Friday, 23 October 2026 |
শিরোনাম
ওয়ার্ল্ড হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট ইউএসএর সাধারণ সম্পাদক ড. সাদিয়া আফরিন এরা চরমোনাই পীরের যুক্তরাষ্ট্র সফর উপলক্ষে নিউইয়র্কে দোয়া মাহফিল, কুরআন-সুন্নাহর আলোকে বয়ান New York Attorney General James Secures Reimbursements for T-Mobile Customers Whose Rates Were Unjustly Raised নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে কুনু-ফিরোজ পরিষদের সাত দফা ইশতেহার ঘোষণা; কমিউনিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠা, সাশ্রয়ী ফিউনারেল সেবা, বিমানের সরাসরি ফ্লাইট ও আর্থিক স্বচ্ছতায় অঙ্গীকার ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের পূর্ণ সমর্থন: জাতিসংঘে রাষ্ট্রদূত আইরিন খান নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে প্রথমবারের মতো বিতর্ক, গুরুত্ব পেল স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি New York Attorney General James Warns New Yorkers About AI-Generated Election Misinformation Ahead of November Elections Bangladesh calls for global treaty to protect victims of crimes against humanity নিউইয়র্কে জাতিসংঘে মুহাম্মদ নওশাদ জমির এমপি: মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রতিরোধে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সনদ প্রণয়নের আহ্বান সোশ্যাল মিডিয়ার তথ্য গোপন করলে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাখ্যান, আবেদনপত্রে চাওয়া তথ্য সঠিক ও সম্পূর্ণভাবে দেওয়ার নির্দেশনা মার্কিন দূতাবাসের
সব ক্যাটাগরি

কালের যাত্রায় চিঠি কী হারিয়ে যেতে বসেছে?

অনলাইন ডেস্ক পঠিত: 160 বার

প্রকাশিত: July 13, 2012 | 4:49 PM

Details

আসিফুর রহমান সাগর  : “ ….এটা ঠিক যে, চিঠি লেখার প্রবণতা কমে আসায় এর ভাষার নান্দনিকতা, শিল্প—তা হারিয়ে যাচ্ছে। চিঠি লেখার মধ্য দিয়েই সাহিত্য রচনার সূচনা ঘটে। কিশোর বয়সে প্রেমের চিঠি লেখার মধ্য দিয়েই কবিত্বের শুরু, ভাষার ব্যবহার শিক্ষা হয়। তাই চিঠির আনন্দ কোনভাবেই প্রযুক্তির মধ্য দিয়ে পাওয়া সম্ভব নয়।”

কালের যাত্রায় চিঠি কী হারিয়ে যেতে বসেছে? প্রিয়জনের কথা জানবার প্রতি মানুষের যে তীব্র ব্যাকুলতা তা যেন হঠাত্ করেই উবে গেছে জীবন থেকে। কতদিন দরজায় এসে কড়া নাড়ে না পোস্ট অফিসের পিওন। অথচ আধুনিক ডাক ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে গত পৌনে দুইশ বছর ধরে রচিত হয়েছে মানুষের অগ্রযাত্রার ইতিহাস।

অনেকের মতে কাগজে লিখলে চিঠি আর ইমেইল করলে তা চিঠি নয়—এমন তো নয়। চিঠি সবই। তবে এটা ঠিক, কাগজে চিঠি লিখতে বসলে একাকী ঘরে অনেক কথা চলে আসে। ইমেইলে যেন সেই জিনিসটা হয় না। কেন হয় না—কে বলতে পারে।

করুণা করে হলেও চিঠি দিও, খামে ভরে তুলে দিও/

আঙ্গুলের মিহিন সেলাই/

ভুল বানানেও লিখো প্রিয়, বেশি হলে কেটে ফেলো তাও,/

এটুকু সামান্য দাবি, চিঠি দিও, তোমার শাড়ির মতো/

অক্ষরের পাড়-বোনা একখানি চিঠি। (চিঠি দিও, মহাদেব সাহা)

আবেগমাখা সেই চিঠি লেখার অভ্যাস মানুষের মাঝ থেকে হারিয়েই যাচ্ছে। ডাক বিভাগের পোস্টম্যান হলুদ খামভরা গুপ্ত কথার ঝুলি নিয়ে ঘুরে ঘুরে যে চিঠি বিলি করতো সেই আকর্ষণ এখন কোথায়! হারিয়েই গেছে। ইমেইল, মোবাইল ফোনের খুদে বার্তা, ফেইসবুক, স্কাইপেতে ভিডিও চ্যাটের জমানায় এ প্রজন্মের কাছে চিঠির সেই তীব্র আকর্ষণ গেছে ফিকে হয়ে।

