Thursday, 12 March 2026 |
শিরোনাম
নিউইয়র্কে অ্যাসাল ওজোন পার্ক চ্যাপ্টারের ইফতার ও অভিষেক নিউইয়র্কে বাংলাদেশ ল সোসাইটি ইউএসএ’র ইফতার মাহফিল: খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকার আহ্বান BOROUGH PRESIDENT GIBSON HOSTS FOURTH ANNUAL BRONX IFTAR DINNER DIALOGUE UNDER THE THEME “UNITY IN DIVERSITY” নিউইয়র্কে মানসিক সংকটে থাকা যুবককে গুলি: পুলিশ প্রশিক্ষণ এবং মানসিক সংকটসংক্রান্ত ৯১১ কল নিউইয়র্কে গ্রী ম্যাকানিকেল ইয়াঙ্কার্স এর ইফতার ও দোয়া মাহফিল নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গমাতা পরিষদ’র ইফতার ও দোয়া মাহফিল নিউইয়র্কে ঢাকা জেলা অ্যাসোসিয়েশনের ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ সোসাইটি অব ব্রঙ্কস নিউইয়র্ক ইনকের কোরআন তেলাওয়াত প্রতিযোগিতা ও ইফতার মাহফিল New York Attorney General James Releases Statement on Live Nation Trial নিউইয়র্কে গোল্ডেন এইজ হোম কেয়ারের ইফতার মাহফিল
সব ক্যাটাগরি

বাংলাদেশ টেলিভিশনের শিল্পের আলোর দিশারী মোস্তফা কামাল সৈয়দের মহাপ্রয়ান

অনলাইন ডেস্ক পঠিত: 156 বার

প্রকাশিত: June 19, 2020 | 5:40 PM

সাইফুর রহমান ওসমানী জিতু : বাংলাদেশ টেলিভিশন শিল্পের সকলকে শোকের সাগরে ফেলে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে অকালে না ফেরার দেশে চলে গেলেন, বাংলাদেশের টিভি ব্যক্তিত্ব ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এনটিভির অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান ও উপদেস্টা (অনুষ্ঠান) মোস্তফা কামাল সৈয়দ।

গেলো ৩১শে মে, ২০২০ চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন বাংলাদেশে ষাটের দশক থেকে বিংশ শতাব্দির ৫৩ বছরের রেডিও এবং টেলিভিশন শিল্পের কর্মময় জীবনের বহুমুখী প্রতিভার অনন্য অবদানের অধিকারী ও একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র -মোস্তফা কামাল সৈয়দ।

বাংলাদেশের মিডিয়া ইতিহাসে মোস্তফা কামাল সৈয়দ ছিলেন বাংলাদেশ টেলিভিশনের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মিডিয়া ব্যক্তিত্ব। তাঁর দীর্ঘ বর্নাঢ্য কর্মময় ও পারিবারিক জীবনের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে, এ প্রতিবেদনের সাথে একটা শব্দচিত্র প্রতিবেদন ‘A Tribute to Television Icon Mustafa Kamal Syed’ জুড়ে দেয়া হলো। অনুগ্রহ করে দেখার অনুরোধ রইলো।

বাংলাদেশ টেলিভিশনের সংগে আমার সম্পৃক্ততা ষাটের দশকে সাদা-কালো টেলিভিশন যুগ থেকে রংগীন টেলিভিশন যুগে প্রচারিত হানিফ সংকেত-র পরিকল্পনা ও উপস্হাপনায় ইত্যাদির ‘হলিউড প্রতিবেদক’ হয়ে অংশ নেবার সুযোগে।  ৬০-র দশকে ঢাকায় ডি.আই.টি ভবনে (বর্তমান রাজউক ভবন) সেখানেই প্রথম মোস্তফা কামাল সৈয়দকে প্রথম দেখি এবং পরে আলাপ পরিচয়ের সুবাদে ঢাকা ও লস এন্জেলেস শহরে মোস্তফা কামাল সৈয়দের সাথে দেখা হবার সুযোগ ঘটে।

