পৃথিবীতে বাংলাদেশই একটি মাত্র দেশ যে দেশে স্বাধীনতার পক্ষের আর বিপক্ষের লোক বসবাস করে-যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গবন্ধু পরিষদ-এর সম্মেলনে ড. মুনতাসির মামুন
সালাহউদ্দিন আহমেদ : নিউইয়র্ক (ইউএনএ): যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গবন্ধু পরিষদ আয়োজিত বঙ্গবন্ধু সম্মেলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক ড. মুনতাসির মামুন বলেছেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই দেশের একমাত্র রাজনীতিক যিনি একাগ্র চিত্তে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আর বাংলাদেশকে বাঙালীদের বাসভূমি করতে চেয়েছেন। তিনি বলেন, আমরা ঝুঁকি নিয়েছি, লড়াই করেছি, বিজয়ী হয়েছি। তিনি বলেন, যতদিন বাংলাদেশ, বাঙালী জাতি থাকবে ততদিন বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকবেন স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য, আর কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঁেবচে থাকবেন বাংলা ভাষার জন্য।যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গবন্ধু পরিষদ আয়োজিত বঙ্গবন্ধু সম্মেলনে ‘বঙ্গবন্ধু স্মারক বক্তৃতা’য় ড. মুনতাসির মামুন উপরোক্ত কথা বলেন। গত ১৭ জুন সিটির এস্টোরিয়াস্থ কাব সনমে প্রথমবারের মতো বঙ্গবন্ধু সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সম্মেলনের অনুষ্ঠানমালার মধ্যে ছিলো বঙ্গবন্ধুর উপর নির্মিত প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শন, কবিতা আবৃত্তি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাটিকা প্রভৃতি, পুঁথি পাঠ অনুষ্ঠান এবং স্মরণিকা প্রকাশ।
সম্মেলনের অনুষ্ঠানমালার শুরুতেই বিকেল ৬টার দিকে প্রদর্শিত হয় ‘কেন তিনি জাতির পিতা’ শীর্ষক প্রামাণ্য চিত্র। এক ঘন্টা ১২ মিনিটের প্রামাণ্য চিত্রটি নির্মাণ ও সম্পাদনা করেছেন খান শওকত। এরপর ছিলো কবিতা আবৃত্তি, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক নাটিকা ও স্মারক বক্তৃতা। ব্যতিক্রমী স্মারক বক্তৃতা পর্বের শুরুতেই সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শিতাংশু গুহ ও সভাপতি ড. নূরুন্নবী।

ড. মুনতাসির মামুন তার স্মারক বক্তব্যে মূলত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৪৮ সাল থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় তাঁর আন্দোলন-সংগ্রামের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ১৯৪৮ সালে বঙ্গবন্ধু কলকাতা থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে এসে ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পরেন। আর এই ভাষা আন্দোলনই বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপ নেয়। তিনি বলেন, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর অনুগামী হিসেবে বঙ্গবন্ধু গণতান্ত্রিক আন্দোলন শুরু করেন। বাংলা ভাষা আর বাংলার ভূখন্ডের জন্য বঙ্গবন্ধুর আন্তরিকতা ছিল তীব্র।
ড. মুনতাসির মামুন ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু অংশগ্রহণ করেননি’ সম্পর্কে বদরুদ্দীন ওমরের লেখা মিথ্যা, ভিত্তিহীন। তিনি বলেন, পৃথিবীতে বাংলাদেশই একটি মাত্র দেশ যে দেশে স্বাধীনতার পক্ষের আর বিপক্ষের লোক বসবাস করে।
ড. মুনতাসির মামুন বলেন, বঙ্গবন্ধুই ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দিয়ে বাংলা ভাষা, বাংলাদেশ আর অসাম্প্রদায়িক চেতনা বুঝিয়েছেন। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের গুণের কারণেই শামসুল হকের (বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক) নেতৃত্ব ম্লান হয়ে যায়। আর স্বাধীনতার আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগের ভিত্তি রচনা করেন বঙ্গবন্ধু।