‘চিঠি দিও প্রতিদিন, চিঠি দিও, নইলে থাকতে পারবো না’ বাংলা সিনেমার হূদয়ে আলোড়ন তোলা সেই গান আর কী কোন আবেদন রাখে এ প্রজন্মের কাছে? অথচ প্রযুক্তির এই জোয়ারের আগে ডাক বিভাগের  বিলি করা চিঠিই ছিল যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম।

‘এখন তুমি কোথায় আছো, কেমন আছো পত্র দিও/শেষ বিকালে মেলায় কেনা খামখেয়ালীর তাল পাখাটা/খুব নিশীথে তোমার হাতে কেমন আছে/পত্র দিও’— হেলাল হাফিজের এ কবিতায় প্রেমিকার কাছে প্রেমিকের যে তীব্র আবেগমাখা উচ্চারণ—সেই আবেগমাখা কথামালা বয়ে আনে চিঠি। খামের ভাঁজে আবেগবন্দি চিঠি কী আলোড়নই না তুলেছে মানুষের মনে। প্রিয়জনের চিঠির প্রতীক্ষা যে কী তীব্র আকুলতা সৃষ্টি করতো—তা বলে বোঝাবার নয়।

চিঠিতে উঠে আসে সময়, জীবনযাত্রার ইতিহাস

প্রাচীনকাল থেকে চিঠির মাধ্যমে উঠে এসেছে সময়, মানুষের জীবনযাত্রার ইতিহাস। সৃষ্টিশীলতার বিকাশও ঘটতে দেখা গেছে চিঠির মধ্য দিয়ে। রবীন্দ্রনাথের চিঠিতে যেভাবে মানুষের জীবন, প্রকৃতি, রাজনীতি ও সমাজনীতি উঠে এসেছে, যেভাবে সোজাসাপটা ভাষায় তিনি সবকিছু বর্ণনা করেছেন তা এ সময়ের মানুষের কাছে চলার দিকনিদের্শনাও দেয়। প্রখ্যাত দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কাছে লেখা চিঠি নিয়ে পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত হয়েছে গ্রন্থ। ‘আনআর্নড ভিক্টরি’ শিরোনামে এ গ্রন্থ শান্তিকামী মানুষের কাছে পথনির্দেশকের ভূমিকা রেখে চলেছে আজো। মেয়ে ইন্দিরার (পরবর্তী সময়ে ইন্দিরা গান্ধী) কাছে জওহরলাল নেহরুর লেখা চিঠি নিয়ে প্রকাশিত দুইটি গ্রন্থ ‘লেটার ফ্রম এ ফাদার টু হিজ ডটার’ এবং ‘গ্লিম্পসেস অব ওয়ার্ল্ড হিস্টরি’ আজো আগ্রহী পাঠকের কাছে বিস্ময়ের সৃষ্টি করে। ১৯২৮ সালে ইন্দিরার বয়স যখন মাত্র ১০ বছর, তখন নেহরু তাকে প্রাকৃতিক ইতিহাস ও সভ্যতার বিকাশ নিয়ে ধারণা দিতে লিখেন প্রথম গ্রন্থে স্থান পাওয়া ৩০টি চিঠি। দ্বিতীয় গ্রন্থে স্থান পাওয়া ১৯৬টি চিঠি নেহরু লিখেন ১৯৩০ থেকে ১৯৩৩ সালের মধ্যে, ভারতের বিভিন্ন জেলে থাকা অবস্থায়। এসব চিঠিরও মূল বিষয় পৃথিবীর ইতিহাস, মানবজাতির ইতিহাস। ফলে ব্যক্তিগত চিঠিও কখনো কখনো পরবর্তীকালের জন্য হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ ও শিক্ষার মাধ্যম।

তরুণদের ভাবনায় ‘চিঠি’

‘চিঠি! সেটা আবার কী জিনিস?’ বলছিলেন আইটি প্রফেশনাল শাহাদত হোসেন। বেসরকারি অফিসে কর্মরত মমতা সুলতানা বললেন, ‘আমি কখনোই চিঠি লিখিনি। বড় হওয়ার পর থেকে ফোন ও ইন্টারনেট পেয়েছি। যা যোগাযোগ রক্ষা করার সব ই-মেইল আর ফোনে কথা বলেই সেরে নিই। চিঠি লেখার তাগিদ বোধ করি না কখনো।’ ইডেন কলেজের মাস্টার্স পড়ুয়া ছাত্রী তানিয়া ফারহানা বললেন, ‘আমি এখনো চিঠি লিখি। বিশেষ করে আমার প্রেমিকের কাছে। সব কথা মুখে বলা যায় না। এসএমএসে সব কথা বলা যায় না। তাই আমার কাছে চিঠির বিকল্প নেই।’ বেসরকারি অফিসের এক্সিকিউটিভ হাসনা হেনা বারী বললেন, ‘আমি চিঠি লিখি। নিয়মিতই। মন খারাপ থাকলে বেশি লিখি চিঠি। আর চিঠি পাইও অনেক। বিশেষ করে প্রেম নিবেদন যারা করে তারা চিঠিতেই বেশি করে।’

