Monday, 8 June 2026 |
শিরোনাম
বাংলাদেশ ল’ সোসাইটি ইউএসএ’র সভাপতি ওয়াহিদ ও সাধারণ সম্পাদক কামালকে অব্যাহতি; ব্যারিষ্টার আকমাম ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও শাবু ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে SUSPENDED ATTORNEY CHARGED WITH GRAND LARCENY FOR STEALING MORE THAN $1 MILLION FROM BORROWERS, DIME COMMUNITY BANK Six Bangladeshi Peacekeepers Posthumously Awarded UN Dag Hammarskjöld Medal নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ড্যাগ হ্যামারশোল্ড পদকে ভূষিত ছয় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া স্টেট সিনেট নির্বাচনে বাংলাদেশি-আমেরিকান শেখ রহমানের টানা পাঁচবার জয় A Star Dimmed: Mourning the Loss of Tofail Ahmed, Architect of Our History নিউইয়র্ক ষ্টেট অ্যাসেম্বলী ডিষ্ট্রিক্ট-৩০’র প্রাইমারী নির্বাচনে শামসুল হকের সমর্থনে জ্যামাইকায় ফান্ড রেইজিং Bangladesh Secures Historic Victory in UNGA Presidency New York Attorney General James Secures Refunds for All New Yorkers Cheated by Nissan Dealerships’ Lease Overcharge Schemes নিউইয়র্কে নতুন সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘হৃদয় বীণা সংগীতালয়’র যাত্রা শুরু
সব ক্যাটাগরি

