বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে নিউইয়র্কে ‘প্যাট্রিয়টস অব বাংলাদেশ’র স্মরণানুষ্ঠান
ইউএসএনিউজঅনলাইন.কম ডেস্ক, নিউইয়র্ক : নিউইয়র্কে বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে এক স্মরণানুষ্ঠানের আয়োজন করেছে ‘প্যাট্রিয়টস অব বাংলাদেশ’। গত ৮ আগস্ট জ্যাকসন হাইটসের ডাইভার্সিটি প্লাজায় দিনব্যাপী এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে দোয়া ও শ্রদ্ধা নিবেদন, শিল্প ও আলোকচিত্র প্রদর্শনী, তথ্যচিত্র প্রদর্শন, কবিতা আবৃত্তি, দেশাত্মবোধক গান, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ‘প্রতিরোধ থেকে পুনর্গঠন’ শিরোনামে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনারও আয়োজন করা হয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত শহীদদের স্মরণ, আহতদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান, মানবাধিকার, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, জবাবদিহি, রাষ্ট্রীয় সংস্কার এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা ছিল এ আয়োজনের মূল প্রতিপাদ্য। নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটির পাশাপাশি দেশ-বিদেশের শিক্ষাবিদ, মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক, কবি, লেখক, আইনজীবী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, ব্যবসায়ী ও কমিউনিটি নেতারা সরাসরি এবং অনলাইনে এ অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্ব পরিচালনা ও সঞ্চালনায় ছিলেন আলিফ নাবিলা ও আব্দুল কাদের। বক্তারা জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহকে কেবল একটি রাজনৈতিক অধ্যায় হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার, মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির আকাঙ্ক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক অধ্যায় হিসেবে তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে সরাসরি বক্তব্য রাখেন নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি জন রিভস, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী গিয়াস আহমেদ, ভাসানী ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আলী ইমাম শিকদার, ম্যাগেলান অ্যারোস্পেসের এইচআর পেশাজীবী মুহতাসিম মাহি রহমান, সংগীতশিল্পী ও কবি নজরুল ইসলাম, “ঊনবাঙাল” এর প্রতিষ্ঠাতা কবি কাজী জহিরুল ইসলাম, “প্রবাহ” সাহিত্য সাংস্কৃতিক পরিষদ এর সদস্য সচিব কবি সোহেল হামিদ, কবি আবুল বাশার, সিনিয়র সাংবাদিক মঈনুদ্দিন নাসের, মীর মাসুম আলী, আইকিউএনএ-এর মাহতাব উদ্দিন খান, ‘প্যাট্রিয়টস অব বাংলাদেশ’র আব্দুল আলীম, দীপন গাজী ও আজিজুর রহমান।
এছাড়া বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও কমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্ট শাহ নেওয়াজ, We Are The People-এর মানবাধিকার অ্যাক্টিভিস্ট জ্যাকব মিল্টন, কমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্ট নীরা, সহকারী অধ্যাপক ড. ইমরান আনসারী, প্রফেসর আবিদ বাহার, ডা: জুন্নুন চৌধুরী, প্রফেসর শোয়াইব আহমেদ ভূঁইয়া, প্রফেসর জামেল কয় হাডসন, ড. শেখ মিজান, লেখক মিসবাহ উদ্দিন এবং লেখক আবুল কালাম আজাদ।
বক্তারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পটভূমি, আন্দোলনের সময় মানুষের আত্মত্যাগ, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ, গুম ও নির্যাতন, আয়নাঘর, শহীদ ও আহত পরিবারের ন্যায়বিচার, আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলেন। তাঁরা বলেন, জুলাইয়ের ইতিহাস সংরক্ষণ করতে হলে কেবল স্মরণসভা আয়োজন করলেই চলবে না; নতুন প্রজন্মের কাছে সত্যনিষ্ঠভাবে আন্দোলনের ইতিহাস, মানুষের আত্মত্যাগ এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ তুলে ধরতে হবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন লেখক ও গবেষক ইমাম উদ্দিন চৌধুরী, সিনিয়র সাংবাদিক মঈনুদ্দিন নাসের, সিনিয়র সাংবাদিক, লেখক ও গণমাধ্যমকর্মী তাসের মাহমুদ, BAAG-এর সভাপতি জয়নাল আবেদিন, এবং কলামিস্ট, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক রিমন ইসলাম।
এছাড়াও নিউইয়র্কের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, মানবাধিকার, পেশাজীবী ও কমিউনিটি সংগঠনের প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন। তাঁদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি বৃহৎ মিলনমেলা ও মতবিনিময়ের পরিসরে পরিণত হয়।
দেশ-বিদেশ থেকে অনলাইন ও বিশেষ সংযোগে বক্তব্য রাখেন অ্যাক্টিভিস্ট ও লেখক পিনাকী ভট্টাচার্য, অবসরপ্রাপ্ত লে. জেনারেল (অব:) আবদুল্লাহিল আমান আযমী, সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রফেসর শোয়াইব আহমেদ ভূঁইয়া এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার রক্ষক, অ্যাক্টিভিস্ট ও কলামিস্ট ড. টম।
তাঁরা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি, গুম ও নির্যাতনের অভিযোগ, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো নিয়ে বক্তব্য দেন।