১৫ই মে শুক্রবার মোস্তফা কামাল সৈয়দ অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাঁকে দ্রুত স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর থেকে তাকে সেখানেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। ৩১শে মে দুপুর দেড়টায় তার ভেন্টিলেশন খুলে দেয়া হয়। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়, তিনি ইন্তেকাল করেন ( ইন্না লিল্লাহে ওয়াইন্না ইলাইহে রাজেউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ৭৪ বছর। বনানী কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

মোস্তফা কামাল সৈয়দের বর্নাঢ্য কর্মজীবনের এক ঝলক:
মোস্তফা কামাল সৈয়দ বর্নাঢ্য কর্মজীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন রেডিও ও টিভি চ্যানেলে। ১৯৬০ সালে বেতারে একজন বাংলা কথিকা পাঠক হিসাবে প্রথম যাত্রা শুরু করেন। বেতারের প্রচুর নাটকের অভিনয়ে অংশ নিয়েছেন তিনি। এছাড়াও অনেক বিজ্ঞাপণ, জিঙ্গেল, ধারা বর্ননা ও প্রামাণ্যচিত্রেও কন্ঠ দিয়েছেন।

১৯৬৭ সালের ১লা এপ্রিল ডিআইটির টেলিভিশন ভবনে মোস্তফা কামাল সৈয়দ, নতুন প্রজন্মের প্রথম  প্রযোজক হিসাবে যোগ দেন। আর সেখান থেকেই পথ চলা এবং দীর্ঘ ৫৩ বছরের কর্মময় জীবনের শেষ দিনটির পরিসমাপ্তি ঘটে, এনটিভির অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে। তিনি ২০০৩ সালে এনটিভিতে যোগ দেন ও দীর্ঘ ১৭বছর এনটিভি’র অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান ছিলেন। বাংলাদেশ টেলিভিশন থেকে তিনি উপ-মহাপরিচালক হিসাবে অবসর নেন।

৫২ বছরের কর্মজীবনে মোস্তফা কামাল সৈয়দ ছিলেন একজন স্বনামধন্য টিভি প্রযোজক, নাট্য নির্দেশক, ধারা বর্ননাকারী, বিজ্ঞাপনে নেপথ্য কন্ঠ, অভিনেতা, পরিচালক  ও আবৃত্তিকার। বাংলাদেশের টেলিভিশন শিল্পে তিনি বহুমুখী প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। যদিও তিনি ক্যামেরা ও পর্দার পেছনের মানুষ, কিন্তু মিডিয়া জগতে তিনি একজন তারকা হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ব্যক্তিগত জীবনে মোস্তফা কামাল সৈয়দ, একজন অত্যন্ত ধার্মিক, বিনয়ী ও ভদ্রমানুষ হিসেবে সকলের কাছে সমাদৃত ছিলেন।  

অত্যন্ত সাদামাটা সাধারণ জীবন-যাপন করতে ভালোবাসতেন। কোন ধরণের উচ্চভিলাস কখনোই আকৃস্ট করেনি। বেতার ও টেলিভিশনে জগতে জীবনের দীর্ঘ সময়টুকু দিয়েছেন সৃজনশীল কাজে। সৃস্টি করেছেন অনেক টেলিভিশন তারকা। অনেক নির্মাতা, উপস্থাপক, শিল্পী, নাট্যনির্মাতা, লেখক এবং কলাকুশলী আছেন, যাঁদের শুরু এনটিভির পর্দায় মোস্তফা কামাল সৈয়দের পদাঙ্ক অনুসরণ করে।

