Sunday, 26 July 2026 |
শিরোনাম
DRIVER CHARGED WITH MANSLAUGHTER IN DEADLY HIT-AND-RUN IN MARCH ON JAMAICA AVENUE নিউইয়র্কে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক সাংসদ অধ্যাপক সেলিম ভূঁইয়াকে সংবর্ধনা, কুমিল্লা বিভাগ শুধু সময়ের ব্যাপার UN General Assembly Adopts Bangladesh-Led Culture of Peace Resolution বাংলাদেশের উত্থাপিত ‘শান্তি ও সহাবস্থানের সংস্কৃতি’ বিষয়ক প্রস্তাব গ্রহণ করল জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ নিউইয়র্কের জ্যামাইকায় জল খাবার রেস্টুরেন্ট এর গ্র্যান্ড ওপেনিং New York Attorney General James Secures $375,000 from 1-800-Flowers for Deceiving Consumers About Automatic Subscription Renewals নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসে বাংলাদেশি আমেরিকা পুলিশ কর্মকর্তার নামে সড়ক ‘ডিটেকটিভ দিদারুল ইসলাম ওয়ে’ ECOSOC recommends UN General Assembly to take decision on Bangladesh and Nepal’s LDC graduation extension requests ইকোসকের সুপারিশ: বাংলাদেশ ও নেপালের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সাধারণ পরিষদ Bangladesh co-chairs multi-stakeholder panel session on Global Road Safety, calls for stronger institutions to save lives
সব ক্যাটাগরি

সাংবাদিক জগতের অন্যতম কিংবদন্তি গিয়াস কামাল চৌধুরী কেমন আছেন?

অনলাইন ডেস্ক পঠিত: 164 বার

প্রকাশিত: July 15, 2012 | 12:29 PM

আ ব দু ল হা ই শি ক দা র : শেষ আষাঢ়ের মেঘভাঙা রোদ মাথার ওপর। নিচে রাস্তার খানাখন্দে জমে থাকা কর্দমাক্ত পানি। রোদ আর পানির মিশ্রণে তৈরি হওয়া ভ্যাপসা গরমে অতিষ্ঠ রাজধানীর জীবন। যানজটে নাকাল হতে হতে আমি যখন ধানমন্ডির এক নম্বর সড়কের একুশ নম্বর বাসার দরজায় কলিংবেলে চাপ দিলাম, তখন ঘড়ির কাঁটা বারোটা পেরিয়ে গেছে। দরজা খুললেন রফিক উম মুনির চৌধুরী। রফিক উম মুনির চৌধুরী গিয়াস ভাইয়ের বড় সন্তান। বললাম, গিয়াস ভাই কেমন আছেন? কোথায় তিনি? তিনি আমাকে সালাম দিয়ে বললেন, আসুন। প্রশান্ত ড্রইংরুমের পূর্ব পাশের ঠিক মাঝখানে, সামনে একটা খোলা জানালা নিয়ে নিঃশব্দ-নীরবে বসে আছেন কেউ। আমরা এগিয়েছি পেছন দিক দিয়ে। তাই মুখটা দেখতে পাইনি। মুনির একটু ঘুরে সেই মানুষটার মুখোমুখি করে বললেন, এই যে আব্বু। আমি চোখ মেলেই দেখি গিয়াস ভাই। আমাদের সাংবাদিক জগতের অন্যতম কিংবদন্তি গিয়াস কামাল চৌধুরী। আমি সালাম দিলাম। আশা করছিলাম তার নিজস্ব স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে সহাস্যে বলবেন, ‘আরে শিকদার যে, ভালো আছেননি?’ কিন্তু কিছুই বললেন না তিনি। হাতটাও একটু নাড়ালেন না। যেভাবে বসে ছিলেন, সেভাবেই নির্বাক বসে রইলেন। একটা চোখ খোলা, অন্য চোখটা অর্ধবোজা। আমি আর কিছু বলার আগেই মুনির বললেন—চাচা, আব্বু তো কথা বলতে তেমন পারেন না। অনেক সময় কাউকে চিনতেও পারেন না। আর হাঁটাচলা, নড়াচড়াও করতে পারেন না। সম্পূর্ণ বেড রিডিং অবস্থায় পড়ে আছেন। আমি অপ্রস্তুত হয়ে পড়ি। গিয়াস ভাইয়ের অবস্থা এতটা খারাপ, চিন্তাও করিনি। গত ফেব্রুয়ারি মাসের ঘটনা। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এসেছেন অধুনালুপ্ত দৈনিক ঈশানের সম্পাদক ও প্রকাশক একেএম শাহজাহান। বললেন, ভাই, ঢাকায় তো আমার কম আসা হয়। তো এবার আসার সময় নিয়ত করে এসেছি, গিয়াস কামাল চৌধুরী সাহেবকে একটু দেখে যাব। তিনি কেমন আছেন জানার জন্য মনটা উতালা হয়ে আছে। কতদিন এই মহাপ্রাণ মানুষটিকে দেখিনি। শাহজাহান ভাইয়ের উত্কণ্ঠা এবং আগ্রহ সঞ্চারিত হয় আমার মধ্যেও। তাই তো আমিও বহুদিন গিয়াস ভাইকে দেখিনি। ফোন করে জানলাম, তার অবস্থা খুবই খারাপ। প্রায় সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে আছেন ধানমন্ডির আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল হসপিটালে। প্রফেসর ডা. ফিরোজ আহমেদ কোরেশীর চিকিত্সাধীনে। হাসপাতালের কেবিনে সজ্ঞাহীন গিয়াস ভাইয়ের নাকে অক্সিজেন মাস্ক। পুরো শরীর জড়িয়ে আছে নানা প্রকার মেশিন। দুই হাতে অনবরত ওষুধ দেয়া হচ্ছে স্যালাইনের সঙ্গে মিশিয়ে। খাদ্যও দেয়া হচ্ছে কৃত্রিম উপায়ে। প্রায় এক মাস ধরে এই অবস্থা। গিয়াস ভাইয়ের এই অবস্থা দেখে মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। খুব কষ্ট হচ্ছিল আমার। শাহজাহান ভাই নরম মনের দরদী মানুষ। তার চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছিল। নিজেকে সামলে, তাকে ধরে কোনোরকমে কেবিনের বাইরে নিয়ে আসি। রুমাল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে শাহজাহান ভাই ক্ষোভের সঙ্গে বলেছিলেন, গিয়াস কামাল চৌধুরীর মতো মানুষ আজ একমাস ধরে হাসপাতালে অচেতন হয়ে পড়ে আছেন, দেশে এত চ্যানেল, এত পত্রিকা—কোথাও একটা খবরও কেউ ছাপায়নি! আশ্বর্য, দেশের হলো কী? সাংবাদিকদেরই বা কি হলো? সংবাদপত্রগুলোতেও কি মানুষ নেই, সব কি মেশিন হয়ে গেছে? সেদিন শাহজাহান ভাইয়ের কথার জবাব দিতে পারিনি। ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই, মাঝখানে ৫ মাস, আমি নিজেও তো এই ৫ মাসে খবর নেইনি। আজ এখন এই মুহূর্তে মৌন নিথর গিয়াস ভাইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে বড় অপরাধী মনে হতে লাগলো। মুনির বললো, আপনার হতাশ হওয়ার কারণ নেই। শুধু এ ক’মাস নয়। গত ২ বছর ধরেই তো আব্বু এ অবস্থায় পড়ে আছেন। আত্মীয়-স্বজন ছাড়া কোনো চ্যানেল, সংবাদপত্র তো দূরের কথা, কোনো রাজনৈতিক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক নেতাও কোনোদিন কোনো খবর নেননি। শুধু রিয়াজ চাচা (রিয়াজ উদ্দিন আহমদ) মাঝে মাঝে ফোন করেন। তবে ফেব্রুয়ারিতে আব্বুকে দেখার জন্য হাসপাতালে একবার এসেছিলেন বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলামগীর। আর আপনি আসার দু’তিনদিন আগে এসেছিলেন ইন্ডিপেনডেন্টের মাহবুবুল আলম চাচা ও গোলাম তাহাবুর চাচা—এটুকুই গত ২ বছরের ভিজিটরস লিস্ট।
