মোহন যেখানেই থাকো ভাল থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো..
মাহবুব জামান : ১৯৭৯ সালের এক সকালে বাংলাদেশ বেতার শাহবাগে শামসুল ইসলাম (ভাইছা’র) রুমে বসে আড্ডা দিচ্ছি একই রুমে জয়নুদ্দিন ভাইও বসে উনি একটি কবিতা লিখে সবাইকে দেখাচ্ছে সামনের সাহিত্যের পাতায় ইত্তেফাক এ যাবে। ঠিক এই সময় মিস্টি হাসি দিয়ে একজন রুমে ঢুকলো এবং আমার পাশের চেয়ারে বসে বললো ভাইছা ভালা নি, তখন শামসুল ইসলাম ভাই নোয়াখালীর ভাষায় কথা বলে পরিচয় করিয়ে দিল এর নাম মাহ্বুবুল হায়দার মোহন ভাল গান গায় । ঠিক সেই সময় সফি ভাই (আবু মোঃসফিকুল ইসলাম) ও মোতাহার হোসেন হেলাল ভাই (এনাউন্সার) দুজনেই এসে আমাকে ডেকে নিয়ে গেল, বললো চল শাহবাগ মোর থেকে চা আর সিংগারা খেয়ে আসি।

রেডিওতে চম্পক এবং অন্বেষা নামের দুটি অনুসঠানে নিয়মিত অংশ নিতাম দায়িত্বে ছিলেন শামীমা সুলতানা (পিপি)আপা। ২/৩ দিন পর শামীমা আপার কাছে জানতে পারলাম কাল রিহার্সেল আছে কন্ট্রাক্ট সাইন করে যেও। পরদিন রিহার্সালে যথা সময়ে উপস্থিত আমরা ৯/১০ জন এর আমি, মোঃ খসরু, পারভেজ(কিছুদিন আগে দূর্ঘটনায় নিহত) শাকিলা, নওশিন , খোকন বাড়ৌ,মাহবুবুল হায়দার মোহন সহ আরও কয়েকজন সংগীতায়নে ছিলেন কাদের জামেরী স্যার। তখন থেকেই মোহন এর সাথে ঘনিষ্ঠতা। একসাথে আড্ডা দেই, গান করি, বিভিন্ন জায়গায় গান করতে যাই, আমি আবার অভিনয় এবং মডেলিং ও করতাম । মোহন সোনালী ব্যাংকে চাকরি করতো। মোহন আবার সোনালী ব্যাংক এমপ্লোয়িজ এসোসিয়েশন এর নেতা ছিল । সোনালী ব্যাংকের হেড অফিসে বসতো, মোহন আবার বাম ঘরানার রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল।

একদিন ও বললো মাহবুব চলো একটা সংগঠন করি আমি বললাম মোহন আমি রাজনীতি পছন্দ করি না, ও বললো সাংস্কৃতিক সংগঠন মানে গণসংগীত এর দল আমি রাজী হয়ে গেলাম ।এরপর আর মোহনের খবর নাই। তার অফিসে গিয়ে জানতে পারলাম ওর পোস্টিং হয়ে গেছে চট্টগ্রাম । আর যোগাযোগ নাই , তখন তো আর মোবাইল ফোন ছিলো না। এর মাঝেই রাজনৈতিক পরিবর্তন জিয়াউর রহমানের মৃত্যু, প্রেসিডেন্ট সাত্তার আসলো তাকে সরিয়ে জেনারেল এরশাদের আগমন । এরশাদের সামরিক শাসন চলছে, বিটিভিতে আমরা সমর দাস দাদার সগীতায়নে রিহার্সাল করছি হঠাৎ মোহন এর সাথে দেখা ও বললো তার পোস্টিং এখন ঢাকায় আগের জায়গায় । পরেরদিন ওর সাথে দেখা হলো সে আমাকে নিয়ে গেল ২৩/২ তোপখানা রোডের শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দলের অফিসে ওখানে নির্মল সেন, সিদ্দিকুর রহমান এবং মোখলেসুর রহমান এর সাথে পরিচয় করিয়ে দিল।