ষাটের দশকের শুরুতে বিটিভির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই তিনি জড়িত ছিলেন। মোস্তফা কামাল সৈয়দের কণ্ঠ বাংলাদেশের রেডিও এবং টেলিভিশন দর্শকের কাছে ছিলো খুবই পরিচিত। নাটকের শুরুতে সূচনা সংগীতের পাশাপাশি ভূমিকা কিংবা পুরো নাটকের সারমর্ম সূচনাপর্বে শুনতে পাওয়া যেতো মোস্তফা কামালের দ্বরাজ নেপথ্য কণ্ঠ। যেটা একটি অনুষ্ঠানের বাড়তি আকর্ষণ হিসাবে সংযোজিত হয়। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত টিভি শিল্পের অনুষ্ঠান বিভাগের সবচেয়ে সফল ও মেধাবী অনুষ্ঠান নির্মাতা, পরিচালক ও প্রযোজক ছিলেন। তার এ আকস্মিক মৃত্যুতে সকল সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া।

মোস্তফা কামাল সৈয়দ প্রযোজিত উল্লেখযোগ্য টেলিভিশন অনুষ্ঠান:
৮০দশকের মাঝমাঝি সময়ে প্রযোজক মোস্তফা কামাল সৈয়দের প্রযোজনা ও নির্দেশনায় সুবর্ণা মুস্তাফা, আফজাল হোসেন ও আসাদুজ্জামান নুর অভিনীত কাজী আব্দুল ওয়াদুদ রচিত “নদীবক্ষে” উপন্যাসের সফল নাট্যরূপ “কুল নাই কিনার নাই” ( The never ending River ), এ নাটকটি বিটিভির জন্য এক বিরল আন্তর্জাতিক সম্মান বয়ে আনে বাংলাদেশের জন্যে। প্রয়াত বর্ষিয়ান টেলিভিশন অভিনেতা ও নাট্যকার মমতাজউদ্দিন আহমেদ নাটকটির সফল নাট্যরূপ দেন। প্রশংসিত হয়েছিল সেই কালজয়ী নাটক দেশে এবং জাপানে।

বিটিভির কোন নাটক সেই প্রথম বিদেশি কোন বিদেশী টিভি চ্যানেল ক্রয় করেছিলো। জাপানী ভাষায় ডাবিং করে NHK নাটকটি প্রচার করে। পরে টোকিও থেকে NHK আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রধান কাইকো তারাসিকো বাংলাদেশ টেলিভিশনের কাছে পাঠানো এক প্রশংসাপত্রে উল্লেখ করেন: ‘অত্যন্ত আনন্দের সাথে জানাচ্ছি আমাদের NHK, Japan টেলিভিশন অনুষ্ঠানে আপনাদের নাটক The never ending River (কুল নাই কিনার নাই) এর প্রচার অত্যন্ত সফল হয়েছে বলে প্রমানিত হয়েছে এবং আমাদের রেটিং অনুযায়ী ১৭ লাখ জাপানি দর্শক এ নাটকটি উপভোগ করেছে‘।

মোস্তফা কামাল সৈয়দ প্রযোজিত উল্লেখযোগ্য নাটকগুলোর মধ্যে রয়েছে: ‘প্রজাপতি মন’, ‘স্বপ্ন বিলাস’, ‘স্নেহ’, ‘দৃষ্টি’, ‘আমার যতো ভালোবাসা’, ‘অনুরাগ’, ‘এবার ধরা দাও’, ‘নিলয় না জানি’, ‘কূল নাই কিনার নাই’, ‘বন্ধু আমার’ ও ‘নীরবে নিঃশব্দে’- সহ অনেক জনপ্রিয় নাটক ও গানের অনুষ্ঠান।