সইতে কষ্ট হচ্ছে লোহানী, শান্তিতে ঘুমাও

অনলাইন ডেস্ক পঠিত: 199 বার

প্রকাশিত: June 21, 2020 | 1:51 PM

রণেশ মৈত্র : শরীরটা খারাপ ছিলো। শুয়ে ছিলাম। ঘুমিয়েও পড়েছিলাম। তাই কামাল লোহানী তার ভালোবাসা পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবার এক ঘন্টা পরে নানা চ্যানেলে (টেলিভিশনের) ও ফেইসবুকে মর্মান্তিক খবর। গভীর মর্মবেদনা আমার বাকি জীবনটুকু তাড়িয়ে বেড়াবে।
লোহানী বলে ডাকতাম-সেই ছোটবেলা থেকে। ১৯৫০ সালের কথা-জনা কয়েক পাবনার তরুণ মিলে ‘শিখাসংঘ’ নামক বাম প্রগতিশীল চেতনা সমৃদ্ধ একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তুলেছিলাম। তখন পাকিস্তান সবে জন্ম নিয়েছে। প্রয়াত বন্ধু আবদুল মতিন, কামাল লোহানী এবং আরও বেশ কিছু সমমনা তরুণ মিলে যেন শ্বাসরোধ করা পাকিস্তানী পরিবেশ পাল্টাতে চেতন-অবচেতনভাবে মার্কসীয় সমাজতান্ত্রিক-সাম্যবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ সমাজ পাল্টানোর নানামুখী কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম।
পেছন ফিরে দেখি সেই অসাধারণ দিনগুলিকে। বাহান্নর মিছিলে পাবনার রাস্তায় সবাই মিলে শহরে নেমেছিলাম। লোহানী ছিলেন জেলার স্কুলের ছাত্র। শিখাসংঘের নেতা-কর্মীরা মিলে মুসলিম ছাত্র লীগের নেতারা সহ সেদিন আমরা পাবনার সকল স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীকে ক্লাস বর্জন করিয়ে মিছিলে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতির দাবীতে সমবেত করতে সফল হয়েছিলাম।
গভীর উত্তেজনায় ভরা সে মিছিল। শ্লোগানে শ্লোগানে উচ্চকিত পাবনার পীচ ঢালা কলো রাজপথ-পাবনার সমগ্র জনগণকে উদ্বুদ্ধ সে মিছিল। ইতিহাসের বাঁক ঘোরানো এই মিছিলকে বাধাগ্রস্ত করেছিলো সেদিনের পুলিশ। সে বাধা মানি নি কেউ-বরং আরও দৃপ্ত পদক্ষেপে অধিকতর উচ্চকিত শ্লোগানে পাবনাকে কাঁপিয়েছিলাম। শ্লোগান লিড করতে হতো মতি, লোহানী ও আমাকে। প্রচারেও থাকতে হতো আমাদেরকেই টিনের চোঙা হাতে।
আজ আর সেদিনগুলি নেই সঙ্গত কারণেই। কিন্তু স্মৃতি আছে আনন্দময় স্মৃতি-দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের কাজে জীবন মরণ পণ করা সংগ্রামে ঝুাঁপিয়ে পড়ার স্মৃতি।
১৯৫২ সালের নভেম্বরে আমরা মতিনের বাসায় তার বাবা মুসলিম লীগ নেতা বেলায়েত হোসেন মোক্তারের চেম্বারে বসে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের পাবনা জেলা সংগঠনিক কমিটি গঠন করি। আমাকে সভাপতির এবং মতিনকে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কী প্রবল উদ্দীপনা আজ অনেকটাই অবিশ্বাস্য বলে মনে হয়।
এলো ১৯৫৩ সাল। আমি গোপাল চন্দ্র ইনষ্টিটিউশনের ছাত্র হিসেবে ১৯৫০ সালে ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের প্রথম ব্যাচে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে পারিবাররিক অর্থ সংকটের কারণে কলেজে ভর্তি না হয়ে এডরুক লেবরেটারী নামক ওষুধ প্রস্তুত কারকানায় অফিস সুপারিষ্টেন্ডেন্ট হিসেবে চাকুরী নেই। কামাল লোহানী জেলা স্কুল থেকে, আবদুল মতিন পাবনা গোপাল চন্দ্র ইনষ্টিটিউশন থেকে ( আমিও জি.সি. ইনষ্টিটিউশনের ছাত্র ছিলাম) ১৯৫২ সালে ম্যাট্রিক পাশ করে এডওয়ার্ড কলেজে ভর্তি হয়। আমিও ভর্তি হলাম চাকুরীতে ইতি দিয়ে।
এবারে ছাত্র ইউনিয়নের শাখা-প্রশাখা জেলা ব্যাপী (তখন সিরাজগঞ্জ ছিল পাবনা জেলার অন্তর্গত একমাত্র মহকুমা) ছড়ালো ও সংগঠনকে শক্তিশালী করে গড়ে তোলার পালা। মাস কয়েকের মধ্যেই ছাত্র ইউনিয়নকে আমরা সকলে মিলে পাবনা জেলার বৃহত্তম ছাত্র সংগঠন হিসেবে দাঁড় করাতে সক্ষম হই।
এলো এডওয়ার্ড কলেজ ছাত্র সংসদের ৫৩-৫৪ শিক্ষাবর্ষের নির্বাচন। ছাত্র ইউনিয়নের মনোনয়নে আমরা ভি.পি. জে. এস. সহ গোটা ক্যাবিনেট (মাত্র একজন বাদে) বিপুল ভোটাধিক্যে জয়লাভ করি। তখন পর্য্যন্ত এডওয়ার্ড কলেজে মুসলিম ছাত্র লীগ ছিল শক্তিশালী অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্র সংগঠন।
১৯৫৩ সালের জুলাইতে পাবনা জেলা ছাত্র ইউনিয়নের প্রথম জেলা সম্মেলন। কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে এলেন ভাষা-মতিন নামে খ্যাত আবদুল মতিন। গাজীউল হক, সহ-সম্পাদাক আবদুস সাত্তার ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইলিয়াস। পাবনা টাউন হলে অনুষ্ঠিত দু’দিন ব্যাপী সম্মেলন, কাউন্সিল অধিবেশন, গণসঙ্গীতের আবর। তার আগে নবনির্বাচিত কমিটির পরিস্থিতি এবং গণ সঙ্গীতের আসর প্রচ- আলোড়ন তুলেছিল পাবনাতে।
