Wednesday, 11 March 2026 |
শিরোনাম
নিউইয়র্কে অ্যাসাল ওজোন পার্ক চ্যাপ্টারের ইফতার ও অভিষেক নিউইয়র্কে বাংলাদেশ ল সোসাইটি ইউএসএ’র ইফতার মাহফিল: খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকার আহ্বান BOROUGH PRESIDENT GIBSON HOSTS FOURTH ANNUAL BRONX IFTAR DINNER DIALOGUE UNDER THE THEME “UNITY IN DIVERSITY” নিউইয়র্কে মানসিক সংকটে থাকা যুবককে গুলি: পুলিশ প্রশিক্ষণ এবং মানসিক সংকটসংক্রান্ত ৯১১ কল নিউইয়র্কে গ্রী ম্যাকানিকেল ইয়াঙ্কার্স এর ইফতার ও দোয়া মাহফিল নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গমাতা পরিষদ’র ইফতার ও দোয়া মাহফিল নিউইয়র্কে ঢাকা জেলা অ্যাসোসিয়েশনের ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ সোসাইটি অব ব্রঙ্কস নিউইয়র্ক ইনকের কোরআন তেলাওয়াত প্রতিযোগিতা ও ইফতার মাহফিল New York Attorney General James Releases Statement on Live Nation Trial নিউইয়র্কে গোল্ডেন এইজ হোম কেয়ারের ইফতার মাহফিল
সব ক্যাটাগরি

বিশ্বনন্দিত স্যার ফজলে হাসান আবেদ : অনুক্রমিক বংশধারার গৌরবগাঁথা

অনলাইন ডেস্ক পঠিত: 127 বার

প্রকাশিত: August 27, 2020 | 12:04 PM

মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ কামালউদ্দিন আহমদ : বিশ্বনন্দিত স্যার ফজলে হাসান আবেদের রক্তধারায় পূর্ববর্তী সপ্তমপুরুষ থেকে বংশ পরম্পরায় সিপাহসালার শাহ সৈয়দ নাসিরউদ্দিন (রঃ) বংশীয়দের সাথে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। ভারত উপমহাদেশে সচরাচর এমন পরিবারের সংখ্যা দৃষ্টি গোচর হয়না। যদিও প্রাচীন ইতিহাস ঘেটে যুগ-যুগান্তরের সঠিক তথ্যাদি সংগ্রহ করা অত্যন্ত কঠিন। এরপরও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এ প্রসঙ্গে ধারণা প্রাপ্তির প্রয়াসে বিশেষ করে যে সমস্ত পরিবারের সাথে এমন যোগসূত্র রয়েছে, তাঁদের স্বার্থ রক্ষার্থে অবশ্যই সকল তথ্যাদি তুলে ধরা অত্যাবশ্যক। যেহেতু অনেক অনেকদিন আগে অতি প্রাচীনকাল থেকেই এরূপ আত্মীয়তার বন্ধন হয়ে এসেছে, সেহেতু এসমস্ত আত্মীয়তার যোগসূত্র অনুসন্ধানপূর্বক সঠিকভাবে উপস্থাপন করাও দুষ্কর। এক্ষেত্রে অবশ্য অতীত ইতিহাস অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। কাজেই ইতিহাস ভিত্তিক গ্রন্থাবলী ঘেটে সত্যনিষ্ঠ তথ্যাদি সংগ্রহ করা বাঞ্ছনীয়। তবে এতদসংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত নির্ভুল ব্যাখ্যা প্রদানের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সমীক্ষা অপরিহার্য। এক্ষেত্রে অবশ্যই যথেষ্ট সময়-সুযোগের প্রয়োজন। তাছাড়াও তাঁদের পরিবার কিশোরগঞ্জ জেলা থেকে হবিগঞ্জ জেলায় স্থানান্তরিত হওয়ার প্রেক্ষাপটেও অনেক কাহিনী নিহিত রয়েছে। তাঁর পূর্বপুরুষগণ মূলত কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুর উপজেলার অন্তর্গত জোয়ানশাহী পরগণার দিলালপুর ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী বাহেরনগর গ্রামের বাসিন্দা। উক্ত পরিবারের পূর্ব পুরুষগণ কিশোরগঞ্জ জেলার উচ্চশিক্ষিত এবং সম্ভ্রান্ত পরিবারবর্গের মধ্যে অন্যতম ছিলেন।

    যখন মোগল সা¤্রাজ্যের ষষ্ঠতম স¤্রাট ছিলেন-একজন খাঁটি মুসলমান ন্যায়পরায়ণ ও খোদাভীরু বাদশাহ আলমগীর আওরঙ্গজেব। যাঁর পূর্ণ নাম আল-সুলতান আল-আজম ওয়াল-খাকান আল-মোকাররম আবুল মোজাফফর মুহি উদ-দিন মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব (১৬৫৮-১৭০৭) এর আমলে বর্তমান কিশোরগঞ্জ জেলার অন্তর্গত বাজিতপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বাহেরনগর নিবাসী কাজী (বিচারক) মৌলভী আমজাদ-উল-হাসান সাহেবের পুত্র তৎকালের প্রখ্যাত আলেম মৌলভী আনিস-উল-হাসান হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচঙ্গ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মীর মহল্লা সাহেব বাড়ী নিবাসী তথাকথিত বানিয়াচঙ্গ রাজ্যের কাজী-উল কোজাত (প্রধান বিচারপতি) মৌলভী সৈয়দ ওয়াজিহ্ উদ্দিন এবং দেওয়ান আসমা বানুর ঔরসজাত কন্যা সৈয়দা নসিবা বানুর সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। মৌলভী আনিস-উল-হাসানের পিতামহ ছিলেন চতুর্থ মোগল স¤্রাট মির্জা নূরউদ্দিন বেগ মোহাম্মদ খাঁন সেলিম ওরফে বাদশাহ জাহাঙ্গীরের আমলে অধুনালুপ্ত জাহাঙ্গীর নগর (ঢাকা) এর কাজী-উল কোজাত (প্রধান বিচারপতি) মৌলভী আরশাদ-উল-হাসান সিদ্দিকী। সৈয়দা নসিবা বানুর মাতামহ ছিলেন বানিয়াচঙ্গ রাজ্যের পরিখ্যাত রাজা বাহাদুর দেওয়ান আবিদুর রাজা। মৌলভী আনিস-উল-হাসান এবং সৈয়দা নসিবা বানুর বিয়ের পর বেশ সুখে-শান্তিতেই বাহেরনগর বসবাস করছিলেন। এক শুভলগ্নে এই সুখী-সমৃদ্ধশালী দম্পতির ঔরসজাত এক পুত্রসন্তান জন্ম গ্রহন করেন। তাঁর নাম রাখা হয় মৌলভী উবেদুল হাসান। 