তিনি এনটিভিতে অনুষ্ঠানের প্রধান দায়িত্ব পালনে উপহার দিয়েছেন দীর্ঘ ১৭ বছরে অনেক মাইলফলক টেলিভিশন অনুষ্ঠান। যার মধ্যে জনপ্রিয় অনুষ্ঠান গুলোর মধ্যে রয়েছে: ‘ক্লোজআপ ওয়ান তোমাকেই খুঁজছে বাংলাদেশ’, রান্না বিষয়ক অনুষ্ঠান ‘সুপার শেফ’, কমেডি শো ‘হা-শো’সহ আরো অনেক রিয়েলিটি শো। এছাড়াও, সৈয়দ আবদুল হাদীর উপস্থাপনায় ‘কিছু কথা, কিছু গান’, ফেরদৌসী রহমানের ‘নিজের গীত গান, এই প্রজন্মের শিল্পীদের দিয়ে পরিবেশিত ‘ভালোবাসো মোর গান’, রান্না অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে শারমীন লাকির উপস্থাপনায় ‘সিদ্দিকা কবীর’স রেসিপি’ আজও একটি মাইলফলক হয়ে আছে।
বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘সুরবিতান‘ সঙ্গীতানুষ্ঠান-সহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ এবং বৈচিত্র্যময় অনুষ্ঠান উপহার দিয়েছেন মোস্তফা কামাল সৈয়দ, যা বাংলাদেশে টেলিভিশন দর্শকদের কাছে আজো জনপ্রিয়।

এক ঝলকে মোস্তফা কামাল সৈয়দের পরিবার পরিচিতি:
মোস্তফা কামাল সৈয়দ ব্যক্তিগত জীবনে তিনি স্ত্রীসহ এক ছেলে ও এক মেয়ে ও নাতী-নাত্নী রেখে গেছেন। মোস্তফা কামাল সৈয়দের এক সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলের জন্ম এবং তিনি বিয়ে করেন সাংস্কৃতিক পরিবেশে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের প্রখ্যাত কন্ঠশিল্পী জীনাত রেহানাকে। বাংলাদেশের তিনি একজন বিশিষ্ট কণ্ঠশিল্পী। ষাট এর দশক থেকে তিনি গানের জগতের সাথে যুক্ত রয়েছেন। ১৯৬৪ সালে বেতার ও ১৯৬৫ সালে টেলিভিশনের শিল্পী হিসেবে গান শুরু করেন জীনাত রেহানা। জীনাত রেহানার মা প্রয়াত জেব-উন-ন্নেসা জামাল ছিলেন প্রখ্যাত গীতিকার ও লেখক এবং খালা ছিলেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় কন্ঠশিল্পী প্রয়াত আঞ্জুমান আরা বেগম।

মোস্তফা কামাল সৈয়দের বাবা প্রয়াত জিল্লুর রহমান ছিলেন তৎকালীন রেডিও পাকিস্তান ঢাকা কেন্দ্রের আঞ্চলিক পরিচালক এবং পরবর্তিতে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি অবশ্য প্রথম অবস্থায় কিছুতেই রাজী ছিলেন না তাঁর সন্তান মিডিয়াকে, একটা পেশা হিসাবে বেছে নিক। কিন্তু কালের আবর্তে, ইতিহাসের চাকা উল্টোদিকে ঘুরে জাতি পেলো এক অনন্য বহুমূখী প্রতিভাবান বেতার ও টেলিভিশন জগতের ‘আইকনিক‘ ব্যক্তিত্ব: মোস্তফা কামাল সৈয়দ‘।

স্ত্রী জীনাত রেহানা কন্ঠশিল্পীর পাশাপাশি তিনি বাংলা গান নিয়েও গবেষণায় কর্মরত। মোস্তফা কামাল সৈয়দ জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত ছায়ার মত স্ত্রী‘র পাশে থেকে সংগীত ও গবেষণার ক্ষেত্রে যুগিয়েছেন সাহস, উৎসাহ, অনুপ্রেরণা এবং স্বপ্নপূরনে তিনি ছিলেন- একজন আজীবন সঙ্গী।

