
ইব্রাহীম চৌধুরী খোকন : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘লোডশেডিং যেন চালু থাকে সে নির্দেশ দিয়েছি। সব সময় বিদ্যুত্ চালু থাকলে জনগণ তো লোডশেডিংয়ের কথা ভুলে যাবে। লোডশেডিংয়ের কথা যেন ভুলে না যায়, তার জন্যই এমন নির্দেশনা দিয়েছি।’ গতকাল রোববার বিকেলে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘের স্থায়ী আবাসিক মিশনে আয়োজিত মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। স্থানীয় সাংবাদিকদের জন্য এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি এ কে আবদুল মোমেন অনুষ্ঠানটি সঞ্চালন করেন। সম্প্রতি বিশিষ্ট আইনজীবী রফিক-উল হক বলেছেন, দেশের প্রয়োজনে তিনি যেকোনো দায়িত্ব নিতে রাজি আছেন। প্রধান বিরোধী দল বিএনপির এ ব্যাপারে সম্মতির আভাস পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে সাংবাদিকেরা জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের গ্রামাঞ্চলে একটি কথা চালু আছে। বাজারে লোকজনের মধ্যে হঠাত্ একজন বলে উঠল, মুই কার খালু রে…।’ শেখ হাসিনা প্রশ্ন করে বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অভিজ্ঞতা কি সবাই ভুলে গেছেন? তারা মামলা, নির্যাতন করেছে; ব্যবসায়ী-রাজনীতিবিদদের হয়রানি করেছে।’ তিনি বলেন, ‘গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আমি জীবনবাজি রেখে দেশে ফিরে গিয়ে কারাবরণ না করলে আপনারা গণতন্ত্র ফিরে পেতেন না।’ সুশীল সমাজের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘যে “সুশীল বাবু”রা এখন টক শোতে কথা বলেন, তাঁদেরও কেউ কেউ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন। “সুশীল বাবু”রা তো নির্বাচন করতে পারেননি। পদত্যাগ করে পালিয়েছিলেন। “সুশীল বাবু”রা উপদেষ্টা হয়ে নির্বাচন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁদের কথা এখন আমাদের শুনতে হবে?’ তিনি প্রশ্ন করে বলেন, ‘ব্যর্থ মানুষদের কাছ থেকে নসিহত শুনতে হবে আমাদের?’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল আরও বিচিত্র। লতিফুর রহমান তাঁর উপদেষ্টাদের শপথ করানোর আগেই নিয়ম লঙ্ঘন করে ১৩ জন সচিবকে চাকরিচ্যুত করেছিলেন। সে সময় মন্ত্রিপরিষদের সচিব ছিলেন আকবর আলি খান। এখন আকবর আলি খানই তো সবচেয়ে বেশি কথা বলেন। অথচ সে সময় নিয়ম লঙ্ঘন করে সচিবদের চাকরিচ্যুতি ও বদলি নিয়ে তো তিনি কথা বলেননি।’ বিএনপির বর্তমান মহাসচিবের নাম উল্লেখ না করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় কিংস পার্টির সঙ্গে তিনি সংশ্লিষ্ট ছিলেন। সে সময় ‘মায়ে খেদানো বাপে তাড়ানো’ লোকদের নিয়ে কিংস পার্টি করার চেষ্টা হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার নাম উল্লেখ না করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘উনি কখন যে কী বলেন, তার তো কোনো তাল নেই। তিনি যে কী চান, তা তো তিনি নিজেও জানেন না।’ সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনির হত্যাকারীদের বিচার সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হাইকোর্টের রায়ের ফলে নতুন করে তদন্ত শুরু হয়েছে। তদন্তে তথ্য দিয়ে সহযোগিতার করার জন্য তিনি সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানান। তদন্ত ও বিচার বিলম্বের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমার পিতা-মাতা-ভাই ও স্বজনের বিচারের জন্য কত দিন অপেক্ষা করতে হয়েছে আপনারা জানেন।’ তিনি বলেন, ‘সব হত্যারই বিচার হবে। আপনারা এ ব্যাপারে নিশ্চিত থাকতে পারেন।’ রামু, টেকনাফ, উখিয়া, পটিয়ায় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এসব এলাকায় অতীতেও জঙ্গিদের আস্থানা ছিল। পুরো বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। পেছন থেকে কে বা কারা ইন্ধন দিয়েছে—সব খুঁজে বের করা হবে। বিশেষ গোষ্ঠী পরিকল্পিভাবে এ ঘটনা ঘটাতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তদন্ত করে ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আগামী সাধারণ নির্বাচন সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৫ ফেব্রুয়ারির মতো ভোটারবিহীন কোনো নির্বাচন দেশে হবে না। আগামী নির্বাচনে জনগণ অংশ নেবে, বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও জনগণ ওই নির্বাচনে অংশ নেবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নেতিবাচক দিক তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, বিশ্বে সংসদীয় গণতন্ত্রে যে পদ্ধতিতে নির্বাচন হয়, বাংলাদেশেও সেভাবেই হবে।
বিশ্বব্যাংক না গেলে না যাবে -প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
এম আবদুল্লাহ, নিউইয়র্ক : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবারও নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করার সংকল্প ব্যক্ত করে বলেছেন, ‘বিশ্বব্যাংক না গেলে যাবে না, আমরাই করব’। বিশ্বব্যাংকের ঋণ দিতে অনীহার কারণ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘অমুক এমডি না থাকলে পদ্মা সেতু হবে না— এমন মন্তব্য শুনতে হয়েছে আমাদের।’ নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে বরেণ্য আইনজ্ঞ ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের সম্মতিকে নাকচ করে দিয়ে তাকে কটাক্ষ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তার অবস্থা হয়েছে—‘মুই কার খালুরে, মুই কার খালুরে।’ কক্সবাজারের রামুতে সংঘটিত সহিংসতার জন্য তিনি চারদলীয় জোটকে দায়ী করেছেন। নিউইয়র্ক থেকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রার প্রাক্কালে স্থানীয় সময় রোববার সন্ধ্যায় জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব মন্তব্য করেন। নির্বাচনকালীন সরকারপ্রধান হতে ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের সম্মতি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গল্পের অবতারণা করে বলেন, ‘এক লোক হাটে গিয়ে দেখল, তার সঙ্গে কেউ কথা বলছে না, তখন সে-ই চারদিকে তাকিয়ে চিত্কার করে বলতে লাগল—মুই কার খালুরে, মুই কার খালুরে, এর বেশি বলতে চাই না।’ পদ্মা সেতুর বিষয়ে পূর্ব নির্ধারিত সময় ১ অক্টোবর বিশ্বব্যাংক প্রতিনিধি দলের বাংলাদেশ সফরে না যাওয়া প্রশ্নে বেশ বিরক্তির সুরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘না গেলে যাবে না, আমরাই করব’। বিশ্বব্যাংকের ঋণচুক্তি বাতিল হওয়ার সঙ্গে মুহাম্মদ ইউনূসের কথিত সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, “এটি তো সবারই জানা আছে যে ‘অমুক এমডি না থাকলে পদ্মা সেতু হবে না’—এমন মন্তব্য আমাদের শুনতে হয়েছে।” সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যার বিচার পেতে সাংবাদিকদের ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমার বাবা-মা-ভাইসহ অন্যদের বিচার পেতে কত দিন অপেক্ষা করতে হয়েছে তাও আপনাদের বিবেচনা করা উচিত। তবে সাংবাদিকরা ক্লু দিলে হয়তো তাড়াতাড়ি তদন্ত শেষ হবে।’ কক্সবাজারের রামুতে সংঘটিত সহিংস ঘটনার জন্য প্রধানমন্ত্রী চারদলীয় জোটকে দায়ী করে বলেন, ২০০১ সালের নির্বাচনের পর যারা সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা-নির্যাতন চালিয়েছে এবারও তারাই এ ঘটনা ঘটিয়েছে। তিনি বলেন, ফেসবুকের মাধ্যমে কারা উসকানি দিয়েছে তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে চিহ্নিত করার কাজ চলছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। ওই অঞ্চলে জঙ্গিদের ট্রেনিং ক্যাম্প ছিল। সেটিও গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী আগামী নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থায় করার সম্ভাবনা আবারও নাকচ করে বলেছেন, জনগণ আমাদের ভোট দিয়েছে। আমরা সংবিধান সংশোধন করেছি। এখন পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসিতে যেভাবে নির্বাচন হয় সেভাবে হবে। ১৫ ফেব্রুয়ারির মতো ভোটারবিহীন নির্বাচন হবে না, জনগণ নির্বাচনে আসবে, দলগুলো আসবে, বিএনপিও সে নির্বাচনে অংশ নেবে। তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুতে সুশীল সমাজের বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, ‘সুশীল বাবুরা টকশোতে পাকা পাকা কথা বলেন, অথচ তারা উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়ে পদত্যাগ করেছিলেন।’ এ প্রসঙ্গে ড. আকবর আলি খানের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যিনি ২০০১ সালে বিচারপতি লতিফুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় কেবিনেট সেক্রেটারি থেকে ১৩ সচিবসহ কর্মকর্তাদের চাকরি খাওয়ার প্রতিবাদ করেননি, যিনি ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা থেকে নির্বাচন অনুষ্ঠানে ব্যর্থ হয়ে পদত্যাগ করেছেন, তার মুখে সুষ্ঠু নির্বাচন ও তত্ত্বাবধায়ক সম্পর্কে বক্তব্য মানায় না।’ প্রধানমন্ত্রী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সমালোচনা করতে গিয়ে জরুরি সরকারের সময় কিংস পার্টি গঠনের কথা উল্লেখ করে বলেন, আমাদের ছাত্র রাজনীতির সময়কার কিছু লোকদের নিয়ে দল গঠনের ষড়যন্ত্র হয়েছিল সে সময়। এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা ফেরদৌস আহমেদ কোরেশীকে ইঙ্গিত করে কৌতুকের সুরে বলেন, ‘তাকে বলা হয় ফের-দোষ-করেছি (ফেরদৌস কোরেশী)। তাদের মতো নামকাওয়াস্ত, সস্তা ও চালচুলোহীন, সম্বলহীন লোকদের নিয়ে দল গঠনের ষড়যন্ত্র সফল হয়নি। তিনি আরও বলেন, ‘আমি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে না ফিরলে আপনারা দেশে আর নির্বাচন পেতেন না।’ ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী সরকারের নিপীড়নের জন্য মইন উ আহমদ ও ফখরুদ্দীনের বিচার করা হবে মর্মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীরের বক্তব্য সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর মনোভাব জানতে চাইলে শেখ হাসিনা পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, বিচারের কথা কে বলেছেন? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা বলেছেন জানানোর পর প্রধানমন্ত্রী বলেন, এতে আমার প্রতিক্রিয়ার কী আছে? সংবাদ সম্মেলন শেষে নিউইয়র্ক সময় রাত ১১টা ২০ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় সোমবার সকাল ৯টা ২০-এ) এমিরেটস এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে দেশের পথে রওনা হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আট দিনের যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে রোববার (বাংলাদেশ সময় সোমবার সকালে) নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের সাফল্য তুলে ধরার পাশাপাশি চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, পদ্মা সেতু, সাগর-রুনি হত্যার বিচারসহ বিভিন্ন বিষয়ে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দেন। তবে সাংবাদিকরা আরও প্রশ্ন করতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী তার দেশে ফেরার তাড়ার কথা জানিয়ে প্রশ্নোত্তর পর্ব সংক্ষিপ্ত করেন। প্রশ্নোত্তর পর্ব পরিচালনাকারী জাতিসংঘ মিশনে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ড. একে আবদুল মোমেন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা না বলেই জানান, প্রশ্ন করতে আগ্রহীদের একটি তালিকা আমার হাতে আছে, আমি সে অনুযায়ী সুযোগ দেব। উপস্থিত সাংবাদিকরা এর প্রতিবাদ জানান। পরে অবশ্য তালিকার বাইরেও একাধিক সাংবাদিককে প্রশ্ন করার সুযোগ দেয়া হয়। ড. মোমেনের তালিকাভুক্ত সাংবাদিকদের অনেকেই প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকারের প্রশংসা করেন এমনকি আগামীতে তার দল ফের ক্ষমতায় যাবেন এমন আশাও প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রী ওই সাংবাদিকের মুখে ফুলচন্দন পড়ুক এমন কামনাও করেন। প্রশ্নোত্তরকালের একপর্যায়ে বেশ কয়েকজন সাংবাদিক একযোগে প্রশ্নের সুযোগ চাইলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের বিরুদ্ধে যে পত্রিকা সবচেয়ে বেশি লেখে তাকে সুযোগ দেন, তার প্রশ্নই নেব। এ পর্যায়ে নিউইয়র্কের ‘বাংলা পত্রিকা’র সম্পাদক আবু তাহের প্রশ্নের সুযোগ পান। সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে শেখ মুজিবুর রহমানের দেয়া ভাষণ শোনানো হয়। এ সময় ড. একে মোমেন জানান, দীর্ঘ এক বছরের প্রচেষ্টায় তারা ওই ভাষণ সংগ্রহ করতে সমর্থ হয়েছেন। ড. মোমেন প্রধানমন্ত্রীকে ভাষণের একটি ডিভিডি সংস্করণ প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন। ড. মোমেন সংবাদ সম্মেলনের সূচনা বক্তব্যে সরকারের দীর্ঘ ফিরিস্তি দিতে থাকলে সেখানে বিরক্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এক সাংবাদিক প্রতিবাদ করে ‘আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে শুনব’ বললে তিনি বক্তব্য শেষ করেন। তার আগে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের স্তূতিসমৃদ্ধ বক্তব্য দেন বাংলাদেশ মিশনের প্রেস মিনিস্টার মামুন-অর রশীদ। সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর প্রেসসচিব আবুল কালাম আজাদ, ওয়াশিংটন বাংলাদেশ দূতাবাসে কর্মরত প্রেস মিনিস্টার স্বপন সাহা উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সময় তারা করতালি ও ‘ঠিক ঠিক’ ধ্বনি দিয়ে সমর্থন জানান। সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে আসন গ্রহণ নিয়ে বেশ উত্তেজনাকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। সামনের সারিতে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী ও মিশন কর্মকর্তাদের বসাতে চাইলে সাংবাদিকরা এর প্রতিবাদ করে বলেন, সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরাই সামনে বসবেন, অন্যরা সামনে বসলে সাংবাদিকরা বর্জন করবে বলেও জানিয়ে দেয়া হয়। কয়েক দফায় সাংবাদিকদের সামনের সারি থেকে উঠিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়। এ সময় এসএসএফ সদস্য মেজর শমশের সাংবাদিকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। তিনি তার কথা শুনে প্রথম সারি ছেড়ে না দিলে সংবাদ সম্মেলন বন্ধ করে দেয়া এবং প্রধানমন্ত্রীকে অনুষ্ঠানে আসার ক্লিয়ারেন্স দেয়া হবে না বলে হুমকি দেন। সাংবাদিকদের বর্জনের মুখে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম চৌধুরীর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হলে নির্ধারিত সময় বিকাল ৫টার একঘণ্টা পর সন্ধ্যা ৬টায় সংবাদ সম্মেলন শুরু হয়। রামুর ঘটনা প্রসঙ্গ : প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনের শেষের দিকে কক্সবাজারের রামুতে সংঘটিত সহিংস ঘটনা সম্পর্কে তার কাছে জানতে চাওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওখানে কী হয়েছে আমার সব জানা আছে। শত শত নয়, ১৪টি ঘরে আগুন দেয়া হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কেউ উসকানি দিয়ে এ ঘটনা ঘটিয়ে থাকলে তা বের করা হবে। রামুতে উগ্রপন্থী মৌলবাদীদের ট্রেনিং ক্যাম্প ছিল। ফেসবুকের একটি ছবি কীভাবে ওখানে উত্তেজনা ছড়াল, কারা করল তা আইটি সার্ভার অনুসন্ধান করে বের করা হচ্ছে। তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। এর পেছনে কে আছে তা তদন্ত হচ্ছে। ভিডিও ফুটেজও আছে। কোন বয়সী লোক কীভাবে এসব ঘটিয়েছে তা আমাদের হাতে আছে। পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। উখিয়াতে ঘটনা ঘটেছে সেখানেও নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। দেশের আরও যেসব এলাকায় একই ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে সেখানেও ফোর্স মোতায়েন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের সুনাম নষ্ট করার জন্য কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে তা খুঁজে বের করা হবে। আপনারা জানেন ওই সব এলাকায় অতীতে জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ছিল। পদ্মা সেতু : প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চাওয়া হয়, পদ্মা সেতুর বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিনিধি দল ১ অক্টোবর ঢাকা সফর করার কথা ছিল, সেটি যাচ্ছে না তা আপনি জানেক কি না, জানলে আপনার প্রতিক্রিয়া কী? প্রশ্ন শেষ না হতেই প্রধানমন্ত্রী বেশ ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলেন, ‘না গেলে যাবে না, আমরাই করব’। তার আগে অন্য প্র্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগের আমলে আমরা পদ্মা সেতুর জন্য জাপানের কাছে গিয়েছিলাম। সেখানে সাড়া পেয়ে সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনও করেছিলাম। কিন্তু পরে জোট সরকার এসে তা আর করেনি। এখন তারা বলছে দুটি সেতু করবে। যারা একটি সেতু করতে পারেনি তারা করবে দুটি। বিমানের নিউইয়র্ক ফ্লাইট : প্রধানমন্ত্রীর আট দিনের নিউইয়র্ক সফরকালে বারবার সামনে এসেছে বাংলাদেশ বিমানের নিউইয়র্ক ফ্লাইট চালুর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন প্রসঙ্গ। সংবাদ সম্মেলনেও প্রশ্ন করা হয়, আপনি গত বছর বলে গিয়েছিলেন শিগগিরই বিমানের নিউইয়র্ক ফ্লাইট চালু হবে। এখনও হয়নি, কবে হবে? উত্তরে প্রধানমন্ত্রী স্বভাবসুলভ বিএনপি সরকারের ওপর দায় চাপিয়ে বলেন, বিএনপি সরকার বিমানকে ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। বিএনপির দুঃশাসনের কারণে বিমান আন্তর্জাতিক মান হারিয়েছে। আমরা বিমানের অনেক উন্নয়ন করেছি। হারানো গৌরব ফিরিয়ে এনেছি। কিন্তু ফ্লাইট চালু করতে তো উড়োজাহাজ লাগবে। দুটি নতুন উড়োজাহাজ কিনেছি। আরও দুটি কিনতে হবে। এটা তো এমন নয় যে বাজারে গেলাম আর ব্যাগ ভরে নিয়ে এলাম। নতুন উড়োজাহাজ কেনার পর নিউইয়র্ক ফ্লাইট চালু হবে। তত্ত্বাবধায়ক প্রসঙ্গ : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন প্রশ্নে আবারও সুশীল সমাজের সমালোচনা করার পাশাপাশি ড. আকবর আলি খান ও ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশীকে এক হাত নেন প্রধানমন্ত্রী। খালেদা জিয়া সম্পর্কেও তিনি বলেন, উনি আগে বলেছেন পাগল ও শিশু ছাড়া কোনো নিরপেক্ষ লোক নেই। ২০০৭ সালে বলেছেন তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাকে জনগণ ঝেঁটিয়ে বিদায় করবে। এখন আবার বলছেন, তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া নির্বাচন করবেন না। উনি কখন কী বলেন কোনো তাল নেই। মির্জা ফখরুলের প্রতি ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উনার যে মুখপাত্র তিনি তো ওয়ান-ইলেভেনে সংস্কারপন্থী ছিলেন। এখনও উনি কার হয়ে খেলছেন কে জানে। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারগুলোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, আমাদের অভিজ্ঞতা তো সুখকর নয়। সাংবাদিকদের উদ্দেশে প্রশ্ন করেন, তত্ত্বাবধায়কের দিনগুলো কি ভুলে গেছেন। সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেন, আপনার সরকারের চার বছরে অনেক সফলতার কথা বলেছেন, আপনি কি সরকারের কোনো ব্যর্থতা দেখেন। উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হ্যাঁ, আমরা একটি জায়গায় ব্যর্থ হয়েছি, তা হলো ২০০১ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি-জামায়াত জোট যেভাবে সারাদেশে সংখ্যালঘু ও আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে আমরা তা করতে পারিনি, এই এক ক্ষেত্রে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। এটিএন বাংলা ইউএসএর পরিচালক ফখরুল আলম সংবাদ সম্মেলনে প্রথম প্রশ্নের সুযোগ পান। তিনি প্রধানমন্ত্রীর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, নিউইয়র্ক সফরের সফলতার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, ‘আমার বিশ্বাস আপনার দল আবারও নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাবে। আমি জানতে চাই, আপনারা কোথায় ভোট বেশি পাওয়ার প্রত্যাশা করেন, শহরে না গ্রামে। গত নির্বাচনে আপনাদের প্রধান ইস্যু ছিল দুর্নীতি এবং মন্ত্রী-এমপিদের সম্পদের হিসাব দেয়ার কথা বলেছিলেন। সে হিসাব তো প্রকাশ করেননি।’ উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের মন্ত্রী-এমপিদের সম্পদের হিসাব আপনি নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটেই পাবেন। নির্বাচনের আগে সেটা দেয়া হয়েছে। তাছাড়া সব মন্ত্রীর সম্পদের হিসাব আমার কাছে আছে। এত বড় ফাইলে রাখা আছে। আয়কর আইনে হিসাব প্রকাশে বাধা আছে। এমপিদের সম্পদের হিসাব স্পিকারের কাছে আছে। দুর্নীতি না কমলে উন্নয়ন হতো না বলে দাবি করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতি থাকলে তো কমিশন খুঁজতে খুঁজতেই সময় শেষ হয়ে যেত, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হতো না। যেহেতু উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে, বুঝতে হবে দুর্নীতি হচ্ছে না। এ প্রসঙ্গে তিনি প্রবাদ বাক্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, এ জগতে হায়, তারা বেশি চায়, যার আছে ভূরি ভূরি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ গরিব মানুষের দল, তাই কোথায় ভোট বেশি পাব তা আপনারা বুঝে নিন। তবে নির্বাচনে আমরা জিতবো ইনশাআল্লাহ। আপনার মুখে ফুলচন্দন পড়ুক। প্রশ্নোত্তরের আগে বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের সাফল্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, আমরা ক্ষমতায় আসার আগে বাংলদেশের মানুষ মোবাইল ফোন দেখেনি। এখন মোবাইলে পোকার ছবি তুলে কৃষক তা পাঠিয়ে দিচ্ছে প্রতিকারের জন্য। কুইক রেন্টালে দুর্নীতি হলে বিদ্যুত্ উত্পাদন বাড়ত না বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। সব ক্ষেত্রে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির চেয়ে অনেক বেশি কাজ করেছেন বলে দাবি করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।