   শিশুকালে এই উবেদুল হাসান ধনীর দুলাল হিসেবে হেসে-খেলে বেড়ে উঠতে থাকেন। কিছুকাল যেতেই এই শিশুর জীবনে নেমে আসে বিপর্যয়, ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। তাঁর বাবা হঠাৎ নিখোঁজ। জানা যায় তাঁর বাবা মৌলভী আনিস-উল-হাসান ইসলামের খেদমতে দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে একদা বাড়ী থেকে বের হয়ে যান। বহুদিন অতিবাহিতের পরও তিনি আর নিজ পরিবারে ফিরে আসেননি। আজ আসবেন, কাল আসবেন বলে নসিবা বানু মনে সান্ত¡না দেন। কিন্তু প্রতীক্ষার প্রহর আর শেষ হতে চায় না। এমনিভাবের এক দৈব ঘটনার বেড়াজালে আবদ্ধ নসিবা বানু। দেখতে দেখতে অবোধ বালক উবেদুল হাসানের তিন বছর পেড়িয়ে গেলো। ইতোমধ্যে শোকাহত মা এবং অবোধ পুত্রের ভবিষ্যত নিয়ে আরো একটি মর্মান্তিক-অসহনীয় ঘটনার অবতারণা হয়। এ প্রসঙ্গে জানাযায় নিখোঁজ মৌলভী আনিস-উল-হাসানের এক বোন ছিলেন। তাঁর নাম ছিল হাজেরা বানু বিবি। তাঁর বাবা তাঁদের বিষয়-সম্পত্তি এবং অদূর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে একজন খানেদামান্দ বা ঘরজামাই খুঁজছিলেন। এ প্রসঙ্গে চতুর্দিকের লোকজন লাগিয়ে অনুসন্ধান করতে থাকেন। অনেকদিন খোজাখুঁজির পর অবশেষে সব দিকদিয়ে উপযুক্ত এবং মনোমত এক পাত্রের সন্ধান পেলেন। তিনি হলেন-কিশোরগঞ্জ জেলার অন্তর্গত পাকুন্দিয়া উপজেলার পুলেরঘাট বাজার সংলগ্ন কালিয়াচাপড়া গ্রাম নিবাসী। শিক্ষিত-মার্জিত এক সম্ভান্ত মুসলিম পরিবারের সন্তান। তাঁর নাম মৌলভী মোহাম্মদ সাদী। তৎসময়ে তিনি ছিলেন-বৃহত্তর ময়মনসিংহের অন্তর্গত শেরপুর দেওয়ানী আদালতের মুন্সেফ। 

    অবশেষে হাজেরা বানু বিবিকে শর্তসাপেক্ষে তাঁর নিকট বিয়ে দিলেন। তাঁকে খানেদামান্দ করে বাহেরনগর এনে তাঁর পরিবারভুক্ত করেন। আরো কিছুদিন অপেক্ষা করার পরও যখন নিখোঁজ ভাই ফিরে এলেন না। তখন হাজেরা বিবি ভাইকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। শরিয়া মোতাবেক সমস্ত সম্পত্তির তিনিই একক মালিক বলে দাবী করেন। এতোদিন পর্যন্ত দুধের শিশুকে বুকে আগলে ধরে কোন রকমে দিনাতিপাত করছিলেন নসিবা বানু। এবারের ধাক্কা আর সামাল দিতে পারলেন না। কথায় আছেনা  “অল্প শোকে কাতর আর অধিক শোকে পাথর” আকস্মিকভাবে প্রাপ্ত এমন অপ্রত্যাশিত বজ্রাঘাত আর সইতে পারছিলেন না নসিবা বানু। নসিবা বানুর নসিবে আর সুখ সইল না। এমতাবস্থায় বঞ্চিতা সৈয়দা নসিবা বানু তাঁর পিত্রালয় বানিয়াচঙ্গ এর মীর মহল্লায় চলে আসেন। সহায়-সম্বলহীন শিশুপুত্রকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর পিতৃকুলে আশ্রয় নিতে বাধ্য হলেন। এই অবোধ শিশু উবেদুল হাসান তাঁর নানার সান্নিধ্যে মায়ের কোলে লালিত-পালিত হতে থাকেন।

     কিছুদিন পর সৈয়দা নসিবা বানুর বাবার মৃত্যুর পর তাঁর সহোদর ভ্রাতা মীর সৈয়দ গোলাম হাফেজ বোন-ভাগনার দায়িত্ব সাদরে গ্রহণ করেন। তখন তিনি করিমগঞ্জ জেলার অন্তর্গত লাতু মুন্সেফী কোর্টের প্রধান মুন্সেফ ছিলেন। তিনি ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত এবং এক পুত্র সন্তানের জনক ছিলেন। তাঁর পুত্রের নাম ছিল সৈয়দ গোলাম ইমাম। ভাগনা মৌলভী উবেদুল হাসানের বাবা নিরুদ্দেশ হওয়ায় পরম হিতৈষী এই মহান ব্যক্তি তাঁকে পিতৃ¯েœহসহ আদর-সোহাগ দিয়ে লালন-পালন করতে থাকেন। তাঁর পুত্র ও ভাগনা প্রায় সমবয়সী হওয়ায় দু’জন একসাথেই মক্তব-¯ু‹লে যাতায়াত করতেন। তিনি ¯েœহের পুত্র এবং ভাগনাকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করার প্রয়াসে  লেখাপড়া করার জন্যে তাঁদেরকে কলিকাতা শহরে পাঠিয়ে দেন। ইতোমধ্যে মুন্সেফ সাহেবের পরপর দুইজন কন্যাসন্তানও জন্ম গ্রহন করেন। ফুফাতো-মামাতো ভাইরা পরস্পরে মিলে-মিশে কলিকাতা শহরে লেখাপড়া নিয়ে ঈপ্সিত লক্ষ্য অভিযোজনে মনোনিবেশ দান করেন। অতীব মনযোগ সহকারে লেখাপড়া করে দু’জনেই উচ্চতর ডিগ্রী লাভ করতে সক্ষম হন। এক পর্যায়ে মৌলভী উবেদুল হাসান সাহেবের পিতামহ নাতিকে দেখার জন্যে বানিয়াচঙ্গের মীরমহল্লা সাহেব বাড়ীতে বেড়াতে আসেন। তখন বিভিন্ন আলাপ আলোচনার এক পর্যায়ে নাতিকে এইমর্মে অসিয়ত করেন যে, তিনি যেন আজীবন তাঁর মামার ¯েœহ-মমতার কথা স্মরণ করে কৃতজ্ঞ থাকেন এবং মামাতো বোনকে বিয়ে করেন।