দূ‘জনেই অত্যন্ত ধার্মিক, সহজ-সরল, নিরহংকার প্রকৃতির সাধারণ মানুষ। অঢেল টাকা পয়শা হবার মোহ অথবা উচ্চাভিলাস সৈয়দ মোস্তফা কামাল সৈয়দ দম্পতিকে কখনোই আকৃস্ট করেনি। আর তাই মোস্তফা কামাল সৈয়দ চিরতরে চলে যাবার বেদনায় আজ সকলেই মর্মাহত। আজ একটি কথাই সর্বত্র আলোচিত, তিনি একজন সত্যিকার অর্থে একজন বিনয়ী ভালো মানুষ ছিলেন।

আমার ভাবতেও কস্ট হয়, এমন একজন মানুষকে জীবন থেকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার এ অন্ত:জ্বালা, সহধর্মিণী জীনাত রেহানা কেমন করে সহ্য করবেন? আল্লাহ যেনো, এ অপূরনীয় ক্ষতি ও শোক সইবার শক্তি দেন।

জীনাত রেহানা ও মোস্তফা কামাল সৈয়দের পরিবারে রয়েছে  তাঁদের এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলে রেহান কামাল সৈয়দ যুক্তরাষ্ট্রে একজন আইটি বিশেষজ্ঞ এবং বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাঙ্গালী। ছেলে রেহান কামাল সৈয়দের পরিবারে দুই মেয়ে ও এক ছেলে: সাকিনা, জারিনা ও নাসির।

মেয়ে রেহনুমা কামাল আহমেদ বিটিভি ও বাংলাদেশ বেতারের একজন নিয়মিত সংবাদ পাঠিকা। রেহনুমা কামাল আহমেদের স্বামী বাংলাদেশ বিমানের পাইলট, ক্যাপ্টেন ইশরাত আহমেদ। তাঁদের পরিবারে রয়েছে একটি ছেলে ও একটি মেয়ে: ইবরাত মহিউদ্দিন আহমেদ ও নাভিনা নুমারাত।

মোস্তফা কামাল সৈয়দের অকাল মৃত্যুতে  শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন, দেশের অনেক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। প্রখ্যাত টেলিভিশন নাট্যাভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদার লিখেছেন ‘ মোস্তফা কামাল সৈয়দের মতো নিখাদ ভালো মানুষের দেখা, এই জীবনে কমই পেয়েছি। তাই যখন তার চলে যাওয়ার খবর শুনলাম, তখন মনে হলো, এই বুকে যেন তীরবিদ্ধ হয়েছে…‘।

জনপ্রিয় টেলিভিশন তারকা সুবর্ণা মুস্তাফা লিখেছেন:
‘৮০ দশকে টিভি নাটকের ভূমিকা কিংবা পুরো নাটকের সারমর্ম সূচনাপর্বে নেপথ্য কণ্ঠে ভেসে আসত। অনেক সময় নাটকের শেষে আরও কিছু না বলা কথা, বলা হতো নেপথ্যে। আবৃত্তির মতো শ্রুতিমধুর সেই বর্ণনা, নাটকের প্রতি দর্শকদের আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিত। সেই সময়ের বেশিরভাগ নাটকের ভূমিকায় কিংবা উপসংহারে যার ভরাট গম্ভীর সুললিত কণ্ঠ মানুষের মন ছুঁয়ে যেতো…‘।

টেলিভিশনের জনপ্রিয় নাট্যনির্মাতা চয়নিকা চৌধুরী ল্খেছেন, ‘ আঙ্কেল, সারাজীবন বলেছেন পজিটিভ নাটক বানাতে। আজ আপনি আমাদের সব নেগেটিভ করে দিয়ে চলে গেলেন! সারাজীবন বলেছেন, আপনার আল্লাহ আছেন, আপনি নামাজ পড়েন, আপনার কিচ্ছু হবে না; আঙ্কেল, আমাদের অভিভাবক আপনি, আপনি পিতাসম! কোথায় চলে গেলেন আমাদের একা করে দিয়ে! যেখানেই যান, আপনি আমাদের হৃদয়ে থাকবেন।’

