Thursday, 12 March 2026 |
শিরোনাম
নিউইয়র্কে অ্যাসাল ওজোন পার্ক চ্যাপ্টারের ইফতার ও অভিষেক নিউইয়র্কে বাংলাদেশ ল সোসাইটি ইউএসএ’র ইফতার মাহফিল: খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকার আহ্বান BOROUGH PRESIDENT GIBSON HOSTS FOURTH ANNUAL BRONX IFTAR DINNER DIALOGUE UNDER THE THEME “UNITY IN DIVERSITY” নিউইয়র্কে মানসিক সংকটে থাকা যুবককে গুলি: পুলিশ প্রশিক্ষণ এবং মানসিক সংকটসংক্রান্ত ৯১১ কল নিউইয়র্কে গ্রী ম্যাকানিকেল ইয়াঙ্কার্স এর ইফতার ও দোয়া মাহফিল নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গমাতা পরিষদ’র ইফতার ও দোয়া মাহফিল নিউইয়র্কে ঢাকা জেলা অ্যাসোসিয়েশনের ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ সোসাইটি অব ব্রঙ্কস নিউইয়র্ক ইনকের কোরআন তেলাওয়াত প্রতিযোগিতা ও ইফতার মাহফিল New York Attorney General James Releases Statement on Live Nation Trial নিউইয়র্কে গোল্ডেন এইজ হোম কেয়ারের ইফতার মাহফিল
সব ক্যাটাগরি

আমার যত প্রিয় বাক্য : আহমেদ মূসা

অনলাইন ডেস্ক পঠিত: 123 বার

প্রকাশিত: July 24, 2020 | 11:04 PM


স্বাধীনতার মানে হলো শেকলবিহীন পা-ও,
নোঙর-ছাড়া পালতোলা ঐ উজান-ভাটির না-ও।

সময়-কালে কতজনে কত কিছু হয়-হবে,
সর্বকালের সেরা ওরা মুক্তিযোদ্ধার গৌরবে।

যে-সব জায়গায় একাত্তরে উদিত হয় আল-বদর,
অভিশপ্ত সেই বাড়িঘর, অভিশপ্ত সেই পরিসর।

একাত্তরের গ্রামে-গঞ্জে রাইফেল হাতের রাজাকার,
জন্মভূমির জাত-কলঙ্ক, মাতা-পিতার কুলাঙ্গার।

কিছু মানুষের গজিয়েছে লেজ এবং মনোহর পুচ্ছ,
লেজ-পুচ্ছ নেড়ে-নেড়ে তারা বাকীদের করে তুচ্ছ।

কম্বল হয়ে গেলে উজার,
ভক্ত কোথায় পাবে পূজার।

রক্তকে রূপ দিলে স্বর্ণেরপিন্ডে
শুধতে হয় ঋণ, সামডে, সামডে।

বিচার মানি, তবে কী-না, ‘তালগাছটা আমার’
আম-ছালা সবই খালুর এবং বাগান মামার।

ফাটা ডিমে দিয়ে তা/ নগদ চাও পাখির ছা।
হুশ হলো না এখনো/বৃথা বসে দিন গোণো।
১০
হো, গণতন্ত্র হো! জেগে আছো তো!
ঠিক আছে স্বাস্থ্যখানা? মন-মর্জি ভালোতো?
১১
কি এমন দিন এলো, কি আজব দিন,
ভোট হলো গার্বেজ, প্রার্থীরা ডাস্টবিন।
১২
রাজনীতি নিয়ে কর ফান-মশকরা,
ময়দানে সে-কারণে ঘুরে-ফিরে ‘ওরা’।
১৩
ফোটা চনা করছে কলুষ বালতিভরা দুধ,
ভালো পেটও নষ্ট করছে খানিক কুড়া-খুদ।
১৪
কত প্রাণ ঝরে গেল কত অনাদরে,
জলচোখে ইতিহাস রেখেছে ধরে।
১৫
সৈনিক কেন লড়ে জানে না,
সে-শুধু পালন করে হুকুমনামা।
১৬
পাওয়ারের দর-বাও বোঝা গেলে,
অমৃতের স্বাদখানা পাবে মাকালে।
১৭
কৈবর্তের নাতির দাবি, ‘সৈয়দবংশ হই,’
বসতে দিবা কই, তোমাগো তেমন চেয়ার কই?
১৮
দড়ি ছিইরা পরাণ কাইরা কইরা সর্বনাশ,
পাগলা ঘোড়ারে, কই থাইকা কই লইয়া যাস!
১৯
একটি দল ক্ষমতায় গেলে
কিছু শয়তান যোগ দেয় দলে।
কিছু শয়তান থাকে ছায়াতলে
কিছু-শয়তান, কেনে-সার্ভিস, তলেতলে।
২০
স্বর্গচ্যুত শয়তান, পাবে না স্বর্গ ফিরে, ভাগ্য তার স্থির, ন্যাস্ত;
তাইতো মর্তের, হরেকগদি তার, যেন-বা-‘সাদ্দাতের বেহেস্ত।’
২১
শয়তান তার, সবগুলো তাস, উল্টে দিলেও আজকাল;
মানুষ ভুলে যায়, দিয়ে যেতে তার, সুনিশ্চিত জয়ের চাল।
২২
ক্ষিপ্ত হয়ে ঢুস মেরে পাহাড়ে
শিং দু’টি খুইয়ে এলে আহারে।
২৩
কাকের বাসায় ডিম পারলে কোকিলে,
বোকা কাক সে ডিমে তা’ দিলে,
তাতাতে ডিম বদল হয়,
দিন বদল নয়।

গদ্যমালা
২৪. আমরা আমাদের বলবান অশ্বগুলিকে হত্যা করে গাধার পিঠে চড়ে বলছি ”জোরসে ছোটো।” জাতি ও নিয়তির সঙ্গে কী করুণ রসিকতা।

২৫. প্রতিটি মানুষের জীবনই কতগুলি নাট; যে-সব নাট আমৃত্যু যুৎসই বল্টু খুঁজে বেড়ায়। কেউ পুরোপুরি পায়, কেউ আংশিক পায়। কেউ দ্রুত
পায়, কেউ দেরিতে পায়। আবার কেউ-কেউ একেবারেই খুঁজে পায় না।

২৬. কাউকে প্রচন্ড জোরে আছাড় দিতে হলে মাথার যতোটা সম্ভব উপরে তুলতে হয়। তাই আস্কারাকে সন্দেহের চোখে দেখা উচিত।

২৭. স্টুপিডের সঙ্গে তর্ক করতে নিষেধ করে গেছেন মার্ক টুইন। ‘ঋষিবাক্য শিরোধার্য।’

২৮. অনেকে লেখার টেবিলে বসে অপেক্ষা করে নিজেরই ফিরে আসার। আসা হয় না, লেখাও তেমন হয় না।

২৯. বড় বড় পাপ অত্যন্ত খরচসাপেক্ষ বলে গরিবের পাপ করার সুযোগও কম।

৩০. বাংলাদেশের রাজনীতির একটি বড় বিকৃতি হচ্ছে ক্ষমতাসীন সরকার ও দলগুলি বিরোধী দলগুলিকে আস্তায় না নিয়ে উচ্ছেদের বার্থ চেষ্টা চালায়। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না।

৩১. রাজনীতিতে আগে নেতৃত্ব আসতো বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, গণসংগঠন, অঙ্গসংগঠন ত্যাগী ও পোড়খাওয়া ব্যাকগ্রাউন্ডের সৎ-অঙ্গীকারবদ্ধদের মধ্যে থেকে। এখন আসে সামরিক-বেসামরিক আমলাপল্লী, ব্যবসায়ী, বিশেষ-বিশেষ পরিবার, পেশীবাজ, তেলবাজ, লুটেরা প্রভৃতির কাতার থেকে।
৩২. একাধারে অন্যায়, অপরাধ ও পাপ করে পাশবিক উল্লাসেরতদেরও গৌরবান্বিত করে চলেছে আরেকদল। অভিশপ্ত সময়ের কী করুণ পরিহাস।

৩৩. ধূর্তরা কখনো বোকার মতো কাজ করে ফেললে সেই বোকামির শরিকানা দেশপ্রেম’ বলে সরল মানুষের মধ্যে বিলি-বন্টন করে। বোকারা তা বহনও করে চলে।

৩৪. প্রাজ্ঞরাই আলোচনাকে নিয়ামক মনে করেন। কারণ, যুদ্ধের পরও আলোচনায়ই বসতে হয়।

৩৫. চাপিয়ে দেওয়ার কারণে প্রবলের বিরুদ্ধেও দুর্বলের যুদ্ধ বীরত্বপূর্ণ, কারণ কোনো কোনো যুদ্ধ করতে হয় সভ্যতার সম্মান রক্ষার জন্য।

৩৬. মানবজাতির মহত্তম দিক হচ্ছে নির্বিশেষ মানুষের কল্যাণে চিন্তা ও কাজ করা, আর সবচেয়ে বড় নির্বুদ্ধিতা হচ্ছে যুদ্ধ।

৩৭. যুদ্ধ বা যে-কোনো আধিপত্য বিস্তারের নামে দুঃখের চাষ করতে যেও না; তাহলে সেচ দিতে হবে অশ্রু দিয়ে, মই বানাতে হবে পাঁজর দিয়ে, নিড়ানিতে উঠে আসবে মনস্তাপ এবং এর ফসল অবেলায় ডেকে আনবে মৃত্যু।

৩৮. যারা নিজেদের সীমান্ত সুরক্ষিত করে অন্যের সীমান্ত লংঘন করে, বুঝতে হবে এই পৃথিবীকে তাদের আর দেওয়ার মতো কিছু নেইÑ দুঃখ ছাড়া।

৩৯. কিছু লোকের কাছে বাংলাদেশটাকে প্রয়োজন শুধু দোহন ও ছড়ি ঘোরানোর জন্য। লুট-দুর্নীতির অর্থ এরা বাংলাদেশে জমাও করে না। এদের খানা-পিনা-সাজসজ্জা আসে সামুদ্রিক বন্দর দিয়ে এবং সংকট দেখলে কেটে পড়ে বিমান বন্দর দিয়ে।