দুই. একটা সময় ছিল, গিয়াস কামাল চৌধুরীকে ছাড়া বাংলাদেশের চলত না। কথাটা শুনে অনেকে আড় চোখে তাকাবেন। তাতে আমার কিছু যায়-আসে না। কারণ সভা-সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে, মিছিলে, স্লোগানে গিয়াস কামাল ছিলেন অনিবার্য নাম। সাংবাদিকদের রুটি-রুজির সংগ্রামে গিয়াস কামাল ছিলেন প্রথম কাতারের নেতা। গণতন্ত্র, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি রেখেছেন স্মরণযোগ্য ভূমিকা। সাংস্কৃতিক আন্দোলনেও তাকে আমরা পেয়েছি। বঙ্গবিজয়ের সাতশ’তম বর্ষ পালন, পলাশী ট্র্যাজেডি, কাগমারী সম্মেলন, বঙ্গভঙ্গ, জাতীয় কবি নজরুলের জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানমালা যে আমরা সাফল্যের সঙ্গে করতে পেরেছিলাম, তারও পেছনে ছিলেন এই মানুষটি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সব আলোচনা সভা, গোলটেবিল ও সমাবেশে সাংবাদিক সমাজের প্রধান হিসেবে তিনিই প্রতিনিধিত্ব করতেন। ডিইউজে, বিএফইউজে ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হিসেবে তার ভূমিকা ভুলে গেলে সাংবাদিকদের পাপ হবে। তিনি নিজেকে সবসময় মওলানা ভাসানীর অনুসারী হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করতেন। বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী যে কোনো কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তিনি সবসময় সোচ্চার ছিলেন। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণে তিনি পালন করে গেছেন অসাধারণ ভূমিকা। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় ‘গিয়াস কামাল চৌধুরী, ভয়েজ অব আমেরিকা’র ঢাকার রিপোর্টের জন্য কান পেতে রাখেনি এমন মানুষ ছিল সে সময় বিরল। গিয়াস কামাল চৌধুরীর জন্ম ১৯৩৯ সালের ২১ জুলাই। জন্ম শহর যদিও ছিল তার চট্টগ্রাম, তবে বাড়ি ফেনীর শর্শদিতে। সাংবাদিকতার শুরু ১৯৬৪ সালে। ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেয়ার অপরাধে পাকিস্তান আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারও হয়েছেন। কারাগারেও যেতে হয়েছে দু’একবার। কুমিল্লার বিখ্যাত দারোগার বাড়িরও সন্তান তিনি। প্রাবন্ধিক মোতাহার হোসেন চৌধুরী ছিলেন তার চাচা। যার ‘সংস্কৃতি কথা’ গ্রন্থ এখনও আমাদের অবশ্যপাঠ্য হয়ে আছে। এই দারোগা বাড়িতে এক সময় গানের আসর বসতো গিয়াস ভাইয়ের আরেক চাচা ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খশরুর তত্ত্বাবধানে। এরকম অনেক গানের আসরে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। আমি যখন নজরুলের ওপর ‘কুমিল্লায় নজরুল’ তথ্যচিত্র নির্মাণ করি, সে সময় এই প্রসঙ্গটির উল্লেখ করে ধারাবর্ণনায় বলেছিলাম, এই বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে কবি বেলাল চৌধুরী এবং সাংবাদিক ব্যক্তিত্ব গিয়াস কামাল চৌধুরীর স্মৃতি। গিয়াস ভাই খুশি হয়েছিলেন। বলেছিলেন, আমার সৌভাগ্য, আপনি আমার নাম নজরুলের নামের সঙ্গে যুক্ত করে দিলেন। গিয়াস ভাইয়ের আম্মা মুনীর আখতার খাতুন চৌধুরাণী ছিলেন কবি। তার ‘চির সুমধুর’ কাব্য প্রকাশের দিনে গিয়াস ভাই আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। বলেছিলেন, গৃহকর্মের ফাঁকে ফাঁকে আমার মহীয়সী জননী লিখেছেন এই কবিতাগুলো। তার ব্যক্তিজীবন যেমন মধুময় ছিল, ছিল পূতঃপবিত্র, তেমনি তার কাব্যও ধারণ করে আছে সেই নির্মল সৌন্দর্য।
