বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ :পাক সেনার বইয়েই বর্বরতার চিত্র
ডেস্ক :বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাদের ‘নির্যাতন-অত্যাচারের’ নিন্দায় মুখর ছিলেন সেই সময়ে দায়িত্বে থাকা এক পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা। তবে জীবদ্দশায় তিনি এসব বর্বরতার কথা জানিয়ে যেতে পারেননি। পাকবাহিনীর চতুর্দশ ডিভিশনের মেজর জেনারেল খাদিম হোসাইন রাজা নিজের পরিবারকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, কেবল তার মৃত্যুর পরেই যেন তার স্বীকারোক্তিমূলক গ্রন্থটি প্রকাশ করা হয়। সম্প্রতি রাজার মৃত্যুর পর তার লেখা ‘আ স্ট্রেঞ্জার ইন মাই ওন কান্ট্রি ইস্ট পাকিস্তান ১৯৬৯-৭১’ বইটি পাকিস্তানে প্রকাশিত হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রবল অস্বস্তিতে পড়েছে ইসলামাবাদ। মুক্তিযুদ্ধে পাকসেনাদের নির্মম বর্বরতার সবিস্তার চাক্ষুষ বিবরণই শুধু নয়, সেই সময় পূর্ব পাকিস্তানের কোন জেলায় কোন কোন সেনা কর্মকর্তা গণহত্যায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তার অকপট স্বীকারোক্তিও রয়েছে বইটিতে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে যখন বাংলাদেশে তোলপাড় চলছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই অবসরপ্রাপ্ত পাক সেনা কর্মকর্তার লেখা বইটি ইসলামাবাদের অস্বস্তি বাড়িয়েছে। বাংলাদেশ বা ভারতের বাজারে এখনও বইটি আসেনি। বইটিকে নিষিদ্ধ করার জন্য জারদারি সরকারকে চাপ দিচ্ছে পাক সেনাবাহিনী। কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে গতকাল শনিবার আনন্দবাজার পত্রিকা জানায়, খুব শিগগির বইটি যাতে পাকিস্তানের বাজারে আর না দেখা যায়, তার বন্দোবস্ত করা হচ্ছে। গত এপ্রিলে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত বইটির ওপর গত ৮ জুলাই পাকিস্তানের দি এক্সপ্রেস ট্রিবিউন পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, মেজর জেনারেল খাদিম হোসাইন রাজা তার বইটিতে জেনারেল আইয়ুব খান এবং জেনারেল ইয়াহিয়া খানের শাসনকালের বর্ণনা দিয়েছেন। পাকসেনারা কীভাবে বাঙালি নারীদের নির্যাতন করেছে, সাধারণ মানুষকে হেনস্থা করে অসদুপায়ে অর্থোপার্জন করেছে, তার বিশদ বর্ণনা রয়েছে রাজার লেখায়। পূর্ব পাকিস্তানের কমান্ডার টিক্কা খানের কথাও উল্লেখ করেছেন রাজা। তিনি জানিয়েছেন, ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে ‘বিদ্রোহ ঘোষণার জন্য’ শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রকাশ্যে ফাঁসিতে ঝোলাতে চেয়েছিলেন টিক্কা খান। মেজর জেনারেল রহিম খানের অত্যাচারের বর্ণনা দিয়ে লেখক বলেছেন, ‘আমি যদিও ব্যক্তিগতভাবে রহিমের বন্ধু ছিলাম, কিন্তু সুযোগ পেলেই তিনি আমাকে ভর্ৎসনা করতেন। তার বক্তব্য ছিল, পূর্ব পাকিস্তানের মানুষেরা একেবারেই কাপুরুষ। অনেক আগেই তাদের শায়েস্তা করা উচিত ছিল। পাঠকেরা এ থেকেই বুঝতে পারবেন, পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি সম্পর্কে কা জ্ঞানের কতটা অভাব ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের কট্টরপন্থি সামরিক কর্তাদের।’ মেজর জেনারেল রাজা জানিয়েছেন, পাকসেনাদের নারীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন আরেক কমান্ডার শেখ নিয়াজি। নির্দেশ অমান্য করার জন্য লেখকের সামনেই কোমরবন্ধ থেকে পিস্তল বের করে মেজর মোশতাক নামে এক বাঙালি কর্মকর্তাকে গুলি করেছিলেন নিয়াজি। এক্সপ্রেস ট্রিবিউন পত্রিকায় বলা হয়, মেজর জেনারেল খাদিম হোসাইন রাজা লিখেছেন, নিয়াজি তার সৈন্যদের বাঙালি নারীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। উর্দুতে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি এই হারামজাদা জাতির আকৃতিই পাল্টে দেব। এরা আমাকে কী মনে করে? এ নিয়াজিই যুদ্ধের শেষদিকে ঢাকায় ৯০ হাজার পাকসেনাসহ ভারতের ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান মেজর জেনারেল জে এফ আর জ্যাকবের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। ঢাকার পতন ঘটে। তার কিছুদিন আগেই নিয়াজি লেখকের কাছে তার পূর্ব পাকিস্তানের বান্ধবীদের ফোন নম্বর চেয়েছিলেন