    মৌলভী উবেদুল হাসানের জন্মস্থান-বাজিতপুরের বাহেরনগর সম্পর্কে জানা যায় যে, এই ঐতিহ্যবাহী মৌলভী বাড়ী বর্তমানে ডেপুটী বাড়ী নামে খ্যাত হয়েছে। কেননা মৌলভী মোহাম্মদ সাদীর সাথে হাজেরা বানু বিবির বিয়ের পর তাঁদের ঔরসজাত দুই পুত্র সন্তান জন্ম গ্রহণ করেন। মৌলভী আলী মাহমুদ এবং মৌলভী আলী আহমদ। মৌলভী আলী আহমদ ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট ছিলেন। মৌলভী আলী আহমদ সাহেবের পুত্র খান বাহাদুর মৌলভী আব্দুল করিম এ্যাডভোকেট সাহেব যুক্তফ্রন্টের আমলে শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন। তিনি তাঁর বাবার সম্মানার্থে এই বাড়ীটিকে ‘ডেপুটী বাড়ী’ নামে প্রতিষ্ঠিত করেন। কথিত আছে তাঁদের পূর্ব পুরুষ ছিলেন ইরাক থেকে আগত হযরত শাহ তাজ মোহাম্মদ (রঃ)। লেখাপড়া শেষ করে মীর সৈয়দ গোলাম হাফেজ সাহেবের পুত্র মৌলানা সৈয়দ গোলাম ইমাম তাঁর বাবার স্থলাভিষিক্ত হয়ে লাতু কোর্টে মুন্সেফ পদে নিয়োজিত হন। মৌলভী উবেদুল হাসান অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে বিভিন্ন শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। তখন মার্টিন লুথার নামের একজন ইংরেজ তৎকালীন ‘ঈষ্ট ই-িয়া কোম্পানীর’ মনোনীত কাউন্সিলর বা এজেন্ট ছিলেন। তিনি কলিকাতায় থেকে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন। তখন মার্টিন লুথার বাংলা, ফার্সী, উর্দু ও হিন্দী ভাষা শিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্যে একজন প-িত ব্যক্তিকে খুঁজছিলেন। তৎসময়ের প্রতিভাবান ব্যক্তি সকল ভাষায় পারদর্শী হিসেবে মৌলভী উবেদুল হাসানকে তাঁর শিক্ষক হিসেবে নির্বাচন করেন। পরবর্তীতে তাঁর দূভাষী মনোনীত করেন। কলিকাতা শহরে থেকেই মৌলভী উবেদুল হাসান সর্বপ্রথম কাজ শুরু করেন। 

     দাদার অসিয়ত মতে মৌলভী উবেদুল হাসান তাঁর আপন মামা বানিয়াচঙ্গ এর মীর মহল্লা নিবাসী মুন্সেফ মীর সৈয়দ গোলাম হাফেজ এবং দেওয়ান নূরচান্দ বানুর কন্যা সৈয়দা আলীমা বানুকে বিবাহ করেন। সৈয়দা আলীমা বানুর মাতামহ ছিলেন-দেশ বিখ্যাত বানিয়াচঙ্গ রাজ্যের রাজা বাহাদুর দেওয়ান উমেদুর রাজা। তাঁদের ঔরসজাত এক পুত্র ও এক কন্যা ছিলেন। সৈয়দা আলীমা বানুর ছোট বোন সৈয়দা সফিনা বানুর বিয়ে হয় রাজবাড়ীর দেওয়ান আমান রাজার সাথে। সেমতে দেওয়ান আমান রাজা মৌলভী উবেদুল হাসানের সম্পর্কে ভায়রা ভাই হন। মিঃ মার্টিন লুথারের সাথে মৌলভী উবেদুল হাসান দীর্ঘকাল কাজ করার ফলে পরস্পরে খুবই ঘনিষ্ট হয়ে ওঠেন। এমনিভাবে বেশ কিছুদিন অতিক্রান্তের পর একসময় ঈস্ট ই-িয়া কোম্পানী কর্তৃক মিঃ মার্টিন লুথারকে কলিকাতা থেকে মুর্শিদাবাদ বদলী করা হয়। মৌলভী উবেদুল হাসানের সাথে মিঃ মার্টিন লুথারের গভীর সম্পর্ক থাকায় মিঃ লুথার জনাব উবেদকে সঙ্গে নিয়ে কলিকাতা ছেড়ে নতুন কর্মস্থল মুর্শিদাবাদ চলে যান। ইতোমধ্যে উবেদুল হাসানের সহধর্মিনী সৈয়দা আলীমা বানু পরলোক গমন করেন। এ সংবাদ পেয়ে খুবই মর্মাহত হন উবেদুল হাসান। শোকাহত উবেদুল হাসান মিঃ লুথারকে সাথে নিয়ে বানিয়াচঙ্গ যান। প্রিয় সহধর্মিনীর কবর জিয়ারত করেন। ¯েœহের পুত্র-কন্যাকে সান্ত¡না দিয়ে এবং আত্মীয়-স্বজনের সাথে সাক্ষাৎ করে মুর্শিদাবাদ কর্মস্থলে ফিরে আসেন।