‘চিঠি হচ্ছে ভবিষ্যতের কাছে রেখে যাওয়া আত্মজীবনী’

কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন বললেন, প্রযুক্তির তাত্ক্ষণিক প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু চিঠির রয়েছে স্থায়িত্ব। ই-মেইলে মানুষের মানবিক জায়গাটা ধরা যায় না। দ্রুত যোগাযোগের জন্য ইন্টারনেট প্রয়োজনীয়। তাই দোষটা প্রযুক্তির নয়, ব্যক্তির অভ্যাসের।

তিনি বলেন, মায়ের চিঠি ছেলের কাছে যাবে, পিতার কাছে সন্তানের চিঠি বা ভালোবাসার মানুষের কাছে চিঠি লিখে যে আবেগটা ধরা দেয়, এর যে মানবিক, নান্দনিক মূল্য রয়েছে—সেটা ইমেইলে বা খুদে বার্তায় আসবে না। ব্যস্ততা, প্রয়োজনের কারণে সৃষ্ট দূরত্ব—মানুষে মানুষে সম্পর্কের টান ও পরস্পরের প্রতি যে ব্যাকুলতা তা হারিয়ে ফেলছে। ফলে অন্তরঙ্গ প্রতিটি সম্পর্কের মধ্যে ফাঁক সৃষ্টি করছে।

তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথের ‘ছিন্নপত্র’র লেখাগুলো আমাদের সেই সময়টাকে বুঝতে সহযোগিতা করে। চিঠি হারিয়ে গেলে এই যে ইতিহাস, মানুষের জীবন এবং সময় হারিয়ে যাবে। হারিয়ে যাবে ভাষার নান্দনিকতা।

কবি মহাদেব সাহা বললেন, চিঠি হচ্ছে মানুষের আবেগ প্রকাশের প্রাচীনতম মাধ্যম, আর ভবিষ্যতের কাছে রেখে যাওয়া আত্মজীবনী। প্রযুক্তি এখন মানুষকে দারুণভাবে প্রভাবিত করছে। তার জীবনযাপনে একটা আলোড়ন তুলেছে। তবে এটা সাময়িক। মানুষ আবারও চিঠি লিখবে। কেননা, মনের গোপনতম ভাবনা মুখে বলা যায় না, ইমেইল বা খুদে বার্তায় তা আঁটে না। চিঠিতেই তা পরিপূর্ণভাবে ব্যক্ত করা যায়।

তিনি বলেন, এটা ঠিক যে, চিঠি লেখার প্রবণতা কমে আসায় এর ভাষার নান্দনিকতা, শিল্প তা হারিয়ে যাচ্ছে। চিঠি লেখার মধ্য দিয়েই সাহিত্য রচনার সূচনা ঘটে। কিশোর বয়সে প্রেমের চিঠি লেখার মধ্য দিয়েই কবিত্বও শুরু, ভাষার ব্যবহার শিক্ষা হয়। তাই চিঠির আনন্দ কোনভাবেই প্রযুক্তির মধ্য দিয়ে পাওয়া সম্ভব নয়। আমরা যুগের পরিবর্তনকে মেনে নেব; কিন্তু তার জন্য নিজের ভাব প্রকাশের স্বকীয়তাকে বিসর্জন দেব না।

চিঠির ভাষা, কাগজে রোমান্টিকতা

রানার ছুটেছে তাই ঝুম ঝুম ঘণ্টা বাজছে রাতে

রানার চলেছে খবরের বোঝা হাতে,

রানার চলেছে, রানার! …

… কত চিঠি লেখে লোকে—

কত সুখে, প্রেমে, আবেগে, স্মৃতিতে, কত দুঃখে ও শোকে

(রানার, সুকান্ত ভট্টাচার্য)