দৈনিক ইত্তেফাকের মালিক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সাথে বঙ্গবন্ধুর সম্পর্কের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, মানিক মিয়ার সাথে বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন বিষয়ে মতান্তর থাকলেও তাঁদেও মধ্যে সুসম্পর্ক বিদ্যমান ছিলো। বঙ্গবন্ধুর অনুরোধেই মানিক মিয়া তৎকালীন সময়ে বাংলাদেশ ছেড়ে কলকাতা বসবাসের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন এবং ইত্তেফাক প্রকাশনায় উদ্বুদ্ধ হন। সেই দিক বিবেচনায় ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব।
ড. মুনতাসির মামুন বলেন, ১৯৬০ সালেই বঙ্গবন্ধুর মধ্যে স্বাধীনতা আন্দোলন তীব্রভাবে দানা বাঁধে এবং কিভাবে বাংলাদেশ স্বাধীন করা যায় তা ভাবতে থাকেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন করতে বঙ্গবন্ধু প্রথমেই ভারতকে বন্ধু হিসেবে কাছে পেতে কূটনৈতিক পথে কাছে টানেন। এ প্রসঙ্গে তিনি ১৯৬২ সালের ২৪ ডিসেম্বর তৎকালীন ভারতীয় কূটনীতিক শশাংকের সাথে ইত্তেফাক অফিসে গভীর রাতে মানিক মিয়া ও বঙ্গবন্ধুর বৈঠক, বৈঠক শেষে তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী জোয়াহের লাল নেহেরুর কাছে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় ভারতের সহায্য-সহযোগিতা ও সমর্থন প্রদান সংক্রান্ত গোপন চিঠি প্রদানের কথা উল্লেখ এবং সেই সময়ই মানিক মিয়া ও বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার রুট ম্যাপ তৈরী করেন। ড. মামুন বলেন, তখন সিদ্ধান্ত হয় যে. বঙ্গবন্ধু লন্ডনে চলে যাবেন এবং লন্ডন থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দেবেন। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু গোপনে ভারতে যান এবং ভারত সরকারের পরামর্শে বঙ্গবন্ধু ঢাকায় অবস্থান করে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। পরবর্তীতে তিনি ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হন এবং আন্দোলনের মুখে মুক্ত হন। ড. মামুন বলেন, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নেহেরু বঙ্গবন্ধুর উদ্দেশ্যে বলেছিলেন যেদিন তার (বঙ্গবন্ধু) সমাবেশে লক্ষ লোকের সমাবেশ হবে সেদিন বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সমর্থন পাওয়া যাবে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর কাছে প্রেরীত চিঠির ভিত্তিতেই পরবর্তীতে চার নীতির আলোকে বাংলাদেশ স্বাধীন করার আন্দোলন গড়ে তোলা হয়।

ড. মুনতাসির মামুন বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন করার লক্ষ্যে ১৯৬২ সালে বঙ্গবন্ধু তরুণদের নিয়ে গোপনে নিউকিয়ার গঠন করেন এবং গোপন কূটনৈতিক আলোচনা প্রেক্ষিতে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী বলেন যে, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যুদ্ধ হলে ভারত সরকার সকল প্রকার সহযোগিতা দেবে। পরবর্তীতে ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর ঢাকায় আয়োজিত হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী স্মরণ সভায় বঙ্গবন্ধু প্রথম পূর্ব পাকিস্তানের নাম ‘বাংলাদেশ’ ঘোষণা দেন এবং ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণের পর কবি রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের লেখা ‘সোনার বাংলা’ গানটি স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এছাড়া ১৯৭১ সালের ৮ জানুয়ারী অস্থায়ী সরকার গঠন কথা তাজউদ্দিন আহমেদকে জানানো হয়।