    মৌলভী উবেদুল হাসানের স্বভাব-চরিত্র, আচার-আচরণ, জ্ঞানে-গুণে ও কাজে-কর্মে খুবই সন্তুষ্ট মিঃ লুথার। তিনি একদিন জনাব উবেদকে সঙ্গে নিয়ে মহামান্য নবাবের দরবারে গেলেন। মৌলভী উবেদুল হাসানের পা-িত্যের ভূয়সী প্রশংসা করেন। একজন সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে মিঃ লুথার তাঁকে নবাব আলীবর্দী খানের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। মুর্শিদাবাদে কিছুদিন অবস্থানের পর মৌলভী উবেদুল হাসানের জ্ঞান-গৌরবের প্রদীপ আরো প্রজ্বলিত হয়ে ওঠে। বিভিন্ন শাস্ত্রে পারদর্শী-বহুবিদ জ্ঞান আহরণের সুখ্যাতি, তাঁর মেধা ও প্রতিভার কথা ব্যাপকভাবে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। মৌলভী উবেদুল হাসানের সুনামের কথা বিস্তারিত অবগত হয়ে নবাব আলীবর্দী খান বিমুগ্ধ হন এবং তাঁর প্রাসাদে তাঁকে নিমন্ত্রণ জানান। এরই ফলশ্রুতিতে নবাব পরিবারের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে উঠে। একদা বিভিন্ন প্রসঙ্গে আলোচনার এক পর্যায়ে বর্তমানে তিনি বিপতীœক বলে নবাব সাহেব অবগত হন। তৎকালে একদা হায়দরাবাদের নিজাম (অধিপতি) নবাব মীর হায়দর আলী কর্তৃক মুর্শিদাবাদের নবাব আলীবর্দী খান বরাবরে একখানা পত্র প্রেরণ করা হয়। মজার ব্যাপার হলো-খামের উপরে প্রাপক ও প্রেরকের নাম-ঠিকানা ফার্ষী ভাষায় যথাযথভাবেই লেখা ছিল। কিন্তু খামের ভেতরের মূল পত্রখানা ছিল সাদা। এই রহস্যাবৃত পত্রখানার বিষয়-বৃত্তান্ত কারো বোধগম্য হচ্ছিল না। নবাব সাহেবের সভাসদসহ অনেক জ্ঞানী-গুণীজন কোন রকম কূল-কিনারা করতে পারলেন না। এক পর্যায়ে এই তাৎপর্যপূর্ণ বা দুর্বোধ্যতায় আচ্ছন্ন পত্রখানার মর্মোদ্দার কিংবা এমন দুর্বোধ্য লেখা পাঠোদ্ধারের নিমিত্তে নবাব সাহেব সকল বিষয়ে পারদর্শী মৌলভী উবেদুল হাসানের সাহায্য কামনা করেন। 

   পরিশেষে, এই পত্রখানা মৌলভী উবেদুল হাসান সাহেবের নিকট হস্তান্তর করা হলো। অতঃপর সৌভাগ্যশালী মৌলভী উবেদুল হাসান এই অদ্ভুত পত্রখানা নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন। অবশেষে একরাতে খাম থেকে পত্রখানা বের করলেন এবং শ্বেতপত্রটি নিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন হলেন। নিবিষ্টচিত্তে ভাবছিলেন তথাপি কোনরকম উপায়ান্তর খুঁজে পাচ্ছিলেন না। এমতাবস্থায় চোখে তন্দ্রার আবেশ, ঘুম-ঘুম ভাব তাই পত্রটি হাতে নিয়েই বিছানায় যেতে বাধ্য হলেন। শুয়ে শুয়ে এর রহস্য উদঘাটনের বিষয়ে ভাবছিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রকটভাবে চোখে ঘুম এসে পড়ে। তখনও চিঠিটি হাতেই ছিল। ইতোমধ্যে বাতি নিভিয়ে পত্রখানা হাতের নাগালের মধ্যেই বালিশের কাছে রেখে ঘুমিয়ে পড়লেন। 

   মহান দয়াময় আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলার লীলা বোঝা সত্যিই ভীষণ দায়। গভীর ঘুমে মগ্ন উবেদ, হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে যেতেই দেখেন ভীষণ অন্ধকারে বালিশের পাশে কিছু একটা চিক্চিক্ করছে। রাতের অন্ধকারে এমন পরিস্থিতি হলে ভয় পাওয়াটাও স্বাভাবিক বটে। তখন কিঞ্চিৎ ভয়-ভীতি গ্রাস করলেও দ্বিধা-দ্বন্ধ দূর করতে মনে সাহস যুগিয়ে বাতি জ্বালিয়ে দিলেন। সম্পূর্ণ নিশ্চিত হতে গভীরভাবে লক্ষ্য করলেন, না ভয় পাওয়ার মতো এখানে তেমন কিছুই নেই। পূনরায় বাতি নিভিয়ে তীক্ষè দৃষ্টিদান করে বিষয়টি অনুধাবন করার চেষ্টা করলেন-দেখলেন ঐ রহস্যাবৃত পত্রখানা ঝলমল করছে। কি আশ্চর্য ! ঘোর-অন্ধকারে স্পষ্টভাবে অক্ষরগুলো ভেসে উঠেছে। এ যেনো-আবৃত রহস্যের আবরণ সরে গিয়ে উন্মোচিত হলো-সেই “চিচিং ফাঁক” এর মতো গুপ্ত ধন ভা-ার। রাতের ঘন-ঘোর অন্ধকারে ঐ পত্রখানার আগা-গোড়া পাঠ করতে সমর্থ হলেন বিজ্ঞ উবেদুল হাসান। এমন আজব চিঠি কি করে-কোন পদার্থের সাহায্যে লিখা হলো। সেসব নিয়ে আবার অনুসন্ধান শুরু করলেন। দেখা গেল অতি নগন্য বা তুচ্ছ একটি কীট। যাকে কেঁচো আবার গ্রাম্য ভাষায় জির বলা হয়। এটা সাধারণতঃ ভূমি মধ্যস্থ কৃমি জাতীয় কীট বিশেষ বা কৃমি সদৃশ পোকা। এজাতীয় বড় কীট বা পোকাকে ল্যাটা জির বলা হয়। পরবর্তীতে বড় কেঁচো বা ল্যাটা জিরের রস-নির্যাস বা ফেনার ব্যাপারে অনুসন্ধান চালালে মনে হয়-বায়ূ মিশ্রিত তরল পদার্থ এবং দুধের ফেনার মতো শ্বেতবর্ণ ও কোমল। প্রতীয়মান হয় যে, এর ভেতর অতি স্বল্প পরিমাণের রাসায়ণিক পদার্থ রয়েছে। তা’তে রাতের ঘন-ঘোর অন্ধকারে দ্বীপ্তিমান তারকা থেকে বিচ্ছুরিত আলোক রশ্মি বা রেডিয়ামের ন্যায় উজ্জ্বল দেখায়। এর দ্বারাই পত্রখানা লিখা হয়েছে বলে অনুমেয়। 