শুধু বিষয় বৈচিত্র্যই নয়, মনের কথা লিখবার আকুতি তা বলবার ধরনেরও ছিল নানা আঙ্গিক। চিঠিতে লেখার চলেও ছিল নানা বৈচিত্র্য। চিঠির শুরুতেই ‘এলাহী ভরসা’ লেখার চল আজো চালু রয়েছে। গুরুজনদের চিঠি লেখার সময় ‘শত কোটি সালাম’ লেখাও ছিল বেশ জনপ্রিয়। চিঠিতে সম্বোধনের পরে ‘পর সমাচার এই যে’ এই বলেও চিঠি লিখতেন অনেকে। তবে ভালোবাসার মানুষটিকে চিঠি লিখবার জন্য চিঠি লিখবার বাহারি প্যাড মিলতো বাজারে। গোলাপি, নীল নানা রোমান্টিক রঙে, প্রেমের আমন্ত্রণী বাণী জলছাপ দিয়ে লেখা থাকতো সেসব প্যাডে। থাকতো ফুলেল নকশার বাহার। ভালোবাসার মানুষের কাছে চিঠি লিখবার সম্বোধনগুলোই বেশ চমকপ্রদ। ‘সুচরিতাষু’, ‘প্রিয়তমেষু’ দিয়ে অনেকেই শুরু করতেন চিঠি।

মজার চিঠি

চিঠি নিয়ে রয়েছে অনেক মজার মজার ঘটনাও। ১৮৬২ সালের কথা। ফ্রান্সের বিখ্যাত সাহিত্যিক ভিক্টর হুগোর উপন্যাস ‘লা মিজারেবল’ প্রকাশিত হয়েছে। লেখক তার বইয়ের বিক্রি নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন ছিলেন। তিনি প্রকাশককে একটি চিঠি লিখলেন। চিঠিতে কোন কথা ছিল না। খালি পাতায় শুধু লেখা ছিল ‘?’। প্রকাশকও কম রসিক ছিলেন না। তিনি উত্তরে লিখেছিলেন ‘!’। এটিই পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট চিঠির আদান-প্রদান বলে স্বীকৃত। আর বিশ্বের দীর্ঘতম চিঠিটি কত বড় শুনবেন? সেটি হচ্ছে ৩ হাজার ২০০ ফুট লম্বা। ১৯৫২ সালের কথা। কোরিয়া যুদ্ধ চলছে। সে সময় নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের এক নারী তার প্রেমিককে পাঠিয়েছিলেন। যিনি কোরিয়ার যুদ্ধের মার্কিন সেনাবাহিনীর সৈনিক ছিলেন। এই চিঠি লিখতে তার এক মাস সময় লেগেছিল।

ডাক ব্যবস্থার প্রচলন

মানুষের সভ্যতার শুরু থেকেই সংবাদ আদান-প্রদান করে আসছে। তবে প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার সুমের অঞ্চলের (বর্তমানে ইরাক ও সিরিয়ার মধ্যবর্তী অঞ্চল) অধিবাসীদের সংবাদ আদান-প্রদানের পদ্ধতিই ইতিহাসের প্রাচীনতম নিদর্শন হিসাবে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। সেটাও কিন্তু কম প্রাচীন নয়। যিশুখ্রিস্টের জন্মের সাড়ে তিন হাজার বছর আগের কথা। সুমেরীয় অধিবাসীরা মাটির পাতলা পাত তৈরি করে কাঁচা অবস্থায় তার উপর সংবাদ, আদেশ-নির্দেশ খোদাই করে লিখতো। এরপর তা আগুনে পুড়িয়ে পাঠানো হতো। তবে নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল আরো পরে।

প্রাচীন সভ্যতার আরেক পীঠস্থান চীনে যোগাযোগ ব্যবস্থার নিদর্শন পাওয়া গেছে একাদশ শতকে। চৌ রাজবংশ ‘ই-চেন’ নামে ডাক ব্যবস্থা গড়ে তোলে। এর অধীনে দশ হাজার ডাকচৌকি বসানো হয়। সংবাদ আদান-প্রদানের জন্য দুই লাখ ঘোড়া ও ঘোড়সওয়ার কর্মরত ছিল।

খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে ইরানে (তত্কালীন পারস্য) সাইরাস বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। এ সাম্রাজ্যেও যোগযোগ রক্ষায় তিনি রানার বাহিনী গড়ে তোলেন। এটিই ছিল প্রথম আধুনিক ব্যবস্থা। যা বর্তমান যুগের ডাক ব্যবস্থার মূলমন্ত্র। এই ব্যবস্থা থেকে গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাস ৪৮৫ অব্দে এক চমত্কার মন্তব্য করেছিলেন। যা পরবর্তীকালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কেও প্রধান ডাকঘরের ফটকের সামনে লেখা রয়েছে।

‘তুষারপাত অথবা বৃষ্টি, প্রখর উত্তাপ কিংবা রাত্রির নিকষ অন্ধকার.