মোস্তফা কামাল সৈয়দের সঙ্গে কিছু ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ:
ষাটের দশকে আমার মামী বদরুন্নেসা আবদুল্লাহ তখন ঢাকার ডিআইটিস্থ ভবনে টেলিভিশন প্রযোজিকা। আমাদের বাসায় প্রায়ই আসতেন আব্বা-আম্মার সাথে দেখা করতে। তখন আমি ও আমার ভাইবোন সকলেই ছোট। তখন সবেমাত্র সাদা-কালো টেলিভিশন সম্প্রচার শুরু হয়েছে। সে সময়টিতে ছোটদের অনুষ্ঠানের দায়িত্বে ছিলেন বদরুন্নেসা আব্দুল্লাহ। মামীর সুবাদে প্রখ্যাত কন্ঠশিল্পী ফেরদৌসী রহমান এবং প্রখ্যাত চলচ্চিত্র ও সঙ্গীত  পরিচালক খান আতাউর রহমানের ছোটদের গান শেখা আসর ও অন্যন্য বেশ কয়েকটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে আমাদের অংশ নেবার সুযোগ হয়েছিলো। সে সুবাদে সাদা-কালো টেলিভিশন যুগে ঢাকার ডিআইটি টেলিভিশন চত্তরে আমার আনাগোনা।

আমার একবার ডাক পড়লো, ছোটদের একটা টেলিভিশন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে। মামী ফোন করে বাবা-মা‘কে জানালেন, আমাদের যেনো পরিপাটি কাপড-চোপর পড়ে সময়মত মতিঝিল ডিআইটি ভবনে যেনো সময়মত পাঠিয়ে দেয়া হয়। তবে কিছুতেই সাদা রঙ্গের কাপড় পড়া একেবারেই চলবে না।

৬০‘র দশকে অধিকাংশই অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করা হতো। শুধুমাত্র কিছু নাটক ও বিশেষ অনুষ্ঠান VTR (Video Tape Recorder)-র মাধ্যমে ধারণ করা হতো।
ডিআইটি টেলিভিশন ভবনের নীচের তলায় ছিলো প্রধান  স্টুডিও। ডিআইটি ভবনের প্রধান প্রবেশ পথের কয়েক ধাপ সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে একটু এগিয়ে গেলেই একেবারে প্রথম হাতের বাঁ দিকে ছিলো মূল টেলিভিশন স্টুডিও ও মাস্টার কন্ট্রোল রুম। আর একটু সামনে এগিয়ে গেলে দোতলায় ওপরে ওঠার সিড়ির নিচের তলায় হাতের বাঁ‘দিকের কক্ষগুলো ছিলো মহড়া কক্ষ, মেকআপ রুম, সেট রাখার জায়গা এবং প্রযোজকদের অফিস কক্ষ। আর এরই আশেপাশে স্হান সংকুলান না হবার কারণে যত্রতত্র দেখা যেতো পড়ে থাকা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সেট।

আমাদের অনুষ্ঠানের জন্য মেকআপ নিয়ে বাইরে অপেক্ষা করছি যে কখন আমাদের স্টুডিওর ভেতরে যাবার ডাক পড়বে? মূল স্টুডিওতে ঢুকতে হলে, একটি ‘সুইং ডোর‘ ধাক্কা দিয়ে প্রতিনিয়ত দেখতাম লোকজন আসা যাওয়া করছে। দরজাটা খুলতেই একটা মিস্টি গন্ধ ভেতর থেকে ক্ষনিকের জন্য অনুভব করতাম। হিমেল এয়ারকন্ডিশনের সাথে একেবারে ঠান্ডা শীতল হাওয়া ও সাথে অনুভব করতাম একটা মিস্টি সুবাস ছড়ানো গন্ধ। সে আমেজের কথা, আজও মনে পড়ে।