৪০. যে রীতিনীতি মানে না তার থেকে এক শ’ হাত দূরে থাকো, যে যুক্তি মানে না তার থেকে দূরে থাকবে এক শ’ মাইল, আর যে প্রকৃতির-প্রতিশোধ বা কর্মফলে বিশ্বাস করে না, তার সঙ্গে যেন তোমার দেখা না হয়।

৪১. কোনো ধর্মই গণহত্যা করতে যায় না। কোনো ধর্মই নির্দোষ-নিরীহ মানুষকে হত্যা করতে বলে না। যারা এ ধরনের হত্যাকান্ড ঘটায় তারা ¯্রফে খুনিÑ যে ধরনের খুনি সব ধর্মেই আছে

৪২. যারা যে-কোনো বিশ্বাস বা দর্শনের নামে উন্মাদনা সৃষ্টি করতে চায়, বুঝতে হবে তাদের মানসিক সমস্যা আছে। কোনো সুস্থ মানুষ অন্যকে উন্মাদ হতে বলে না।

৪৩. একটি হত্যাকান্ড আরো হত্যাকান্ড ডেকে আনে, অথবা ঘটে যাওয়া হত্যাকান্ডটি পূর্বের কোনো হত্যাকান্ডেরই জের।

৪৪. ধার্মিকেরা সম্মানিত, ধর্ম-ব্যবসায়ীরা অলস ও ফেরেববাজ এবং ধর্মান্ধরা মানসিক প্রতিবন্ধী ।

৪৭. সনাতন ধর্মের প্রবাদ-পুরুষ ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির বলেছেন, ‘আমি ধর্মবণিক নহি’, আর ধর্মবণিকেরা বলে, ‘আমরাই যুধিষ্ঠির’।

৪৮. যে বিবেকের শাসন উপেক্ষা করে, সে অন্যসব শাসন-অনুশাসন মুহূর্তেই জলাঞ্জলি দিতে পারে।

৪৯. মাথায় তুলে রাখার পরও যারা ঘাড়ে চড়তে চায় তাদের মাটিতে নামিয়ে দেওয়াই উত্তম।

৫০. তেল বেশি খেলে দেহধারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সবল হয় রোগ।

৫১. কারো কাছে সহায়তা চাওয়াই যথেষ্ট নয়, তা নিতেও জানতে হয়।

৫২. প্রত্যন্ত গ্রামের ছেলেটি স্বপ্ন দেখে উপজেলা শহরের বাসিন্দা হওয়ার। উপজেলায় যে আছে সে স্বপ্ন দেখে তার জেলা শহরে গিয়ে থাকার। জেলা শহরের বাসিন্দা চলে যেতে চায় রাজধানী ঢাকা শহরে। ঢাকা শহরের মানুষ আসতে চায় আমেরিকায়। আর, আমেরিকায় যারা আছে তারা যেতে চায় চাঁদে-মঙ্গলে।

৫৩. যে-সব গুণাবলী অন্যান্য প্রাণী থেকে মানুষকে আলাদা করে, পৃথিবীর বহু মানুষ এখনও সেই গুণাবলী অর্জন করতে পারেনি, বিশেষ করে চতুর ও শক্তিমানেরা।

৫৪. দুর্বৃত্তরা যখন নেতা, তখন তারা একইসঙ্গে অঙ্গীকারখেলাপি, নিপীড়ক এবং লুটেরা। এরা যখন ব্যবসা করে, তখন তারা মূলত চোরাচালান এবং লুণ্ঠনই করে। এরা যখন বুদ্ধিজীবী, তখন অতিমাত্রায় শঠ এবং শঠতাকেই সবসময় মহিমান্বিত করে।

৫৫. রাজনীতিতে সন্ত্রাসীদের অপরিহার্য হয়ে ওঠার কারণ, প্রধান দলগুলোর একটি মাস্তান পুষলে অন্যগুলোর জন্যও সন্ত্রাসী দরকার হয়ে পড়ে। তাই যেসব সন্ত্রাসী মন্ত্রী-এমপিদের বডিগার্ড হওয়ার কথা, তারা নিজেরাই তখন মন্ত্রী-এমপি।

৫৬. একটি দলের জন্য কখনো কখনো এমন সময় আসে যখন দলকে বাঁচানোই প্রধান লক্ষ্য হয়, কখনো কখনো এমন সময় আসে যখন দলের নেতাকর্মীদের বাঁচিয়ে রাখাই প্রধান লক্ষ্য হয়, আর কখনো কখনো এমন সময়ও আসে যখন নিজেকে বাঁচিয়ে রাখাই বড় রাজনীতি।

৫৭. একটি ক্ষুধার্ত শিশু যখন খাদ্যের অভাবে কাঁদে, তখন তার সঙ্গে কাঁদে সেই জমি যার বুকে ফসল উৎপন্ন হয়। কাঁদে সেই বীজ যার একটি দানা থেকে বেশুমার দানার সৃষ্টি হয়। কাঁদে সেই হালের গরু, লাঙ্গল-জোয়ালসহ সবকিছু, শস্য উৎপাদনে যাদের ভূমিকা থাকে । অভিসম্পাত দেয় সেই গোলা, যাতে মজুদ করা হয় খাদ্য-দানা।

৫৮. একজন সভ্য মানুষের চোখে সবচেয়ে মর্মান্তিক দৃশ্য হচ্ছে, খাদ্যের জন্য ক্ষুধার্ত শিশুদের ছোটাছুটি।

৫৯. মাতৃগর্ভ থেকে বের হওয়ার পরই এখানে অনেক শিশুর জন্য অপেক্ষা করে ক্ষুধার রাজ্য। এখানে ঘাটতি শুধু খাদ্যের নয়, প্রচন্ড ঘাটতি রয়েছে মননশীলতার। চোখ খুলে শিশু যে পৃথিবীকে দেখে সে পৃথিবী তার কাছে বড় সুন্দর। কেননা তখন সে স্বাধীন, নিরুদ্বেগ। উদ্বেগটা সে অনুভব করে তখন, যখন সে বুঝতে শেখে।

৬০. শিশুদের উদ্বেগগুলো তৈরি করে রাখি আমরা। উদ্বেগ-হতাশা-অবিচারের ভর্তি ডালা নিয়ে আমরা অপেক্ষা করি তাদের জন্য। এমনকি এখানে অবোধ পশুর জন্যও আমরা তৈরি করেছি অভয়ারণ্য, যেখানে তাদের কোনো উদ্বেগ নেই, প্রতিযোগিতা-প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই। কিন্ত‘ অবুঝ শিশুদের জন্য একটি মানবিক পরিবেশও আমরা হাজির রাখতে পারছি না।

৬১. যে শিশু ফুলের মতো, যে শিশু সৌন্দর্যের মূর্ত প্রতীক, কোনো ক্রুর প্রবৃত্তি তার মধ্যে জন্ম নেওয়ার আগেই তাকে আমরা বলি, যাও, পরীক্ষা দাও, অন্য শিশুটিকে হটিয়ে তুমি এগিয়ে যাও। পারলে কনুইয়ের গুঁতো মারো, তোমারই মতো আরেক নিষ্পাপ শিশুকে।

৬২. ঢাকা শহরে, প্রায় কোলের শিশুরা ‘ভালো’ স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে এবং হাজার হাজার শিশু ভর্তি হতে ব্যর্থ হয়ে যখন মলিন মুখে ঘরে ফেরে, তখন কি এটা বলা যায় না যে, এই ‘ব্যর্থ’ শিশুদের সঙ্গে আমরা বর্বরের মতো ব্যবহারটা করলাম? এই কোমলমতি শিশুকে জীবনের প্রথমেই একটা বড় ধাক্কা দিলাম? নইলে এই বয়সে ‘সফল’ বা ‘ব্যর্থ’ হওয়ার জন্য কেন আমরা তাদের রেসের ঘোড়ার মতো জুড়ে দিলাম!

৬৩. একটি জাতির জীবনে কোনো কিছুই রাতারাতি ঘটে না । সব ধরনের সরকার এবং দলেরই দু’টি একাউন্ট থাকেÑ ভালো ও মন্দ জমা হওয়ার জন্য। মন্দ জমতে-জমতে পাল্লা ভারি হয়ে গেলে পতন ঘটে সরকারের। অবশ্য মানুষের সামনে আস্থাভাজন বিকল্পও থাকা চাই।

৬৪. সম্পন্ন মানুষেরাও কত কারণে হঠাৎ করে হয়ে পড়ে উন্মূল-উদ্বাস্তু। মানুষের অভিবাসনের শেষ নেই, ঠাঁইনাড়ারও ইতি নেই। যুদ্ধ, জীবিকা, নদী-ভাঙ্গন, ক্ষুধা ও নয়া স্বপ্নসহ কত কারণেই না মানুষ পরিত্যাগ করে তার পুরোনো ঠাঁই। যদিও মানুষ একটি ঠাঁই থেকে আরেকটিতে যায় মাত্র, আগেরটিকে ছেড়ে নয়। সেটি গেথে থাকে তার বুকে। প্রায়ই কোদাল পড়ে সেখানে।

৬৫. প্রতিটি মানুষের জন্মস্থানে থাকে একটি অদৃশ্য পানির-ভান্ড; যেখানে মানুষ মাঝে মাঝে গিয়ে চোখের পানি জমা রেখে আসে। না যেতে পারলে স্বপ্নে হলেও।

৬৬. আমাদের মতো দেশে মানুষ নিজেকে মনের মতো করে সাজাতে পারে না বলে নিজের চিন্তা দিয়ে একটি আইডিয়ার জীবন তৈরি করে। তাই তারা শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতিতেও খোঁজে বাস্তবের নয়, আইডিয়ার জীবন- যে জীবন হতে পারতো কিন্তু হয়নি। শিল্প-সাহিত্য যারা রচনা করেন; বিশেষ করে মেধাবী-খ্যাতিমান যাঁরা, তাঁদের মধ্যেও মানুষ আইডিয়ার জীবনই খোঁজে নাটক-সিনেমার নায়ক-নায়িকাতো বটেই, মানুষ এমন কি তাদের রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যেও খোঁজে আইডিয়ার উন্নত জীবন।