  অতঃপর আর কোন রকম অস্বস্তিকর ঝঞ্ঝাট হলো না। নবাব মীর হায়দার আলী খাঁন কর্তৃক প্রেরিত পত্রখানার বিস্তারিত অবগত হয়ে নবাব সাহেবের সম্মতিক্রমে প্রেরকের নিকট যথাযথভাবে জবাব লিখে পাঠালেন। নবাব আলীবর্দী খাঁন এই কাজে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হলেন। তখন নবাব সাহেব বুঝতে পারলেন যে, স্বভাবসুলভ ভাবেই দূরদর্শিতা-বুদ্ধিমত্তা-বিচক্ষণতা বা প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্বের কথা কখনো চাপা থাকেনা। জনগণের মাঝে অবশ্যই এর বহিঃপ্রকাশ ঘটে। এরই প্রেক্ষিতে এব্যাপারে অভিজ্ঞ আবিষ্কারককে পুরস্কৃত করার উদ্দেশ্যে বাংলার সুবেদার নবাব মির্জা মোহাম্মদ আলী খাঁন প্রকাশ্যে আলীবর্দী খান, তাঁর বড়ভাই মির্জা হাজী আহাম্মদ আলী খাঁনের কন্যা, ¯েœহের ভ্রাতুষ্পুত্রী মির্জা জয়বুন্নেছা ওরফে ইমানী বেগমকে বিয়ে দিয়ে মৌলভী উবেদুল হাসানকে মুর্শিদাবাদ নবাব পরিবারভুক্ত করেন। মির্জা ইমানী বেগমের সহোদরা মির্জা ফয়জুন্নেছা ওরফে রাবেয়া বেগমকে বিয়ে করেন নবাব আতা উল্লাহ খাঁন। তিনি বিহার প্রদেশের আকবরনগর রাজমহলের ফৌজদার (আঞ্চলিক শাসক) ছিলেন। উনারা দু’জনই ছিলেন নবাব সিরাজদৌলার আপন ফুফু। নবাব সিরাজদৌলার পিতা ছিলেন মির্জা হাজী আহাম্মদ আলীর পুত্র মির্জা জৈনউদ্দিন হাসেম। তাঁর মাতার নাম ছিল-মির্জা আমেনা বেগম।           

    হায়দরাবাদের নবাব কর্তৃক মুর্শিদাবাদের  নবাবের বরাবরে প্রেরিত অতীব গোপনীয়-অত্যন্ত কৌশলযুক্ত পত্রখানার যথোপযুক্ত জবাব পেয়ে নবাব হায়দার আলী অত্যন্ত পরিতৃপ্ত হলেন। তবে কে এই পত্রখানা পাঠ করে গুপ্ত তথ্য মর্মোদ্ধারে সমর্থ হলেন? এব্যাপারে খোঁজ-খবর নিয়ে মৌলভী উবেদুল হাসানের কথা জানতে পারেন। তখন তাঁকে দেখার জন্য হায়দরাবাদের নিজাম বাহাদুর আমন্ত্রণ জানান। একই সময়ে ইষ্ট ই-িয়া কোম্পানী কর্তৃক মিঃ লুথারকে হায়দরাবাদের এজেন্ট বা কাউন্সিলর নিযুক্ত করে সেখানে বদলী করা হয়। ফলে নবাব আলীবর্দী খাঁনের অনুমতি নিয়ে দিনক্ষণ ঠিক করে নবাব হায়দার আলীকে সেখানে উপস্থিতির সংবাদ জানিয়ে দিলেন। সেমতে মিঃ লুথারকে সঙ্গে নিয়েই মৌলভী উবেদুল হাসান হায়দরাবাদে পৌঁছেন। তখন নিজাম বাহাদুরের পক্ষ থেকে তাঁকে প্রাণঢালা সংবর্ধনা দেয়া হয়। তিনি নবাব আলীবর্দী খাঁনের আত্মীয় হিসেবে তাঁকে সসম্মানে রাজকীয় অতিথিশালায় রাখা হয়। হায়দরাবাদের নিজাম বাহাদুর উবেদুল হাসানের জ্ঞান গৌরবের কথা ও বিভিন্ন শাস্ত্রে পা-িত্যের বিবরণ জানতে পেরে বিমোহিত হন। ইতোমধ্যে তাঁর কথা-বার্তা ও চাল চলনে অতীব পরিতৃপ্ত হন। পর্যায়ক্রমে হায়দরাবাদের অধিপতি নবাব হায়দার আলী তাঁর সান্নিধ্য লাভে ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠেন। কেননা তখন নবাব সাহেব তাঁর ¯েœহভাজন পুত্র টিপু সুলতানের জন্যে উচ্চ শিক্ষিত-মার্জিত-ভদ্র  এবং সর্ব বিষয়ে অভিজ্ঞ একজন গৃহ শিক্ষক খুঁজছিলেন। তখন এবিষয়ে নবাব আলীবর্দী খাঁনের অনুমতি নিতে সক্ষম হন। এরইপ্রেক্ষিতে  তিনি নবাব মীর হায়দর আলী খান বাহাদুরের পুত্র বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব স্বনামধন্য শের-ই-মহীশূর মীর ফতেহ আলী খান টিপু সুলতানের গৃহ শিক্ষক হিসেবে মনোনীত হন। গৃহ শিক্ষক হওয়ার পর কিছুদিন যেতেই তাঁর আচার-আচরণে নবাব সাহেব অভিভূত হন। ফলে নবাব মীর হায়দার আলী খান একইসাথে তাঁকে মীরমুন্সি (চীফ সেক্রেটারী) পদে নিয়োগ দান করেন।   