যাহোক, দাঁড়িয়ে দেখছি ঘন ঘন হাতে কাগজ নিয়ে অনেকেরই হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে আনাগোনার দৃশ্য। বুঝতে পারছিলাম ভেতরে অনুষ্ঠান চলছে এবং সকলেই ব্যস্ত। এরই মধ্যে মামীর একজন সহযোগী এসে জানিয়ে গেলো, ভেতরে চলমান অনুষ্ঠান শেষের পথে এবং তার পরপরই আমাদের অনুষ্ঠান শুরু হবে, অতএব সকলেই যেনো তৈরী থাকে।

স্টুডিওর ভেতরে এত লোকের আনাগোনা রিতীমত হা করে গিলছিলাম বলতে হবে। কিন্তু একটি ব্যক্তির প্রতি আমার দৃস্টি আকৃস্ট করেছিলো। হাতে একগুচ্ছ পান্ডুলিপি, অনেকটা পরিপাটি বিটলসের মত কাটা চুল, ফর্সা রঙ্গ, সুদর্শন এবং মনে হলো হয়তো বিদেশী কেউ হবেন। বোঝার উপায় নেই একজন বাঙ্গালী। কোন একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন নিয়ে তিনি ভীষণ ব্যস্ত। জানার কৌতুহল যেনো আরো বেড়ে গেলো, কি হচ্ছে স্টুডিওর ভেতরে! আমার তখন সে বয়স ছিলোনা যে, মোস্তফা কামাল সৈয়দের নাম জানা অথবা পরিচিত হবার।

তবে পরবর্তিতে টেলিভিশনের সঙ্গে ব্যক্তিগত আনাগোনার কারণে জানতে পেরেছিলাম তিনিই ছিলেন, টেলিভিশন শিল্পের বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী টেলিভিশন আইকন মোস্তফা কামাল সৈয়দ। বিটিভির বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রযোজদের সাথে আমার অনুষ্ঠানে অংশ নেবার সুযোগ হয়েছিলো, কিন্তু ভাগ্যে জোটেনি মোস্তফা কামাল সৈয়দের সরাসরি কোন প্রযোজিত অনুষ্ঠানে, একটু অংশ নেবার। সে অনুশোচনা ও আক্ষেপ কোনদিনই পরিপূর্ন হবার নয়।

৯০-র দশকে লস এন্জেলেস শহরে মোস্তফা কামাল সৈয়দ:
সৌভাগ্যক্রমে ৯০-র দশকে কামাল ভাইকে একবার পেয়ে গেলাম লস এন্জেলেস শহরে। বেশ কিছু জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছি।কামাল ভাই একদিন বললেন, এখানে শাড়ী-কাপড কোথায় কিনতে পাওয়া যাবে? নিয়ে গেলাম আর্টেশিয়া শহরে ভারতীয় বিপনন কেন্দ্রে। খুব খূশী হলেন। বললেন, ‘আপনি না থাকলে, এ এলাকা আমি খূঁজেই পেতাম না‘। যাবার পথে আমাদের প্রবাসী বাংলাদেশীদের জীবনযাত্রা নিয়ে জানার আগ্রহ প্রকাশ করলেন।

অত্যন্ত কাছাকাছি থেকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের এক বিশাল ব্যক্তিত্বের মানুষ মোস্তফা কামাল সৈয়দকে দেখার ও জানার সুযোগ পেয়েছিলাম। অত্যন্ত আন্তরীক, নেই কোন অহমিকা, দম্ভ বা অহংকার। অত্যন্ত সাধারণ, সহজ সরল ভদ্র প্রকৃতির, একজন মানুষ। ওঁনার ব্যবহারে এমনিতেই শ্রদ্ধায় মাথা নত আসে।