৬৭. আজকালকার বুদ্ধিজীবীরা জীবনজগৎকে দেখেন কচ্ছপের মতো গলা বাড়িয়ে। গতিক সুবিধার দেখলে ঘাড়টা ভালো করে বের করেন; দুর্যোগ দেখলে গলাটি সেঁটিয়ে ফেলেন শক্ত খোলসের ভেতর। জনগণের স্পন্দনে-সংগ্রামে তাঁদের সক্রিয় অংশগ্রহণ খুবই অল্প। নিজের অবস্থানটি পোক্ত রেখে যা করার তা করেন। চরম অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ করতে এগিয়ে এসেছেন এমন নজির বুদ্ধিজীবীদের ক্ষেত্রে বিরল। অথচ প্রতিবাদ-প্রতিরোধের প্রাক-পরিবেশটি বুদ্ধিজীবীদেরই তৈরি করার কথা।

৬৮. দলান্ধ হলে দুই লাইন লিখে, দুই পঙক্তি গেয়ে, দুই কদম নেচে, দুই পোচ এঁকে বা দুই হাঁক দিয়েই অতি বিখ্যাত ও বিত্তবান হওয়া যায়। যারা কোনো উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রচনা করেননি বা জীবনে উদ্ধৃতিযোগ্য দু’টি লাইনও লেখেননি, তারাও বিভিন্ন পদক ভাগাভাগির কারণে ‘বিরাট প্রতিভা।’ এবং সেটা বরকন্দাজীর জন্য। দলের চশমায় তারা সবকিছু দেখেন। সে কারণে আমাদের সৃজনকাল অনেকটাই বন্ধ্যা । আমাদের দলান্ধ ও ধারান্ধ সৃজনশীলরা অঙ্গীকার ও প্রতিভার সংজ্ঞায় ঊন-মানুষ।

৬৯. সরস্বতীর বরপুত্র আমাদের সৃজনকালের প্রতিভাবানরা তাদের নিজেদেরকে কেউ ভাবেন বাঙালি, কেউ ভাবেন বাংলাদেশি। কেউ ভাবেন তারা অমুকের সৈনিক, কেউ ভাবেন তমুকের সৈনিক, কিন্তু নিজেকে পূর্ণ মানুষ ভাবেন না। তারা কিছু দেখেন কিছু দেখেন না, কিছু লেখেন কিছু লেখেন না, কিছু বলেন কিছু বলেন না। মনে-মনে অবশ্য ভাবেন সবই। কিন্তু প্রকাশে তারা অর্ধ-মানব, কেউ বা সিকি মানব। চিন্তার এই বামুনত্বের জন্যও আমাদের কেনো কিছুই বিশ্ব-মাপের হয়ে ওঠে না, এমন কি হয়ে ওঠে না মানসম্মত বা রুচিসম্মতও। এবং অভিন্ন কারণেই দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষের প্রপঞ্চগুলি নির্মোহভাবে তুলে ধরার কাউকে আমরা দেখি না।

৭০. পারিবারিক পাঠাগার মানে আলোকিত পরিবার। বইয়ের জন্য আপনার সংসারে একটু জায়গা ও বাজেট বরাদ্দ রাখুন। গ্রন্থের সব ধরনের বিজ্ঞাপন শেয়ার করুন।

৭১. যে-ঘরে আলোকিত বই আছে, পিতামাতা বই পড়েন, তাদের সন্তানরাও বইমুখি হতে বাধ্য। বইমুখিদের সন্ত্রাসী-মাদকাসক্ত হওয়ার আশঙ্কা অনেক কম। কোনো গবেষক যদি এমন একটা গবেষণা করেন; সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ঘুষ-দুর্নীতি-প্রতারণা ইত্যাদির মাধ্যমে যারা বাংলাদেশকে অন্ধকারের দিকে নিতে চায় তাদের ঘরে বইয়ের উপস্থিতি কেমনÑ তা হলে চমৎকার গবেষণা হবে সেটা।

৭২. বই সম্পর্কে নির্লিপ্ত সংসারগুলিতেও ফিরে আসুক বই-বান্ধব পরিবেশ। বাংলাদেশের বর্তমান সমস্যার টেকসই সমাধানের জন্য দরকার চিন্তার রাজ্যে ব্যাপক আলোড়ন ও আন্দোলন। কিন্ত‘ তার আগে দরকার আলোকিত বই এবং তার ব্যাপক প্রচার। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ গড়ে উঠছে মাত্র। এখন দরকার সেই বই, যে বই একটি জাতির মৌল ভিত্তি গড়ে তুলতে সহায়তা করে। বই-বান্ধব পরিবেশ এখন দূষণমুক্ত পরিবেশের চেয়ে কম জরুরী নয়।

৭৩. বয়স ও সময়ের ফিতায় মাপলে আমাদের জীবন খুবই ছোট। তবে এই জীবনকে আমরা আগে-পিছে অনেকটাই সম্প্রসারণ করতে পারি। বিদ্যমান জীবনেই আমরা অতীতে চলে যেতে পারি ইতিহাস, ইতিহাস-আশ্রয়ী উপন্যাস, ঐতিহাসিক চিঠি ইত্যাদির ডানায় ভর করে। আবার দূর-সুদূরের ভবিষ্যতে চলে যেতে পারি কল্পবিজ্ঞান বা সায়েন্সফিকশনের রথে চড়ে। আজ যা কল্পবিজ্ঞান কাল তা বাস্তব হয়ে আসেÑ এতো বহুল প্রমাণিত। ‘হিস্টোরি রিপিট ইটসেল্ফ’Ñ এটাওতো মানব সভ্যতারই আপ্তবাক্য। এখানে রথ-ডানা সবইতো বই।

৭৪. বাংলাদেশের মূলধারার রাজনীতিকেরা নিজেরাই উদ্যোগ নিয়ে দেশের মানুষকে দুই ভাগে ভাগ করে এক অংশের গায়ে ভারতের সিলমোহর ও অন্য অংশের গায়ে পাকিস্তানের তকমা লাগিয়ে দিয়েছেন। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, প্রতীকিভাবে একথা বলা চলে, আওয়ামী লীগ ভোটে জিতলে যেন বা ক্ষমতায় আসে ভারতের গোয়েন্দা সংস্তা ‘র’, আর বিএনপি ভোটে জিতলে যেন বা ক্ষমতায় আসে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্তা আইএসআই। তারা লোম বাছতে গিয়ে ইতোমধ্যেই কম্বল উজার করে ফেলেছেন। জনগণ রাজনীতিকদের তরফ থেকে এমন ধারণাই পাচ্ছে। অথচ বাংলাদেশের মানুষ শুধুমাত্র বাংলাদেশপন্থী।

৭৫. মানুষের সৃজনী-প্রতিভা যেখানে বেপথু হয় অথবা ঘটে এর নিদারুণ অপচয়, সেখানে ইতি ঘটে সৃজনকালের। আসে মড়ক-মাৎস্যন্যায়। কখনো আসে স্বল্পকালের জন্য, কখনো বা সুদীর্ঘকালের। এর আগে সমকালকে কাঠগড়ায় তোলে ইতিহাস, জেরা করতে; যদিও সদুত্তর সুদূরপরাহত।

৭৬. পিঁপড়া থেকে হাতি পর্যন্ত কোনো জীব না খেয়ে মরার ঘটনা বিরল। না খেয়ে মরে মানুষ। অথচ পৃথিবীর প্রতিটি মানুষকে খাইয়ে-পরিয়ে বাঁচিয়ে রাখার ক্ষমতা রয়েছে আবিষ্কৃত সম্পদের মধ্যেই। এখনো অনাবিষ্কৃত রয়েছে বহু সম্পদ, বহু জ্ঞান। বিশেষ করে সমুদ্র ও মাটির তলার সম্পদের অল্প অংশই মানুষ আহরণ করতে পারছে।

৭৭. একটি ক্ষুদ্র পাখির জন্যও উন্মুক্ত রয়েছে বিশাল আকাশ, বাধাহীন ভূমন্ডল। উন্মুক্ত রয়েছে একটি নেড়ি কুকুরের জন্যও। উন্মুক্ত নেই শুধু মানুষের জন্য। মানুষের গমনাগমনে প্রাচীর হয়ে আছে সীমান্ত; আশ্চর্য যে এই সীমান্ত আবার মানুষই সৃষ্টি করেছে। মানুষ সীমান্তের পাকাপোক্ত নিরাপত্তা আরও জোরদার করছে, আবার বিশ্বায়নের কথাও বলছে। বিশ্বায়ন এখানে বাণিজ্যায়নের মার্কেটিং ম্যানেজার।

৭৮. পাপ-স্বজনপ্রীতি-লুণ্ঠন-লাম্পট্যে পারদর্শীরা এই সমাজসংসার পরিচালনার দায়িত্বটিও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে।

৭৯. বাংলাদেশে আরেকটি কৌতূহল-উদ্দীপক বিষয় লক্ষণীয় যে, ক্ষমতায় যখন কথিত ভারতপন্থিরা থাকে, সাধারণ মানুষ তখন ভারতের প্রতি থাকে সন্দিহান, আর যখন কথিত ভারত-বিরোধীরা ক্ষমতায় থাকে, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে দেখা দেয় ভারতের প্রতি সহানুভূতি।

৮০. এখন ছিয়াত্তর, তেতাল্লিশ বা চুয়াত্তরের মতো মন্বন্তর-দুর্ভিক্ষ হবে না, যখন খাদ্য-শস্যের গোডাউনের দেয়ালে হেলান দিয়ে কঙ্কালসার মানুষ ধীরে-ধীরে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করবে কিংবা একজন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্পের আক্ষেপপূর্ণ শিরোনাম হবে, ওরা লুট করে খেলো না কেন।
এখন দুর্ভিক্ষ হলে লুট করে খাবে মানুষ।