এছাড়াও এলইডি স্ক্রিনে ধারণকৃত বক্তব্যের মাধ্যমে অনুষ্ঠানে যুক্ত হন ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ এবং একুশে পদকপ্রাপ্ত মানবাধিকারকর্মী, আলোকচিত্রী ও লেখক ড. শহিদুল আলম। তাঁদের বক্তব্যে জুলাই বিপ্লব, মানবাধিকার, ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে।
সাংস্কৃতিক পর্বে শিল্পী সুরাইয়া আক্তার সাইফা-র “শ্রাবণের বিপ্লব” পরিবেশনা এলইডি স্ক্রিনে প্রদর্শিত হয়। তাঁর পরিবেশনায় জুলাইয়ের সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও বিপ্লবের চেতনাকে শিল্পের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়।
বক্তাদের আলোচনায় বিশেষভাবে উঠে আসে—জুলাইয়ে যারা জীবন দিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন, তাঁদের আত্মত্যাগকে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি জনসচেতনতা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানের প্রতি সমর্থন ও শুভেচ্ছা জানান মার্কিন কংগ্রেসম্যান নিক লালোটা এবং কংগ্রেসম্যান টম সুয়োজি।
নিউইয়র্ক সিটি পাবলিক অ্যাডভোকেট জুমানে ডি. উইলিয়ামসের পক্ষ থেকে ডেপুটি পাবলিক অ্যাডভোকেট কাশিফ হুসেইন অনুষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন এবং শুভেচ্ছা ও সংহতি প্রকাশ করেন।
আয়োজকেরা বলেন, নিউইয়র্কের মতো বহুজাতিক ও বহুসাংস্কৃতিক শহরে বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস তুলে ধরার মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিরা গণতন্ত্র, মানবাধিকার, নাগরিক অংশগ্রহণ ও মানবিক মর্যাদার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংযোগ আরও জোরদার করতে চান।
অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পর্বে বিশেষ আকর্ষণ ছিলেন নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় ব্যান্ড প্রমিথিউসের বিপ্লব। তিনি বিপ্লবী ও দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করে দর্শকদের উজ্জীবিত করেন। তাঁর পরিবেশনায় জুলাইয়ের সংগ্রাম, দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ এবং ঐক্যের বার্তা উঠে আসে। দর্শকদের উদ্দেশে তিনি বিভেদ ভুলে দেশের স্বার্থ, গণতান্ত্রিক অধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
এছাড়া ‘প্যাট্রিয়টস অব বাংলাদেশ’র ব্যান্ড বিপ্লবী গান পরিবেশন করে। সংগীত পরিবেশনায় অংশ নেন আব্দুল কাদের, ইকবাল, সাগর, আনাফ, মাহি, দীপন গাজী ও শাহ লিটন।
গান, কবিতা ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক পরিবেশনার পাশাপাশি অনুষ্ঠানে “ছত্রিশ জুলাই” শীর্ষক পুঁথি পরিবেশিত হয়। আয়োজকদের মতে, শিল্প ও সংস্কৃতির মাধ্যমে জুলাইয়ের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে সহজ ও আবেগঘনভাবে পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবেই এসব আয়োজন রাখা হয়।
বক্তারা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের ইতিহাস জাতীয় স্মৃতির অংশ হিসেবে সংরক্ষণ করতে হবে। একই সঙ্গে আহতদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন, শহীদ পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তাঁরা।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, “জুলাই বিপ্লব শুধু বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটি মানুষের স্বাধীনতা, মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য আত্মত্যাগের একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়।”
আয়োজকরা বলেন, নিউইয়র্ক থেকে বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস ও চেতনাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরা, প্রবাসী নতুন প্রজন্মকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত করা এবং মানবাধিকার, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তোলাই এ আয়োজনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচন ২০২৬: কুনু-ফিরোজ পরিষদের আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচারণা শুরু ব্রঙ্কস থেকে
- বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে নিউইয়র্কে ‘প্যাট্রিয়টস অব বাংলাদেশ’র স্মরণানুষ্ঠান
- কোরআন ও হাদিসের আলোকে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ)
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ কনস্যুলেটে জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান দিবসের দ্বিতীয় বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা: ‘আমন্ত্রণপত্র’ ও শুধুমাত্র আমন্ত্রিত ‘অতিথি-তালিকার’ ভিত্তিতে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচন ১৮ অক্টোবর
- নিউইয়র্কে বর্ণাঢ্য সাউথ এশিয়ান ইউনিটি প্যারেড
- নিউইয়র্কে বরুড়া উপজেলা অ্যাসোসিয়েশন ইউএসএর বার্ষিক বনভোজন
- নিউইয়র্কে বঙ্গমাতার ৫১তম মৃত্যুবার্ষিকী পালন বঙ্গমাতা পরিষদ যুক্তরাষ্ট্র’র