তাহ দেশে কাটিয়ে আসার পর গত ৩ জুন নিউইয়র্কে ফিরে আসেন। ৯ মে যেদিন হুমায়ূন ভাই তিন সপ্তাহের জন্য দেশে গেলেন, সে কথাই আজ বার বার মনে পড়ছে। সেদিন হুমায়ূন ভাই ছিলেন, আজ হুমায়ূন ভাই নেই। এই যে পার্থক্য, সেটা প্রতি পরতে পরতে উপলব্ধি হয়েছে। আজ কেন জানি এই হুমায়ূন ভাইকে বড় অপরিচিত মনে হয়েছে। যিনি একবারও কাছে ডাকেননি, একবারও গলায় ঝুলানো ব্যাগে পাসপোর্ট এবং বোর্ডিং পাশ ঢুকিয়ে দিতে বলেননি। হুমায়ূন ভাই যখনি এর আগেরবার দেশে গেছেন, টিকেট কাউন্টার থেকে গেইটে যাওয়া পর্যন্ত মনে হয়েছে, আমি হুমায়ূন ভাইয়ের পাশে পাশে আছি। আর আজ নিজেকে অনেক একা, নিঃস্ব, একাকী, সর্বহারা মনে হচ্ছে। আজ যারা হুমায়ূন ভাইয়ের সাথে যাচ্ছে, তাদেরকেও অচেনা মনে হচ্ছে। আজ হুমায়ূন ভাই দেশে যাচ্ছেন, সবসময় দেশে যাওয়ার সময় বা আসলে আমাদের গাড়ীতে আসতেন, আজ আসেননি। নিষাদ, নিনিত বা তাদের মাও আমাদের গাড়ীতে আসেননি। এসেছেন হুমায়ূন আহমেদ-এর বন্ধু ফাংশু মন্ডলের গাড়ীতে। আর হুমায়ূন ভাইকে বিদায় দিতে তদারকী করতে এসেছেন জাতিসংঘের স্থায়ী প্রতিনিধি ড. আব্দুল মোমেন এবং তাঁর স্ত্রী। আমার বারবারই মনে হলো, গত ৯ মাসে ৯ বারও দেখিনি এতসব মহান মানুষগুলোকে। গত তিন সপ্তাহ ধরে হুমায়ূন আহমেদ যখন বেলভিউ হাসপাতালে লাইফসাপোর্টে ছিলেন, তখন বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে গাড়ী দিয়ে রাইডের ব্যবস্থা এবং রাতে হাসপাতালে থাকার জন্য একজন লোক নিয়োগ করে। হুমায়ূন আহমেদ-এর মরদেহ এবং তাঁর আত্মীয় স্বজনেরা আজ সরকারী খরচে দেশে গেলেন। আমি নিশ্চিত হুমায়ূন ভাই বেঁচে থাকলে এটা হতো না। এখনো আমার চোখে জ্বল জ্বল করছে, যেদিন হুমায়ূন ভাই চিকিৎসা করাতে প্রথম নিউইয়র্কে আসলেন, সেদিনও বাংলাদেশ কনস্যুলেটের কনসাল জেনারেল সাব্বির হোসেন চৌধুরীর গাড়ীসহ আরো কয়েকটি গাড়ী আসে। হুমায়ূন আহমেদ কারো গাড়ীতে উঠেননি। আমাদের গাড়ীতে করেই এসেছিল। এম্বেসীর গাড়ী সাহায্য নিয়ে হুমায়ূন ভাই নিউইয়র্কের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ কলামে এ সম্পর্কে লিখেছিলেন ‘এ মণিহার আমার নাহি সাজে’। আজ হুমায়ূন ভাইকে সে মণিহার পরিয়ে দেয়া হয়েছে। হুমায়ূন ভাই, আমি নিশ্চিত আপনি এজন্য খুব ব্যথিত। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, আপনাকে কেমন জানি আলাদা করে দিয়েছে, আপনার চারপাশের মানুষগুলো। নতুবা বাংলা ভাষাভাষী সবচেয়ে প্রিয় লেখকের মরদেহকে গোসল করাবার সময় একজন সাংবাদিকসহ মাত্র তিনজন লোক কেন থাকবে? হুমায়ূন ভাই আপনাকে যারা ভালবাসেন, তাদের কাছ থেকে আস্তে আস্তে করে একেবারে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়েছে। আজ আপনি সেসব বেস্টনী থেকে মুক্ত। আপনি আজ আপমর সকল বাঙালীর। আজ আপনি আবার হুমায়ূন আহমেদ, সকল বাংলা ভাষা-ভাষী মানুষের হয়ে গেলেন। সারা জীবন আপনি তাদের অন্তরে থাকবেন। হুমায়ূন