৮১. বিজ্ঞান-প্রযুক্তির এই যুগে দুর্ভিক্ষ ও ‘মহাপুরুষ’, দুটিরই সৃষ্টি হওয়া কঠিন।

৮২. বিভক্ত হয়ে পড়ায় সাংবাদিক সংগঠনগুলির অন্তর্নিহিত শক্তি ও দরকষাকষির ভিত্তিভূমি ভয়ঙ্করভাবে দুর্বল হয়েছে। এতে লাভবান হয়েছে মালিকপক্ষ ও একশ্রেণীর সাংবাদিক নেতা। অভিন্ন কারণে সংবাদমাধ্যমগুলির স্বাধীনতা খর্ব হয়েছে, বাড়ছে হলুদ সাংবাদিকতা ও আগাছা। হ্রাস পেয়েছে জনগণের কাছে সংবাদমাধ্যমগুলির জবাবদিহিতার অনিবার্য তাগিদ।
৮৩. প্রথমেই সত্যকে সেন্সর করেন সাংবাদিকেরা নিজে। তারা জানেন জানি, কর্মরত পত্রিকাটিতে কী লেখা যাবে আর কী লেখা যাবে না। অবজেকটিভ ঘটনাগুলোকে কীভাবে মালিক ও সম্পাদকের চাহিদা অনুযায়ী পরিবেশন করতে হয়, সেটা জানা প্রথম কর্তব্য। দুই দলের দু’টি গুন্ডা যদি গোলাগুলি করে মরে যায়, সাংবাকিদের প্রথম দেখতে হয় দুজনের মধ্যে তাদের মালিকে লাইনের (ভদ্রভাষায় বলা হয় সম্পাদকীয় নীতিমালা) কোনো গুন্ডা আছে কি না। যদি না থাকে তাহলে সাঙবাদিকেেদর শব্দবাহিনী বীরবিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়বে নিহত দুজন গুন্ডার ওপর। আর, থাকলে একজনের ওপর।
৮৪. সরকার যা না চায় তা বরং কায়দা-কানুন করে লিখে ফেলা যায়, সামরিক শাসনের সময়ও ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কিছু লেখা যায়। কিন্ত‘ সাক্ষাৎ মালিক যা না চায় তার একবর্ণও লেখা যায় না। বেকার হয়ে পড়লে নতুন একটি চাকরি পেতে ব্যক্তিগত সমস্যাই বাড়বে। এই ঝুঁকিকে এখন খুব ভয়।
৮৫. এমনকি বিরোধী দল সমর্থক অনেক পত্রিকার মালিকও কর্মীদের বলেন, সরকারের সমালোচনা করুন, কিন্ত‘ তথ্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বেশি ঘাঁটাবেন না। কারণটা কী? খুব সরল কারণ। একজনের হাতে আছে বিজ্ঞাপন, আরেকজনের হাতে পুলিশ। মালিকেরা বিজ্ঞাপন পেতে চান এবং পুলিশ থেকে দূরে থাকতে চান। অথবা দরকার পড়লে পুলিশের সাহায্য নিশ্চিত করতে চান।
৮৬. মালিকেরা ভালো একটি রচনার জন্য যত না উদ্্গ্রীব, তার চেয়ে বেশি আগ্রহী বিজ্ঞাপনের জন্য। মালিকদের এই চাহিদা সর্বজনীন। তাই তো একটি বড় বিজ্ঞাপন এসে পড়লে একটি ভালো রচনাও অবাঞ্ছিত হয়ে পড়ে। লক্ষ্মী ঢুস মেরে সরিয়ে দেয় সরস্বতীকে। তাই পত্রিকাও হয়ে ওঠে পণ্যময়-বাণিজ্যময়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে বড় বিজ্ঞাপন যারা দেয় তাদের কদর জামাইয়ের চেয়ে কম নয়। কার সাহস আছে সেই জামাইদের প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি-অনিয়ম তুলে ধরে শ্বশুরকে চটায়?

৮৮. বাংলাদেশের মানুষ ব্যক্তির শাসন দেখেছে, সামরিক শাসন দেখেছে, পরিবারের শাসন দেখেছে; দেখে চলেছে নির্বাচনের জিঞ্জিরাসংস্করণজাত ‘রায়ে’ জনগণের কাঁধে চড়ে জুলুম-লুন্ঠন-চালাকি এবং সব ধরনের বাহিনী ও আমলাতন্ত্রকে সেসবের ফাইফরমাশ-খাটানো স্বৈরশাসন। দুর্ভাগা জনগণ শুধু আইনের শাসনেরই দেখা পেলোনা, যেটা ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রাথমিক অঙ্গীকার।

৮৯. বাকশাল-বামনিধন-দুর্ভিক্ষ-লুন্ঠন প্রভৃতির চেয়েও আওয়ামী লীগ ইতিহাসে অধিকতর নিন্দিত হবে জনগণকে ভোটবঞ্চিত করে ক্ষমতা দখল ও ভোগ করার জন্য। ভোট দিতে না পারার অপমান জনগণ কখনো ক্ষমা করে না। ভোটের রায় অসম্মান করায় একাত্তরে এদেশের মানুষ পাকিস্তান ভেঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছে।

৯০. সামরিক শাসকরা জনগণের ওপর জবরদস্তি করে সেনাবাহিনী দিয়ে। আজকালকার স্বৈরশাসকেরা করছে সবগুলি বাহিনী, প্রতিষ্ঠান ও দলীয় সন্ত্রাসী-ক্যাডার দিয়ে।

৯১. যারা সরকার, সরকারি দল ও ক্ষমতাগামী বিরোধী দলের কাজ-কর্ম খুব কাছে থেকে দেখেননি, তারা জানেন না, বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে রাজনীতিবিদরা মাঠে-ময়দানে-সংসদে যেসব কথা বলেন তার প্রায় সবগুলোই ধাপ্পা-মশকরা। এমন কি এমপি-মন্ত্রীরাও নয়, দেশ চলে কিচেন কেবিনেটের সিদ্ধান্তেÑ যে ক্যাবিনেটে থাকে পরিবারতন্ত্রের ফাইফরমাস-খাটা নেতা নামক কিছু কর্মচারি, মূল চালকের কিছু আত্মীয় ও বিভিন্ন গোয়েন্দা বাহিনীর পরীক্ষিত-অনুগত লোকজন। প্রতীকিভাবে বলতে গেলে, কিচেন কেবিনেটের হেড বাবুর্চি যা রান্না করেন, সারা দেশের মানুষ তাই গোগ্রাসে গেলেÑ বাঙালি বা কাঙালি ভোজের বিরিয়ানির মতো।

৯২. আমাদের বীরদের আমরা খুঁজে খুঁজে হত্যা করেছি। এমনকি স্বপরিবারেও। হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চার নেতা, শহীদ জিয়াউর রহমান, খালেদ মোশাররফ, জেনারেল মঞ্জুর, ক্যাপ্টেন হায়দার, সিরাজ শিকদার, ন্যাভাল শিরাজ, সিদ্দিক মাস্টার, মোশাররফ হোসেন, কামেল বখত্ ও মোফাখ্খারসহ অসংখ্য বীর-বিপ্লবী। কর্ণেল তাহের হয়েছেন জুডিশিয়াল কিলিং-এর শিকার। দেশপ্রেমিকদের আমরা আখ্যা দিয়েছি তাঁবেদার; বিপ্লবীদের অপবাদ দিয়েছি সন্ত্রাসীর। অনেকগুলি সামরিক অভুত্থানে ঝরেছে কত প্রাণ।

৯৩. কৃষক, প্রবাসী, গার্মেন্টস-কর্মী এই তিন শক্তি কিন্ত‘ মূলত একই শক্তি । কারণ গার্মেন্টস কর্মী এবং প্রবাসীরা মূলত কৃষক শ্রমিকের সন্তান যারা সবটুকু উপার্জন দেশে পাঠিয়ে দেয়। আমাদের মত প্রবাসীরা হয়তো ঘর সংসার করে যেটুকু থাকে তার অল্পই দেশে পাঠাই । বাংলাদেশের এক কোটিরও বেশি মানুষ দেশের বাইরে। এমনকি ইউরোপ-আমেরিকা থেকে দেশে রেমিট্যান্স সবচেয়ে বেশি পাঠায় গরিব মানুষের ছেলেমেয়েরাই। আর দেশের লুটেরারা সেই সম্পদ পাচার করে বিদেশে জমাচ্ছে, ঘরবাড়ি করছে। সব শুভ ও সুন্দরের পিঠ ঠেকে গেছে দেয়ালে।

৯৪. লেখকের পক্ষে রাজনীতির বাইরে যাওয়া সম্ভব নয়, তবে একজন লেখক নির্দলীয় হতে পারেন। ‘প্রগতিশীলতার নথি’ বা ‘জাতীয়তাবাদী’দের কাতার থেকে বাদ পড়ার ‘আশঙ্কায়’ কোনো ব্যক্তি, দল বা দেশের ন্যায্য সমালোচনা থেকে বিরত থাকা উচিত নয়।

৯৫. যেখানে পদে পদে দ্বন্দ্ব রয়েছে ইতিবাচকতার সঙ্গে নেতিবাচকতার, সেখাানে একজন মানুষ কখনো নিরপেক্ষ থাকতে পারে না। তার কর্ম ও বক্তব্য কারো না কারো পক্ষে যাবেই। এমন কি কোনো ইস্যুতে সে যদি নিষ্কর্ম অবস্থায় বা নিঃশব্দেও বসে থাকে, তখনো তার নিষ্ক্রিয়তা ও নৈঃশব্দ কারো না কারো কিংবা কোনো না কেনো পক্ষে যাবে।

