Thursday, 12 March 2026 |
শিরোনাম
নিউইয়র্কে অ্যাসাল ওজোন পার্ক চ্যাপ্টারের ইফতার ও অভিষেক নিউইয়র্কে বাংলাদেশ ল সোসাইটি ইউএসএ’র ইফতার মাহফিল: খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকার আহ্বান BOROUGH PRESIDENT GIBSON HOSTS FOURTH ANNUAL BRONX IFTAR DINNER DIALOGUE UNDER THE THEME “UNITY IN DIVERSITY” নিউইয়র্কে মানসিক সংকটে থাকা যুবককে গুলি: পুলিশ প্রশিক্ষণ এবং মানসিক সংকটসংক্রান্ত ৯১১ কল নিউইয়র্কে গ্রী ম্যাকানিকেল ইয়াঙ্কার্স এর ইফতার ও দোয়া মাহফিল নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গমাতা পরিষদ’র ইফতার ও দোয়া মাহফিল নিউইয়র্কে ঢাকা জেলা অ্যাসোসিয়েশনের ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ সোসাইটি অব ব্রঙ্কস নিউইয়র্ক ইনকের কোরআন তেলাওয়াত প্রতিযোগিতা ও ইফতার মাহফিল New York Attorney General James Releases Statement on Live Nation Trial নিউইয়র্কে গোল্ডেন এইজ হোম কেয়ারের ইফতার মাহফিল
সব ক্যাটাগরি

সাংবাদিক মিনার মাহমুদের মৃত্যু ঘিরে রহস্য, ‘স্ত্রী বললেন আত্মহত্যা’

অনলাইন ডেস্ক পঠিত: 182 বার

প্রকাশিত: March 29, 2012 | 5:32 PM

 

স্টাফ রিপোর্টার: এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় ‘বিচিন্তা’ প্রকাশ করে হইচই ফেলে দেয়া মিনার মাহমুদ দুই দশকের প্রবাস জীবন কাটিয়ে দেশে ফিরেছিলেন নতুন আশায়। ২০০৯-এর শুরুতে দেশে এসে পুনরায় বিচিন্তা প্রকাশে তৎপর হন। ততদিনে দেশও বদলেছে। গণমাধ্যমের চিত্রও বদলেছে। বিচিত্র কর্মাভিজ্ঞতা দিয়ে ভেবেছিলেন সফল হবেন। কিছু একটা করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেবেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের টগবগে তারুণ্য। প্রবাসে ট্যাক্সি ড্রাইভার, সুইমিংপুলের লাইফগার্ড ছিলেন।

 

আর দেশে ফিরে কিছু করতে পারবেন না- এটা বিশ্বাস করতে পারেননি। সব ছাপিয়ে মিনার মাহমুদ আবারও জেগে উঠবেন। এমন ভাবনা নিয়ে ছুটোছুটি করেছিলেন রাজধানীতে। উত্তরার তিন নম্বর সেক্টরে বসত গাড়লেন। থিতু হতে দু’বছর আগে বিয়ে করলেন ডা. লুবনাকে। শ্বশুরবাড়িতেই থাকতেন। একদিকে সংসার আর ফেলে যাওয়া দিনগুলোর স্বপ্ন নিয়ে লড়াই করতে লাগলেন মিনার মাহমুদ। কিন্তু হোঁচট খেলেন। সাপ্তাহিক বিচিন্তাকে পুনঃপ্রকাশের চেষ্টা করেও খুব একটা সফল হতে পারেননি। ধীরে ধীরে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তাকে গ্রাস করতে লাগলো। অল্প কিছুদিন সমকালে লেখালেখি করেছেন। সবশেষ যোগ দিয়েছিলেন দৈনিক আজকের প্রত্যাশায় নির্বাহী সম্পাদক পদে। ১৯৫৯-এ ফরিদপুর শহরের আলীপুর মহল্লায় জন্ম নেয়া মিনার মাহমুদের লাশ গতকাল এয়ারপোর্ট রোডের রিজেন্সি হোটেল থেকে উদ্ধার করা হয়। তার মৃত্যু নিয়ে নানা রহস্য আর প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। স্ত্রী দাবি করেছেন আত্মহত্যা। পুলিশ মিনার মাহমুদের লেখা ৫ পৃষ্ঠার একটি চিঠিও উদ্ধার করেছে। পরিবারের একাধিক সদস্য জানিয়েছেন, প্রচণ্ড হতাশা থেকেই মিনার মাহমুদের এমন অকাল মৃত্যু। শেষ চিঠিতে মিনার মাহমুদ লিখে গেছেন, ‘নতুন আশায় বাঁচতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার বাঁচা হলো না।’