ভাই, আপনি অবিনশ্বর হয়ে চিরজাগরুক হয়ে থাকবেন। উল্লেখ্য, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১১ সালে হুমায়ূন আহমেদ কর্কট রোগের চিকিৎসার জন্য নিউইয়র্ক আসেন। প্রথমে মেমোরিয়াল সোলান ক্যাটারিং হাসপাতালে ড. স্টিপেন আর ভিচ এর তত্বাবধানে তিনটি ক্যামোথেরাপী নেন। পরবর্তীতে নিউইয়র্ক শহরের ম্যানহাটানের বেলভ্যু হাসপাতালে অঙ্কলজি বিভাগের ডা: জেইন এর তত্বাবধানে চিকিৎসা করাতে শুরু করেন। প্রথম পর্যায়ে ৮টি ক্যামোথেরাপী দেয়ার কথা থাকলেও পরবর্তীতে ক্যান্সারের নিরাময়ে কার্যকরী ভূমিকা নেয়ায় সর্বমোট ১২টি ক্যামোথেরাপী দেয়া হয়। বেলভ্যু হাসপাতালের চিকিৎসক ড. জেইন পরবর্তীতে এমআরআই, সিটি স্ক্যানসহ বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে ক্যান্সার বিভাগের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি টিম গঠন করেন। সার্জিকাল অঙ্কলজি বিভাগের ডাক্তার জর্জ মিলার সমস্ত রিপোর্ট দেখে গত ৭ মে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে হুমায়ূন আহমেদের ক্যান্সার রোগ নিরাময় হওয়া সম্ভব বলে মত পোষন, ১২ জুন অস্ত্রোপচারের তারিখ নির্ধারণ করেন এবং সফল ভাবে তার অস্ত্রোপচার হয়।
২০ জুন ঘরে ফেরার ২ দিন পর ২২ জুন হুমায়ূন আহমেদ-এর প্রচন্ড ব্যথা অনুভব করলে প্রথমে জ্যামাইকা হাসপাতালে এবং পরবর্তীতে বেলভ্যু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২৩ জুন দ্বিতীয় দফা অস্ত্রোপচারের পর থেকে ওনার অবস্থার অবনতি ঘটে। অত্যন্ত দুর্ভাগ্য ক্যান্সার বা হার্টূ এটাকের জন্য হুমায়ূন আহমেদ এর মৃত্যু হয়নি, হয়েছে ইনফেকশনের জন্য।
বিশ্বজিত সাহা ,অতিথি লেখক ,নিউইয়র্ক মুক্তধারা নিউইয়র্কের প্রধান
- Low-Income, Rural Students Face Higher Dropout Risk Due to English Gaps and Cultural Shock, BUBT Study Finds
- বাংলাদেশ ল’ সোসাইটি ইউএসএ’র সভাপতি ওয়াহিদ ও সাধারণ সম্পাদক কামালকে অব্যাহতি; ব্যারিষ্টার আকমাম ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও শাবু ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে
- SUSPENDED ATTORNEY CHARGED WITH GRAND LARCENY FOR STEALING MORE THAN $1 MILLION FROM BORROWERS, DIME COMMUNITY BANK
- Six Bangladeshi Peacekeepers Posthumously Awarded UN Dag Hammarskjöld Medal
- নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ড্যাগ হ্যামারশোল্ড পদকে ভূষিত ছয় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী
- যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া স্টেট সিনেট নির্বাচনে বাংলাদেশি-আমেরিকান শেখ রহমানের টানা পাঁচবার জয়
- A Star Dimmed: Mourning the Loss of Tofail Ahmed, Architect of Our History
- নিউইয়র্ক ষ্টেট অ্যাসেম্বলী ডিষ্ট্রিক্ট-৩০’র প্রাইমারী নির্বাচনে শামসুল হকের সমর্থনে জ্যামাইকায় ফান্ড রেইজিং