৯১. একজন মানুষ অবশ্যই নির্দলীয় থাকতে পারে। কিন্ত‘, নিরপেক্ষ কোনোভাবেই নয়।

৯৬. শুধু মানুষ কেন, বুদ্ধিমান কোনো প্রাণীও তথাকথিত নিরপেক্ষ নয়। একটি কাককে হত্যা করা হলে অসংখ্য কাক জড়ো হয়ে বিকট স্বরে প্রতিবাদ করে। একটি পিঁপড়ে মরলে অনেক পিঁপড়ে তাকে বহন করে নিয়ে যায়। কিন্ত‘ স্বল্পবুদ্ধির পশু একটি গরুকে যখন জবাই করা হয় তখন আরেকটি গরু দিব্যি ঘাস খেতে থাকে।

৯৭. আজকের যে বাংলাদেশ, তারও রয়েছে অভিবাসীদের আশ্রয় দেওয়ার সুমহান ঐতিহ্য। অহিংস ধর্মের অনুসারী বৌদ্ধদের ওপর প্রাচীন ভারতের বিভিন্ন স্থানে যখন হত্যাযজ্ঞ ও আক্রমণ শুরু হয় তখন বৌদ্ধদের বিরাট অংশ আশ্রয় নেয় পুন্ড্র-গৌড়-বরেন্দ্র,-বঙ্গ-সমতট-হরিকলে, যার সমন্বিত রূপ এখনকার বাংলাদেশ।

৯৮. জামায়াতে ইসলামী একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত হলেও বৃহৎ অর্থে এটি একটি এনজিও। চাকরি ও ঋণ দিয়ে তারা অধিকাংশ কর্মীকে বেঁধে রেখেছে। ইসলামী ব্যাংকের ব্যবসাপাতি, ইসলামী হাসপাতালের যন্ত্রপাতি বা কোচিং সেন্টারের গাইড বইয়ের মতো ইসলামও তাদের কাছে রাজনৈতিক হাতিয়ার ছাড়া আর কিছু নয়। সে কারণে ক্ষমতার জন্য কথিত সেকুলার আওয়ামী লীগের পদাঙ্ক অনুসরণে যেমন তাদের আপত্তি নেই, তেমনি আপত্তি নেই কথিত জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে গাঁটছাড়া বাঁধায়।

৯৯. জামাায়াত ধর্মকে ব্যবহার করে, আর আওয়ামী লীগ জামায়াতকে ব্যবহার করে। এটা তারা করে কৌশলে, আর বিএনপি জামায়াতকে ব্যবহার করে বা ব্যবহৃত হয় নগ্নভাবে।

১০০. যেসব কারণে বাংলাদেশে নক্সালদের রাজনীতি ব্যর্থ হয়েছে, অভিন্ন কারণে জামায়াতে ইসলামী বা সে ধরনের দলের রাজনীতি বাংলাদেশে ব্যর্থ হতে বাধ্য। কোনো উগ্র-ঝোঁকসম্পন্ন রাজনীতিই বাংলাদেশে সফল হওয়ার সুযোগ কম। বাংলাদেশের মাটি ও মানুষ সেই ধাচেরই।

১০১. বিবেক-শাসিত মানুষ যখন, যেখানে, প্রয়োজন মনে করেন, সম্ভব মনে করেন, সাহস নিয়ে উঠে দাঁড়ান। এ জন্য পঞ্জিকায় দিন-তারিখ বা লগ্ন দেখতে যান না। প্রতিপক্ষ কতো শক্তিধর বা তারা ক্ষতি করার কতোটা ক্ষমতা রাখে, সেটা কখনো আমলে আনেন না।

১০২. বাংলাদেশের মানুষ ধর্ম-প্রাণ, কিন্ত‘ ধর্মান্ধ নয়। ধর্ম ব্যবসায়ীদেরও তারা সুনজরে দেখেন না। তারা ওয়াজ শুনে কাঁদেন, তাদের কেউ কেউ আবার দোতারার গান বা পালা শুনেও কাঁদেন। বাঙালি মধ্যবিত্ত একই পাঞ্জাবী পরে জুমার নামাজ আদায় করেন, আবার সেটি পরেই যান সঙ্গীতানুষ্ঠান বা পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে। সাধারণ মানুষ চিরকালই অসাম্প্রদায়িক।

১০৩. বাংলাদেশের প্রধান-প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীরা সব সময়ই একটা চালাকির মধ্যে থাকেন। নিজের বা দলের ক্ষমতা ও স্বার্থ রক্ষায় চালাকির সুযোগ পেলে সেটা তারা ছাড়েন না। এই চালাকি তারা শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধেই করেন না, এটা তারা জনগণের বিরুদ্ধেও করে থাকেন।

১০৪. আমরা যারা নানা কারণ ও প্রয়োজনে প্রবাসে জীবন-যাপন করছি, তারা বাংলাদেশ থেকে এসেছি বটে, কিন্ত‘ বাংলাদেশ ছেড়ে আসিনি। গে¬াবাল ভিলেজের কথা যতই বলা হোক না কেন, পদে পদে আমরা অনুভব করি নাড়ির টান, শেকড়ের টান। পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিধর, সমৃদ্ধ-উন্নত দেশে বাস করলেও আমাদের বুকে দোলে কাশবন, পদ্মা-মেঘনা-যমুনার ঢেউ; আতিপাতি করে খুঁজি বাংলার ঘুঘু ডাকা বিষণœ দুপুর। খুঁজি স্বজন-পরিজনকে । বাংলাদেশ ভাল আছে জানলে আমরা ভাল থাকি, সংকটে আছে জানলে উদ্বিগ্ন হই।

১০৫. আমাদের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি যদি অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিত, নিদেনপক্ষে শিক্ষা নিত ১৯৮৬ ও ৮৮‘র নিরর্থক ও প্রহসনের নির্বাচন, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির একতরফা-হাস্যকর নির্বাচন এবং ২০০৭ সালের হাস্যকর-একতরফা-নির্বাচনী প্রচেষ্টার করুণ পরিণতি থেকে, তাহলেও সংকট তৈরি হতো না, ২০১৪ ও ২০১৯ সালের প্রতারণার প্রয়োজন হতো না। তারা ভুলে গেছেনে যে, এ ধরনের নির্বাচন সব সময়ই নির্বাচনকে পরিণত করে প্রহসনে, প্রার্থীদের পরিণত করে ফেলে ডাস্টবিনে এবং ভোটকে পরিণত করে আবর্জনায়।

১০৬. দেশের সম্পদ একশ্রেণীর মানুষ লুন্ঠন করে আসছে বর্গীর মতো, দুর্নীতির সকল সীমা অনেক আগেই ছাড়িয়ে গেছে। নৈরাজ্য, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা-পরায়ণতা, আইনÑশৃঙ্খলার অবনতি চরমে। মহৎ পেশাগুলিও কলুষিত। সর্বোপরি রাজনীতি এখন মেধা-মনীষা ও অঙ্গীকার শূন্যপ্রায়। সৎ ও নিবেদিতরা রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, মন্দ লোকেরা দখল করছে বড় স্থান, যেভাবে নিকৃষ্ট মুদ্রা উৎকৃষ্ট মুদ্রাকে বিতারণ করে। ভুল লোক বসে আছে শুদ্ধ জায়গায়।

১০৭. বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন অসৎ, ধূর্ত, সুবিধাবাদী, ডিগবাজ, পেশীবাজ, স্তাবক ও সন্ত্রাসীদের প্রাধান্য। রাজনীতিতে এদের প্রাধান্যের কারণ, বাংলাদেশের রাজনীতি এখন মানব জীবনের তিনটি আরাধ্যই সহজে সরবরাহ করছে; এক, ক্ষমতা; দুই, অর্থ ও তিন, প্রচার। মন্দ ও অযোগ্যদের কাছে এই রাজনীতি তাই বেশী আকর্ষণীয়।

১০৮. সামরিক শাসন বড় ধরনের বিকৃতি। আবার নির্বাচিত স্বৈর-শাসনও বিকৃতিরই নামান্তর। এতোগুলি এবং এতো ধরনের বিকৃতি মোকাবেলা করতে হয়েছে, হচ্ছে বাংলাদেশ ও তার জনগণকে, যার সবগুলিই মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন-চেতনার প্রতিপক্ষ। সে কারণে বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠতে গিয়ে বার বার খাবি খাচ্ছে।
১০৯. গনেশ উল্টে গেলে যাদের জেলে যেতে হবে, জনরোষ মোকাবেলা করতে হবে, যারা সরকারের উচ্ছিষ্ট ভোগ করছে এবং ভোগের পাইপলাইনে আছে, তারা ছাড়া আর কেউ সরকারের কথা বিশ্বাস বা বিশ্বাসের ভান করছে বলে মনে হয় না ।

১১০. কিছু ভুলের মাশুল খুবই চড়া। দরকষাকষি চলে না। দায় চাপানোর জন্য কোনো ঘাড়ও খুঁজে পাওয়া যায় না। এ বড় নিদানকাল।

১১১. জীবন এমনকি তখনও সুন্দর, যখন মানুষ অসুন্দরের সঙ্গে সংগ্রাম করে।

১১২. বহু বছর ধরে কিছুলোক বাংলাদেশকে রাজপথ থেকে কিছুটা বিভ্রান্ত ও খানিকটা টেনে-হিঁচড়ে ঢুকিয়ে ফেলেছে এই কানাগলিতে। গলির দুইপাশে কসাইখানা। সামনে বিকৃতি-বঞ্চনার দেয়াল। বাংলাদেশের স্বপ্নের পান্ডুলিপি মুদ্রণ করবে বলে নিয়ে সে ঢুকিয়ে ফেলেছে তার লালসায় ভরা পেটে।

১১৩. ধর্মব্যবসায়ীদের পাশাপাশি রাজনীতির পশরা সাজিয়ে বসেছে ‘মুক্তিযুদ্ধ বেপারীরা।’ এই দুই পক্ষ-ঘরানা আবার পরস্পরের মধ্যে এই দুইপণ্য চালাচালি করে। ধর্ম ও মুক্তিযুদ্ধ ওদের ক্ষমতার নাদুস-নুদুস চেহারা বজায় রাখার স্বাস্থ্যকর টনিকমাত্রÑ খাবার পরে দুইচামচ, শোবার আগে দুইচামচ। অথবা প্রয়োজন মতো। হায়রে বাংলাদেশ!