খুবই হতাশ ছিলেন মিনার 
বিগত কয়েক বছর ধরে খুবই হতাশ ছিলেন মিনার মাহমুদ। ইতিমধ্যে তার একটি স্ট্রোক হয় এবং মাথায় একটি জটিল অপারেশন করতে হয়। মাথার অপারেশনের জন্য নিয়মিত জীবনরক্ষাকারী ওষুধ সেবন করতে হতো। গত ক’দিন ধরে তিনি জীবনরক্ষাকারী ওই ওষুধ সেবনও বাদ দিয়েছিলেন বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে। সাংবাদিক মিনার মাহমুদের ছোটভাই মেহেদী হাসান জানান, গত বুবধার রাতে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় তিনি জীবনরক্ষাকারী ওই ওষুধ সঙ্গে নেননি। রাত ১০টা ৪৫ মিনিটে তিনি উত্তরার ৩ নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে বের হয়ে ঢাকা রিজেন্সি গেস্ট হাউজে ওঠেন। মেহেদী জানান, এক সময়ে মিনার মাহমুদ সাপ্তাহিক বিচিন্তার সম্পাদক হিসেবে দেশময় পরিচিত ছিলেন। কিন্তু আমেরিকা থেকে ফিরে আসার পর তিনি তেমন কোন ভাল মিডিয়ার সঙ্গে জড়াতে পারেননি। বলতে গেলে তিনি মিডিয়ার কারণে প্রচণ্ড রকম হতাশ ছিলেন। এ হতাশা তার আচরণে টের পাওয়া যেত।
জন্মস্থান ফরিদপুরে বন্ধুবৎসল লোক হিসেবেই পরিচিত ছিলেন মিনার মাহমুদ। পড়াশোনা করেছেন ফরিদপুর শহরের ফরিদপুর হাই স্কুল, ফরিদপুর ইয়াছিন কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ৪ ভাই ২ বোনের মধ্যে বড় ছিলেন মিনার মাহমুদ। তার অপর দুই ভাই মশিউর রহমান খোকন ও মেহেদী হাসান সাংবাদিকতা পেশায় জড়িত।

হোটেল কক্ষে সাংবাদিক মিনার মাহমুদের লাশ 
সাংবাদিক মিনার মাহমুদের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে হোটেল কক্ষ থেকে। গতকাল বিকালে পুলিশ রাজধানীর হোটেল রিজেন্সির ৭২৮ নম্বর কক্ষ থেকে তার লাশ উদ্ধার করে। এসময় মিনার মাহমুদের লেখা পাঁচ পৃষ্ঠার একটি নোট উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ ও হোটেল সূত্র জানায়, বুধবার বেলা ১০টা ৪৭ মিনিটে তিনি ওই রুমে ওঠেন। রুম নিয়েছিলেন ২৪ ঘণ্টার জন্য। কিন্তু ওই সময় অতিক্রম হওয়ার পরও তিনি রুম ছাড়ছিলেন না। এ কারণে হোটেল সিকিউরিটি ম্যানেজার মেজর (অব.) মাহবুবুল ওয়াদুদ মাস্টার চাবি দিয়ে রুমটি খুলে ফেলেন। রুমে ঢুকেই তিনি দেখতে পান কালো রঙের একটি চেয়ারে কাত হয়ে বসে আছেন মিনার মাহমুদ। এরপরই পুলিশকে খবর দিলে তারা লাশ উদ্ধার করে। এ সময় র‌্যাব ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। রুম থেকে উদ্ধারকৃত পাঁচ পৃষ্ঠার