সবই বদলাবে-হুমায়ূন আহমেদ

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আলীম অজিজ:ক্যানসারের চিকিৎসায় নিউইয়র্কের দিনগুলোয়, বাইরের জমাট ঠান্ডায় হুমায়ূন আহমেদ লেখার পাশাপাশি নিয়মিত ছবি এঁকেছেন। খুব শিগগরিই তাঁর ছবি নিয়ে একটি প্রদর্শনীরও আয়োজন চলছে। সাময়িকীর পাঠকদের জন্য হুমায়ূন আহমেদের সৌজন্যে এই ছবিগুলো ছাপা হলো।
লিফটে ঢোকার পর প্রতিবারই কোন ফ্লোরে, কত নম্বর বোতামে টিপ দেব—এই নিয়ে একটা অনিশ্চয়তায় ভুগি। এবারও ৫ নম্বর লেখা বোতামে চাপ দিয়ে প্রবল একটা সন্দেহ নিয়ে ওপরে উঠে এলাম। লিফটের দরজা খোলার পর হাঁফ ছাড়লাম—না, ঠিক ফ্লোরেই এসেছি। কারণ হুমায়ূন আহমেদ আর অন্যপ্রকাশের মাজহারুল ইসলামের ফ্ল্যাট পাশাপাশি এবং বেশির ভাগ সময় দুটো দরজাই খোলা থাকে।
হুমায়ূন আহমেদের বাসার দরজার সামনে ছড়ানো থাকে অসংখ্য জুতো-স্যান্ডেল। আজও তাই, কিন্তু ভেতরে পা দিয়েই হকচকিয়ে গেলাম। বৈঠকখানা ভর্তি মানুষ। আট-দশজন তো হবেই। এর আগেও অনেকবার হুমায়ূন আহমেদের বাসায় এসেছি, অনেক লোকের ভরা আড্ডার মাঝখানেও হাজির হয়েছি। তবে তাদের মধ্যে সব সময়ই কেউ না কেউ চেনা বেরিয়ে পড়ত। কিন্তু আজকের কাউকেই চিনছি না। এদের পোশাক-আশাকও ঠিক শহুরে লোকজনের মতো নয়। প্রবল একটা ধন্দে পড়ে গেলাম, ঠিক বাসায় এসেছি তো!
ঘরের ভেতরে ঢুকে এ রকম একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে যখন স্থাণু হয়ে দাঁড়িয়ে, তখনই তীরের মতো ভেতরের একটা ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন হুমায়ূন আহমেদ। খুব উত্তেজিত দেখাচ্ছে তাঁকে। আমাকে দেখেই থমকে দাঁড়িয়ে গেলেন। ‘এসেছ? আসো আসো। দেখো, এদেরকে দেখো! ভালো করে দেখো।’
এঁরা সবাই হুমায়ূন আহমেদের নিজ হাতে বানানো নেত্রকোনার স্কুলের শিক্ষক মায় স্কুল কমিটির লোক।
ব্যাপার আর কিছুই না, আমেরিকার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ইমেরিটাস আফিয়া দিল জীবনের প্রায় সর্বস্ব দিয়ে কুমিল্লার এক চরে তাঁর গ্রামের ছেলেমেয়েদের শিক্ষার সুব্যবস্থা করতে একটি স্কুল দিয়েছেন। বাবার নামে স্কুল। গত বছর দেশে এসে স্কুলের খোঁজখবর করতে গিয়ে তিনি বিস্ময় নিয়ে আবিষ্কার করেন, স্কুলের চাপরাশি থেকে শুরু করে হেডমাস্টার পর্যন্ত সবাই আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। আফিয়া দিলও সেদিন কিছুতেই হিসাব মেলাতে পারছিলেন না। বারবার হতাশায় মাথা নাড়ছিলেন। হুমায়ূন আহমেদের স্কুলের চিত্রও ওই আফিয়া দিলের স্কুলের মতোই। সুদূর আমেরিকায় দুরারোগ্য ক্যানসারের সঙ্গে তিনি যখন নিরন্তর এক লড়াইয়ে ব্যস্ত, চিকিৎসার পেছনে গুচ্ছের টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে, তখনো ওই স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারীরা যাতে মাসের বেতন ঠিক ১ তারিখেই পান, সেই ব্যবস্থা করে গেছেন। আর তাঁরাই তাঁর অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে জড়িয়ে পড়েছেন নানা দুর্নীতিতে। ‘সব সিস্টেম কোলাপস করছে, বুঝলে! সারা দেশেরই এই অবস্থা। রাজনীতির দিকে দেখো, কোনো আশা দেখতে পাও? এসব দেখে চূড়ান্ত আশাবাদী লোকটিও হতাশ হয়ে পড়বে।’ এটা হুমায়ূন আহমেদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। কিন্তু ক্যানসারের চিকিৎসায় আমেরিকা যাওয়ার আগে এবং পরে তাঁর বিভিন্ন লেখায় বারবার প্রবল আশা আর স্বপ্নের কথা শুনিয়েছেন হুমায়ূন আহমেদ—কোনো হতাশাকেই কাছে ভিড়তে দেননি। তাই এই ঘটনাও তাঁকে একেবারে নিরাশ করে ফেলবে—এটা আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না। চেয়ারে কিছুক্ষণ স্থির বসে থাকার পর হঠাৎ জেগে ওঠার মতো হুমায়ূন আহমেদ বললেন, ‘এ অবস্থা ঠিক হয়ে যাবে। যেতেই হবে। এই যে দেখো, চিকিৎসার জন্য আমেরিকায় গেছি। আমার ক্যানসারের চিকিৎসাই তো মূল ছিল, তাই না? কিন্তু নিজের চেয়ে আমার বেশি খারাপ লাগত আমার বাচ্চা দুটোর জন্য। প্রচণ্ড ঠান্ডার জায়গা। আমরা ঘর থেকে বেরোতে পারছি না। ওরা ঘর থেকে বের হতে পারছে না। দেশে অনেক বন্ধুবান্ধব ছিল। নো ওয়ান ইজ দিয়ার। শুধু আমার কারণে বাচ্চা দুটো কষ্ট পাচ্ছে। আমার কারণে শাওন কষ্ট পাচ্ছে। শাওনকে সবকিছু ছেড়েছুড়ে আমার সঙ্গে থাকতে হচ্ছে। এটা আমার জন্য পেইনফুল ছিল। এ ছাড়া আর কী ভেবেছি? চিকিৎসা শুরু হয়েছে, সুস্থ হলে হব; না হলে কিছু করার নেই। বহু লোকই তো ক্যানসারে মারা যাচ্ছে। এটা নিয়ে যে আমার খুব একটা মাথাব্যথা হয়েছে, এমন না। খুব যে হতাশ হয়ে গেছি, কান্নাকাটি অমুক—না না। ভুলেও এমন চিন্তা কাজ করেনি। যা হওয়ার হবে—কে সারা সারা! যা হওয়ার হবে, এত চিন্তা করে কিছু হবে না।’
তার পরও কি এমন অকুতোভয় থাকা যায়? মৃত্যুকে এত সহজে উড়িয়ে দেওয়া যায়? নিউইয়র্কের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ-এর (প্রথম আলোতে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত) লেখাগুলোয় নানা আশাবাদ আর স্বপ্নের কথা এসেছে, কিন্তু মৃত্যুচিন্তা দূরে সরিয়ে রাখতে পারেননি হুমায়ূন আহমেদ। এ ব্যাপারে তাঁর কথা হলো, ‘প্রায় নয় মাস আমেরিকায় একটা ঘরের মধ্যে বন্দী, ঠান্ডায় কোথাও বেরোতে পারছি না। কিন্তু আমরা তো গরম দেশের মানুষ। বাইরে প্রচণ্ড ঠান্ডা। আমি জানালা দিয়ে বাইরে যে গাছপালা দেখছি, সেখানে গাছ থেকে একে একে সব পাতা ঝরে যাচ্ছে। নিজেকে কমপেয়ার করি গাছের সঙ্গে—ও মাই গড! গাছের মতো আমারও তো পাতা ঝরে যাচ্ছে। কিন্তু মাথায় তখন এটা ছিল না যে একসময় গ্রীষ্ম আসবে, গাছে আবারও পাতা গজাবে। এর সঙ্গে আমি নিজের একধরনের মিলও খুঁজে পাই। যেমন ধরো, আমি আবার ফিরে যাচ্ছি, ১২ তারিখে আমার সার্জারি হবে। হোপফুলি সার্জারিতে ক্যানসারটা কেটে বিনাশ করার চেষ্টা করবে—এই নিয়েই তো বাস করছি, তাহলে দেশ নিয়ে আমি হতাশ হই কীভাবে?