তিন. কোনো দীন-দরিদ্র পরিবারের সন্তান নন গিয়াস কামাল চৌধুরী। একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের মানুষ হয়েও তিনি আজীবন ছিলেন তার প্রিয় নেতা মওলানা ভাসানীর মতো সহজ, সাধারণ জীবন যাপনে অভ্যস্ত। একটা ফুলহাতা কিংবা হাফহাতা জামা, হাতে বহু ব্যবহারে জীর্ণ হয়ে যাওয়া একটা ছোট হ্যান্ড ব্যাগ, গিয়াস ভাই তার পুরনো পল্টনের বাসা থেকে তোপখানা সড়কের ফুটপাত দিয়ে হেঁটে হেঁটে আসতেন প্রেস ক্লাবে। পেছনে হয়তো তিন-চারজন মানুষ। সাংবাদিক ইউনিয়ন কিংবা প্রেস ক্লাবের কাজকর্ম সেরে গিয়াস ভাই অপেক্ষমাণ লোকজনকে নিয়ে ছুটছেন এ অফিসে-ও অফিসে অথবা সচিবালয়ে। বেশিরভাগ সময় পায়ে হেঁটে, একটু বেশি দূর হলে রিকশায়। বলতাম, গিয়াস ভাই এসব লোককে নিয়ে কোথায় এত ছোটাছুটি আপনার? বলতেন, আহারে ভাই, লোকগুলো বিপদে পড়ে দেশের নানা অঞ্চল থেকে আমার কাছে আসে। তাদের বিশ্বাস, আমি একটু তদবির করলে তাদের পেনশনটা তাড়াতাড়ি পাবে, ছেলেমেয়ের চাকরিটা হবে, চিকিত্সার জন্য হয়তো কেউ একটু সাহায্য করবে। ঠোঁটকাটা কেউ হয়তো বলতেন, গিয়াস ভাই, আপনার আয় ইনকাম তো তাহলে ভালোই। গিয়াস ভাই খুব বিরক্ত হতেন এ ধরনের কথা শুনলে। তবুও বলতেন, ভাইরে! মানুষের উপকার করে প্রতিদান নিতে হয় না। তাতে মানবতার অপমান হয়। একবার এক তদবিরকারীকে ধরে তরুণ সাংবাদিকরা বলেন, গিয়াস ভাইকে কত দিয়েছেন? ভদ্রলোক জিহ্বায় কামড় দিয়ে বললেন, ছিঃ ছিঃ একটা ফেরেশতার মতো মানুষ সম্পর্কে কীসব বাজে কথা বলছেন আপনারা। উনাকে কিছু দেয়া দূরের কথা, উল্টো উনিই রিকশা ভাড়াটাও দেন নিজের পকেট থেকে। ওনার মতো মানুষ হয় না।— আসলে মানুষের উপকার করাটা ছিল গিয়াস ভাইয়ের জীবনের অন্যতম ব্রত। কেউ বিপদে পড়ে গিয়াস কামালের কাছে গেছে আর গিয়াস কামাল কিছু করেননি—এ হতেই পারে না। হয়তো এজন্যই দেশের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে নিঃস্ব-রিক্ত প্রান্তিক মানুষটা পর্যন্ত তাকে অন্তর দিয়ে সম্মান করেছে, করে যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে দুটি ঘটনার উল্লেখ না করে পারছি না। ’৯৮ সালের দিকে রাজশাহী যাচ্ছি এক সেমিনারে অংশ নিতে। চলনবিলের মাঝ দিয়ে যাচ্ছে আমাদের মাইক্রোবাস। গাড়িতে গিয়াস কামাল চৌধুরী, আরিফুল হক, ড. আফতাব আহমাদ, কবি মতিউর রহমান মল্লিক ও আমি। সামান্য যাত্রা বিরতির ভুলে গাড়ি স্টার্ট নেয় না। ড্রাইভার বললো, ঠেলতে হবে। আমরা প্রাণপণ ঠেললাম। গাড়ি নড়ে না। আশপাশেও কেউ নেই। বাড়ি-ঘর অনেক দূরে দূরে। হঠাত্ বিলের ধান-পাট ক্ষেতের মধ্যে হারিয়ে গেলেন গিয়াস ভাই। আমরা অপেক্ষা করছি। গিয়াস ভাই ফিরে এলেন। সঙ্গে ২০/২৫ জন লোক। তারা ঠেলে গাড়ি স্টার্ট করে দিয়ে