বলে বইটিতে জানিয়েছেন রাজা। এ স্ট্রেঞ্জার ইন মাই ওন কান্ট্রি ইস্ট পাকিস্তান, ১৯৬৯-১৯৭১ মেজর জেনারেল খাদিম হোসাইন রাজার বইটির মুখবন্ধে বলা হয়, ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানের বিয়োগান্তক ঘটনা কেবল পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর ব্যর্থতাই নয়, এটা সুশীল সমাজেরও বড় ধরনের বিপর্যয়। ওই সময় পূর্ব পাকিস্তানের ব্যাপারে পশ্চিম পাকিস্তানে সামরিক বাহিনীর নেওয়া পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কিছু প্রতিবাদ উঠেছিল। তবে তা এতটাই মৃদু ছিল যে, ওই প্রতিবাদ সেনাবাহিনীর ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। এর ফলে পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান সেনাবাহিনী পরাজিত হয় এবং পাকিস্তান ভেঙে যায়। ওই সময় লেখক পূর্ব পাকিস্তানে ১৪ ডিভিশনের জিওসি (জেনারেল কমান্ডিং অফিসার) ছিলেন। তার প্রত্যক্ষ বর্ণনায় ঘটনাবলি সম্পর্কে তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ সেনা কর্মকর্তাদের ভূমিকা উঠে আসে। তাদের মধ্যে রয়েছেন ফিল্ড মার্শাল মোহাম্মদ আইয়ুব খান, জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান, লে. জেনারেল টিক্কা খান এবং লে. জেনারেল এএকে নিয়াজি। যারা পাকিস্তানের ইতিহাস জানতে চান তাদের জন্য বইটি খুবই সহায়ক হবে। মেজর জেনারেল খাদিম হোসাইন রাজা (১৯২২-১৯৯৯) পাকিস্তানের ঝিলাম জেলার হারানপুরে এক কৃষকের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন মেজর জেনারেল (অব.) খাদিম হোসাইন রাজা। তিনি লাহোরের সেন্ট্রাল মডেল হাইস্কুল থেকে প্রথম জীবনে শিক্ষা লাভ করেন। পরে ইংরেজিতে অনার্স করেন লাহোর গভর্নমেন্ট কলেজ থেকে। ১৯৪২ সালে তিনি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং দেরাদুনে দুনে ইন্ডিয়ান মিলিটারি একাডেমী থেকে কিংস কমিশন লাভ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার আগে পর্যন্ত তিনি ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটালিয়নে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যুক্ত হন। ১৯৪৭-৪৮ সালে তিনি কাশ্মীরে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি কোয়েটা স্টাফ কলেজ এবং যুক্তরাষ্ট্রের আর্মি কমান্ড অ্যান্ড জেনারেল স্টাফ কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি নেন। পরে তিনি কাকুলে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমীতে ফার্স্ট পাকিস্তান ব্যাটালিয়নের কমান্ডের দায়িত্ব পালন করেন এবং মেজর জেনারেল পদে উন্নীত হন। অবসর নেওয়ার আগে তিনি পাকিস্তান সেনা সদরের ডিরেক্টর জেনারেল আর্টিলারির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭২ সালে খাদিম হোসাইন রাজা আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট গঠনে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি এর প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। এই প্রতিষ্ঠানে তিনি পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি মোজাম্বিকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত হন। একই সঙ্গে তিনি অ্যাঙ্গোলা, সোয়াজিল্যান্ড ও লেসোথোর দায়িত্বও পালন করেন। সমকাল
সর্বশেষ সংবাদ
- নিউইয়র্কে অ্যাসাল ওজোন পার্ক চ্যাপ্টারের ইফতার ও অভিষেক
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ ল সোসাইটি ইউএসএ’র ইফতার মাহফিল: খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকার আহ্বান
- BOROUGH PRESIDENT GIBSON HOSTS FOURTH ANNUAL BRONX IFTAR DINNER DIALOGUE UNDER THE THEME “UNITY IN DIVERSITY”
- নিউইয়র্কে মানসিক সংকটে থাকা যুবককে গুলি: পুলিশ প্রশিক্ষণ এবং মানসিক সংকটসংক্রান্ত ৯১১ কল
- নিউইয়র্কে গ্রী ম্যাকানিকেল ইয়াঙ্কার্স এর ইফতার ও দোয়া মাহফিল
- নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গমাতা পরিষদ’র ইফতার ও দোয়া মাহফিল
- নিউইয়র্কে ঢাকা জেলা অ্যাসোসিয়েশনের ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত
- বাংলাদেশ সোসাইটি অব ব্রঙ্কস নিউইয়র্ক ইনকের কোরআন তেলাওয়াত প্রতিযোগিতা ও ইফতার মাহফিল