‘বুঝি, এটা একটা দরিদ্র দেশ। সব অসহিষ্ণু মানুষ। কারও ধৈর্য নেই। সবাই অধৈর্য। হ্যাঁ, এ রকম অবস্থা আরও কিছুদিন থাকবে—আমার ধারণা। তারপর ঠিক হয়ে যাবে। দেশের কিন্তু উন্নতি হচ্ছে। এটা আমরা অস্বীকার করতে পারব না। যদি বলি, আগের মতোই অন্ধকারের দিকে যাচ্ছি না আমরা। উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ, ইটস নট ট্রু। এটা সত্যি নয়। স্বদেশ কিন্তু স্বদেশের মতো চলেছে। আরও ভালো চলতে পারত, যদি আমাদের চালক যাঁরা আছেন, তাঁদের যদি একটু সহনশীলতা থাকত—তাহলে আমরা আরও অনেক ভালো থাকতে পারতাম।
‘দেশের সঙ্গে—আরও একটা ব্যাপার আমার খুব খারাপ লাগে: ইউনূস সাহেবকে নিয়ে রাজনীতি। এটা আমার কাছে খুবই পেইনফুল। একটা দেশের জন্য যে বিরাট সম্মান তিনি নিয়ে এসেছেন, তাঁকে অসম্মান করা মানে দেশকেই অসম্মান করা। এই জিনিসটা কেউ বুঝতেছে না কেন আমি জানি না। উনি একজন অতিশয় ভদ্রলোক। আমি ওনাকে খুব ভালো করে চিনি। নিউইয়র্কের জ্যামাইকায় ওনার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। একজন ভালো মানুষ, কারও সাতে নাই পাঁচে নাই। নিজের মতো করে থাকেন। তাঁকে নিয়ে এই যে কাটাছেঁড়াটা হচ্ছে—এই যে থুতু আকাশের দিকে ছুড়লে নিজেদের গায়ে এসেই পড়ছে—এগুলো খুবই আনফরচুনেট, আনকাইন্ড। একজন মন্ত্রীর মন্তব্য যে নোবেল প্রাইজ পেতে হলে যুদ্ধ থামাতে হবে—এটা কেমন কথা! এটা কোনো বুদ্ধিমান লোকের কথা হলো?
‘শোনো, তোমাদের পত্রিকাতেই আমার উপন্যাস দেয়াল-এর দুটো অধ্যায় ছাপা হয়েছে। আদালতে গড়িয়েছে ব্যাপারটা। আমাকে সংশোধনের জন্য প্রচুর দলিল-দস্তাবেজ সরবরাহ করা হয়েছে। সব পড়তে গেলে দুই বছর লেগে যাবে। কিন্তু আমি জানি, যে ঘটনা নিয়ে আমি লিখেছি, সে সময়ের অনেকেই বেঁচে আছেন। তাঁদেরকে আগেই আমি পাণ্ডুলিপি পড়তে দিয়েছি। সংশোধন করা হবে। তোমাদের পত্রিকায় দুই অধ্যায় ছেপে আমি বুঝতে চেয়েছিলাম—আমি অভূতপূর্ব সাড়া পেয়েছি। অনেকে অনেক তথ্য দিয়ে সাহায্য করছে। যেমন, খালেদ মোশাররফের দুই কন্যাকে আমি দেখিয়েছি, ওদের নাম উল্লেখ করেছি, কিন্তু এখন জানলাম যে খালেদ মোশাররফের আসলে তিন কন্যা—এই ভুলগুলো তো আমি শুদ্ধ করব। আমিও চাই না কোনো ভুলভ্রান্তি থাকুক। তবে এই বই পড়ে কেউ খুশি হবে না। আওয়ামী লীগও খুশি হবে না, বিএনপিও খুশি হবে না। আমি কারও রিঅ্যাকশন নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি না। পুরো উপন্যাসটি পড়লে, কী হয়েছে অন্তত এটা জানা যাবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ গত নয় মাস আমি যেখানে যত তথ্য পেয়েছি, পড়েছি। ইন্ডিয়া থেকে বই আনিয়েছি, আর্কাইভ থেকে বই নিয়ে পড়েছি। পুরোটা সময় তো আমি এই কাজের মধ্যেই ছিলাম।