সপ্তাহ খানেক পরে নির্মল দাদা, মোহন এবং আমি বসে ঠিক করলাম একটি গণসংগীত এর দল বানাবো , তখন ঋষিজ এবং উদীচী নামের দুটি সংগঠন আছে, একটি কর্নধার ফকীর আলমগীর আর উদীচী’র মাহমুদ সেলিম । আমি এবং মোহন ১৮/২০ জনের একটি সংগঠন দাড় করিয়ে ফেললাম কিন্তু সমস্যা হচ্ছে নাম নিয়ে, সংগঠনের নাম কি হবে । সিদ্দিকুর রহমান ভাইয়ের বাসায় মিটিং করি তখন মোহন একটি নাম প্রস্তাব করে ” ক্রান্তি ” কিন্তু প্রশ্ন দাড়ায় এই ক্রান্তি নামের স্বাধীনতার আগে একটি সংগঠন ছিল । তার সভাপতি ছিল শেখ লুতফুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক ছিল কামাল লোহানী । আমি এবং মোহন তখন নজরুল একাডেমীতে গেলাম শেখ লুতফুর রহমান এর কাছে উনি অসুস্থ মানুষ হাটাচলা অক্ষম , ক্রান্তি নামের ব্যাপারে তার আপত্তি নাই বলে জানালেন, পরে কামাল লোহানী ভাই এর ওখানে গেলাম উনি তখন প্রেস ইনিস্টিউটের ডিজি, তিনি বললেন স্বাধীনতার আগে ৬৬/৬৭ সালে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ক্রান্তি নামের সংগঠনের বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছিল । এখন এই ক্রান্তি নামের সংগঠনে তাদের কোনো আপত্তি নাই।

আমাদের দু’জনকে অভিনন্দন জানিয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে বললেন তোমারা শুরু কর আমি আছি । আমি মোহনকে বললাম লোহানী ভাই কিভাবে সহযোগিতা করবে উনি তো জেঃএরশাদের গোলামী করে। মোহন বললো দুর চেপে যাও আমরা যে কাজে এসেছি তা তো সাকসেসফুল । তারপর ” ক্রান্তি ” নাম দিয়ে সংগঠন শুরু করি। মোহন ১ নং সদস্য আমি ২ নং সদস্য , ১৯৮৩ সালে শুরু হয় একটি গণমূখী সাংস্কৃতিক সংগঠন এর কাজ। বাংলাদেশের শিল্পী অঙ্গনের এমন কেউ বাদ ছিলনা যারা আমাদের ক্রান্তি’র সাথে সংযুক্ত ছিলনা।