নোটসহ বিভিন্ন আলামত থেকে তাদের প্রাথমিক ধারণা- এটি আত্মহত্যা হতে পারে। পুলিশ আলামত হিসেবে ব্যথানাশক ও ঘুমের প্রায় ১৫০ ট্যাবলেট ও ক্যাপসুল উদ্ধার করেছে। মাহবুবুল ওয়াদুদ বলেন, নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী বুকিং এক্সেটেনশন করবেন কিনা তা জানার জন্যই মূলত তার কক্ষ খোলা হয়েছিল। পারিবারিক সূত্র জানায়, অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক পত্রিকা বিচিন্তার সম্পাদক ছিলেন মিনার মাহমুদ। পরে চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে ১৯ বছর কাটিয়ে দেশে ফিরে আসেন তিন বছর আগে। ফের লেখালেখি শুরু করেন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। বছর দুয়েক আগে দৈনিক আজকের প্রত্যাশা নামে একটি পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেন। তার দাম্পত্য জীবন ছিল  ঘটনাবহুল।  প্রথম স্ত্রী ছিলেন নারীবাদী লেখিকা তসলিমা নাসরিন। এরপর বিয়ে করেন কবিতা নামে একজনকে। তার সঙ্গেও স্থায়ী হয়নি সম্পর্ক। সবশেষে বিয়ে করেন ডা. লুবনা ওরফে লাজুককে। এ দম্পতি ছিলেন নিঃসন্তান। মৃতের স্বজনরা জানান, মিনার মাহমুদের মস্তিষ্কে পানি জমতো। এ কারণে ১৫-২০ দিন আগে তার মাথায় নিউরো সার্জারি করা হয়। এরপর থেকেই তিনি উচ্চমাত্রার ব্যথানাশক ও ঘুমের ওষুধ সেবন করতেন। তবে সপ্তাহখানেক আগে তিনি ওষুধ সেবনে অনিয়ম করলে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার পিতার নাম মোস্তফা আলী খান। বাড়ি ফরিদপুর জেলার আলীপুর গ্রামে। থাকতেন উত্তরা মডেল টাউনের ৩নং সেক্টরের ১৬নং রোডের ১৭নং বাড়িতে। ওই বাড়ি থেকে বুধবার সকাল নয়টায় তিনি বাইরে বের হয়েছিলেন। এরপর সারা দিন তাঁর খোঁজ মেলেনি। বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়। এরই এক পর্যায়ে গতকাল বিকালে খিলক্ষেত এলাকার রিজেন্সি হোটেল থেকে তাঁর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। রিজেন্সি হোটেলের বিপণন কর্মকর্তা আসরা ইলহাম বলেন, মিনার মাহমুদের মরদেহের পাশ থেকে পুলিশ ছয় পৃষ্ঠার একটি নোট উদ্ধার করেছে। মিনার মাহমুদের ভাই মেহেদি হাসান সাংবাদিকদের বলেন, সমপ্রতি তার কয়েকটি অস্ত্রোপচার হয়। এরপর তাকে নিয়মিত ওষুধ খেতে হতো। কিন্তু বুধবার সকাল নয়টার দিকে তিনি বাসা থেকে বের হয়ে যান। আমরা অনেক খোঁজাখুঁজি করেও পাচ্ছিলাম না। গতকাল বিকালের দিকে তার মোবাইলটি অন হয়। আমরা তাকে ফোন করি। ফোনটি ধরেন খিলক্ষেত থানার ওসি। তিনিই জানান, মিনার মাহমুদের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে মেহেদি বলেন, বাংলাদেশের গণমাধ্যমে ভাইয়া অনেক কিছু করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোথাও জায়গা পাচ্ছিলেন না। তার অনেক ক্ষোভ ছিল। এসব ক্ষোভ থেকেই হয়তো আত্মহত্যা করেছেন।  