কোনকিছুই এই সংবাদ বাহকদের কর্তব্য পালন থেকে বিচ্যুত করতে পারে না।’

রানার বা ডাকহরকরাদের শ্রম ও নিরলস সেবার প্রাচীনতম নিদর্শন এটাই। যা সব যুগে স্বীকৃত।

তবে ডাকটিকিটের মাধ্যমে যে ডাক ব্যবস্থার প্রচলন তা হয়েছে মাত্র ১৭২ বছর আগে। ১৮৪০ সালের ১ মে ইংল্যান্ডে চিঠিপত্র আদান-প্রদানে ডাকঘরের মাধ্যমে ডাকটিকিট প্রবর্তন করা হয়। আর এই কার্যক্রম শুরু হয় ৬ মে থেকে। এই ডাকটিকিটের ব্যবহার বিশ্বব্যাপী একটি সুনিয়ন্ত্রিত পদ্ধতির সূত্রপাত করে তেমনি একটি দেশের পরিচয়, তার ইতিহাস-ঐতিহ্যকে ডাকটিকিটে ধরে রাখারও মাধ্যম হয়ে ওঠে ডাকটিকিট।

উপমহাদেশে প্রাচীনতম ডাক যোগাযোগের কথা লিপিবদ্ধ রয়েছে বৈদিক গ্রন্থ ‘অথর্ববেদে’। আদিকালে আপনজনের কাছে খবর পাঠাতে দূত ‘ক্বসিদ’ এবং কবুতর ব্যবহার করা হতো। ১২০৬ সালে দিল্লির সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবেক ডাক ব্যবস্থার উন্নতি ঘটান। তখন ডাক বিভাগকে বলা হতো ‘মাহকামা-ই-বারিদ’। এ সময়ে ‘রানার’ ঘোড়ার সাহায্যে চিঠি আদান প্রদান করা হতো। ব্রিটিশ শাসনামলে রবার্ট ক্লাইভ ১৭৬৬ সালে ডাক ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ঘটান। এর আগে কলকাতা ও শহরকেন্দ্রিক সীমিত পরিসরে ডাক ব্যবস্থার প্রচলন ছিল। আর ১৮৫৪ সালের ১ অক্টোবর উপমহাদেশে ডাকটিকিট চালু হয়।

বাংলাদেশে ডাক ব্যবস্থা

মানুষের যে চিঠি লেখার প্রতি আগ্রহ কমে আসছে এর প্রমাণ মিলছে ডাক বিভাগের বছরের পর বছর ধরে লোকসান করতে থাকায়। ২০০৬-০৭ অর্থবছর থেকে ২০০৮-০৯ অর্থবছর পর্যন্ত ডাক বিভাগ টানা লোকসান করে চলেছে। গত পাঁচ বছরে এ বিভাগের লোকসানের পরিমাণ ৮৪৪ কোটি ৮১ লাখ টাকা।

ডাক বিভাগ সূত্রে জানা যায়, খাম ও ডাকটিকিট বিক্রি বিগত ১০ বছরে ধারাবাহিকভাবে কমে আসছে। বর্তমানে ডাক বিভাগের আয়ের সবচেয়ে বড় খাত বৈদেশিক শাখার পার্সেল প্রেরণ।

বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল কুষ্টিয়া জেলার মুজিবনগরে বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার গঠনের সঙ্গে সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় ৫০টি মাঠ পর্যায়ের ডাকঘর চালুর মাধ্যমে যাত্রা শুরু করেছিল ডাক বিভাগ। আর ১৯৭১ সালের ২৯ জুলাই একইসঙ্গে মুজিবনগর সচিবালয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশন এবং লন্ডনের হাউজ অব কমন্সে বিশেষ ধরনের আটটি স্ট্যাম্প চালু করা হয়। এরপর বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর তদানিন্তন ইস্টার্ন সার্কেলের পোস্ট মাস্টার জেনারেল এ এম আহসানউল্লাহকে ডাক বিভাগের মহাপরিচালক নিয়োগ দেয়া হয়। বর্তমানে দেশে ডাকঘরের সংখ্যা প্রায় ৯ হাজার ৪০১টি। আর প্রতি ১৩ হাজার ৮২৮ জন নাগরিকের বিপরীতে ১টি ডাকঘর রয়েছে।ইত্তেফাক

বিজ্ঞাপন / স্পন্সরড কন্টেন্ট
ট্যাগ:
সর্বশেষ সংবাদ