‘হতাশার কথা বলো, কিছু লোক তো ছিল আমাদের। যেমন ধরো, কর্নেল তাহের যে হাসিমুখে ফাঁসিতে ঝুললেন। এসব যখন পড়েছি, ভালো লেগেছে যে, না, আমাদের দেশে সাহসী লোকজন আছে। তারপর খালেদ মোশাররফ। কোনো রক্তপাত হয়নি তাঁর হাত দিয়ে। এ ঘটনা যখন লিখি, তখন আশাবাদী হই। যদি বলো এই উপন্যাস কেন লিখেছি। কারণ আমি নিজে এক ক্রাইসিসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, দেশে ক্রাইসিস আছে—ওই কারণে আরেকটা ক্রাইসিসকে বুঝতে চেয়েছি। দেখো, কেন আশাবাদী এর একটা উদাহরণ দিই। এই যে নিশাত আর ওয়াসফিয়া নামে পরপর দুটো মেয়ে এভারেস্টে উঠল, এটা কি পজিটিভ ঘটনা নয়? আমাদের দুই নেত্রীর সম্পূর্ণ কন্ট্রাস্ট। কাজেই সবই বদলাবে।’
সবই বদলাক, মঙ্গলময় হয়ে উঠুক আমাদের চারপাশ। সেই সঙ্গে মরণব্যাধি ক্যানসারকে পরাস্ত করে আমাদের মধ্যে ফিরে আসুক প্রিয় হুমায়ূন আহমেদ। তাঁর কলম থেকে আরও গল্প-উপন্যাস আমাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখুক অনেককাল। দরজার দিকে পা বাড়ানোর আগে আরেকবার ডাকেন হুমায়ূন আহমেদ। ‘শোনো, লেখার টানে ক্যানসার হাসপাতাল বানাব বলে ফেলেছিলাম। কিন্তু পরে যে অভূতপূর্ব সাড়া পেয়েছি, তাতে এই কাজটা আমি করে যাব। হয়তো হাজার মাইল পাড়ি দেওয়ার প্রথম পদক্ষেপটা আমি শুরু করে দিয়ে যেতে পারব। বাকিটা তোমরা শেষ করবে। আর সিনেমাটা আমার প্যাশান, আরেকটা সিনেমা বানাতে ইচ্ছে করছে, খুব।’প্রথম আলো
- DRIVER CHARGED WITH MANSLAUGHTER IN DEADLY HIT-AND-RUN IN MARCH ON JAMAICA AVENUE
- নিউইয়র্কে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক সাংসদ অধ্যাপক সেলিম ভূঁইয়াকে সংবর্ধনা, কুমিল্লা বিভাগ শুধু সময়ের ব্যাপার
- UN General Assembly Adopts Bangladesh-Led Culture of Peace Resolution
- বাংলাদেশের উত্থাপিত ‘শান্তি ও সহাবস্থানের সংস্কৃতি’ বিষয়ক প্রস্তাব গ্রহণ করল জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ
- নিউইয়র্কের জ্যামাইকায় জল খাবার রেস্টুরেন্ট এর গ্র্যান্ড ওপেনিং
- New York Attorney General James Secures $375,000 from 1-800-Flowers for Deceiving Consumers About Automatic Subscription Renewals
- নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসে বাংলাদেশি আমেরিকা পুলিশ কর্মকর্তার নামে সড়ক ‘ডিটেকটিভ দিদারুল ইসলাম ওয়ে’
- ECOSOC recommends UN General Assembly to take decision on Bangladesh and Nepal’s LDC graduation extension requests