পাকিস্তান কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীন বাংলাদেশ প্রত্যাবর্তন প্রসঙ্গে ড. মুনতাসির মামুন বলেন, ভারতীয় কূটনীতিক মি. শশাংকের পরামর্শে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টোর ঘনিষ্ঠ বান্ধবী লায়লা নামের এক রমনীর স্বামীকে দিল্লী থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে ভুট্টোর সাথে লায়লার আলোচনা করার এক পর্যায়ে লায়লা প্রস্তাব করেন যে, বঙ্গবন্ধুর মুক্তি হতে পারে ভারত যদি সেদেশে আটক ৭৩ হাজার যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি দেয়। সেই আলোচানার জের ধরেই বঙ্গবন্ধুর মুক্তির পথ সুগম হয় এবং লন্ডন থেকে ভারতীয় প্লেনে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ ফিরে আসার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তুু তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর পরামর্শে ভারতীয় নয় বৃটিশ এয়ারওয়েজে বঙ্গবন্ধুর ফেরার সিদ্ধান্ত হয় এই ভেবে যে, তখন পর্যন্ত বৃটেন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দিলেও তাদের বিমানে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশে ফিরলে সেটিও হবে এক ধরণের স্বীকৃতি।বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার প্রসঙ্গে ড. মামুন বলেন, বৃটিশ বিমান যোগে বাংলাদেশ ফেরার পথে দিল্লীতে যাত্রা বিরতিকালে বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে আনুষ্ঠানিক বৈঠকের আগেই কৌশলে মি. শংকরের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে বার্তা পাঠান যে, তাঁদের বৈঠকে মার্চ মাসের মধ্যেই বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সৈন্য ফিরিয়ে নেয়া হবে সেই ঘোষণাই যেন হয়। পরবর্তীতে সেই সিদ্ধান্তই কার্যকর হয়।

ড. মুনতাসির মামুন তার বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে বলেন, আমরা ঝুঁকি নিয়েছি, লড়াই করেছি, বিজয়ী হয়েছি। তিনি বলেন, যতদিন বাংলাদেশ, বাঙালী জাতি থাকবে ততদিন বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকবেন স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য, আর কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঁেবচে থাকবেন বাংলা ভাষার জন্য।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে স্থানীয় শিল্পীরা সঙ্গীত ও নৃত্য পরিবেশন করেন। অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় ছিলেন ফাহিম রেজা নূর। বঙ্গবন্ধু সম্মেলন উপলক্ষ্যে ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ শীর্ষক একটি স্মরণিকা প্রকাশিত হয়। বিপুল সংখ্যক দর্শক-শ্রোতা অনুষ্ঠানটি উপভোগ করেন।
- DRIVER CHARGED WITH MANSLAUGHTER IN DEADLY HIT-AND-RUN IN MARCH ON JAMAICA AVENUE
- নিউইয়র্কে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক সাংসদ অধ্যাপক সেলিম ভূঁইয়াকে সংবর্ধনা, কুমিল্লা বিভাগ শুধু সময়ের ব্যাপার
- UN General Assembly Adopts Bangladesh-Led Culture of Peace Resolution
- বাংলাদেশের উত্থাপিত ‘শান্তি ও সহাবস্থানের সংস্কৃতি’ বিষয়ক প্রস্তাব গ্রহণ করল জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ
- নিউইয়র্কের জ্যামাইকায় জল খাবার রেস্টুরেন্ট এর গ্র্যান্ড ওপেনিং
- New York Attorney General James Secures $375,000 from 1-800-Flowers for Deceiving Consumers About Automatic Subscription Renewals
- নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসে বাংলাদেশি আমেরিকা পুলিশ কর্মকর্তার নামে সড়ক ‘ডিটেকটিভ দিদারুল ইসলাম ওয়ে’
- ECOSOC recommends UN General Assembly to take decision on Bangladesh and Nepal’s LDC graduation extension requests