রেলওয়েগেট কেলেঙ্কারি- সেই রাতে বিজিবি হেড কোয়ার্টারে কি ঘটেছিল

নাশরাত চৌধুরী: রেলওয়েগেট কেলেঙ্কারি নিয়ে সে রাতে কি ঘটেছিল বিজিবি হেড কোয়ার্টারে? এ প্রশ্ন এখন দেশজুড়ে। কেনই বা কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িতদের আটকের পর ছেড়ে দেয়া হলো? কেন পুলিশে দেয়া হলো না তাদের? টাকা জব্দ করা হলো না কেন? এমন নানা প্রশ্ন সর্বত্র। তবে অনুসন্ধানে জানা যায়- উপরের নির্দেশেই টাকা জব্দ না করে আটককৃতদের ছেড়ে দেয় বিজিবি। এ বিষয়ে কোন কথা না বলার জন্যও বিজিবি’র ওপর চাপ রয়েছে। টাকা উদ্ধারের পর বিজিবি’র মহাপরিচালক পরিকল্পনাও করেছিলেন টাকা জব্দ করে তা পুলিশের হাতে তুলে দেয়ার। সেই সঙ্গে আটককৃতদেরও পুলিশের হাতে তুলে দেয়ারও ইচ্ছা ছিল তার। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তা পারেননি। অনুসন্ধানে জানা যায়, সোমবার রাতে গাড়ি থেকে বিজিবি ৭০ লাখ টাকা উদ্ধার করেছিল। ওই টাকা তারা জব্দ করে নিউমাকের্ট থানায়ও হস্তান্তর করার সিদ্ধান্ত নেয়। বিজিবি’র এলাকটি চারটি থানায় পড়েছে। নিউমার্কেট, লালবাগ, ধানমন্ডি ও হাজারীবাগ থানা। ঘটনাটি নিউমার্কেট থানা এলাকার মধ্যে হওয়ায় সেখানেই জানানোর সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু প্রভাবশালী মহলের চাপে তারা তা করতে পারেনি বলে বিজিবি সূত্র নিশ্চিত করেছে। সূত্র জানায়, বিজিবি’র সদর দপ্তরে কোন গাড়ি অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করতে পারে না। এই অবৈধভাবে গাড়ি প্রবেশের অপরাধে ব্যবস্থা নেয়ার নিয়ম থাকলেও তা নেয়া হয়নি। এমনকি চাপের কারণে থানায় অভিযোগ পর্যন্ত দায়ের করতে পারেনি বিজিবি।
ওদিকে রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের এপিএস ওমর ফারুক তালুকদার তার ব্যাংক হিসাবে ওই টাকা জমা করেছেন। টাকা জমা দেয়া হয়েছে বুধবার সকালে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ধানমন্ডি শাখায়। ওই ব্যাংকের মতিঝিল শাখায় ওমর ফারুকের ব্যক্তিগত হিসাব রয়েছে। অনলাইনে ধানমন্ডি শাখায় জমা দেয়া ৭০ লাখ টাকা ইতিমধ্যে মতিঝিল শাখায় স্থানান্তরিত হয়েছে। হিসাব খোলার ফরমে সম্ভাব্য লেনদেনের সঙ্গে ফারুকের জমা করা অর্থের পরিমাণের মিল না থাকায় ‘সন্দেহজনক লেনদেন’ হিসেবে মার্কেন্টাইল ব্যাংক গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে এ বিষয়ে রিপোর্ট করেছে। এছাড়া বড় অঙ্কের নগদ লেনদেনের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকে রিপোর্ট করার যে নিয়ম রয়েছে, সে অনুযায়ী এ সম্পর্কে আলাদা রিপোর্ট করা হয়েছে।
বিজিবি’র একটি সূত্র জানায়, সোমবার রাতে চারজনকে গেটে আটক করে বিজিবি’র সদর দপ্তরে গোয়েন্দারা জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এ সময়ে রেলমন্ত্রীর এপিএস ওমর ফারুক তালুকদার প্রথমে তার পরিচয় দেন সাংবাদিক। তিনি বেশ কয়েকজন সিনিয়র সাংবাদিকের নাম বলেন। বলেন, তারা কলিগ। তিনি সাংবাদিক জানার পর বাকিদের পরিচয় জানতে চান বিজিবি’র সদস্যরা। এই পর্যায়ে অন্যরা তাদের আসল পরিচয় জানাতে বাধ্য হন। এপিএস-এর পরিচয় এক সময়ে বের হয়ে আসে। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর কিছুটা সন্দিহান হয়ে পড়ে বিজিবি’র কর্মকর্তারা। তারা বিষয়টি নিরাপত্তা বিভাগের প্রধানকে জানান। তিনি জানার পর ঘটনাটি গোয়েন্দা বিভাগের প্রধানকে জানান। তারপর তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখেন। পাশাপাশি তারা বিষয়টি মহাপরিচালক ও ডিডিজিকে জানান। তারা বিষয়টি দেখার আশ্বাস দেন। ঘটনা রাতে হলেও মহাপরিচালক তাদের রেখে দিতে বলেন। ছেড়ে দেয়ার কোন সিদ্ধান্ত দেননি। বিষয়টি যথাযথভাবে খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেন। মন্ত্রীর বাসায় এত টাকা নিয়ে কেন যাচ্ছেন তা জানতে চাইলে এপিএস প্রথমে টাকা মন্ত্রীকে দেয়ার কথা স্বীকার করেননি। নিজের বলেই দাবি করেন। জিএম ইউসুফ মৃধা স্বীকার করেন টাকা নিয়ে তারা মন্ত্রীর বাসায় যাচ্ছিলেন। মন্ত্রীর নাম-ঠিকানা জানার পর নড়েচড়ে বসেন বিজিবি’র কর্মকর্তারা। তারা সিদ্ধান্তহীনতায় পড়েন। কিন্তু কি করবেন বুঝতে পারছিলেন না। ওদিকে সকালেই মিডিয়ায় ঘটনা জেনে যায়। বিডিআরের ডিজি সাংবাদিকদের কাছে স্বীকার করেন একটি ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল, পরে তা মিটে গেছে। যারা ভেতরে ঢুকেছিল তাদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে বিজিবি’র যাতে কোন ঝামেলা না হয় এ জন্য মুচলেকা নিয়ে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে। বিজিবি’র সূত্র বলেছে, ওই টাকা আমরা চেয়েছিলাম জব্দ করে জড়িতদের পুলিশে সোপর্দ করতে। কিন্তু উপর থেকে চাপ আসে। তখন তাদের সবাইকে ছেড়ে দিতে হয়েছে। এমনকি ওই বিপুল পরিমাণ টাকাও দিয়ে দিতে হয়েছে। এদিকে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, গাড়ি চালক আজমকে নিয়ে। আজমের কোন হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। আজম এখন কোথায় জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, আমাদের কাছে নেই। আমরা তাকে ছেড়ে দিয়েছি।
সূত্র জানায়, বিজিবি’র সদর দপ্তরের ভেতরে সংঘটিত ঘটনা জানার পর রাতেই সরকারের প্রভাবশালী কয়েকজন ব্যক্তি বিজিবি’র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ফোন করেন। তারা তাদের ছেড়ে দিতে অনুরোধ করেন। রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তও ফোন করেন। এক পর্যায়ে মন্ত্রী বিজিবি’র সদরদপ্তরেও যান। মহাপরিচালকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বিজিবি সূত্র জানায়, তাদের পরিচয় না জানার কারণে তাদের সারারাত বসিয়ে রাখা হয়। সকালে তাদের পরিচয় জানার পর মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়। বিজিবি’র এক কর্মকর্তা বলেন, আমরা তাদের আটক করেছি অনুমতি ছাড়া ভেতরে প্রবেশ করার কারণে। অবৈধ টাকা বহন করার জন্য আটক করা টাকা জব্দ করা পুলিশের কাজ।
সূত্র মতে, ওমর ফারুক বিজিবি’র কর্মকর্তাদের জানিয়েছিলেন, টাকার বস্তা নিয়ে পূর্বাঞ্চলীয় রেলের মহাব্যবস্থাপককে সঙ্গে করে জিগাতলায় সুরঞ্জিতের বাসার দিকেই যাচ্ছিলেন। ওই টাকা মন্ত্রীর টাকা। এ কারণে তারা এ নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করেনি। ওমর ফারুক মন্ত্রীর খুবই বিশ্বস্ত কর্মচারী। তিনি বেশিরভাগ সময়ই কাজ শেষে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তর সঙ্গে বের হতেন। সোমবার দিন তিনি মন্ত্রীর সঙ্গে বের হননি। আগেই বের হয়ে যান। সংসদ ভবন থেকে বের হয়ে তিনি যান অন্য স্থানে। যেখানে মন্ত্রীই তাকে যাওয়ার জন্য সায় দিয়েছেন। ওইদিন