গেল। যাওয়ার সময় এক এক করে সবাই গিয়াস ভাইকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে গেল। বলে গেল, স্যার আপনার মতো মানুষকে সামনাসামনি দেখতে পেয়ে ধন্য হলাম। আরিফুল হক ভাই বললেন, কি জাদু করেছেন এদের? গিয়াস ভাই বললেন, লোকগুলো এখানকার কৃষক। ক্ষেতে কাজ করছিল। আমি তাদের সুখ-দুঃখের কথা জিজ্ঞাসা করতেই তারা জানতে চাইল আমি কে? তারপরই এই কাণ্ড। অন্য ঘটনাটি ২০০১ সালের। বিএনপি সদ্য ক্ষমতায় এসেছে। সে বছর শবেবরাতের আগের দিন জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিকদের দুপুরের খাওয়ার দাওয়াত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। বিরাট গোলটেবিল ঘিরে সবাই বসে আছেন। তিল ধারণের জায়গা নেই। সবাই অপেক্ষা করছেন প্রধানমন্ত্রীর আগমনের। প্রধানমন্ত্রী আসার পাঁচ-সাত মিনিট আগে এসে উপস্থিত হলেন গিয়াস কামাল চৌধুরী। এর কিছুদিন আগে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিজয়স্তম্ভ নিয়ে এক বক্তব্যের জের ধরে আবদুল মান্নান ভূঁইয়া ও তার চেলারা গিয়াস কামালকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। যা হোক গিয়াস কামালকে কেউ সমাদর করে বসাল না। তিনি বেশ দূরে গিয়ে জায়গা নিলেন। প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া কক্ষে প্রবেশ করলেন। সালাম ও কুশলবিনিময়ের পর, নিজের আসনে বসার আগে তিনি ব্যবস্থাপকদের কাছে জানতে চাইলেন, গিয়াস কামাল চৌধুরী সাহেবকে দাওয়াত দাওনি? তিনি আসেননি?—এবার হুলস্থুল পড়ে গেল। এই যে ম্যাডাম। এই যে ওখানে তিনি। প্রধানমন্ত্রী তাকালেন দূরে বসে থাকা গিয়াস কামালের দিকে। দৃশ্যটা তার ভালো লাগল না। তিনি যেন কিছুটা রাগত স্বরেই আদেশ করলেন, আমার পাশে একটা চেয়ার দাও। এখানে তাকে বসাও। ত্বরিতগতিতে পালিত হলো প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ। গিয়াস কামালকে পাশে বসিয়ে দুপুরের খাবার খেলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।—আমাদের সাংবাদিকতার ইতিহাসে এরকম সম্মান পাওয়া মানুষের সংখ্যা এখন আর নেই বললেই চলে।
চার. গিয়াস ভাইয়ের জীবনটা বদলে গেল ১৯৯৪-এ। জুলাই মাসের দিকে ব্রেন হ্যামারেজ হলো তার। তিনি কোমার কাছে চলে গেলেন। ডাক্তাররা বাঁচার আশা প্রায় ছেড়ে দিলেন। গিয়াস ভাইয়ের এবং আমাদের সৌভাগ্য, তখন রাষ্ট্রক্ষমতায় বেগম খালেদা জিয়ার সরকার। বেগম জিয়া ছিলেন গিয়াস কামালের প্রতি অপরিসীম মমত্বশীল। ফলে দ্রুত ভালো চিকিত্সার ব্যবস্থা হলো। CMH-এ ব্রিগেডিয়ার নূরুজ্জামান অপারেশন করলেন। কিছুটা সংজ্ঞা ফিরলে উন্নততর চিকিত্সার জন্য তাকে নিয়ে যাওয়া হলো সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে। দেশের সর্বস্তরের মানুষের অসীম ভালোবাসার প্রতিদান ঘটতে থাকলো সর্বত্র। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত এমন কোনো মসজিদ নেই যেখানে গিয়াস কামালের জন্য দোয়ার অনুষ্ঠান হয়নি। হয়তো এই ভালোবাসার জোরেই তিনি সুস্থ হয়ে ফিরলেন দেশে। আবার সক্রিয় হয়ে উঠলেন। কিন্তু ততদিনে তিনি দুরারোগ্য পারকিনসনে আক্রান্ত হয়েছেন। এজন্য দীর্ঘমেয়াদি চিকিত্সার দরকার। বেগম খালেদা জিয়ার দায়িত্বশীল ভূমিকার কারণে, তার চিকিত্সার স্বার্থে পাঠানো হলো লন্ডনে বাংলাদেশ হাই কমিশনের ইকোনোমিক মিনিস্টার করে। যাতে তিনি রাষ্ট্রীয় কাজের ফাঁকে ফাঁকে উন্নত চিকিত্সা নিতে পারেন। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতার পালাবদল ঘটলে শেখ হাসিনার সরকার নির্দয়ভাবে তাকে দেশে ফেরার নির্দেশ দিল। চিকিত্সা অসমাপ্ত রেখেই তিনি দেশে ফিরলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, সরকার তার মূল কর্মস্থান বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় যোগ দিতে দিল না। এই চাকরিটি তিনি আর ফিরে পেলেন না। ফলে তার মন ভেঙে যায়। তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। এই মানসিক আঘাত থেকেই বাড়তে থাকে তার পারকিনসন রোগ। প্রথম দিকে ওষুধপত্র দিয়ে রোগের প্রকোপ কমিয়ে রাখা গেলেও, বর্তমানে তা প্রকট আকার ধারণ করেছে। ফলে তিনি শারীরিকভাবে সম্পূর্ণরূপে অচল ও অক্ষম হয়ে বিছানায় পড়ে আছেন। এই অবস্থা গত দু’বছরে আরও বেড়েছে। বলতে গেলে গত দু’বছর ধরেই তিনি ঘরে পড়ে আছেন। দেখা দিয়েছে মারাত্মক স্মৃতিভ্রষ্টতা। কথা বলতে পারেন না প্রায়। বললেও তা বোঝা যায় না। কাউকে তেমন চিনতেও পারেন না। খিদে লাগলেও বলতে পারেন না। রক্ত চলাচল কখনও একটু-আধটু বাড়লে কিছু স্মৃতি ফিরে আসে। এই ফাঁকে আরও এক-দু’বার বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তাকে। সর্বশেষ নিয়ে যাওয়া হয় ধানমন্ডির আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে। এই দু’বছরে আমাদের অকৃতজ্ঞ রাজনীতি, সাংবাদিকতা ও সংস্কৃতির জগতের লোকেরা প্রায় ভুলেই গেছে গিয়াস কামাল চৌধুরীর কথা। তবে ইতিহাস সাক্ষ্য দেবে, গিয়াস কামালের বর্তমান অবস্থার জন্য অনেকাংশেই শেখ হাসিনার আগের সরকার দায়ী। গিয়াস কামাল চৌধুরীকে আমাদের প্রাত্যহিকতার বাইরে ঠেলে দেয়ার দায় থেকে কখনোই মুক্তি পাবে না তার সরকার। এই কথাগুলো আমরা কখনোই ভুলবো না।
পাঁচ. আমরা ভুললেও গিয়াস কামাল চৌধুরীর কথা বাংলাদেশের মানুষ কখনও ভুলবেন না। তিনি যেমন এই দেশ ও দেশের মানুষকে ভালোবেসেছিলেন, তেমনি এদেশের মানুষও গিয়াস কামালকে ভালোবেসেছেন। সবকিছু একদিন ক্ষয় হয়, ক্ষয় হবে। রয়ে যাবে শুধু অজয়-অমর ভালোবাসা। এই ভালোবাসার অযুত নক্ষত্র খচিত আকাশে গিয়াস ভাই বহুকাল জ্বলজ্বল করবেন নিজস্ব বিভায়। তবে তার আগে এই মুহূর্তে আমাদের একটাই প্রার্থনা পরম প্রভুর কাছে, তাকে সামগ্রিকভাবে রোগমুক্ত করে দাও। তাকে আমাদের মাঝে সচল-সক্ষম করে বিচরণশীল করে দাও। এটা কি খুব বেশি কিছু চাওয়া! আমাদের মাঝে থেকেও, তার মতো মানুষ স্থবির হয়ে ঘরে পড়ে থেকে, আমাদের অমার্জনীয় অবহেলা আর উদাসীনতা সয়ে যাবেন—এ হয় না। তাকে সুস্থ কর প্রভু।আমার দেশ /  [email protected]
বিজ্ঞাপন / স্পন্সরড কন্টেন্ট
ট্যাগ:
Situs Streaming JAV