হোটেল রিজেন্সির ম্যানেজার আরিফা আফরোজ বলেন, মারা যাওয়ার আগে তার কক্ষে ছয় পৃষ্ঠার একটি নোট লিখে গেছেন। ওই নোটে কি লেখা আছে সে বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, নোটটি পুলিশ নিয়ে গেছে। খিলক্ষেত থানার ওসি শামীম হাসান বলেন, বুধবার সকালে ঢাকা রিজেন্সি হোটেলে ৭ তলার একটি কক্ষে অতিথি হিসেবে ওঠেন মিনার মাহমুদ। গতকাল দুপুর পর্যন্ত তার কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে হোটেল কর্তৃপক্ষ বিকাল সাড়ে ৫টায় পুলিশে খবর দেয়। পরে  ওই হোটেলে ফোর্স পাঠিয়ে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ওসি আরও বলেন, হোটেলের ৭০২৮ নম্বর কক্ষের টেবিলের ওপর কাৎ হওয়া অবস্থায় তার মৃতদেহ পাওয়া যায়। তার বিছানার পাশে চেতনানাশক ট্যাবলেটের খোসাও পাওয়া গেছে। তবে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত কোন তথ্য দিতে পারেননি তিনি।  মিনার মাহমুদের সহকর্মীরা জানান, আশি দশকের আলোচিত সাময়িকী ছিল ‘বিচিন্তা’। সাফল্যের সঙ্গে এ পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। শেষ পর্যন্ত তার এমন পরিণতি কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না।  পুলিশ তার মৃত্যুর কারণ বিষয়ে তাৎক্ষণিভাবে কিছু জানাতে পারেনি। তবে হোটেল কর্তৃপক্ষের ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরায় ধারণকৃত ভিডিও চিত্রে মিনার মাহমুদকে সম্পূর্ণ খালি হাতে হোটেল কক্ষে প্রবেশ করতে দেখা গেছে। এছাড়া হোটেল থেকে কোন ধরনের পানীয়, খাবার ও ওষুধপত্র দেয়া হয়নি। তাই প্রশ্ন উঠেছে- উদ্ধারকৃত ওষুধ ও পানীয় বোতল তার রুমে কিভাবে এলো? মিনারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু মোতাচ্ছিম বিল্লাহ বলেন, বছর দুয়েক আগে বর্তমান স্ত্রী লুবনাকে বিয়ে করেছিলেন। তার আগে বিয়ে করেছিলেন তাসলিমা নাসরিন ও কবিতা নামের একজনকে। র‌্যাব সদর দপ্তরের ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান বলেন, মিনার মাহমুদ রুম বুকিং দিয়েছিলেন, কিন্তু খাবারের অর্ডার দেননি। ২৪ ঘণ্টায় একবারের জন্যও রুম থেকে বের হননি। এমনকি তার কক্ষের বাথরুম  ও বিছানা পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়নি। বিষয়টি রহস্যজনক। হোটেল কর্তৃপক্ষ জানায়, রুম বুকিংয়ের জন্য মিনার মাহমুদ ২০ হাজার টাকা পরিশোধ করেছেন। তার কাছে পাওয়া গেছে আরও চার হাজার টাকা। র‌্যাব কর্মকর্তা মোশতাক বলেন, মিনার মাহমুদের রুমে যে পরিমাণ ক্যাপসুল ও ট্যাবলেট পাওয়া গেছে তা ২৪ ঘণ্টার জন্য নয়, অন্ততপক্ষে ১০ দিনের ওষুধ ছিল। কালো চেয়ারের হাতলে হেলান দেয়া অবস্থায় তার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময় তার পরনে হালকা আকাশি রঙের একটি শার্ট ও কালো রঙের প্যান্ট ছিল।

জীবন ছিল দাসত্বের
“আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি, তোমার মতো মেয়ে হয় না। কিন্তু আমি বাঁচতে পারলাম না। অনেকবার চেষ্টা করেছি আত্মহত্যা করার, তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে করতে পারিনি। সর্বশেষ তোমার অগোচরে চলে এসেছি। আমার কাছে মাত্র ৪ হাজার টাকা আছে। কোন সহায়সম্পত্তি নেই। কি করে আমি বাঁচবো? সবাই নতুন করে বাঁচতে চায়, কিন্তু আমি পারলাম না। ১৮ বছরের দাসত্বের জীবন শেষ করে নতুন আশা নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলাম। অনেক চেষ্টা করেছিলাম নতুন পত্রিকায় যোগ দিতে, কেউ আমাকে নিতে চায়নি। সবাই চায় নতুন আর নতুন। আমি আত্মহত্যার পথ বেছে নিলাম। এ মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। সুখে থেকো, ভাল থেকো। আমাকে ক্ষমা করে দিও।”

মিনার মাহমুদ জনতার চোখকে যা বলেছিলেন
দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে মিনার মাহমুদ দেশে ফিরে ২১শে মে ২০০৯-এ সংখ্যায় এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন তার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। সাক্ষাৎকার নিয়ে ছিলেন জনতার চোখ-এর নির্বাহী সম্পাদক কাজল ঘোষ। সেই সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো-
প্রবাসে জীবনের তিন ভাগের এক ভাগই কেটে গেছে। বাকি সময়টা দেশেই কাটাতে চাই। নানা আশঙ্কা ও অনিশ্চয়তার কারণেই আমাকে প্রবাসে চলে যেতে হয়েছিল। বর্তমানে বাংলাদেশের মিডিয়া অনেক বেশি স্বাধীন, কিন্তু এক ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যায়। ওয়ান-ইলেভেন প্রমাণ করেছে ‘এভরি ওয়ান ইজ টাচেবল’। তসলিমা ছিল আমার ভুল সময়ের ভুল মানুষ। আমরা দু’জন দু’জনের আনফিট ছিলাম বলবো না, ছিলাম মিসটেক। তসলিমা আমার কাছে এক্স, ওয়াই, জেড, আকুলি, বকুলিদের মতই একজন সাধারণ মানুষ। যে নিজের লেখা নিজেই বিশ্বাস করে না। কোন পরিস্থিতিতে বিদেশ চলে গেলেন প্রশ্নে মিনার মাহমুদ জানান, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে ‘বিচিন্তা’ একটি বড় ভূমিকা পালন করলেও আমি দেশত্যাগ করি একানব্বইয়ের ডিসেম্বরে। তখন বেগম খালেদা জিয়ার সরকার। চাপের মুখেই তখন আমাকে দেশ ত্যাগ করতে হয়েছিল। আমার বিরুদ্ধে তখন পাঁচ-ছয়টি মামলা। দ্রুত বিচারের অধীনে সেই মামলার বিচার চলছিল। আমার সব মামলা ছিল সাংবাদিকতা সম্পর্কিত। কোনটাই চুরি-ডাকাতির মামলা না। তবুও সমনজারি, সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হওয়া। নানা রকম হয়রানি হতে হতো। সপ্তাহের সাতদিনই আমার কাটে আদালতের বারান্দায়। আমি কি সাংবাদিকতা করবো, অফিস করবো না আদালতে ঘরবাড়ি, থাকার বন্দোবস্ত করি। তা না হলে এগুলো ছেড়ে পালাই? এমন কোন অপরাধ বা অন্যায় তো করিনি যে দিনের পর দিন আমাকে আদালতে থাকতে