১৯৫৪ তে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন। ছাত্র ইউনিয়ন ছাত্র লীগ মিলে যৌথভাবে ছাত্র কর্মী শিবির পড়ে সবাই নির্বাচনী প্রচারণায় নেমে পড়ি। ৪ঠা ফেব্রুয়ারি আমার বাবা মারা যান।
নির্বাচনী এলাকা থেকে ফিরে এসে ১১ দিনে অশৌচ পালন করে আবার নির্বাচনী এলাকা সুজানগর ফিরে যেতে চাইলে রাজনৈতিক নেতৃত্ব বাধা দেন। লোহানী আগে থেকেই পাবনাতে ছিলেন। নেতাদের অভিমত অনুযায়ী সেবার অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ রেখে পাবনাতে একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপনের দিনব্যাপী ব্যাপক কর্মসূচীর উদযাপনের দিনব্যাপী ব্যাপক কর্মসূচী নেওয়া হয়।
সেদিন বিশাল জনসমাবেশে পাবনা টাউন হলে মুসলিম লীগের ভোটে পরাজিত করে যুক্তফ্রন্টের সকল প্রার্থীকে বিজয়ী করার আহ্বান জানান হয়।
২২ ফেব্রুয়ারি ভোর ৪টা থেকে অজশ্র পুলিশ এসে বাড়ী ঘেরাও করে ফেলে। সকালে গ্রেফতার থানায় যাওয়ার পরপরই গ্রেফতার হয়ে এলেন কামাল লোহানী এবং আরও অনেকে। জেল খানায় বাস করতে হয় এক মাস। নির্বাচনী ফলাফল বেরোচ্ছিল প্রতি সন্ধ্যায়। খবর পাওয়া যাচ্ছিল মুসলিম লীগ প্রার্থীদের পরাজয়ের। কারাবাসের ঠিক ৩০ দিনের দিন নূরুল আমিনের পরাজয়ের খবর বেতারে প্রচারের সাথে সাথেই পাবনা শহরের আনন্দের জোয়ার বইতে শুরু করে-সন্ধ্যায়ই বেরোয় বিজয় মিছিল। পর দিনই আমরা মুক্তিলাভ করি জেল গেটে স্বত:স্ফুর্তভাবে হাজার হাজার লোকের সমাগম। মেইন গেট দিয়ে বেরোতেই মানুষের কাঁধে কাঁধে হলো আমাদের (ছাত্র নেতাদের স্থান) পরে এলো বিপুল সংখ্যক মালা। কারামুক্তদেরকে মাল্যভূষিত করে পুনরায় মিছিল করে যুক্তফ্রন্ট অফিসে চায়ের আয়োজন- অতি:পর বাসায় প্রত্যাবর্তন।
গঠিত হলো শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট সরকার। ৫৮ দিনের মাথায় ঐ সরকারকে করাচীর কেন্দ্রীয় সরকার বাতিল ঘোষণা করার সাথে সাথে পুনরায় সবাই গ্রেফতার হই। রাজশাহীর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে পাবনায় আটকের ১৭ মাস পরে লোহানী সহ আমরা মুক্তি পেয়ে চলে যাই রাজশাহী জেলা ছাত্র ইউনিয়ন কার্যালয়ে। দ্রুতই ছাত্র ইউনিয়ন ভূবন মোহন পার্কে আয়োজিত বিশাল গণ সম্বর্ধনা শেষে ছাত্র ইউনিয়ন কার্যালয়ে সংক্ষিপ্ত নৈশভোজ শেষে রাহের ট্রেওনে ইশ্বরদী এসে বাসে পাবনা। সেটা ১৯৫৫ সাল।
লোহানী ভালবাসতেন এডওয়ার্ড কলেজে আমাদের সহপাঠি দীপ্তিকে। পরিবারের আপত্তি অগ্রাহ্য করে তাঁরা বিবাহ পর্ব অনাড়ম্বর ভাবে শেষ করে উভয়ে ঢাকা চলে যান। কামাল লোহানী যোগ দেন দৈনিক মিল্লাতে। অত:পর সংবাদে। তারপর রাজশাহীর দৈনিক বার্তা প্রভৃতি।
বাল্যকাল থেকে বাপন্থী মতবাদের দীক্ষিত কামাল লোহজানী ঢাকাতে একটি সংগঠনের নাচের শিক্ষা নেন-হন সাময়িকভাবে অভিনয় শিল্পীও। অত:পর তাঁর হাতে গড়া সংস্কৃতিক সংগঠন ‘ক্রান্তি’ বেশ কিছুকাল ধরে পরিচালনা করেন। ক্রান্তিহ ছিল অনেকটা মাওবাদ সমর্থক।
এলো একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধ। লোহানী চলে গেলেন কলকাতায়। সেখানে বাংলাদেশ বেতারে বার্তা সম্পাদক নিযুক্ত হন।
মুক্তিযুদ্ধ শেষে দেশে ফিরে এসে ১০ জানুয়ারি-৭২ বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে ঢাকা বিমানবন্দর থেকে অন্যতম ধারা বিবরণী পাঠ করেন-যা বেতারে সরাসরি প্রচারিত হয়।
অত:পর গড়ে তোলেন বাম ধারার সাংস্কৃতিক সংগঠন গণশিল্পী সংস্থা। অল্প কয়েক বছর আগে উদচী শিল্পী গোষ্ঠীর সভাপতির আসন অলংকৃত করেন। দুই দফায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর ডাইরেক্টার-জেনারেল পদের দায়িত্ব পালন করেন। বছর কয়েক আগে দাপ্তি লোহানী মারা যান।
মার্কসীয় মতবাদে বিশ্বাসী হলেও তিনি কোন রাজনৈতিক দলে যোগ দেন নি। নিখাদ অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারক বাহাত্তরের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী দেখে ক্ষুব্ধ হন।
সেদিন আমরা যারা বিপ্লবী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নতুন ধারায় বন্ধুত্ব-বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলাম-লোহানী আর আমি বেঁচে ছিলাম। বাকীরা হারিয়ে গেছেন অনেক আগেই। সেদিন গেলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামন। আর আজ ২০ জুন কামাল লোহানীও সকলকে ছেড়ে পরপারে স্থান করে নিলেন। হয়ে পড়েছি নি:সঙ্গ-অতীতের সকল বিপ্লবী বন্ধুকে হারিয়ে।
বিদায় লোহানী।
স্যালিউট।
মনে রাখবো তোমাকে আমৃত্যু।

-লেখক, রণেশ মৈত্র

বিজ্ঞাপন / স্পন্সরড কন্টেন্ট
ট্যাগ:
সর্বশেষ সংবাদ
Situs Streaming JAV