   জানাযায় যে, বানিয়াচঙ্গের ঐতিহ্যবাহী মীর মহল্লা সংলগ্ন ঐতিহাসিক কামাল খানী ‘মৌলভীবাড়ী’র প্রতিষ্ঠাতা মৌলভী উবেদুল হাসান সাহেবের দ্বিতীয় স্ত্রী মির্জা ইমানী বেগমকে মুর্শিদাবাদ থেকে বানিয়াচঙ্গ নিয়ে আসার পূর্বে একটি সুবৃহৎ নতুন বাড়ী নির্মাণ করা হয়েছিল। আমার ধারণা আত্মীয়তার বন্ধন ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে বিজ্ঞ মৌলভী উবেদুল হাসান বহুদিন পূর্বেই একাগ্রচিত্তে এ বিষয়ে মনস্থ করেছিলেন। সময়-সুযোগ হলে মামা বাড়ীর সন্নিকটে নিজের এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্যে একটি মনোমুগ্ধকর বাড়ী নির্মাণ করবেন। ঐ সমস্ত এলাকা নি¤œাঞ্চল হওয়ায় এযাবৎ হাতে পর্যাপ্ত পরিমাণের টাকা-পয়সা না থাকায় সম্পূর্ণ নতুনভাবে একটি বাড়ী তৈরী করার ভরসা পাননি। বহুকাল প্রতীক্ষার পর প্রয়োজনীয় অর্থ যোগানের নিমিত্তে অবশেষে দ্বৈবাৎ একটি ঘটনা ঘটে। বাড়ী নির্মাণে পর্যাপ্ত পরিমাণের অর্থকড়ি হাতে ধরা দেয়ার পেছনেও একটি শালীসির কাহিনী রয়েছে। মৌলভী উবেদুল হাসান যখন নবাব মীর হায়দার আলী বাহাদুরের মীরমুন্সি বা চীফ সেক্রেটারী এবং তাঁর পুত্রদ্বয়ের গৃহ শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। কিছুদিন পর আকস্মিকভাবে নবাব মীর হায়দার আলী খাঁনের মৃত্যু হয়। তখন পুত্রদ্বয়ের মধ্যে কে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হবেন, এনিয়ে ভ্রাতৃদ্বয়ের মাঝে মনোমালিন্যতাসহ বিবাদ শুরু হয়। এব্যাপারে গন্য-মান্য ব্যক্তিবর্গের মধ্যে অনেকেই এগিয়ে আসেন কিন্তু কারো দ্বারা মীমাংশা করা সম্ভব হয়ে ওঠে নি। পরিশেষে ভ্রাতৃদ্বয়ের গৃহ শিক্ষক, হাদরাবাদের মীরমুন্সি, মীমাংশা দর্শনে প-িত ব্যক্তি মৌলভী উবেদুল হাসানকে শালিস নিযুক্ত করা হয়। তিনি ন্যায় বিচার করবেন বলে তাঁর উপর সকলের পূর্ণ আস্থা ছিল।                                                যে কারণে উত্থাপিত কলহ নিষ্পত্তির দায়-দায়িত্ব তাঁর উপর ন্যস্ত করা হয়। 

   প্রারম্ভেই শালিসীর রায়ই চূড়ান্ত বলে মেনে নেবেন, এইমর্মে ভ্রাতৃদ্বয়ের একটি অঙ্গীকারনামা স্বাক্ষর করান। হায়দরাবাদের পারিপার্শি¦ক অবস্থার বিষয়সমূহ বিস্তারিতভাবে উভয় ভ্রাতার নিকট উপস্থাপন করেন। তাঁদের মধ্যে কার দ্বারা হায়দরাবাদের স্বার্থ সুরক্ষিত হবে, সেদিকগুলোও আলোকপাত করেন।  ভ্রাতৃদ্বয়ের মধ্যে কে এবং কেন নিজাম বা অধিপতি হওয়ার যোগ্যতা রাখেন। সে বিষয়ে বিবরণী ব্যক্ত করে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বুঝিয়ে দিতে সমর্থ হন। পরিশেষে বড়ভাই মীর ফতেহ আলী টিপু সুলতানই তাঁর সালিশীতে নিজাম পদে নির্বাচিত হলেন। ছোটভাই সন্তুষ্টচিত্তে ন্যায় বিচার হয়েছে বলে উস্তাদ তথা সালীশীর রায় মেনে নিলেন। ন্যায়পরায়ণ সালীশির পারিতোষিক হিসেবে হায়দরাবাদের নব-নিযুক্ত নিজাম দু’ঘন্টার জন্যে রাজকোষাগার উন্মুক্ত করে দিলেন। ন্যায়বিচারক মৌলভী উবেদুল হাসানের প্রতি অনুরোধ রইল যেনো এই দু’ঘন্টা সময়ের ভেতর কোষাগার থেকে যা কিছু মন চায়, নিজের জন্যে নিয়ে যেতে পারবেন। জ্ঞান পিপাসুগণের জ্ঞান ভান্ডার পরিপুর্ণ করার লিপ্সায় কোষাগার থেকে প্রথমত অমূল্যরতœ হিসেবে বিশ্ব বিখ্যাত লেখকদের লিখা গ্রন্থসমূহ সংগ্রহ করলেন, এতেই প্রায় সমস্ত সময় অতিক্রান্ত হয়ে যায়। সঙ্গে থাকা মিঃ লুথারের ইশারায় তাড়াহুরা করে এরসাথে একটি থলিতে করে কিছু মহা মূল্যবান হীরা-মণি-মুক্তা ও স্বর্ণ নিয়ে বের হয়ে এলেন। এগুলোর বিনিময়ে অনেক টাকা পেলেন। 