ঢাকায় ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক কারণে যতবারই কামাল ভাইয়ের সঙ্গে ঢাকায় দেখা হয়েছে, ওঁনার আতিথেয়তা ও আন্তরীকতার কথা কখনোই ভূলবোনা। কোন কিছুই বদলায়নি। জীনাত আপা বেশ কয়েকবার অনুষ্ঠানের জন্য লস এন্জেলেস শহরে
এসেছিলেন। পরিচয়ের সে সুবাদে ঢাকায় গেলে চেস্টা করি, আমেরিকা আসার আগে অন্তত: একটিবারের জন্য হলেও, এনটিভি ভবনে কামাল ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করে আসার   সুযোগ করে নিতে।

আজ এ কথা মনে করে আমার অশ্রু শিক্ত হয়ে আসে যখনই আমি ভাবি কামাল ভাইকে আর কোনদিনই ঢাকার কাওরান বাজারের এনটিভির, সে অফিস কক্ষে দেখতে পাবো না।

মোস্তফা কামাল সৈয়দ একজন ধীর ও স্হির প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। সবসময় মুখে হাসির একটা রেশ লেগেই থাকতো। অনুষ্ঠান নির্মাণের গুনগত মান রাখার সবসময় তিনি ছিলেন সচেস্ট। অনেক যত্ন নিয়ে তিনি প্রতিটি অনুষ্ঠান তৈরী করতেন। সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা আর আয়োজনের কারণে অন্যন্য অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে, মোস্তফা কামাল সৈয়দের প্রযোজিত অনুষ্ঠানগুলো ছিলো ভিন্নমাত্রার।

আমরা এই বরেণ্য মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, বিটিভির সাবেক উপমহাপরিচালক, স্বনামধন্য প্রযোজক, আবৃত্তিশিল্পী, অভিনেতা ও এনটিভির উপদেষ্টা  মোস্তফা কামাল সৈয়দের বিদেহী আত্মার প্রতি মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করি।

মোস্তফা কামাল সৈয়দ বাংলাদেশে ছয় দশকের কাছাকাছি সময়ে দেশের ইলেকট্রনিক মিডিয়া জগতে অনুষ্ঠান নির্মানে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে আসেন। টেলিভিশন মিডিয়ায় অনুষ্ঠান পরিকল্পনা ও নির্মাণে অসাধারণ এখন সৃজনশীলতার উদাহরণ তিনি রেখে গেছেন।

বাংলাদেশ টেলিভিশনে চার দশক ও পরবর্তী সময়ে বেসরকারি টেলিভিশন এনটিভির জন্মলগ্ন থেকে শুরু করে দীর্ঘ ১৭টি বছর আমৃত্যু পর্যন্ত বিরামহীন অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান হিসেবে মেধা ও রুচির অনন্য স্বাক্ষর রেখে গেছেন। টেলিভিশনে নতুনত্বের সন্ধানে তিনি ছিলেন সবসময় তৎপর। কাজের মধ্যেই তিনি সবসময় নিজেকে  সক্রিয় থাকতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করতেন। কাজের মধ্যেই তিনি যেনো  নিজেকে খুঁজে পান।

করোনা ভাইরাসের সম্ভাব্য জীবনের ঝুঁকি জেনেও মোস্তফা কামাল সৈয়দকে বাসায় বন্ধী করে রাখতে পারেনি। জীবনের ঝুঁকির চাইতে পেশাগত কাজকে তিনি সবসময় প্রাধান্য দিয়ে এসেছেন। আর তাই, জীবনের শেষ দিনটিতেও কর্মরত থেকে ‘IN THE LINE OF DUTY’-তে পৃথিবীর সকল মায়া ত্যাগ করে, মোস্তফা কামাল সৈয়দ চিরতরে হারিয়ে গেলেন-অসংখ্য তারার মাঝে।

ট্যাগ:
সর্বশেষ সংবাদ
Advertisements
karnafully1
TEKSERV

Situs Streaming JAV