১১৪. আবার ক্ষমতা অর্জন ও রক্ষার সংগ্রামে নিয়োজিতরা তাদের প্রস্থান আসন্ন দেখে রাজতান্ত্রিক উত্তরাধিকারও গড়ার চেষ্টা করেন। তাদের এবং আমাদের সবারই পূর্ণ উপলব্ধিতে আসতে হবে যে, ইতিহসের সঙ্গে এর মধ্যেই অনেক বেশি রসিকতা করা হয়ে গেছে, আর নয়। অপরাজনীতির ভারে দেশের মানুষের মেরুদন্ড এমনিতেই ন্যূব্জ, তাদের ঘাড়ে আরো ভার পাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়।

১১৫. পরিবারতান্ত্রিক নেতৃত্ব চাপিয়ে দিলে জনগণ গ্রহণ করে না। সঞ্জয় গান্ধীকে জনগণের ওপর চাপিয়ে দিতে গিয়ে ইন্দিরা গান্ধী ব্যর্থ হয়েছেন। আবার তার মৃত্যুর পর মানুষ খুঁজে এনে ক্ষমতায় বসায় সেই রাজীব গান্ধীকে, যিনি প্রকাশ্যেই বলতেন, যে তিনি রাজনীতিকে ঘৃণা করেন। পাইলট রাজীব গান্ধীও হত্যাকান্ডের শিকার হলেন অপছন্দের রাজনীতি করতে এসে। আর, নেতৃত্ব-চাপিয়ে দেওয়া রাজনীতি করতে এসে অরাজনৈতিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন সঞ্জয় গান্ধী। ব্যাপারটা কাকতালীয় হতে পারে, অথবা হতে পারে দুর্জ্ঞেয় রহস্যময়ও।
১১৬. শেষ বয়সে মানুষের হাতে অনেকগুলি ঘুড়ি থাকলেও নাটাই থাকে অন্যের হাতে, যেগুলি সে আগে নিজেই বিলিবন্টন করেছে।

১১৭. বার্ধক্যে একেকজনের একেকরকম অসুখ হয়। একটি অসুখ খুবই কমন, চোখের পানির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা। এ অশ্্রু বেদনায় ঝরে, আনন্দেও ঝরে।

১১৮. সমাজে বহু মানুষ আছে যাদের মধ্যে অল্পবিস্তর বিকৃতি আছে, যারা মহীরুহের পতন দেখার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে। আর যদি সেই মহীরুহের কানটি মলে দেওয়ার সুযোগ আসে, তাহলে তো কথাই নেই, বিমল আনন্দে তা করে থাকে।

১১৯. সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে প্রভাবিত হওয়ার ক্ষমতা মেধাবীদেরই আছে; মেধাহীনরা করে নকল। এ ধরনের প্রভাবিত হওয়ার সাক্ষ্য বাংলা সাহিত্যেই অনেক আছে। মাইকেল মধুসূদন প্রভাবিত হয়েছেন হোমার দ্বারা। রবীন্দ্রনাথে প্রভাব রয়েছে লালন-বিহারীলালের। এমন কি বাংলাদেশের যে জাতীয় সঙ্গীত, সেটিতেও গগন হরকরার একটি গানের ছায়া রয়েছে। প্রভাবিত হয়েছেন জীবনানন্দ দাস। ভারতে এখন বঙ্কিম চন্দ্রের যে বন্দে মাতরম গান নিয়ে নতুন করে মাতামাতি শুরু হয়েছে সেটিতেও কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের দ্বিতীয় খন্ডের একটি শে¬াকের ছায়া রয়েছে।

১২০. মানুষের দেশ আসলে কোনটি? যে ভূ-খন্ডে মানুষ জন্ম নেয়? যে ভূ-খন্ডে বসবাসের স্বপ্ন দেখে? কিংবা যে ভূ-খন্ডের সঙ্গে ব্যক্তিমানুষের আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক চৈতন্যের সাযুজ্য বেশি? এ প্রশ্নের উত্তর খুবই জটিল। কিন্তু গড়পরতা হিসেবে আমার সবসময়ই মনে হয়েছে, এই পৃথিবীর প্রতিইঞ্চি মাটিতে প্রতিটি মানুষের অধিকার থাকা উচিত।

১২১. বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের অসৎ অংশ হচ্ছে পার্টটাইম দস্যু আর আমলা-বণিকদের অসৎ অংশ হচ্ছে ফুলটাইম তস্কর। সাংবাদিকদের অসৎ অংশ ব্ল্যাক-মেইলিং ও হলুদ সাংবাদিকতা করে। শিক্ষকদের অসৎ অংশ প্রশ্নপত্র ফাঁস করে। অসৎদের এসবই করার কথা। কিন্তু তারাই বাংলাদেশ নয়।

১২২. নাটক-সিনেমার নায়ক-নায়িকাতো বটেই, কিছু মানুষ এমন কি তাদের রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যেও খোঁজে আইডিয়ার জীবন। আমাদের সমাজে যে লোকটি অহরহ দুর্নীত করে, ঘুষ খায়, সেও চায় উপন্যাস-নাটক-সিনেমার নায়কেরা যেন ঘুষ না খায়, দুর্নীতি না করে। গল্পকার, উপন্যাসিক, নাট্যকার, চলচ্চিত্রকাররা যেন অতি সৎ হয়। তাদের রাজনৈতিক নেতারা যেন সৎ হয়। যে লোক দুশ্চরিত্র সেও চায় তার আইডিয়ার নায়ক-নেতারা যেন চরিত্রবান হয়। প্রচন্ড দুর্মুখ-বাচাল-মিথ্যাবাদীরাও চায় তাদের নায়ক-নেতারা যেন পরিমিতিবোধ সম্পন্ন হয়।

১২৩. এই সময়টিতে সম্পদে-জ্ঞানে-বিজ্ঞানে-প্রযুক্তিতে পৃথিবী খুবই সমৃদ্ধ। মানব সভ্যতার ইতিহাসে এতো সম্পদ আর কখনো দেখা যায়নি। কিন্তু পাশাপাশি এই তথ্যটি তোমাদের না জানালে নয় যে, পৃথিবীতে মানুষে মানুষে এমন প্রবল পার্থক্যও কখনো আর দেখা যায়নি। মানুষকে হত্যার জন্য মানুষের দ্বারা এমন মারণাস্ত্র তৈরির নজিরও আগে দেখা যায়নি। সারা পৃথিবীকে বহুবার ধ্বংস করার ক্ষমতা এখন যুদ্ধবাজ মানুষের হাতে।

১২৪. হুমায়ূন আহমেদ তাঁর সৃজনশীলতার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটি ভালোবাসার পত্রই লিখে গেছেন। এই ভালোবাসা মানুষের প্রতি, মানবগ্রহের প্রতি ভালোবাসা। এই পত্রটিই আমরা কখনো দেখেছি উপন্যাসের আকারে, কখনো ছোট গল্পের আকারে, কখনো পত্রিকার কলামের আকারে, কখনো নাটক-চলচ্চিত্ররূপে। হুমায়ূন আহমেদের প্রধান গুণ, তিনি-যে মানুষকে ভালোবাসেন তা জানান্ দিতে পেরেছেন। মানুষকে বোঝাতে পেরেছেন। এ জন্যই মানুষের হৃদয় জয় করা সহজ হয়েছে তাঁর ।

১২৫. দুর্ভাগ্য বাংলাদেশ ও তার প্রয়াত নায়কদের। তাদের রেখে যাওয়া দলগুলি ক্রমশ দেউলিয়া হয়ে পড়ায় ক্ষমতার প্রাণ-ভোমরা হিসেবে প্রয়াত দুই নেতাকে এচ্ছত্রভাবে হাজির করতে গিয়ে দু’জনকেই গালিগালাজের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে চলেছে।

১২৬. অহিংস ধর্মের অনুসারী বৌদ্ধদের ওপর প্রাচীন ভারতের বিভিন্ন স্থানে যখন হত্যাযজ্ঞ ও আক্রমণ শুরু হয় তখন বৌদ্ধদের বিরাট অংশ আশ্রয় নেয় পুন্ড্র-গৌড়-বরেন্দ্র,-বঙ্গ-সমতট-হরিকলে, যার সমন্বিত রূপ এখনকার বাংলাদেশ। বৌদ্ধ ধর্ম প্রাচীন ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকে যখন বিলুপ্ত-প্রায় তখন ভারতবর্ষের পূর্ব-প্রান্তের আমাদের অঞ্চলে সগৌরবে বিরাজিত ছিল। শাসক হিসেবে পাল-খড়গদের কথা সুবিদিত। পরবর্তীকালের তুর্কি-পার্সী-পাঠান-মোগলদের আশ্রয় নেওয়ার পরিসংখ্যানও কম নয়। অন্যদিকে আমাদের পার্বত্য অঞ্চলে আজকের উপজাতিরা বিতাড়িত হয়ে এসেছিল থাইল্যান্ড, বার্মা ও আরাকান থেকে। বাংলাদেশের আদিবাসী বলতে যাদের বোঝায় তারাও ভারতের নানা প্রান্ত থেকে আসা। মূলত বাংলাদেশে বাঙালীরাই হচ্ছে প্রকৃত আদিবাসী।

১২৭. একজন প্রবাসীর জমাখরচের খাতায় ডলারের সাথে-সাথে অনেক কথাও থাকে। কিছু কথা ‘কহতব্য’; কিছু কথা ‘ কহতব্য নহে’। আবার একজন প্রবাসী তার ভাই-বোনের কাছে যে দুঃখ-ভরা সত্যটি বলে, সেটি সে আড়াল করে তার বাবা-মায়ের কাছে। মুদ্রার একেক পিঠ একেকজনকে দেখায়। মধুর মিথ্যায় সুখে রাখতে চায় জনক-জননীদের।

১২৮. বাংলাদেশের দারিদ্র্যের ইতিহাস দেড়-দু’ শ’ বছরের মাত্র। এর আগের হাজার-হাজার বছরের ইতিহাস সমৃদ্ধি ও অভিবাসী-বাৎসল্যের। বরং শাদা চামড়ার লোকেরা ভাগ্য গড়তে যেতো আমাদের ভূ-খন্ডে। আমাদের সভ্যতা যদি কারো জন্য বুক বিছিয়ে দিতে পারে, অন্য সভ্যতা কেন আমাদের জন্য বুক বিছিয়ে দেবে না?
১২৯. জনগণ যাদের ভোট দিয়ে ক্ষমতায় পাঠায়, ওরা প্রায়শ ক্ষমতার গদিতে না বসে বাঘের পিঠে উপবেশন করেন। পরে আর চাইলেও নামতে পারেন না।

১৩০. একটি জাতির উত্থান-স্পন্দন ও বিজয়ে কত নাম না-জানা মানুষের ত্যাগ এবং রক্ত-অশ্রু থাকে, তার খবর কতজন রাখে?