হবে। মানুষ দেশ ছাড়ে ভাগ্য অন্বেষণে। আর আমাকে ভাগ্য ছেড়ে যেতে হয়েছে। মামলা মোকাবিলার ভয় না মামলার হয়রানি থেকে বাঁচতে স্বেচ্ছা নির্বাসনে গেলেন- এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বেশির ভাগ মামলা ছিল হয়রানিমূলক। কোন মামলাতেই আমাকে অপরাধী সাব্যস্ত করা যায়নি। একটি মামলায় আমি দুঃখপ্রকাশ করেছি, অন্য একটি মামলাতে সামান্য জরিমানা হয়েছে মাত্র। মূলত হয়রানির জন্যই চলে গেলাম। মামলাগুলোর সর্বশেষ অবস্থা কি- জবাবে বলেন, জানি না। খোঁজও নিইনি। আপনি যে দেশ রেখে গিয়েছিলেন দুই দশক পরে ফিরে কেমন দেখছেন? মিনার জবাব দেন, পরিবর্তনের কথা বলছেন? প্রথমেই বলতে হয় আমাদের সাংবাদিকতার কথা। অনেক পরিবর্তন এসেছে। এক সময় সাংবাদিকতা করি বললে, আর কি করেন- এমন আরও একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হতো। তা আজ আর হতে হয় না। বর্তমানে সাংবাদিকদের বেতন কাঠামো যে কোন ব্যাংক বা আন্তর্জাতিক সংস্থার বেতন কাঠামোর মতোই। মিডিয়া বর্তমানে একটা গ্ল্যামারাস জবের জায়গায় স্থান করে নিয়েছে। প্রবাস জীবনের দীর্ঘ সময়টা কিভাবে কেটেছে? জবাবে তিনি বলেন, দীর্ঘ আঠারো বছরের প্রবাস জীবনে আমি তেইশটি চাকরি করেছি। এর মধ্যে টি শার্টের এমব্রয়ডারি, গ্যাস স্টেশনে, ট্যাক্সি ড্রাইভ, সুইমিংপুলে লাইফগার্ডের কাজ করেছি। প্রবাস জীবনে বিশেষত আমেরিকার মানুষের মুভমেন্টের স্বাধীনতা লক্ষ্য করে আমার ভাল লেগেছে। এক সময় আমি জর্জিয়া আটলান্টায় কাজ করতাম। আমার বাসা থেকে অফিসের দূরত্ব ছিল ৪৫ মাইল। আমি নিজে প্রতিদিন গাড়ি ড্রাইভ করে কাজে যেতাম আবার ছুটে আসতাম কাজ শেষে বাসায়। নব্বই মাইলের ছোটাছুটি আমার কাছে ইস্কাটন থেকে বাংলামোটর আসা-যাওয়ার মতোই মনে হতো। আপনার বন্ধু-সতীর্থরা অনেকেই দেশে-বিদেশে খ্যাত। পুরনো স্মৃতি আউড়ে কোনরকম নস্টালজিয়ায় ভোগেন কিনা? আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসকে খুবই মিস করি। এখনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস দিয়ে যাওয়ার সময় হাকিম চত্বরে ঘাস না দেখে মন খারাপ হয়। মাঠে এখন ঘাস নেই। বসার ব্যবস্থা নেই। এক সময় এ মাঠের ঘাসে বসেই বন্ধুদের নিয়ে দিনের পর দিন আড্ডা দিতাম। সতীর্থদের মধ্যে ২০০০ সম্পাদক ও খ্যাতিমান লেখক মঈনুল আহসান সাবের, বিজ্ঞাপন নির্মাতা তুষার দাস, প্রয়াত কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর কথা মনে পড়ে। তসলিমা নাসরিন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ছাত্রী ছিলেন। রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সঙ্গে প্রেম ও পরে বিবাহ সূত্রে মাঝেমধ্যে আমাদের আড্ডায় এসেছে। অল্প কিছুদিনের জন্য আমার বিবাহিত স্ত্রীও ছিলেন। দু’জনের দু’রকম দৃষ্টিভঙ্গি আর দু’রকম আদর্শগত দ্বন্দ্বের কারণেই আমাদের