দিলরুবা খান, রিজিয়া পারভীন, এম, এ, খালেক, মোঃ খসরু, হাসান চৌধুরী, মোঃ পারভেজ, মৌসুমি কবীর, নিলুফার বানু লিলি, নাজমা হক, রেবা রহমান, কিরণ চন্দ্র রায়, চন্দনা মজুমদার , জাকির হোসেন আখের,পুর্না ঘোষ, দেবব্রত রায়, হিরু, নাহিদ, রোমান, হাবিবুর রহমান জালাল ব্যাংকার, মসউদ মান্নান (বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের রাস্ট্রদূত) , সফি উদ্দিন সিকদার (জিএম বিটিভি) বেনু শর্মা (সিওও বৈশাখী টিভি) শফি কামাল (শিল্পকলা একাডেমি), ফরিদ উদ্দিন বাসার( সাংবাদিক), মাঈনুল হক ভূইয়া (সাংবাদিক), সাইফুল বারী মাসুম (সাংবাদিক), কবিতা হায়দার (সাংবাদিক বিচিত্রা) সিকান্দার ফয়েজ (সাংবাদিক), বাদল রায় (সাংবাদিক), হারুনুর রশীদ ব্যাংকার, মঞ্জুর মোর্শেদ ব্যাংকার, আমিনুর রহমান মিলন ব্যাংকার আরও কতো সুহৃদয় নাম লিখে শেষ করা যাবে না। ক্রান্তির জন্মটাই হয়েছে একটা যুদ্ধের মধ্যে, এরশাদের সামরিক শাসনের মধ্যেই আমরা গণসংগীতের উদ্দাম তান্ডবের ঝড় তুলেছিলাম। নির্মল দাদা আমাকে এবং মোহনকে ডেকে নিয়ে বলতেন গান – বাজনা যে কর পেটে কিছু পড়ে? মাঝে মধ্যে টাকা পয়সাও দিতেন, নির্মল দাদা ক্রান্তি’র সবার জন্য একটা অফিসের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন, আমরা ক্রান্তির মিটিং, রিহার্সেল, আড্ডা সব কাজকর্ম এই ২৩/২ তোপখানা রোডের এই অফিসই ঠিকানা ছিল।
এরশাদের সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে দূর্বার গণসংগীত এর আন্দোলন চালিয়েছি। একদিন প্রেসক্লাবের সামনে গণসংগীত পরিবেশন করছিলাম হঠাৎ এরশাদের পাচাঁটা আর্মি এবং বিডিআর’রা আমাদের গণসংগীতের দলের উপর হামলা চালায়, আমরা দিকবিদিকশুন্যতায় এদিক সেদিক চলে গেলেও বন্ধু মোহন সংগঠনের সভাপতিকে ধরে নিয়ে যায় সামরিক জান্তা। পরেরদিন বাংলাদেশের এমন কোনো পত্রিকা ছিলনা যেটাতে বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্রান্তির সভাপতি মাহবুবুল হায়দার মোহন এর গ্রেফতারের খবর ছাপা হয়নি ! পরদিনই কোর্টে আমরা ঢাকার সব পত্রিকার কপি নিয়ে হাজির হলাম, কয়েকশত মানুষের দাবীর মুখে বিচারক মোহনকে মুক্তি দিয়ে বাধ্য হয়। তারপর আসে ৮৮ সালের বন্যা, আমি আগেই বলেছি গানের সাথে অভিনয়ও করতাম, ৮৮ সালের বন্যার কয়েকদিন আগে একটি সিনেমার সুটিং এর জন্য কক্সবাজার যাই, এদিকে জানতে পারি ঢাকা শহরের ৯৫%ডুবে গেছে পানিতে। ঢাকার সাথে রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেল। পরে ভেঙ্গে ভেঙ্গে লঞ্চে চাঁদপুর হয়ে সদরঘাট দিয়ে ঢাকায় ফিরে আবার ক্রান্তির সবাইকে নিয়ে মহাপ্লাবনে বানভাসিদের সাহায্যে ঝাপিয়ে পড়েছি, গান গেয়ে, পথনাটক করে চাঁদা তুলে, কবিতা হায়দার এর সহযোগিতায় কিছু এনজিওর থেকে সাহায্য নিয়ে অসহায়দের মাঝে বিতরণ করেছি।
৮৮ র বন্যার কারনেই জেঃ এরশাদ আরো ২ বছর বেশি ক্ষমতায় ছিল। বন্ধু মাহবুবুল হায়দার মোহন এর সাথে আমার পারিবারিক সম্পর্ক ছিল, মোহন এর মনিপুরীর বাসায় নিয়মিত যাতায়াত ছিল আমার, আমাকে একদিন বলছে, মাহবুব সবাই ধরেছে বিয়ে করার জন্য, আমি বললাম বেশতো মেয়ে কোথাকার, ও বললো ঢাকারই পূর্ব রাজাবাজার স্থানীয়, মৃত্তিকা সদনে চাকরি করে। ভাবী’র সাথে কথা বললাম ভালোই ঘরোয়া ভাবে বিয়ে হয়ে গেল। মোহনের শশুর বাড়ির সবাই আমাকে অনেক স্নেহের চোখে দেখতো। আমি ৯০ সালে বিদেশে চলে যাই , বিদেশ থেকে টুকটাক কথা হতো। মাঝে মধ্যে দেশে আসলে দেখা হতো। দেশে এসে জানলাম মোহন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সমন্বয়কারী বড় সংগঠক তাই তো হবার কথা । সারাজীবন সংগঠন আর সংগঠন।
জীবনটাই উৎসর্গ করেছে দেশের জন্য, দেশের মানুষের স্বার্থের জন্য । নিজের জন্য সংসারের জন্য বউ, বাচ্চাদের জন্য কিছুই করে নাই। প্রিয় বন্ধুটি যখন অসুস্থতায় আক্রান্ত হয়েছিল আমি তখন দেশের বাইরে। অন্য বন্ধুদের মাধ্যমে জানতে পারি এই অকুতোভয় দুঃসাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধা, এবং সংস্কৃতির কন্ঠযোদ্ধা মাহবুবুল হায়দার মোহন আমাদের সবাইকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেছে। আমি মহান আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করি তুমি এই মানুষটিকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান কর। সবশেষে আবারও বলবো মোহন যেখানেই থাকো ভাল থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো —- তোমারই মাহবুব***।
- DRIVER CHARGED WITH MANSLAUGHTER IN DEADLY HIT-AND-RUN IN MARCH ON JAMAICA AVENUE
- নিউইয়র্কে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক সাংসদ অধ্যাপক সেলিম ভূঁইয়াকে সংবর্ধনা, কুমিল্লা বিভাগ শুধু সময়ের ব্যাপার
- UN General Assembly Adopts Bangladesh-Led Culture of Peace Resolution
- বাংলাদেশের উত্থাপিত ‘শান্তি ও সহাবস্থানের সংস্কৃতি’ বিষয়ক প্রস্তাব গ্রহণ করল জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ
- নিউইয়র্কের জ্যামাইকায় জল খাবার রেস্টুরেন্ট এর গ্র্যান্ড ওপেনিং
- New York Attorney General James Secures $375,000 from 1-800-Flowers for Deceiving Consumers About Automatic Subscription Renewals
- নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসে বাংলাদেশি আমেরিকা পুলিশ কর্মকর্তার নামে সড়ক ‘ডিটেকটিভ দিদারুল ইসলাম ওয়ে’
- ECOSOC recommends UN General Assembly to take decision on Bangladesh and Nepal’s LDC graduation extension requests