১৩১. সৃজনশীলতাকে অবশ্যই রাজনীতিমনষ্ক হতে হবে, কারণ কিছুই রাজনীতির বাইরে নয়। কিন্ত‘ সৃজনশীলতা দলমন্য হলেই বিপজ্জনক এবং আরো বিপজ্জনক এটা উচ্ছিষ্টের অনুগামী হলে। বাংলাদেশে সেই বিপদই হয়ে পড়েছে স্বাগতিক। এর অন্যতম কারণ, দলকানা সৃজনশীলদের অনেক সুবিধা। এতে কড়ির সঙ্গে আসে প্রচার, ভ্রমণ, পদক প্রভৃতি।

১৩২. বড় দুই দলই ক্ষমতায় থাকতে অপকর্মের কারণে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে অপেক্ষা করে বিস্মৃতিপরায়ণ বাংলাদেশের মানুষ সেগুলি কখন ভুলবে! দল নামক দোকানটাকে কোনো রকম খুলে রেখে ওৎপেতে থাকে ‘সুদিনের জন্য।’ তাই ভোটাররাও তাদের কাছে ভালো কিছু শেখে না।

১৩৩. সংসার-করা বহু মানুষ আধা-গেরস্ত আধা-সন্ন্যাসী। থাকে ঘরে, কিন্ত‘ মন হুহু করে বের হয়ে যাওয়ার জন্য। কেউ বেরিয়ে পড়ে, কেউ না পেরে আফসোস করে।

১৩৪. একটি দেশ মগের মুল্লুকে পরিণত হলে ষন্ডাদের দিতে হয় সালামি আর তাদের সর্দারদের দিতে হয় সালাম-সালামি দুটোই।

১৩৫. গৌতম বুদ্ধ ছিলেন পৃথিবীর প্রধান যুদ্ধ-বিমুখ ও রক্তপাত-বিরোধী মানুষ, কিন্ত‘ আলেক্সান্ডারের চেয়েও অনেক বেশি সাহসী।

১৩৬. যদি সামর্থ থাকে তাহলে যে-কোনো সমস্যার সমাধান অর্থ দিয়ে কিনে ফেলো। কারণ, এই পদ্ধতিই সবচেয়ে সস্তা ও স্বাস্থ্যকর।

১৩৭. আইন আর কতোটুকু খোঁজে, মিডিয়া আর কতোটুকু লেখে। কতো সত্যই না রয়ে যায় আড়ালে।

১৩৮. স্তুতি বা নিন্দা. ইতিহাস কোনোটাকেই গ্রহণ করে না। স্তাবক বা নিন্দুকেরা যা লেখে সেটা ইতিহাসও নয়।

১৩৯. বয়স মানুষের অভিজ্ঞতা লাভে সহায়তার পাশাপাশি লোকসানের দিকে ঠেলে দেয় স্মৃতিশক্তিকে। কী করুণ এই লেনদেন।

১৪০. মুক্তিযুদ্ধের অনেকগুলি বায়াদলিল বিএনপির হাতে থাকা সত্ত্বেও সে এই মহান প্রত্যয় ও মুক্তিযুদ্ধের গোটা জমিন ছেড়ে দিয়েছে আওয়ামী লীগকে। একই সঙ্গে জামায়াতের লিগেসি বৈধ করায় আওয়ামী লীগ জামায়াত-বিএনপিকে নিয়ে দড়ি পাকাবার সুযোগ পেয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যয়-চেতনাকে নিজেদের করে নিয়ে এবং সেই গর্ব-অহংকারেরই জমিনে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিতর্কে যাওয়ার যে সুযোগ বিএনপির রয়েছে, সেখানে বিএনপি নিজের জমিনই বন্ধক দিয়ে চলেছে জামায়াতসহ অন্য ধর্ম-ব্যবসায়ীদের কাছে।

১৪১. বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলি এ সত্য উপলব্ধি করে না যে, একজন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কৃষিবিদ, শিক্ষক বা সাংবাদিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় না, তৈরি হয় শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। কিন্ত‘ কিছু পেশাজীবী রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহৃত হন এবং ব্যবহার করার রাস্তা নিজেরা করে দেন।
১৪২. মওলানা ভাসানী আমাদের কালের সাহসীতম মানুষ, প্রজ্ঞাবান রাজনীতিক, নির্মোহ নেতা। তাঁর কালের জওহরলাল নেহরু, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, নেতাজী সুভাষ বসু, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ প্রমুখ মাপের নেতা তিনি। একই সঙ্গে তিনি রাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো সমাজ সংস্কারক। রাজনীতিক ও সংস্কারকÑ এই দুই গুণের সমন্বয় রাজনীতিতে বিরল যা ঘটেছিল মওলানা ভাসানীর ক্ষেত্রে। তিনি আমৃত্যু ছিলেন রাজপথের মানুষ, ক্ষমতার কানাগলিতে প্রবেশ করেননি।

১৪৩. মওলানা ভাসানী পরম পরহেজগার-ধর্মপ্রাণ ছিলেন। কিন্ত‘ ধর্মান্ধ ছিলেন না এবং ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির ঘোরতর বিপক্ষে ছিলেন। এই কারণে ধর্মের অন্তর্নিহিত তাৎপর্যে তিনি এক মহান মওলানা।

১৪৪. অতি-দরিদ্র মানুষেরও আছে হারাবার মতো অনেক মূল্যবান সম্পদ; যেমন স্বপ্ন, সাহস, সম্ভ্রম, সাংবিধানিক ও মানবাধিকারÑ এমনকি জন্মভূমি।

১৪৫. আগে পৃথিবীর দেশে-দেশে শুভ, সুন্দর ও উদারতার শেষ ভরসা ছিল সাধারণ মানুষ। এখন অনেক দেশে ভোটে পাশ করছে মন্দ মানুষেরা। পেছনেরদিকে-হাঁটা ভূতে পেয়েছে মানব সভ্যতাকে।

১৪৬. স্তুতি বা নিন্দা. ইতিহাস কোনোটাকেই গ্রহণ করে না। স্তাবক বা নিন্দুকেরা যা লেখে সেটা ইতিহাসও নয়।

১৪৭. বহু রাজনীতিক আছে যারা ক্ষমতায় যাওয়া বা উপরে ওঠার জন্য সিড়ি হিসেবে ব্যবহার করে মানুষের লাশ। সেই সিড়িকে আলপনা করে রক্ত দিয়ে। শিশুরা যেমন ঈদুল ফিতরের চাঁদ দেখার জন্য অপেক্ষা করে, তেমনি এ-সব রাজনীতিকও লাশের জন্য অপেক্ষা করে।

১৪৮. মন্ত্রিসভার আজীবন সদস্য থাকার নিয়ম বাংলাদেশে নেই। অথচ সে চেষ্টাই করেন নেতা-নেত্রীরা ।

১৪৯. আর্যরা ভারতবর্ষে দাস প্রথার প্রচলন না করে তারচেয়েও জঘন্য ব্যবস্থার প্রচলন করেছিল, যার নাম জাত-পাত। দাস প্রথার বিলুপ্তি ঘটলেও জাত-পাতের বর্বরতা রয়েই গেল।

১৫০. ইসলাম ও মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই, তবে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে দু‘টোরই আছে।

১৫১. একটি ভাষার জন্য এটাও গুরুত্বপূর্ণ, যে, সেই ভাষাটি কারা বলছে, কাদের মাতৃভাষা সেটি। সে অর্থে ইংরেজি বর্তমান বিশ্বের প্রধানতম ভাষা। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মানুষ ম্যান্ডারিন ভাষায় কথা বলে, যাকে সাধারণ অর্থে চীনা ভাষা বলা হয়। কিন্ত‘ তালিকায় তৃতীয় স্থানে থাকা সত্ত্বেও ইংরেজি ভাষার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। কারণ, ইংরেজি এখন শুধু একটি ভাষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ইংরেজি এখন প্রযুক্তিরও অংশ।

১৫২. মা ও মাতৃভূমির হৃদপিন্ড ছিঁড়ে প্রবাসে যাওয়া প্রতিটি ছেলেমেয়েই ফিনিক্স পাখির মতো প্রাণশক্তিতে ভরপুর। এরা দেশের অন্যতম প্রাণপ্রবাহ, সংসারগুলিরও প্রাণপ্রবাহ। এই প্রবাহ সচল রাখতে তারা জীবনের ফলবান-খন্ড যেভাবে বিসর্জন দেয়, এই ত্যাগের তুলনা নেই।

১৫৩. কাউকেই মালাউন বলা উচিত নয়, কারণ মালাউন অর্থ অভিশপ্ত। কোনো মানুষই অভিশপ্ত নয়, অভিশপ্ত হতে পারে না। কারণ, মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব।