রাতে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত তার জিগাতলার বাসায় অপেক্ষা করছিলেন ওমর ফারুক ও মৃধার টাকার জন্য। যদিও সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বারবার অভিযোগ অস্বীকার করে যাচ্ছেন। উল্টো বলেছেন, ফারুক মিথ্যা বলছে। বিজিবি’র কর্মকর্তাদের কাছে ফারুক স্বীকার করেছে, ঘটনার রাতে গাড়িচালক আজমকে মন্ত্রীর জিগাতলার বাসায় যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ওমর ফারুক সোমবার রাত পৌনে ৯টায় সংসদ ভবন কার্যালয় থেকে বের হন। এরপর যান ল্যাবএইড হাসপাতালে। সেখানে তার স্ত্রীকে ডাক্তার দেখান। এরপর তিনি তার স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে মোহাম্মদপুরে যান। তাজমহল রোডে স্ত্রী ও সন্তানকে নামিয়ে দেন। এরপর যান সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায়। রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক ইউসুফ আলী মৃধা তাকে ফোন করে জানান তিনি অপেক্ষা করছেন। সেখান থেকে তাকে ও এনামুলকে তুলে নেন। এরপর গাড়ি জিগাতলার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। জানা গেছে, সুরঞ্জিতের কাছে অনেকেই এপিএস ফারুকের বিভিন্ন অপকর্ম সম্পর্কে তথ্য দিয়েছিলেন। সুরঞ্জিত তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থাই নেননি। বিজিবি’র কাছে ওমর ফারুক স্বীকার করেছেন, সোমবার রাতে তিনি জিগাতলাস্থ মন্ত্রীর বাসার উদ্দেশে রওনা হন। যেতে যেতে গাড়ি চালক আজম খান কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই গাড়িটি রাইফেল স্কয়ারের পাশ দিয়ে পিলখানার ভেতর ঢুকিয়ে দেয়। টাকার ব্যাগ রেখে গাড়ি থেকে নেমে যেতে বলে। ওই সময়ে মোবাইলগুলো ছিনিয়ে নেয়। টাকার কথা কেউ না জানলেও মৃধা ও আজম জানতো। আজম গাড়ি থেকে নেমে বিজিবি সদস্যদের জানায়, গাড়িতে অবৈধ টাকা রয়েছে। ওই টাকা অবৈধ নয় বলে ফারুক বিজিবি’র সদস্যদের জানান। পাশাপাশি টাকা ও তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা প্রদানের অনুরোধ জানান। ওই সময়ে কর্তব্যরতরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জানায়।মানবজমিন
- ওয়ার্ল্ড হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট ইউএসএর সাধারণ সম্পাদক ড. সাদিয়া আফরিন এরা
- চরমোনাই পীরের যুক্তরাষ্ট্র সফর উপলক্ষে নিউইয়র্কে দোয়া মাহফিল, কুরআন-সুন্নাহর আলোকে বয়ান
- New York Attorney General James Secures Reimbursements for T-Mobile Customers Whose Rates Were Unjustly Raised
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে কুনু-ফিরোজ পরিষদের সাত দফা ইশতেহার ঘোষণা; কমিউনিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠা, সাশ্রয়ী ফিউনারেল সেবা, বিমানের সরাসরি ফ্লাইট ও আর্থিক স্বচ্ছতায় অঙ্গীকার
- ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের পূর্ণ সমর্থন: জাতিসংঘে রাষ্ট্রদূত আইরিন খান
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে প্রথমবারের মতো বিতর্ক, গুরুত্ব পেল স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি
- New York Attorney General James Warns New Yorkers About AI-Generated Election Misinformation Ahead of November Elections
- Bangladesh calls for global treaty to protect victims of crimes against humanity