সংসার বেশি দিন টেকেনি। আপনাদের সংসার কতদিন স্থায়ী ছিল? সাত-আট মাস। যে বছর আমি দেশ ত্যাগ করি সে বছরই অর্থাৎ একানব্বইয়ের। ফেব্রুয়ারির দিকে আমাদের বিয়ে হয় আর ডিসেম্বরে দেশ ত্যাগের সময় আমাদের সেপারেশন হয়। পরে বিদেশ থেকেই আমাদের ডিভোর্স হয়। আদর্শগত দ্বন্দ্ব বলতে কি বোঝাতে চেয়েছেন? তার লেখালেখিসহ জীবন-যাপনের অনেক কিছুর সঙ্গে আমি একমত আবার অনেক কিছুর সঙ্গে আমি দ্বিমত পোষণ করেছি। তসলিমা নাসরিন নিয়মিত ‘বিচিন্তা’য় লিখতেন। বিচিন্তাতেই কাজ করতেন অম্লান দেওয়ান। বর্তমানে বাংলাদেশস্থ ফরাসি দূতাবাসে কর্মরত অম্লানের অভ্যাস ছিল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লেখাপড়া করা। সে হঠাৎ তসলিমা নাসরিনের একটি লেখা আর ভারতের নারীবাদী লেখিকা (এ মুহূর্তে নামটা মনে নেই) সম্ভবত সুকুমারী রায়ের একটি লেখা নিয়ে আসে। দুটো লেখা মিলিয়ে দেখা গেল তসলিমা নাসরিনের লেখাটি আর সুকুমারী রায়ের লেখা হুবহু এক। দাড়ি-কমাসহ। আকার-ইকারও কোন রকম বদলায়নি। এটাকে আমরা বলি চৌর্যবৃত্তি। তো তৎকালীন বিচিন্তায় তসলিমা নাসরিনের লেখাটি আর সুকুমারী রায়ের লেখা আমরা পাশাপাশি ছাপালাম। যা হয়- এখান থেকেই সাংসারিক ক্ষেত্রে আর আদর্শগত দিক থেকে আমাদের দ্বন্দ্বের সূচনা। আমি আসলে তখন বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছি, আমি যখন সম্পাদক তখন সেখানে, ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে আমার দায়িত্বের এখতিয়ার অনেক বড়। এখতিয়ারই বলে যে, আমাকে লেখাটি ছাপাতে হবে। অপরাধ যদি আমার ঘরে থাকে তবে আমি অন্যদের অপরাধ কিভাবে ছাপাবো। বিষয়টি তাকে বোঝাতে আমি ব্যর্থ হই। এটিকে সে অত্যন্ত অফেনসিভ হিসেবে নেয়। সে আমাকে বললো, আমি তার সঙ্গে শত্রুতা করেছি। আমি পাল্টা জবাবে বলেছিলাম, এটা রিয়েলিটি, তুমি নিজেই দেখ। তোমার নিজের লেখার পাবলিকেশন্স তারিখ আর সুকুমারী রায়ের লেখা ছাপা হয়েছে তিন-চার বছর আগে। চুরিটি ছিল খুবই কৌশলের চুরি-এটা প্রকাশিত না হলে কেউ জানতো না। পরে তসলিমা নাসরিনের প্রথম বই ‘নির্বাচিত কলামে’ও লেখাটি ছাপা হয়েছিল। যেদিন থেকে এ ঘটনা জানতে পারি সেদিন থেকে আমি তসলিমার লেখালেখির ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলি। কারণ, একটি মৌলিক লেখা যা অন্যের তা কাট-পেস্ট করার কোন মানে হয় না। মূলত সেই থেকেই আমাদের দ্বন্দ্বের সূত্রপাত। তসলিমার লেখালেখি নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কি? প্রথম কথা, তসলিমা যা লেখেন তিনি নিজেই তা বিশ্বাস করেন না। তার সঙ্গে বসবাসের সুবাদে এটা আমি জেনেছি। তিনি নারী স্বাধীনতা আর নারী মুক্তির কথা বলেন, কিন্তু নিজে ব্যক্তিগতভাবে যে ধরনের আচরণ করেন, তাতে আমার মনে হয়েছে তিনি নিজেই নিজের লেখা বিশ্বাস করেন না। তার কোন দিকটি আপনাকে এমন