১৫৪. স্বাধীনতার যুদ্ধ, বিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থান কখনো সংবিধান বা আইনকানুন মেনে হয় না। এগুলি ঘটেই প্রচলিত কাঠামো-কানুনের বিরুদ্ধে।

১৫৫. ইহুদিরা বিতারিত হয়েছিল রোমানদের দ্বারা এবং নির্যাতিত হয়েছে খৃস্টানদে হাতে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইউরোপীয়দের প্রিয় খেলা ছিল ইহুদিদের হত্যা করা। মধ্য ও আধুনিক যুগে বহুবার বৃটেন, রাশিয়াসহ অনেক দেশ থেকে ইহুদিদের বিতারণ করা হয়েছে। অথচ, এখন তারা চরম অত্যাচার করছে মুসলমানদের।

১৫৬. ভারতের কিছু কিছু লেখক-লেখিকার কলম শাঁখের করাতের মতো, যাদের কলম প্রাচীন যুগে গেলে কালিমালিপ্ত করে বৌদ্ধদের এবং মধ্যযুগে গেলে করে মুসলমানদের।
১৫৭. বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন দলের বাইরের মানুষ আগে ছিল দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক। এখন তাদের অবস্থা অধিকারহীন দাসের মতো।
১৫৮. সবচেয়ে চালাক, ধুরন্ধর, নষ্ট ও মতলববাজরা আজ সমাজসংসারের অগ্রবাহিনী। চারদিকে পচনের দুর্গন্ধ। অফিস-আদালতগুলো আজ কলুষিত। সেখানে ঘিনঘিনে গুবরে পোকার মতো থিক থিক করে প্রধানথ ঘুষখোর-লুচ্চা-অপগন্ডরা। চাকরি নামক একটি জমিদারি করায়ত্ত করে গোটা দেশটাই তারা লিজ নিয়ে নিয়েছে, ইচ্ছেমতো করে-টরে খাচ্ছে। সৎ কর্মকর্ত-কর্মচারিরা অসৎতদের কৃপা-প্রার্থী এখন।
১৫৯. যে রাজনীতি সংস্কৃতির শুদ্ধতম প্রকাশ, মানুষকে আস্থাগ্রাহ্য করে তুলতে পারছে না। ভয়াবহ বিকার, পচন, মূর্খতার গ্রাস থেকে মুক্ত করতে পারছে না মানুষকে। অথচ মানুষ মূল্য কম দেয়নি। স্বাধীনতার জন্য এত মূল্য কয়টি জাতি দিয়েছে? গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এত আত্মত্যাগ আর কোথায় হয়েছে? রপ্রধান নগরগুলির প্রতিটি রাস্তার মোড়ে পাওয়া যাবে দেশপ্রেমিকের লাশ, অলিতে-গলিতে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ; আত্মত্যাগের শিখর স্তম্ভ।
১৬০. পৃথিবীতে বাংলাদেশই হয়তো একমাত্র দেশ যেখানে জাতির মৌলিক স্বার্থের ক্ষেত্রেও ঐকমত্য নেই, যেখানকার চিন্তাবিদদের একটা অংশই হীনম্মন্য, তারা নিজের দেশে শিকড় প্রোথিত করতে পারে না। দাসত্বকে উপভোগ করে নন্দনতত্ত্ব হিসেবে।
১৬১. পৃথিবীর প্রতিটি দেশের স্বাধীনতার যুদ্ধেই বাইরের দেশ সাহায্য করেছে। এ নিয়ে ভারতের মতো কেউ হরহামেশা ঢোল পেটায় না। ভিয়েতনামের যুদ্ধে চীনের সাহায্য কিংবদন্তীতুল্য। কিন্ত‘ র্মাদার প্রশ্নে সেই দুই দেশের মধ্যে একটা যুদ্ধও হয়ে গেছে।

১৬২. কিছু লোক আবার ভারত ও আওয়ামী লীগের উগ্রবিরোধিতা করতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধেও কথাবার্তা বলে ফেলেন। এটাকে আরো উষ্কে দেন তারা, স্বাধীন বাংলাদেশকে যারা আন্তরিকভাবে গ্রহণ করতে পারেননি।

১৬৩. আবার কিছু লোক ‘ভারতের সবই মহান’ বলে চালিয়ে দেয়ার অপচেষ্টাও করে আসছেন। ভারতের বাংলাদেশ-বিরোধী পদক্ষেপ বা ভারতীয় কিছু লোকের আপত্তিকর কথাবার্তা তাদের বিচলিত করে না। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভারতের কোনো কোন মহলের ধৃষ্টতাপূর্ণ মন্তব্যও তাদের গায়ে লাগে না বা তারা তার প্রতিবাদ করেন না।

১৬৪. খেলার সময় বাংলাদেশের পক্ষে ধর্ম, বর্ণ ও রাজনৈতিক মতবাদ নির্বিশেষে বাংলাদেশের সব মানুষ এক কাতারে চলে আসে। জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে এই বন্ধন যেদিন টেকসই রূপ নেবে, সেদিন থেকে শুরু হবে বাংলাদেশের অকল্পনীয় ও অপ্রতিহত অগ্রযাত্রা। আমাদেরকে কোথাও না

১৬৫. জ্ঞানগর্ভ বাণী দিচ্ছে হাদারা,
গরু রচনা লিখছে গাধারা।
১৬৬. স্বদেশটাকে নরক করার মানে জানো?
কষ্ট পাবে তোমার জনক, জননী-জায়া-সন্তানও।
১৬৭. গুন্ডারা করে যায় গুন্ডামি, লুটেরার দল যায় লুটে,
অসহায় চোখে দেখছে মানুষ, কয়না কিছু মুখ ফুটে।
১৬৮. পাড়-ভাঙ্গনের মাটি দিয়ে গড়তো নতুন চর,
এখন বালু নেয়রে কেটে ভূমিদস্যুর-বহর।
১৬৯. ঘামেভেজা ডলার দিয়ে কিনেছো মায়ের হাসি,
দুঃখ-কষ্ট ধন্য তোমার, ধন্যহে, প্রবাসী।
১৭০. পড় হে, পড় হে, বই-বিমুখ সুপ্রিয় সুজন,
কেন না তুমি আর পাবে না, এমন দুর্লভ মানবজীবন।
১৭১. মুক্তিযুদ্ধকে নির্মোহ ও নির্লিপ্তভাবে দেখার সময় হয়েছে। কিন্ত‘ পাশাপাশি এটাও স্মরণ রাখতে হবে, এতো বছর আগে সে যুদ্ধ শেষ হলেও এর আবেগ-পবিত্রতা ভবিষ্যৎ-সঞ্চারী, অনাদিকাল সঞ্চারী। যুগে যুগে যারা আসবে, তাদের কাছে এই প্রত্যয় সমান আবেগ ও সম্মান নিয়ে বিরাজ করবে।
১৭২. মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্য ও গৌরবকে উপেক্ষা করে, পাশ কাটিয়ে কিংবা কটাক্ষ করে কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষেই বিকশিত হওয়া দূরের কথা, টিকে থাকাও সম্ভব নয়।
১৭৩. গোলামের আওড়ালে স্বাধীনতার বাণী
স্বাধীনতার মানে, যায় বদ্লে তখনি।
১৭৪. ভেতরে ছাগ তুমি, গায়ে বাঘছাল,
চিনি না মনে কর, তুমি কোন মাল্।
১৭৫. এরে দাও, ওরে দাও, নানাবিধ গাল,
তুমি বাবু কোথাকার হরিদাস পাল!
১৭৬. বাঙালি মুসলমান অনেক স্বপ্ন ও সংগ্রামের পর যখন একটি গাড়ি কেনে, তার কাছে তখন দু’টি গাড়ির প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হতে থাকে।

১৭৭. নির্লিপ্ত বাঙালির উপমা পলাশির প্রান্তর,
গর্জে ওঠা বাঙআলির রচনা ৫২, ৬৯, ৭১..।

১৭৮. মনিব গণতন্ত্রী বা সমাজন্ত্রী অথবা মৌলবাদী হলেও দাসের কিছু যায়-আসে না। কারণ, দাসের কোনো চয়েজ নেই।
১৭৯. আজ সবার হাতে কলম, সবার হাতে ক্যামেরা। জোরদার হচ্ছে সোস্যাল মিডিয়া। বাংলাদেশের মূলধারার কিছু প্রচারমাধ্যমকে এটাও উপলব্ধি করতে হবে যে, পয়সা দিয়ে কেউ গোলামের বুলি কেনে না। যে প্রচারমাধ্যম মানুষের পাশে থাকে, ন্যায়ের পক্ষে তাকে, সেটিই লাভ করে গণমাধ্যমের সম্মান।
১৮০. বাংলাদেশকে কখনো না কখনো,কোথাও না কোথাও থেকে নতুন কওে শুরু করতে হবে।

181. Life is short! But we can extend our lives from both ends of past and future. We can go back to ancient time by flying on the wings of history. Likewise, we can travel to the future with the spaceships of science fictions.  It has frequently been evidenced that the fiction of today becomes the fact of tomorrow. On the other hand, `history also repeats itself’-  every now than then. Books would be our wings or spaceships here!

182. Personal  library is the sign of enlighted family.  Keep space and budget for books in your home.  Please share publicity of books at social media.
(নিজের লেখা থেকে সংগ্রহ। কোথাও কারো উদ্ধৃতির সঙ্গে মিলে গেলে ব্যাপারটি কাকতালীয়। তবু নজরে আনলে ধন্যবাদের সঙ্গে গৃহীত হবে এবং আমারটি পরিবর্তন করে নেব।)
২৫ জুলাই, ২০২০। টেম্পা, যুক্তরাষ্ট্র।
আহমেদ মূসা, লেখক-সাংবাদিক-নাট্যকার। সম্পাদক, সৃজনকাল। উপদেষ্টা সম্পাদক, সাপ্তাহিক বর্ণমালা।

ট্যাগ:
সর্বশেষ সংবাদ
Advertisements
karnafully1
TEKSERV

Situs Streaming JAV