      এই টাকা দিয়ে পূর্ব পরিকল্পনানুযায়ী প্রাচীর বেষ্টিত একটি বৃহদাকারের বাড়ী নির্মাণ করার উদ্দেশ্যে প্রাথমিকভাবে একটি বিরাটাকারের দীঘিসহ মোট ১৪ একর জমি ক্রয় করেন। সেটা অতীব নি¤œাঞ্চল হওয়ার কারণে এই নীচু ভূমিতে অবস্থিত বিরাটাকারের দীঘিটি পুণরায় খনন করেন। এতদ্ব্যতীত আরো দু’টি দীঘি খনন করেন। এই দীঘিগুলোর সমস্ত মাটি বিশাল এলাকা জুড়ে ভরাট করত: নতুন বাড়ী নির্মাণ করেন। এর বিপরিতে যথেষ্ট টাকা-কড়ি ব্যয় করতে হয়েছিল। জানাযায় উক্ত বাড়ী নির্মাণ করতে তৎকালীন সময়েই কয়েক লক্ষ টাকা খরচ করতে হয়েছিল। এই মনোলোভা বাড়ীটি ‘মৌলভী বাড়ী’ নামে খ্যাত হয়। অত:পর অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ন একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মির্জা ইমানী বেগমকে মুর্শিদাবাদ থেকে এনে এই বাড়ীতে উঠানো হয়। কিংবদন্তী রয়েছে যে, এই বিবিকে নিয়ে আসার সময় বহনকারী বজরা (বিরাটাকারের নৌকা) সুটকী নদীর উত্তরদিকে বানিয়াচঙ্গ ঢুকার পূর্বে জাঙ্গাল নামক স্থানে আটকা পড়ে। তখন বিবিকে নৌকায় রেখেই জমি ক্রয় করে অনেক লোকজন লাগিয়ে গড়ের খাল পর্যন্ত খনন করে আনতে হয়েছিল। ঐ খাল ‘মৌলভী খাল’ নামে খ্যাত হয়।

    মৌলভী উবেদুল হাসান সাহেবের প্রথম পক্ষের পুত্র মৌলভী মফিজুল হাসান বিবাহ করেন-হবিগঞ্জ জেলার অন্তর্গত চুনারুঘাট উপজেলার ঐতিহ্যবাহী রামশ্রী সাহেব বাড়ী নিবাসী নবীগঞ্জ মুন্সেফী কোর্টের মুন্সেফ সৈয়দ রেজাউর রহমান এবং দেওয়ান সৈয়দা কালা বিবির ঔরাসজাত কন্যা সৈয়দা নাদেরা বানুকে। কথিত আছে যে, দেওয়ান সৈয়দা কালা বিবির পিতা লস্করপুর নিবাসী দেওয়ান সৈয়দ হামিদ রাজার সন্তানাদি জন্ম গ্রহণের কয়েকদিন পরই মারা যেতেন, যে কারণে জন্মের পর এই সুন্দরী কন্যার নাম রাখা হয়েছিল ‘কালা বিবি’। মৌলভী উবেদুল হাসান সাহেবের প্রথম পক্ষের একমাত্র কন্যা উম্মেসালমা বানুর বিবাহ হয়ে ছিল বানিয়াচঙ্গ রাজবাড়ী নিবাসী দেওয়ান কুরবান রাজার পুত্র দেওয়ান জামান রাজার সাথে। দ্বিতীয় পক্ষের পুত্র নবাব তফিজুল হাসান বিবাহ করেন মীর মহল্লা সাহেববাড়ী নিবাসী তাঁর বাবার মামাতো ভাই ও সমন্ধিক, লাতুর মুন্সেফ মৌলানা সৈয়দ গোলাম ইমাম ও কাজী আয়মনা বেগমের ঔরসজাত কন্যা সৈয়দা সাফিয়া বানুকে। নবাব তফিজুল হাসান এবং সৈয়দা সাফিয়া বানুর ঔরসজাত একমাত্র কন্যা করিমুন্নেছার বিবাহ হয় সিলেট ধুপাদিঘীর পূর্ব পাড় নিবাসী সৈয়দ নছরুল্লাহ সাহেবের পুত্র সৈয়দ মহসীন আলীর সাথে। 

    তৎকালীন সময়ে বানিয়াচঙ্গের ভূস্বামী হিসেবে খ্যাত মৌলভী মফিজুল হাসান সাহেবের প্রথম পুত্র মৌলভী মইদুল হাসান বিবাহ করেন-কিশোরগঞ্জ জেলার অধীনে অষ্টগ্রাম উপজেলার অন্তর্গত জোয়ানশাহী পরগণার জমিদার মৌলভী মীর সৈয়দ নাসিরউদ্দিন হুসাইন সাহেবের কন্যা সৈয়দা আখতারুন্নেছা খাতুনকে। তাঁর অপর বোন সৈয়দা শামসুন্নেছা খাতুনের বিয়ে হয়েছিল-হবিগঞ্জ জেলা ও উপজোলার অন্তর্গত ঐতিহ্যবাহী ফকিরাবাদ সাহেববাড়ী নিবাসী শাহ সৈয়দ এমাদুর রহমান সাহেবের পুত্র শাহ সৈয়দ আলতাফুর রহমান ওরফে তোরন মিয়া সাহেবের নিকট। তিনি ছিলেন নিতাইরচক সাহেব বাড়ীর প্রতিষ্ঠাতা কিন্তু তাঁর মাজার ফকিরাবাদ মসজিদের সম্মূখে অবস্থিত বলে জানা যায়। মৌলভী মফিজুল হাসান সাহেবের দ্বিতীয় পুত্র মৌলভী ফয়জুল হাসান বিবাহ করেন-মীরমহল্লা সাহেববাড়ী নিবাসী মৌলভী সৈয়দ আলী ইমাম এবং সৈয়দা আফিফা বানুর ঔরসজাত কন্যা-সৈয়দা সাফিয়া বানুকে। তাঁর মাতামহ ছিলেন-জলসুখা-মাধবপাশা সৈয়দবাড়ী নিবাসী পীরে কামেল সৈয়দ মেহদীউজ্জামান। মৌলভী মফিজুল হাসান সাহেবের তৃতীয় পুত্র মৌলভী অইদুল হাসান বিবাহ করেন মীরমহল্লা সাহেববাড়ী নিবসী মৌলভী সৈয়দ হুসেন ইমাম সাহেবের কন্যা সৈয়দা জহিরুন্নেছাকে। তাঁর মাতামহ ছিলেন বানিয়াচঙ্গ কাজীমহল্লা-কাজীবাড়ী নিবাসী মীর সৈয়দ খুররম আলী।    