মন্তব্য করতে উৎসাহ জোগালো? নারীরা এ দেশে মুক্তি পাক, নারীরা স্বাধীনতা পাক, তিনি জরায়ুর স্বাধীনতা চান, এটা চাইতেই পারেন। তার নিজের জরায়ুর স্বাধীনতা চাওয়া নিজের ব্যাপার। কিন্তু কথায় ও কাজের তো মিল থাকতে হবে। আমি বাইরে ধূমপান বিরোধী কথা বলছি, আর ঘরে ফিরে সমানে ধূমপান করছি। এটা কি স্ববিরোধী নয়। তার সঙ্গে বসবাসের ফলে আমি এমন স্ববিরোধী নানা আচরণ খেয়াল করেছি। ও নিজেই আসলে নিজের লেখা বিশ্বাস করে না। মানুষ কিভাবে বিশ্বাস করবে। তার লেখালেখির বিষয়ে আমি খুব একটা শ্রদ্ধাশীল নই। ‘বিচিন্তা’ সম্পর্কে মিনার মাহমুদ বলেন, ’৮৭-র আন্দোলন যখন ব্যর্থ হয় তখন অবধারিতভাবেই বিচিন্তা বন্ধ হয়। সময়টা তখন ১৯৮৮-এর জানুয়ারি। এরশাদকে নিয়ে কাভার স্টোরি ছিল ‘গণঅভ্যুত্থান দিবসে গণহত্যা এবং নিরোর বাঁশি’। এটা ছিল চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশে গণহত্যাকে কেন্দ্র করে। কাকতালীয়ভাবে এরশাদ সেই গণহত্যার সময় ইতালি ছিলেন। সম্রাট নিরোকে কল্পনা করে আমরা এরশাদের হাতে তখন বাঁশি ধরিয়ে দিই। এর জন্য বিচিন্তা বন্ধ হয়। আমার বিরুদ্ধে আরও বেশ কিছু মামলা হয়। রাষ্ট্রদ্রোহিতা মামলায় আমি প্রায় ৬ মাস অভিযুক্ত ছিলাম। পরে আমি বেকসুর খালাস পাই মামলা থেকে। পরে আবার এরশাদ পতনের পর বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের সংবাদপত্রের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ফলে পত্রিকা আবারও প্রকাশ করতে পারি। এবারও ৯ মাস পত্রিকা প্রকাশের পর আমি দেশত্যাগ করি। তখন কি পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ করে গেলেন না বিক্রি করে দিলেন? না বিক্রয়ের কথা যারা বলেন, তারা মিথ্যা বলেন। এটা অপপ্রচার। আমি দেশ ছাড়ার সময় ইউএনবির এনায়েতউল্লাহ খানের কাছে পত্রিকা হস্তান্তর করে যাই। তিনি দু’মাসের মতো পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন। তারপর আবার বন্ধ হয়ে যায়। দেশে ফিরে আমি যোগাযোগ করেছি, তিনি আমার পত্রিকা ফিরিয়ে দেয়ার সম্মতি জানিয়েছেন। বিচিন্তায় যারা আমার সঙ্গে কাজ করেছে তারা সবাই এখন স্ব স্ব কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. আসিফ নজরুল, দেশটিভির আমিনুর রশীদ, বৈশাখীর আমীরুল ফয়সল, জনকণ্ঠের ফজলুল বারী (বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায়), তৃতীয় মাত্রার জিল্লুর রহমান, আরটিভির আনিস আলমগীর- এরা কোন না কোনভাবে বিচিন্তার সঙ্গে যুক্ত ছিল। এবং অনেকের কাজের শুরু বিচিন্তা থেকেই। আমি গৌরব বোধ করি যখন ভাবি, আমিও ছিলাম না, বিচিন্তাও নেই। কিন্তু সৃষ্টি তো রয়ে গেছে। তারা প্রত্যেকেই স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। মানবজমিন

ট্যাগ:
সর্বশেষ সংবাদ
Advertisements
karnafully1
TEKSERV

Situs Streaming JAV