    মৌলভী মইদুল হাসান সাহেবের পুত্র খান বাহাদুর রফিকুল হাসান বিবাহ করেন ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার অন্তর্গত নাসিরনগর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী গোকর্ণ নবাব বাড়ী নিবাসী এ্যাডভোকেট সৈয়দ রিয়াজত উল্লাহ সাহেবের কন্যা সৈয়দা রাবেয়া খাতুনকে। তিনি ছিলেন বিখ্যাত ব্যক্তি নবাব স্যার সৈয়দ শামসুল হুদা সাহেবের একমাত্র বোন। তাঁদের পিতামহ শাহ সৈয়দ শরাফত উল্লাহ ছিলেন চট্টগ্রাম বিচার বিভাগের সাব-জজ। মৌলভী মইদুল হাসান সাহেবের অন্যতম পুত্র মৌলভী শফিকুল হাসান ওরফে বাদশাহ মিয়া (পীর সাহেব) বিবাহ করেন-বানিয়াচঙ্গ মীরমহল্লা নিবাসী মৌলভী সৈয়দ গোলাম সামদানী ওরফে নান্নœা মিয়া এবং দেওয়ান ছালেহা খাতুন চৌধুরীর ঔরসজাত কন্যা সৈয়দা হাসিনা বানুকে। তাঁর মৃত্যুর পর অপর কন্যা সৈয়দা উম্মে কুলসুমকে। উনারা ছিলেন বিশিষ্ট চিকিৎসক ডাঃ সৈয়দ গোলাম রহিম ওরফে ময়না মিয়া সাহেবের আপন বোন। 

    মৌলভী রফিকুল হাসান (সাবরেজিষ্ট্্রার) সাহেবের পুত্র মৌলভী সিদ্দিকুল হাসান (ডিষ্ট্রিক্ট রেজিষ্ট্্রার) বিবাহ করেন-কিশোরগঞ্জ জেলার অষ্টগ্রাম উপজেলার জোয়ানশাহী পরগণনার অন্তর্গত ঐতিহ্যবাহী অষ্টগ্রাম মিনিষ্টারবাড়ী নিবাসী তথাকথিত ব্রিটিশ সরকারের আমলে ১৯৪৩-১৯৪৭ সাল পর্যন্ত কৃষি-পল্লীউন্নয়ন এবং শিক্ষামন্ত্রী খানবাহাদুর সৈয়দ মোয়াজ্জেমউদ্দিন হুসেইন ও শারেকা বানু বিবির ঔরসজাত কন্যা সৈয়দা সুফিয়া খাতুনকে। তাঁর মাতামহ ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার অন্তর্গত বিজয়নগর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী চাওড়া সাহেব বাড়ী নিবাসী বিখ্যাত জমিদার মৌলভী ফতেহ-উল-ইসলাম ওরফে কনা মিয়া সাহেব এবং তাঁর মামা ছিলেন-খানবাহাদুর এ এন শহিদুল হক। উল্লেখ্য যে, খানবাহাদুর সৈয়দ মোয়াজ্জেম উদ্দিন হুসেইন সাহেবের চাচাতো ভাই খানবাহাদুর সৈয়দ মিজবাহ উদ্দিন হুসেইন সাহেবও যোগাযোগ মন্ত্রী ছিলেন। তাঁর পুত্র বিশ্ব নন্দিত স্যার ফজলে হাসান আবেদ বিবাহ করেন মামাতো বোন অষ্টগ্রাম নিবাসী জেলা জজ সৈয়দ জালালউদ্দিন হুসেইন এবং আয়েশা হুসেইন এর কন্যা লেডী সৈয়দা সারওয়াত হাসান আবেদকে। তাঁর মাতামহ ছিলেন ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার নিবাসী খানবাহাদুর আতাউর রহমান সাহেব।

     পরিশেষে এই কীর্তিমান পুরুষ মৌলভী উবেদুল হাসান তাঁর জীবদ্দশায় অসিয়ত করেন যে, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর স্থায়ী নিবাস কিশোরগঞ্জ জেলার অন্তর্গত বাহেরনগর গ্রামে তাঁর পূর্বপুরুষদের সাথে তাঁকে সমাধিস্থ করার জন্যে। তিনি পরলোক গমন করলে তাঁর শেষ ইচ্ছানুযায়ী তাঁকে বাহেরনগর পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। উল্লেখ্য যে, তিনি ছিলেন ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বক্কর সিদ্দিক (রাঃ) পরবর্তী বংশধর বলে অভিহিত। আল্লাহ তাঁকে জান্নাত-উল-ফেরদৌস দান করুন-আমিন। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার ঃ
এখানে উল্লেখ করা অত্যাবশ্যক যে, উপরোল্লেখিত ঐতিহ্যবাহী এমন একটি পরিবারের পারিবারিক বিষয়ের উপর লেখা আমার এই প্রবন্ধখানা সংকলনে অতি প্রাচীনকাল থেকে অদ্যাবধি সঠিক তথ্যাদি অনুসন্ধানের ব্যাপারে আমাকে সহযোগিতা করার জন্যে আমার ছোট ভাই বানিয়াচঙ্গের ঐতিহ্যবাহী মীরমহল্লা সাহেববাড়ী নিবাসী “সিলেট সিটি কর্পোরেশন”এর বারবার নির্বাচিত ‘কাউন্সিলর’ বিশিষ্ট সমাজসেবক, শিকড় সন্ধানী লেখক, ইতিহাস-ঐতিহ্যের গবেষক, কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ সিলেট এর সাবেক পাঠাগার সম্পাদক এবং নজরুল একাডেমী সিলেট এর সভাপতি সৈয়দ মিসবাহ্ উদ্দিন এর নিকট আন্তরিক ধন্যবাদ ও তার প্রতি কৃতজ্ঞতার পাশে আবদ্ধ।

ট্যাগ:
সর্বশেষ সংবাদ
Advertisements
karnafully1
TEKSERV

Situs Streaming JAV